মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নীত করা যায় কীভাবে?

মানবাধিকার আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার একটি মৌলিক ভিত্তি। জন লক (John Locke), জাঁ জাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau) কিংবা টমাস পেইনের (Thomas Paine) মতো সামাজিক চুক্তি তত্ত্বের প্রবক্তারা রাষ্ট্রের বৈধতার উৎস হিসেবে নাগরিকের সম্মতি, নিরাপত্তা ও স্বাধীনতার সুরক্ষাকে চিহ্নিত করেছেন।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্র কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্ষমতাকেন্দ্র নয়; বরং এটি নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের জন্য গঠিত একটি নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। রাষ্ট্র যখন সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, কিংবা নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার নামে নাগরিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে, তখন সামাজিক চুক্তির নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মানবাধিকার সংকট একটি কাঠামোগত রূপ ধারণ করে।
সমসাময়িক বিশ্বে মানবাধিকার সংকটকে আর বিচ্ছিন্ন কিছু লঙ্ঘনের ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং এটি রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নাগরিকের পারস্পরিক সম্পর্কের ভেতরে নিহিত এক গভীর কাঠামোগত টানাপড়েনের প্রতিফলন।
বহু রাষ্ট্রে নিরাপত্তা, সন্ত্রাস দমন কিংবা ডিজিটাল শৃঙ্খলার নামে প্রণীত আইন ও নীতিমালা ক্রমে মতপ্রকাশ, সমাবেশ ও রাজনৈতিক ভিন্নমত নিয়ন্ত্রণের কার্যকর হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। সমস্যাটি এখানে কেবল আইনের অস্তিত্বে নয়; বরং আইন প্রয়োগের দর্শন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার জবাবদিহির অভাবে মানবাধিকার প্রান্তিক হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতি বোঝার জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ‘নিরাপত্তা বনাম স্বাধীনতা’ বিতর্কটি গুরুত্বপূর্ণ। বহু উন্নয়নশীল দেশে একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে। কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া স্থিতিশীলতা আসে না, আর স্থিতিশীলতা ছাড়া উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই যুক্তিতে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, আর মানবাধিকারকে দেখা হয় গৌণ বা বিলাসী বিষয় হিসেবে। কিন্তু ইতিহাস ও তুলনামূলক রাষ্ট্রচর্চা দেখায়, এই ধারণা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নয়।
ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো—সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক আস্থাকে উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে নিয়েছে। সেখানে রাষ্ট্র শক্তিশালী, কিন্তু সেই শক্তি প্রয়োগের মূল উৎস নাগরিক সম্মতি ও বিশ্বাস। ফলে আইন প্রয়োগে কঠোরতা থাকলেও তা ভীতিকর নয় বরং গ্রহণযোগ্য।
মানবাধিকার সংকটের আরেকটি গভীর মাত্রা হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। যখন রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় সহিংসতার জন্য দায়ীদের কার্যকরভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হয় না, তখন আইনের শাসন একটি কাগুজে ধারণায় পরিণত হয়। দার্শনিক হান্না আরেন্ট (Hannah Arendt) যেমনটি সতর্ক করেছিলেন, রাষ্ট্র যখন নাগরিকের ন্যায়ের অনুভূতিকে ভেঙে দেয়, তখন সমাজে নৈতিক অবক্ষয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। এই অবক্ষয় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে গিয়েও সামাজিক সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা এবং ভিন্নমতের প্রতি ঘৃণার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ মানবাধিকার রক্ষার অন্যতম স্তম্ভ। স্বাধীন গণমাধ্যম রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়; বরং এটি একটি সতর্ক সংকেত, যা ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সহায়ক। যুক্তরাজ্য বা কানাডার মতো দেশে সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে নয়, বরং নীতিগত সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানবাধিকার সুরক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মব সহিংসতা ও গণবিচার মানবাধিকার সংকটের একটি নতুন ও বিপজ্জনক রূপ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গুজব, পরিচয় রাজনীতি কিংবা ধর্মীয় ও আদর্শিক আবেগের ভিত্তিতে সংঘটিত এসব সহিংসতা আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে চলে। ফলে রাষ্ট্রের একচেটিয়া বলপ্রয়োগের নীতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং নাগরিকদের মধ্যে ন্যায়বিচারের ধারণা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। রাষ্ট্র যখন এ ধরনের সহিংসতায় কার্যকর হস্তক্ষেপে ব্যর্থ হয় বা নীরব থাকে, তখন মানবাধিকার সংকট কেবল রাষ্ট্রীয় নয়, সামাজিক সংকটেও রূপ নেয়।
মানবাধিকার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, সাংবিধানিক ঘোষণা ও নীতিগত অঙ্গীকার যথেষ্ট নয়; কার্যকর প্রয়োগই মূল চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে জার্মানির অভিজ্ঞতা, এই বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে। সেখানে ‘মানব মর্যাদা অক্ষুণ্ণ’ নীতিকে সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা জরুরি অবস্থাতেও মানবাধিকারের মৌলিক কাঠামো ভাঙার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত রাখা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, মানবাধিকার রাষ্ট্রের দুর্বলতা নয়; বরং নৈতিক বৈধতার প্রধান উৎস।
আরও পড়ুন
মানবাধিকার সংকট রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সামাজিক মানসিকতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা যখন শত্রুতায় রূপ নেয় এবং ভিন্নমতকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন মানবাধিকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞতা দেখায়, সহিংস অতীতের পরও স্বীকারোক্তি, জবাবদিহি ও পুনর্মিলনের মাধ্যমে একটি মানবাধিকারভিত্তিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব। এই প্রক্রিয়া প্রতিশোধের রাজনীতির বদলে ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেয়।
মানবাধিকার উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো নাগরিক শিক্ষা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোয় মানবাধিকার কেবল আইনি নথিতে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেই নাগরিক অধিকার, দায়িত্ব ও সহনশীলতার ধারণা প্রোথিত থাকে। এই শিক্ষা নাগরিককে রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করার সক্ষমতা দেয়, আবার আইন মানার প্রয়োজনীয়তাও শেখায়। নাগরিক সচেতনতা ছাড়া রাষ্ট্রীয় সংস্কার অনেক সময় টেকসই হয় না।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ মানবাধিকার রক্ষার অন্যতম স্তম্ভ। স্বাধীন গণমাধ্যম রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়; বরং এটি একটি সতর্ক সংকেত, যা ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সহায়ক। যুক্তরাজ্য বা কানাডার মতো দেশে সমালোচনাকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে নয়, বরং নীতিগত সংশোধনের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানবাধিকার সুরক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।
এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে সমর্থন করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও পর্যবেক্ষণ। বিভিন্ন বৈশ্বিক সংস্থা তাদের মূল্যায়নে দেখিয়েছে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন এখন আর ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং এটি শাসনব্যবস্থার ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচন, বিশেষ ও জরুরি আইনের অপব্যবহার, বিচারবহির্ভূত সহিংসতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহির ঘাটতিকে তারা বৈশ্বিক মানবাধিকার সংকটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিরাপত্তা ও সন্ত্রাস দমনের নামে গৃহীত নীতিগুলো অনেক ক্ষেত্রে সমালোচনামূলক সাংবাদিকতা, নাগরিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক ভিন্নমতকে দমনের কার্যকর উপকরণে পরিণত হয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে মানবাধিকার কেবল আইনি প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি রাষ্ট্রের বৈধতা ও নৈতিক কর্তৃত্বের প্রশ্নে রূপ নেয়।
মব সহিংসতা এবং সামাজিক সহিংসতার বিস্তার নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাষ্ট্র যখন এ ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয় বা নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে না, তখন নাগরিকদের মধ্যে ন্যায়বিচারের ধারণা ভেঙে পড়ে এবং সহিংসতা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার ঝুঁকি তৈরি হয়। একইভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় কার্যকর তদন্ত ও বিচার না হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে।
নারী ও শিশুর অধিকার, সংখ্যালঘু সুরক্ষা এবং সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অভিন্ন উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কেবল নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অধিকার লঙ্ঘন নয়; বরং সামগ্রিক মানবাধিকার কাঠামোর দুর্বলতার প্রতিফলন।
কোনো রাষ্ট্রে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের প্রশ্নটি কোনো একক সিদ্ধান্ত বা আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাধান হবে না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে আইনের শাসন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নাগরিক শিক্ষা এবং সামাজিক সহনশীলতা একসঙ্গে কাজ করবে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মানবাধিকার সুরক্ষা কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আন্তর্জাতিক আইন, বৈশ্বিক মানবিক মানদণ্ড এবং রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, বিশেষ আইনের সংস্কার, নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি এবং নাগরিক স্বাধীনতার সুরক্ষা- এসব বিষয়কে তারা মানবাধিকার উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
সব মিলিয়ে তাত্ত্বিক রাষ্ট্রচিন্তা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ একত্রে একটি বিষয় স্পষ্ট করে-মানবাধিকার সংকট কোনো সাময়িক বা বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়। এটি রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও নাগরিকের সম্পর্কের ভেতরে নিহিত একটি গভীর কাঠামোগত সংকট।
এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব কেবল তখনই, যখন রাষ্ট্র মানবাধিকারকে নিরাপত্তা বা উন্নয়নের প্রতিবন্ধক নয়, বরং বৈধতা, স্থিতিশীলতা ও টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করবে। রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার এই নতুন সম্পর্কই মানবাধিকার সংকট উত্তরণের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পথ।
সবশেষে বলা যায়, কোনো রাষ্ট্রে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের প্রশ্নটি কোনো একক সিদ্ধান্ত বা আইন পরিবর্তনের মাধ্যমে সমাধান হবে না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে আইনের শাসন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নাগরিক শিক্ষা এবং সামাজিক সহনশীলতা একসঙ্গে কাজ করবে।
উন্নত রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়, মানবাধিকার রক্ষা করলে রাষ্ট্র দুর্বল হয় না; বরং আরও বৈধ, শক্তিশালী ও টেকসই হয়। যদি কোনো রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থে উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা চায়, তবে মানবাধিকারকে বাধা নয়, বরং উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতেই হবে। রাষ্ট্র ও নাগরিকের এই নতুন আস্থার সম্পর্কই ভবিষ্যৎ মানবাধিকার সংকট উত্তরণের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ।
ড. সুলতান মাহমুদ রানা : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
