স্তন্যপায়ীদের মধ্যে বাদুড়ই কি একমাত্র ভাইরাস বহন করে?

শীতের সকালে গাছ থেকে তাজা খেজুরের রস নামানো হয়েছে। লোভ সামলাতে না পেরে কেউ কেউ এক গ্লাস কাঁচা খেজুরের রস খেয়ে ফেলেন। গ্রামবাংলায় বেশিরভাগ সময় এই ঘটনা ঘটে। অরক্ষিত সেই রসে থাকে বাদুড়ের লালা কিংবা মূত্র। কয়েকদিন পর শুরু হয় জ্বর, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, শ্বাসকষ্ট। গুরুতর অবস্থায় রোগীর বিভ্রান্তি, মস্তিষ্কের ফোলা (এনসেফালাইটিস), এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
এভাবেই বাদুড় কাঁচা খেজুরের রস, আধখাওয়া ফল ইত্যাদির মাধ্যমে নিপাহ ভাইরাস ছড়াতে পারে যাতে মৃত্যুহার অত্যন্ত বেশি। ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার শতকরা ৭১ ভাগ।
বাদুড় মানুষের মধ্যে নিপাহ ছাড়াও ইবোলা, র্যাবিস, হেন্ড্রা, সার্সসহ বিভিন্ন মারাত্মক ভাইরাস ছড়াতে পারে। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে রিওভাইরাস নামে আরেকটি মারাত্মক ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে যার বাহক হিসেবে বাদুড়কে শনাক্ত করা হয়েছে। এতে শ্বাসতন্ত্র ও স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয় এবং উপসর্গগুলো নিপাহ ভাইরাসের সাথে মিলে যাওয়ার কারণে রোগ নির্ণয়ে দেরি হতে পারে।
বাদুড় থেকে মানুষের মধ্যে যেসব ভাইরাসবাহিত রোগ হতে পারে:
১. র্যাবিস: র্যাবডোভিরাইডি গোত্রের এই ভাইরাস বাদুড়ের কামড় থেকে, লালামিশ্রিত আঘাতের স্থানে সংক্রমিত হতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর, বিভ্রান্তি, পক্ষাঘাত, জলাতঙ্ক ও মৃত্যু হতে পারে।
২. নিপাহ ভাইরাস: প্যারামিক্সোভিরাইডি গোত্রের ভাইরাসটি বাদুড়ের লালামিশ্রিত খেজুরের রস, আধাখাওয়া ফল খাওয়ার মাধ্যমে ছড়াতে পারে। এতে শ্বাসকষ্ট ও মস্তিষ্কের প্রদাহ দেখা যায়।
৩. হেন্ড্রা ভাইরাস: এটি ফ্লুর মতো উপসর্গ যেমন নিউমোনিয়া, এনসেফালাইটিস দেখায়।
৪. ইবোলা ভাইরাস: এটি বাদুড় থেকে অন্য প্রাণীতে প্রবেশ করে ও মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে হেমোরাজিক জ্বর দেখা যায়। মৃত্যুর হার অত্যন্ত বেশি।
অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের তুলনায় বাদুড়ের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যাতে ভাইরাস তাদের দেহে বসবাস করলেও কোনো ক্ষতি করে না।
৫. মারবার্গ ভাইরাস: সরাসরি বাদুড়ের বাসস্থানের সংস্পর্শে আসলে ছড়ায়। ইবোলার মতো হেমোরাজিক জ্বর এই রোগের উপসর্গ।
৬. করোনাভাইরাস: সার্স, মার্সসহ কোভিড-১৯ বাদুড়ের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। এতে শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ ও নিউমোনিয়া দেখা যায়।
বাদুড়ের দেহের অনন্য গঠন, বাস্তুতন্ত্রের ভূমিকা এসব কারণে এরা নিজে আক্রান্ত না হয়েও অনেক ধরনের ভাইরাস ছড়াতে পারে। ভবিষ্যতে এসব সংক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য আমাদের এ সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাদুড়ের অনন্য রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা:
বাদুড়ের অনন্য রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এদের ভাইরাস থেকে সুরক্ষা দেয়। অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের তুলনায় বাদুড়ের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা এমনভাবে বিবর্তিত হয়েছে যাতে ভাইরাস তাদের দেহে বসবাস করলেও কোনো ক্ষতি করে না।
অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রে ভাইরাস সংক্রমিত হলে শরীর অত্যন্ত তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। কিন্তু বাদুড়ের বেলায় এই প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে তারা সক্ষম যাতে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না।
স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে বাদুড়ই একমাত্র উড়তে পারে যার জন্য উচ্চ শারীরবৃত্তীয় হার প্রয়োজন হয়। ওড়ার ফলে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে যায় যেটা অন্য প্রাণীর জ্বরের সমান।
আরও পড়ুন
বছরের পর বছর ধরে বাদুড় এভাবে চাপ সহ্য করার ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ শক্তি নিচু স্তরে সক্রিয় থাকে যা ভাইরাসকে মেরে না ফেলে অকার্যকর করে রাখতে ভূমিকা রাখে। এ কারণে ভাইরাস বাদুড়কে আক্রান্ত করে না।
দীর্ঘায়ু: বাদুড় অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকে। কিছু প্রজাতির বাদুড় ৩০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। এই লম্বা সময় ভাইরাস বাদুড়ে বেঁচে থাকে। বাদুড় যেহেতু ভাইরাসের আক্রমণে মারা যায় না, ভাইরাস বাদুড়ের মধ্যে অভিযোজিত হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়।
সামাজিক আচরণ এবং ঘনবসতি: বাদুড় অত্যন্ত সামাজিক প্রাণী। হাজার বছর ধরে বাদুড় একত্রে বড় কলোনি তৈরি করে বসবাস করে। একসাথে কাছাকাছি গুহা বা গাছে অবস্থান করার কারণে সহজেই একে অপরের মাঝে ভাইরাস ছড়াতে পারে।
এছাড়াও কিছু প্রজাতি পরিযায়ী বা অনেক দূরত্ব অতিক্রম করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে উড়ে যায়। এভাবে খুব সহজেই ভাইরাস বিভিন্ন দেশ, মহাদেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ভাইরাসের সাথে বিবর্তনের ইতিহাস: বাদুড় পৃথিবীতে ৫০ মিলিয়ন বছর ধরে অবস্থান করছে। এসময়ে ভাইরাস ও বাদুড় একসাথে অভিযোজিত হওয়ার ফলে যেসব ভাইরাস বাদুড়ের সাথে সহাবস্থানে সক্ষম, সেগুলো বিলুপ্ত হয়নি। এর ফলে বাদুড়ের মধ্যে কোনো রকম রোগ সৃষ্টি ছাড়াই ভাইরাস অবস্থান করতে পারে।
বনভূমি উজাড়, শহর সম্প্রসারণ ও কৃষিকাজের উন্নয়নের ফলে বাদুড়ের বসতি কমে যাচ্ছে। এতে তারা মানুষের কাছাকাছি চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে।
অন্যদিকে একই ভাইরাস মানুষ বা অন্যকোনো প্রাণীর মধ্যে প্রবেশ করলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এভাবে বাদুড় বা অন্যপ্রাণী থেকে মানুষের মাঝে রোগ সংক্রমণকে জুনোসিস (zoonosis) বলা হয়।
মানুষের আগ্রাসন: বনভূমি উজাড়, শহর সম্প্রসারণ ও কৃষিকাজের উন্নয়নের ফলে বাদুড়ের বসতি কমে যাচ্ছে। এতে তারা মানুষের কাছাকাছি চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে।
এছাড়া বন্যপ্রাণী নিয়ে অবৈধ বাণিজ্য ও শিকারের ফলে মানুষ ভাইরাস আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে আসতে পারে। এর ফলে বাদুড় থেকে মধ্যবর্তী কোনো পোষকদেহে (শূকর, উট ইত্যাদি) ভাইরাস প্রবেশ করে সেখান থেকে মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে।
অবশ্য বাদুড় খুব কমই সরাসরি মানুষের কাছে ভাইরাস ছড়ায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো মধ্যবর্তী পোষকের মাধ্যমে বা মানুষের আচরণের কারণে ভাইরাসের সংক্রমণ হয়ে থাকে।
শুধু বাদুড়ই যে মানুষের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে পারে, তা নয়। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে বানর (ইবোলা, এইচআইভি), ইঁদুর (হান্তাভাইরাস, লাসাফেভার), শূকর (ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিপাহ), উট (মার্স কোভিড), কুকুর ও বিড়াল (র্যাবিস) ও গবাদিপশু (রিফট ভ্যালি ফেভার) বিভিন্ন ভাইরাস ছড়াতে সক্ষম।
যেহেতু বেশিরভাগ ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তিকে মূলত উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়, প্রতিকারের চেয়ে এক্ষেত্রে প্রতিরোধ করাটাই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন, বাদুড়বাহিত ভাইরাস থেকে সুরক্ষা পেতে কাঁচা খেজুরের রস খাওয়া যাবে না। গাছ থেকে আধাখাওয়া কোনো ফল খাওয়া যাবে না। প্রতিরোধ করাই সুরক্ষা নিশ্চিত করার সহজ উপায়।
ড. প্রিয়াংকা বড়ুয়া : সহযোগী অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]