ইলিয়াস জাভেদ : সোনালী যুগের জনপ্রিয় অভিনেতা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে প্রবীণ ‘হিরো’ হিসেবে বেঁচেছিলেন জাভেদ। তার সমসাময়িক নায়কদের কেউই এখন আর বেঁচে নেই। দীর্ঘদিন ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি তার ৮২ বছরের জীবনেরও অবসান ঘটলো।
১৯৪৪ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের, বর্তমান পাকিস্তানের পেশোয়ারের এক ধার্মিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস। পিতা রাজা মুহাম্মদ আফজাল চাইতেন পুত্র ব্যবসা বা চাকরি করুক। এর মধ্যে সপরিবারে তারা চলে আসেন পাঞ্জাবে। এদিকে সন্তানের চোখে ঝিলমিলে সিনেমার স্বপ্ন।
ততদিনে উপমহাদেশে লেগেছে চলচ্চিত্রের ঢেউ। দেশভাগের পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে নির্মিত হচ্ছে দারুণ সব চলচ্চিত্র। লাহোরে তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র স্টুডিও। কিন্তু তীর্থ তখন মুম্বাই। রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য মুম্বাই চলে গিয়েছিলেন। নাচের তালিম নিয়েছিলেন সাধু মহারাজ ও শম্ভু মহারাজের কাছে।
বলিউডের প্রখ্যাত কোরিওগ্রাফার সরোজ খানের সঙ্গেও নাচ শিখেছিলেন। তখন অনেকেই চলচ্চিত্রে কাজের খোঁজে মুম্বাই যেতেন। বাংলাদেশের সৈয়দ শামসুল হক, সুভাষ দত্ত, আফজাল চৌধুরী প্রমুখও গিয়েছিলেন। ফিরে এসে বাংলা চলচ্চিত্রের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।
তবে রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াস মুম্বাই থেকে পেশোয়ার বা পাঞ্জাবে না গিয়ে ফিরে এলেন ঢাকায়। ঢাকায় তিনি যখন আসেন, তার বয়স মাত্র ১৮/১৯ বছর। ঢাকায় তখন নির্মিত হচ্ছে প্রচুর উর্দু ও বাংলা চলচ্চিত্র। অভিনয়ের সুযোগ না পেয়ে প্রথমে তিনি শুরু করেন নৃত্য পরিচালনা দিয়ে।
১৯৬৪ সালে কায়সার পাশার উর্দু ছবি ‘মালান’ দিয়ে তার শুরু। পরের বছর উর্দু চলচ্চিত্র ‘নয়ি জিন্দেগি’ দিয়ে শুরু অভিনয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ছবিটি মুক্তি পায়নি। ১৯৬৭ সালে ‘পুনম কি রাত’-এ আবার নৃত্য পরিচালনা করেন। পরের বছর ১৯৬৮ সাল তার জন্য স্মরণীয়।

শাবানার বিপরীতে তিনি অভিনয় করেন ‘পায়েল’ সিনেমায়, যা বাংলায় ডাবিং হয় ‘নূপুর’ নামে। এই ছবিতে ছিলেন রাজ্জাকও, যিনি কলকাতার ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার রাতে রীতিমতো এক পোশাকে ঢাকায় এসে উঠেছিলেন শরণার্থী ক্যাম্পে। ‘পায়েল’ বা ‘নূপুর’ এর পরিচালক ছিলেন মুস্তাফিজ, তিনিই রাজা মোহাম্মদ ইলিয়াসের চলচ্চিত্র নাম দেন ‘জাভেদ’। তারপর থেকে তিনি এই নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে তাকে সবাই ইলিয়াস জাভেদ নামে ডাকতে থাকে।
জাভেদের প্রথম প্রবল পরিচিতি তৈরি হয় ‘মালকা বানু’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। ১৯৭৪ সালের ১৫ নভেম্বর মুক্তি পাওয়া এই ছবিতে তিনি শাবানার বিপরীতে অভিনয় করেন কেন্দ্রীয় চরিত্রে। কোরিওগ্রাফিও করেন। এই চলচ্চিত্রের ‘মালকা বানুর দেশে রে, বিয়ের বাদ্য আলা বাজে রে’ গানটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। যে গান এখনো গ্রামবাংলাসহ গোটা বাংলা ভাষাভাষীদের বিয়ের গান হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়। তবে ‘মালকা বানু’ প্রবল জনপ্রিয় হলেও জাভেদ তখনো পৌঁছাননি তার চূড়ান্ত সাফল্যে। তার জন্য ছিল আরেকটু অপেক্ষা।
...মধুমিতা মুভিজের প্রযোজনায় তিনি তৈরি করলেন ‘নিশান’। যমজ দুই ভাইয়ের চরিত্রে দ্বৈত অভিনয় করলেন প্রায় নবাগত জাভেদ, যিনি নৃত্যপরিচালক হিসেবেই বেশি খ্যাত। এক ভাই ফর্সা, আরেক ভাই কালো; এক ভাই অভিজাত, আরেক ভাই নিচতলার ডাকু—এরকম সম্পূর্ণ আলাদা দুই চরিত্রে একক অভিনয় করে একাই কাঁপিয়ে দিলেন জাভেদ। তুমুল জনপ্রিয় সেই ছবি সারাদেশে টানা কয়েক বছর একচেটিয়া ব্যবসা করে।
বিশ্বখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক আলেকজান্দার দ্যুমা (Alexandre Dumas)-এর ক্লাসিক উপন্যাস ‘দ্য কর্সিকান ব্রাদার্স’। বনেদি পরিবারে জন্ম নেওয়া দুই যমজ ভাই লুসিয়েন ও লুই দো ফ্রানশি, যারা জন্মগতভাবে সংযুক্ত থাকলেও আলাদা জীবন যাপন করে কিন্তু একে অপরের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট অনুভব করতে পারে, যা তাদের প্রতিশোধ এবং ভালোবাসার যাত্রায় প্রভাব ফেলে।
এই দুই যমজ ভাইকে নিয়ে লেখা দ্যুমা-এর বিশ্বখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য কর্সিকান ব্রাদার্স’ সারাবিশ্বে ঝড় তোলে। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়, মঞ্চে রূপান্তরিত হয়। বাংলাদেশের সেবা প্রকাশনীও এর অনুবাদ প্রকাশ করে কাজী আনোয়ার হোসেনের অনুবাদে। ১৯৭১ সালে এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয় তামিল ছবি ‘নিরাম নিরুপ্পাম’, পরের বছর এটি নির্মিত হয় বোম্বেতে, ‘গোরে অওর কালে’ নামে।
ততদিনে রূপকথার জগতের চলচ্চিত্র বানিয়ে প্রবল সাফল্য অর্জন করেছেন পরিচালক ইবনে মিজান। মধুমিতা মুভিজের প্রযোজনায় তিনি তৈরি করলেন ‘নিশান’। যমজ দুই ভাইয়ের চরিত্রে দ্বৈত অভিনয় করলেন প্রায় নবাগত জাভেদ, যিনি নৃত্যপরিচালক হিসেবেই বেশি খ্যাত।
এক ভাই ফর্সা, আরেক ভাই কালো; এক ভাই অভিজাত, আরেক ভাই নিচতলার ডাকু—এরকম সম্পূর্ণ আলাদা দুই চরিত্রে একক অভিনয় করে একাই কাঁপিয়ে দিলেন জাভেদ। তুমুল জনপ্রিয় সেই ছবি সারাদেশে টানা কয়েক বছর একচেটিয়া ব্যবসা করে। এককালে বাংলাদেশের অন্যতম অভিজাত সিনেমা হল মধুমিতায় ঢুকলেই সবার চোখে পড়তো বড় করে সাজানো ‘নিশান’ এর পোস্টার, মধুমিতা বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত এটাই ছিল দৃশ্যমান।
জীবনে কয়েকশ চলচ্চিত্রের কয়েকশ চরিত্রে অভিনয় করলেও ‘নিশান’ এর ‘কালে খাঁ’ চরিত্রটি জাভেদের করা সবচেয়ে সেরা এবং তার নিজের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র। এক ‘নিশান’ করে জাভেদের যে উত্থান হলো, তারপর টানা দুই দশক তার আধিপত্য। বিশেষ করে ফোক ফ্যান্টাসি ঘরানার চলচ্চিত্রে জাভেদ অতুলনীয় জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
‘রাজকুমারী চন্দ্রভান’, ‘কাজল রেখা’, ‘সাহেব বিবি গোলাম’, ‘নরম গরম’, ‘তিন বাহাদুর’, ‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’—চলচ্চিত্রে জাভেদের জয়রথ ছুটে চলে অনেকদিন।
শাবানা, ববিতা, কবরী, অলিভিয়া, অঞ্জু ঘোষ, রোজিনা, নূতন, সুচরিতা—সেই সময়ের সেরা সব নায়িকার বিপরীতে জাভেদ অভিনয় করেছেন। এইসব নায়িকারা জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে যে কোরিওগ্রাফি, সেগুলোও জাভেদেরই করা। শুধু নায়িকা নয়; রাজ্জাক, আলমগীর, সোহেল রানা, ওয়াসিম, ফারুক, জাফর ইকবাল, ইলিয়াস কাঞ্চন—প্রায় সবারই নাচের হাতেখড়ি জাভেদের হাতেই। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের পরবর্তী প্রজন্মের কোরিওগ্রাফাররাও তার হাতেই তৈরি। ঢাকাই চলচ্চিত্রের নাচের জগতের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলেন তিনি, সবাই-ই তাকে ‘ওস্তাদ’ বলে ডাকতো।
‘চুপি চুপি বলো কেউ জেনে যাবে’, ‘মালকা বানুর দেশে রে’, ‘মনের এ ছোট্ট ঘরে আগুন লেগেছে হায়রে’, ‘চাকভুম চাকভুম চাঁদনী রাতে’—প্রভৃতি জনপ্রিয় গানে জাভেদের করা কোরিওগ্রাফি বাংলা চলচ্চিত্রে ইতিহাস হয়ে আছে।
...শাবানা, ববিতা, কবরী, অলিভিয়া, অঞ্জু ঘোষ, রোজিনা, নূতন, সুচরিতা—সেই সময়ের সেরা সব নায়িকার বিপরীতে জাভেদ অভিনয় করেছেন। এইসব নায়িকারা জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে যে কোরিওগ্রাফি, সেগুলোও জাভেদেরই করা।
জন্ম পেশোয়ারে হলেও জাভেদের কর্মজীবন পুরোটাই বাংলাদেশে, ঢাকায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি নিজের মাতৃভূমিতে ফিরে যাননি, ততদিনে বাংলাদেশই তার প্রাণের দেশ, তাই এদেশেই থেকে যান তিনি। থাকতেন পুরান ঢাকার সিদ্দিক বাজারে। যে মহল্লায় থাকতেন, সে মহল্লার নামই হয়ে গেছে ‘জাভেদ মহল্লা’। এই দীর্ঘ ক্যারিয়ারে জাভেদের কোনো বদনাম শোনা যায়নি, নেই কোনো বাজে স্ক্যান্ডাল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রই ছিল তার জীবনযাপন, এফডিসি ছিল ঘরবাড়ি।

‘চন্দন দ্বীপের রাজকন্যা’ ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে প্রেম হয় সহ-অভিনেত্রী চিত্রনায়িকা ডলি চৌধুরীর সঙ্গে, বিয়ে করেন তারা। দীর্ঘ ৪২ বছরের দাম্পত্য জীবন কাটান নিঃসন্তান। উত্তরার ১৪ নম্বর সেক্টরে একটা বাড়িতে শেষ জীবন অতিবাহিত করেন জাভেদ।
জীবনের শেষ প্রায় দশ বছর ছিলেন সিনেমা থেকে দূরে, আসলে বাধ্য হয়েছিলেন। দীর্ঘদিন ক্যান্সারে ভুগছিলেন। উত্তরার একটা হাসপাতালে রেখে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছিলো। একসময় বাসায় রেখে চিকিৎসা চলছিলো। হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক ও দুজন নার্স এসে নিয়মিত সেবা দিচ্ছিলেন।
২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি সকালে নার্স এসে টের পান তার শরীর শীতল হয়ে গেছে। হাসপাতালে নিলে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন। জীবনাবসান হয় বাংলা চলচ্চিত্রের প্রথম যুগের নায়কদের মধ্যে বেঁচে থাকা শেষ নায়ক জাভেদের। তার সমসাময়িক রাজ্জাক, রহমান, সুভাষ দত্ত প্রমুখ আগেই বিদায় নিয়েছেন।
যদিও রাজ্জাক, রহমান, সুভাষ দত্ত’র মতো তিনি সুধী সমাজে কদর পাননি জীবিতকালে। ফোক ফ্যান্টাসি ঘরানার ছবি কিংবা মেকাপ গেটাপের কারণে হাস্যরসের পাত্রই হয়েছেন অধিকাংশ সময়। আর পুরুষ নৃত্যশিল্পীরা তো বাংলাদেশে বরাবরই হাসির পাত্র। জাভেদের ভাগেও তা কম জোটেনি। শেষ জীবন কেটেছে অনেকটা নিঃসঙ্গই।
বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান ঝকমারিতে জাভেদকে খুব বেশি লোক মনে রাখেনি। জোটেনি কোনো পুরস্কার, কোনো স্বীকৃতি। তিন দশকের দর্শকের ভালোবাসাই সম্বল, যা ছিল অফুরন্ত। হয়তো এখন জুটবে কিছু মরণোত্তর সম্মাননা, কিন্তু দীর্ঘ ৮২ বছরের জীবন ‘অসম্মাননা’ নিয়েই কাটিয়ে দিতে হলো বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তী অভিনেতা ও নৃত্য পরিচালক জাভেদকে। যে ব্যর্থতার দায় কোনোদিন পূরণ করতে পারবে না রাষ্ট্র কিংবা সাংবাদিক প্রতিষ্ঠানগুলো।
প্রয়াণে এই কিংবদন্তীর প্রতি অফুরান শ্রদ্ধা আর সম্মান।
নজরুল সৈয়দ : সংস্কৃতিকর্মী
