খেজুরের কাঁচা রস খেলে কি নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে?

শীত এলে কার মনে না চায় খেজুরের রস খেতে! গ্রামীণ জনপদ, সংস্কৃতি ও সভ্যতায় খেজুরের রস নিয়ে রয়েছে নানা প্রবাদ ও ধাঁধা। খেজুর গাছকে অনেকে শখের বসে ‘মধুবৃক্ষ’ বলেন।
বাঙালি ঐতিহ্যের ধারক-বাহক সুমিষ্ট, সুস্বাদু এই খেজুরের রসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে নিপাহ ভাইরাস। নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা খুব বেশি না হলেও এ ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা ব্যাপক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিকভাবে যেসব প্রাণঘাতী সংক্রামক ব্যাধিকে অগ্রাধিকার দেয়, নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ সেসব রোগের একটি। পরবর্তী মহামারি হতে পারে নিপাহ ভাইরাস। নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের ধরন কিছুটা করোনাভাইরাসের মতো। তবে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণে মৃত্যুর হার কোভিডের সংক্রমণে মৃত্যুর হারের তুলনায় অনেকটাই বেশি!
নিপাহ ভাইরাসের আক্রান্তদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ৪০-৭৫ শতাংশ বা তার বেশি। অন্যদিকে কোভিডে আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার নিপাহর তুলনায় অনেকটাই কম মাত্র ২-৩ শতাংশ। বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্তদের ৭১ শতাংশ মারা গেছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০১১ সালে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ রোধে এর ব্যবস্থাপনা, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে একটি জাতীয় নির্দেশিকা জারি করে। এতে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করতে খেজুরের কাঁচা রস খাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এ নির্দেশিকায় খেজুরের কাঁচা রসকে নিপাহ ভাইরাসের প্রধান বাহন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুস্থ থাকতে ১৪ ডিসেম্বর ২০২৬ এ জরুরি সর্তকবার্তা জারি করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা। কেউ কাঁচা রস খেতে চাইলে তা বিক্রি না করতে গাছি (খেজুরের রস সংগ্রহকারী) বা বিক্রেতাদের প্রতিও অনুরোধ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে নিপাহ ভাইরাস নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবেও প্রচার অনেক কম। টেলিভিশন বা গণমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত প্রচারমূলক বিজ্ঞাপনও কম।
বাংলাদেশের মেহেরপুরে ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে ২০০১ সালে নিপাহ ভাইরাসের প্রথম প্রাদুর্ভাব চিহ্নিত হয়। বাংলাদেশে ২০০১ সালের পর প্রতিবছরই শীতকালে এ রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যাচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে ২০০১-২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ৩৫টি জেলায় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত মোট ৩৪৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৫ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাট জেলায়।
আইইডিসিআর জানায়, ২০২৩ সালে দেশে ১৪ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০ জনই মারা গেছেন (৭১ শতাংশ মৃত্যুহার)। ২০২৪ সালে দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত পাঁচজনের সবাই মারা গেছেন (৭ জন শনাক্ত, ৫ জন আক্রান্ত, ৫ জন মৃত্যু)। এছাড়া ২০২৫ সালে দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশে দুই দশকের বেশি সময় ধরে যতজন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ৭১ শতাংশের মৃত্যু হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৈশ্বিকভাবে যেসব প্রাণঘাতী সংক্রামক ব্যাধিকে অগ্রাধিকার দেয়, নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ সেসব রোগের একটি। পরবর্তী মহামারি হতে পারে নিপাহ ভাইরাস। নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের ধরন কিছুটা করোনাভাইরাসের মতো।
সাধারণত বাংলাদেশে শীত মৌসুমে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। এ সময় বিশেষ সতর্ক থাকা উচিত। কিন্তু ২০২৫ সালের আগস্ট মাসেও নিপাহ রোগী পাওয়া গেছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, খেজুরের কাঁচা রস ছাড়াও সংক্রমণের অন্য কোনো উৎস থাকতে পারে।
এছাড়া ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ভোলায় রোগী শনাক্ত হয়েছে, যেখানে আগে কখনো এই ভাইরাসের অস্তিত্ব ছিল না। নিপাহ ভাইরাসের জন্য এখনও কার্যকর কোনো চিকিৎসা বা টিকা আবিষ্কৃত হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
শীতে খেজুরের রস বাদুড়েরও অন্যতম একটি প্রিয় খাবার। বাদুড়ের প্রজাতিগুলোর মধ্যে গ্রেটার ইন্ডিয়ান ফ্রুট ব্যাট খেজুরের রস পছন্দ করে। বাংলাদেশে টেরোপাস মিডিআস (Pteropus medius) গোত্রের বাদুড় নিপাহ ভাইরাসের প্রাকৃতিক আধার।
বাদুড় খেজুরের রস বের হওয়ার স্থানটি চেটে রস খায়। কখনো আবার সেখানে প্রস্রাব ও পায়খানা করে। আর বাদুড়ে মুখ দেওয়া খেজুরের রস পানে মানুষের মধ্যে দেখা দেয় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি। খেজুরের রস ছাড়াও শাক-সবজি, ফলমূলেও বাদুড় মলমূত্র ত্যাগ করে এবং আংশিক খেয়ে থাকে। এসব জিনিস যখন মানুষ ভালো করে পরিষ্কার না করেই কাঁচা খায়, সেটাও নিপাহ ভাইরাসের অন্যতম একটা উৎস। বাদুড়ের আংশিক খাওয়া ফল মানুষ খেলেও নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটতে পারে।
আইইডিসিআরের গবেষণায় দেখা যায়, দেশে একজন প্রসূতির বুকের দুধে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ওই মায়ের সন্তানের পরে মৃত্যু ঘটে। বুকের দুধে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া সারা বিশ্বে একটি বিরল ঘটনা।
আরও পড়ুন
এছাড়া এবার নতুন একটি জেলাতে নিপাহ ভাইরাসের রোগী পাওয়া গেছে। এ রোগী পাওয়ার অর্থ হলো এই ভাইরাস এখন দেশের অন্য এলাকায় বিস্তৃত হয়ে পড়ছে। এটা একটা বিপদ। এখন দরকার এ বিস্তৃতি রোধ করা।
নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে ভারতের কেরালা রাজ্যের একটি জেলার সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কেরালা সরকার নিপাহ ভাইরাস প্রাদুর্ভাব কমানোর জন্যই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাংলাদেশে গবেষণা থেকে প্রমাণ পাওয়া গেছে, মানুষ থেকে মানুষে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটেছে। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকেও অন্য ব্যক্তিতে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এলে হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে তার পরিবারের সদস্য ও পরিচিতরা আক্রান্ত হয়। তাদের মাধ্যমে স্বাস্থ্যকর্মীরাও আক্রান্ত হতে পারেন।
দূষিত খেজুরের রস দ্বারা শরীরে ভাইরাস প্রবেশ করার পর সাধারণত সংক্রমণের ৫-১৪ দিনের মধ্যে নিপাহ রোগের লক্ষণ প্রকাশ পেতে দেখা দেয়। তবে লক্ষণ প্রকাশ না করেও ৪৫ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় শরীরের মধ্যে থাকতে পারে। প্রাথমিকভাবে প্রচণ্ড জ্বর, সর্দি, কাশি, গলাব্যথা, বমি, মাথাব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথার মতো উপসর্গ দেখা যায়।
মাথা ঘোরা, ঘন ঘন তৃষ্ণা পাওয়া, ঘুম ঘুম ভাব, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, প্রলাপ বকা ও মস্তিষ্কের তীব্র সংক্রমণজনিত নানাবিধ স্নায়বিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কেউ কেউ নিউমোনিয়া, রক্ত জমাট বাঁধা, বুকে তীব্র যন্ত্রণাসহ তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে আসে। তাদের দ্বারা এই রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও বেশি থাকে।
নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধের কোনো টিকাও নেই। গাছ থেকে সদ্য নামানো খেজুরের রস ও বাদুড়ে খাওয়া ফলমূল খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
যারা সৌভাগ্যক্রমে নিপাহ থেকে বেঁচে যান তাদের সাধারণত কোনো স্থায়ী সমস্যা দেখা দেয় না, তবে প্রায় ২০ শতাংশ রোগীর দীর্ঘমেয়াদি নিউরোলজিক্যাল সমস্যা দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার কয়েক বছর পরও তার শরীরে পুনরায় নিপাহ ভাইরাস সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, যাকে ‘রিল্যাপসিং এনকেফেলাইটিস’ বলা হয়।
প্রস্রাব, রক্ত, সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড (Cerebrospinal Fluid) ইত্যাদি শারীরিক তরল থেকে পিসিআর, অ্যান্টিবডি টেস্ট, এলাইজা, সেল কালচার দ্বারা ভাইরাসকে শনাক্ত করা যায়।
তবে এটি যেহেতু একটি এনভেলপড ভাইরাস, তাই সাবান, ডিটারজেন্ট, ৭০ শতাংশ অ্যালকোহল এবং ৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রার মাধ্যমে এই ভাইরাস ধ্বংস করা সম্ভব।
এখন প্রশ্ন হলো, খেজুরের রসের তাহলে কী হবে। জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, খেজুরের গুড় তৈরিই সঠিক উপায়। খেজুরের রস থেকে তৈরি গুড় খেতে কোনো বাধা নেই, এতে ক্ষতি নেই। রসের গুড় তৈরি হোক। এর চাহিদাও আছে যথেষ্ট। রস দিয়ে তৈরি পিঠা-পায়েস অর্থাৎ আগুনের উত্তাপে রস রান্না হওয়ার পর তৈরি সব খাবার খাওয়া যেতে পারে। কিন্তু কোনোক্রমেই কাঁচা রস খাওয়া যাবে না।
নিপাহ ভাইরাসে কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হলে বা আক্রান্ত হয়েছে সন্দেহ হলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। যদিও নিপাহ ভাইরাসের সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নাই। এ ক্ষেত্রে লক্ষণভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধের কোনো টিকাও নেই। গাছ থেকে সদ্য নামানো খেজুরের রস ও বাদুড়ে খাওয়া ফলমূল খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। যেকোনো ফল ভালো করে ধুয়ে খোসা ফেলে খেতে হবে। খেজুরের রস ফুটিয়ে নিলে নিপাহ ভাইরাস মরে যায়। আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে গেলে সাবধান থাকতে হবে। গাছ পরিচর্যা, ফলমূল পাড়া ও খেজুরের রস আহরণের পর ভালো করে হাত ধুয়ে নিতে হবে। নিপাহ ভাইরাসে আতঙ্কিত নয়, দরকার সচেতনতা।
ড. আনোয়ার খসরু পারভেজ : গবেষক ও অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
