ভয় ভেঙে ভোটের পথে, নাকি নীল নকশার ফাঁদে গণতন্ত্র

দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল ভয় ও নীরবতায় আচ্ছন্ন। মৌলিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। ভিন্নমত দমন করা হয় আইন ও প্রশাসনের মাধ্যমে। ভোটাধিকার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নির্বাচন অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। ফলাফল পূর্বনির্ধারিত মনে হওয়ায় মানুষ ভোটে আগ্রহ হারায়। বিরোধী রাজনীতি ও গণমাধ্যম চাপে থাকে। এর ফলে দেশজুড়ে ভীতিকর নীরবতা ও হতাশা ছড়িয়ে পড়ে।
এই অন্ধকার সময়ের মধ্যেই আসে ৫ আগস্ট। দিনটি অনেকের কাছে নতুন আশার প্রতীক হয়ে ওঠে। ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থার অবসরের খবর মানুষের মনে স্বস্তি আনে। রাজপথে মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। দীর্ঘদিন পর মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পায়। আনন্দ ছিল। উত্তেজনা ছিল। সবচেয়ে বড় কথা ছিল প্রত্যাশা।
মানুষ ভাবতে শুরু করেছিল নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা। তারা চেয়েছিল আইনের শাসন। তারা চেয়েছিল সম্মানজনক জীবন। তারা চেয়েছিল এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে ভয় ছাড়া কথা বলা যাবে। যেখানে মতভিন্নতা অপরাধ হবে না। যেখানে ভোটের মূল্য থাকবে।
কিন্তু এই পরিবর্তনের পর খুব দ্রুতই আরেকটি চিত্র সামনে আসে। ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়। সেই শূন্যতার সুযোগ নেয় একটি পক্ষ। তারা রাস্তায় নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে। জনতার শক্তিকে ব্যবহার করা হয় ভিন্নভাবে। মব কালচারের উত্থান ঘটে। এটি সমাজে নতুন আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
যেখানে আগে ছিল রাষ্ট্রের দমন, সেখানে এখন দেখা যায় অনিয়ন্ত্রিত জনতার দাপট। আইনের জায়গা দখল করে নেয় শক্তির ভাষা। কে সঠিক আর কে ভুল তা নির্ধারণ করতে শুরু করে রাস্তায় জড়ো হওয়া কিছু মানুষ। এই পরিস্থিতি নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
মব কালচার শুধু বিশৃঙ্খলাই তৈরি করেনি। এটি নাগরিক অধিকারের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরে হানা দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ঐতিহাসিক স্থাপনাও রেহাই পায়নি। সন্দেহের বশে মানুষকে হেনস্তা করা হয়। ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে। মানুষ আবারও ভয়ে থাকতে শুরু করে।
রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রে নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকে। এই নীরবতা আরও ভয় বাড়ায়। মানুষ প্রশ্ন করে রাষ্ট্র কোথায়। আইন কোথায়। এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলে না।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই দেশ এগিয়ে যায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে। নির্বাচন নিয়ে মানুষের আগ্রহ আছে। আবার উদ্বেগও আছে। কারণ নির্বাচন হওয়ার কথা মানুষের মতপ্রকাশের প্রধান মাধ্যম। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই আস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
মাঠ পর্যায়ে কিছু তৎপরতা মানুষের মনে প্রশ্ন তুলছে। বাড়ি গিয়ে মোবাইল নম্বর সংগ্রহের খবর ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য নেওয়ার ঘটনাও সামনে আসে। এই কাজের কোনো পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই। কারা করছে তা স্পষ্ট নয়। কেন করছে তাও বলা হচ্ছে না।
কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে কথিত বন্ধুর খোঁজ নেওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে।
নির্বাচনের আগে এ ধরনের তথ্য সংগ্রহ মানুষের মনে আশঙ্কা তৈরি করছে। অনেকেই ভাবছে এটি কি কোনো গোপন নীল নকশার অংশ। নির্বাচন কি সত্যিই অবাধ ও সুষ্ঠু হবে। নাকি আবারও ভিন্ন পথে হাঁটবে দেশ। অতীত অভিজ্ঞতা মানুষকে সতর্ক করছে। স্মৃতি খুব সুখকর নয়।
যদি জাতীয় নির্বাচন কল্পিত নীল নকশায় ভূলুণ্ঠিত হয়, তাহলে তার প্রভাব হবে গভীর। শুধু একটি নির্বাচন ব্যর্থ হবে না। প্রশ্নের মুখে পড়বে দেশের সার্বভৌমত্ব। কারণ একটি রাষ্ট্রের শক্তি আসে জনগণের ইচ্ছা থেকে। সেই ইচ্ছা যদি বিকৃত হয়, তাহলে রাষ্ট্র কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৈধতা হারায়।
ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দেয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অবমূল্যায়ন দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ ফল বয়ে আনে। মানুষ রাজনীতির প্রতি আস্থা হারায়। তারা বিকল্প পথ খুঁজতে শুরু করে। সেই পথ অনেক সময় সহিংসতার দিকে মোড় নেয়। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে। সমাজে বিভাজন গভীর হয়।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন কোনো একক দলের বিষয় নয়। এটি একটি জাতীয় দায়িত্ব। প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের সৎ ও নিরপেক্ষ হতে হবে। তাদের কাজ হতে হবে সংবিধান অনুযায়ী। কোনো রাজনৈতিক চাপ গ্রহণ করা যাবে না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হতে হবে পেশাদার। তাদের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তারা যেন কোনো পক্ষের হাতিয়ার না হয়। ভোটার যেন ভয় ছাড়া ভোট দিতে পারে। সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সিদ্ধান্তের উপর মানুষের আস্থা নির্ভর করে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। ভোট গ্রহণ থেকে ফল ঘোষণা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ পরিষ্কার হতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার সহায়ক হতে পারে। তবে সেটি হতে হবে নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য।
রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও অবহেলা করার সুযোগ নেই। তাদের ভাষা ও আচরণ সমাজে প্রভাব ফেলে। দায়িত্বশীল রাজনীতি ছাড়া অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়। সহিংস ভাষা ও উসকানি বন্ধ করতে হবে। প্রতিযোগিতা থাকবে। তবে তা হতে হবে নীতিগত।
সাধারণ মানুষের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ভয়কে অতিক্রম করতে হবে। গুজবে কান দেওয়া যাবে না। তথ্য যাচাই করতে হবে। নিজের ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়ার আগে সতর্ক থাকতে হবে। নাগরিক সচেতনতা গণতন্ত্রের মূল শক্তি।
এই মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হতে পারে। একটি ভূলুণ্ঠিত নির্বাচন নতুন সংকট তৈরি করবে। দীর্ঘমেয়াদে দেশ পড়তে পারে সার্বিক ভূলুণ্ঠনের মধ্যে। তখন আবারও নতুন রূপে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারে। চরিত্র বদলাবে না।
এই আশঙ্কা কল্পনার নয়। ইতিহাসে এর বহু উদাহরণ রয়েছে। যেখানে গণতন্ত্র দুর্বল হয়েছে, সেখানে শক্তির রাজনীতি মাথা তুলেছে। জনগণ আবারও বঞ্চিত হয়েছে। উন্নয়নের স্বপ্ন ভেঙে পড়েছে।
বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। এখানকার মানুষ সংগ্রামী। তারা অধিকার আদায় করতে জানে। ৫ আগস্ট তার প্রমাণ। কিন্তু সেই অর্জন ধরে রাখতে হলে আরও সতর্ক হতে হবে। শুধু শাসন পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। শাসনের ধরন বদলাতে হবে।
একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সেই পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হতে পারে। এটি শুধু ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয় নয়। এটি ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা। তাই এখনই সময় সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করার।
রাষ্ট্র যদি নাগরিকের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে মব কালচারের জায়গা সংকুচিত হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে ভয় কমবে। মানুষ আবারও বিশ্বাস করতে শিখবে। সেই বিশ্বাসই গণতন্ত্রের শক্তি।
এই সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হতে পারে দীর্ঘদিন। সঠিক সিদ্ধান্ত দেশকে এগিয়ে নিতে পারে বহু দূর। জাতীয় নির্বাচন যেন কোনো পক্ষের খেলার মাঠ না হয়। এটি যেন হয় জনগণের উৎসব। সেই লক্ষ্যেই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ড. খালিদুর রহমান : অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
