নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতা কেমন হওয়া উচিত?

১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (বড় কোনো অঘটন না ঘটলে) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের বেশিদিন বাকি নেই। এই সময়টুকু নির্বাচনী সাংবাদিকতার জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। কারণ এই পর্যায়েই গণমাধ্যম ভোটারদের তথ্যপ্রাপ্তির প্রধান উৎসে পরিণত হয় এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।
কমিউনিকেশন স্টাডিজের দৃষ্টিকোণ থেকে গণমাধ্যম এখানে কেবল তথ্য পরিবেশক নয়; বরং জনমত গঠনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্র, যেখানে সংবাদ বাছাই, উপস্থাপন ও ব্যাখ্যার মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অর্থ নির্মিত হয় (McQuail, 2010)।
এই সময়ে রাজনীতিবিদরা ব্যস্ত ভোটের অঙ্ক কষতে, কর্মীরা ব্যস্ত স্লোগান আর মিছিল নিয়ে, আর ভোটাররা ব্যস্ত ভাবতে—এবার ভোট দিতে পারবো তো? কিন্তু এই ব্যস্ততার ভিড়ে একটি গোষ্ঠী আছে, যাদের ঘুম কমে যায়, ফোনে চার্জ থাকে না, আর লাইভে যাওয়ার আগে বুকের ভেতরটা একটু ধুকপুক করে—তারা হলেন সাংবাদিক।
কারণ নির্বাচনের এই কয়েকটা দিন শুধু রাজনীতির প্রস্তুতি নয়, এটি আসলে সাংবাদিকতার জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এখানে ভুল মানে শুধু ভুল খবর নয়, ভুল মানে ভুল আস্থা, আর সেই আস্থার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে পুরো নির্বাচন। এইসময় ‘ভালো রিপোর্ট প্রকাশ প্রচার করে গণমাধ্যম জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে। এখানে ভালো রিপোর্টের অর্থ হলো তাতে থাকবে পুঙ্খানুপুঙ্খ, যথার্থ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং মানসম্পন্ন বিবরণ যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের যোগ্যতা, সম্ভাবনা, শক্তি ও দুর্বলতা পরিমাপ করা যায়’ (গাইন, ২০০৮, পৃ.৭)।
রাজনৈতিক যোগাযোগ তত্ত্ব অনুযায়ী, নির্বাচনী সময়ে গণমাধ্যম মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে—এজেন্ডা সেটিং, ফ্রেমিং এবং প্রাইমিং। এজেন্ডা সেটিং তত্ত্ব আমাদের মনে করিয়ে দেয়, গণমাধ্যম মানুষকে কী ভাবতে হবে তা সরাসরি না বললেও, কী নিয়ে ভাবতে হবে—তা নির্ধারণ করে দেয় (McCombs & Shaw, 1972)।
ফলে নির্বাচনের প্রস্তুতি সাংবাদিকতায় যদি মূল ফোকাস থাকে কেবল রাজনৈতিক সংঘাত, বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্য বা সম্ভাব্য বিজয়ী অনুমানের ওপর, তাহলে ভোটারদের সামনে নির্বাচন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াগত প্রশ্নগুলো—যেমন নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি, ভোটার তালিকার নির্ভরযোগ্যতা, ভোটকেন্দ্র ব্যবস্থাপনা বা অভিযোগ নিষ্পত্তির কাঠামো—আড়ালে চলে যায়। এর ফল হিসেবে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেয় তথ্য ও প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নয় বরং আবেগ ও ধারণার ওপর ভর করে।
এখানেই ফ্রেমিং তত্ত্বের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। ফ্রেমিং তত্ত্ব বলছে, একই ঘটনা বিভিন্ন ভাষা ও কাঠামোয় উপস্থাপনের মাধ্যমে ভিন্ন অর্থ তৈরি করতে পারে (Entman, 1993)। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নির্বাচনী সহিংসতার একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে যদি ‘নির্বাচন সহিংসতায় ভরে গেছে’ এই ফ্রেমে উপস্থাপন করা হয়, তবে তা পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর জনআস্থাকে দুর্বল করে।
অথচ একই ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার আলোকে বিশ্লেষণ করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা যায়। তাই নির্বাচনী সাংবাদিকতায় ফ্রেম নির্বাচন কোনো নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি নৈতিক ও পেশাগত নির্বাচন, যা সরাসরি গণতান্ত্রিক আস্থার সঙ্গে যুক্ত।
কমিউনিকেশন স্টাডিজে সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতাকে দেখা হয় একটি পদ্ধতিগত নৈতিকতা হিসেবে—যার মধ্যে রয়েছে তথ্য যাচাই, একাধিক সূত্র ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং ভুল হলে তা সংশোধনের সংস্কৃতি (Kovach & Rosenstiel, 2014)।
নির্বাচনী সাংবাদিকতায় প্রায়ই শোনা যায়, ‘দুই পক্ষের কথা সমানভাবে তুলে ধরলেই নিরপেক্ষতা নিশ্চিত হয়।’ বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। যখন এক পক্ষের বক্তব্য তথ্যভিত্তিক আর অন্য পক্ষের বক্তব্য বিভ্রান্তিকর বা অসত্য, তখন কেবল বক্তব্য-বক্তব্যের ভারসাম্য ন্যায্যতা নিশ্চিত করে না। এই পরিস্থিতিতে সাংবাদিকতার দায়িত্ব হলো বক্তব্যকে বক্তব্য হিসেবে নয়, বরং যাচাইযোগ্য দাবি হিসেবে উপস্থাপন করা।
নির্বাচনী সাংবাদিকতা বা যেকোনো ধরনের সাংবাদিকতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো সংবাদ সূত্র বা সোর্স। এই প্রসঙ্গে বলা যায়—‘খবরের সোর্স বা সূত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ সংবাদ সূত্রগুলো হচ্ছে: মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা, মেয়র বা পৌর চেয়ারম্যান, পুলিশ, দমকল বাহিনী, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, জনসংযোগ কর্মকর্তা ইত্যাদি। সব রিপোর্টারই এসব সূত্র ব্যবহার করেন। কিন্তু এর বাইরেও একজন রিপোর্টারকে অনেক সূত্র গড়ে তুলতে হয়। সেগুলো হয় তার নিজস্ব। তবে তাকে খেয়াল রাখতে হবে যে, সেই সূত্র যেন হয় নির্ভরযোগ্য’ (গাইন, ২০০৫, পৃ. ৪৫)।
তবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে—ডিজিটাল সাংবাদিকতার রমরমা সময়ে ২০০৫ সালের এই আলাপটিরও হালনাগাদ সংস্করণ দরকার। এখন সোশ্যাল মিডিয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সূত্র হয়ে উঠেছে। সব রাজনৈতিক দল, প্রার্থী তো বটেই নির্বাচনের সিংহভাগ সম্পন্ন হচ্ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। তাই ডিজিটাল সোর্স এর জন্য প্রযুক্তিগত সুশিক্ষিত সাংবাদিকতার আচরণ কাম্য।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি ও সাংবাদিকদের জন্য নির্ধারিত নীতিমালা একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স পয়েন্ট। নির্বাচনকালীন সময়ে ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা, ভোটকেন্দ্রের ভেতরে লাইভ সম্প্রচার সীমিত রাখা এবং ভোটারদের পরিচয় প্রকাশ না করার নির্দেশনাগুলো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ (Election Commission of Bangladesh, 2025)।
এসব নীতিমালা মানা শুধু আইনগত বাধ্যবাধকতা নয়; এটি সাংবাদিকতার নৈতিক দায়িত্বের অংশ, কারণ ভোটারদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা সরাসরি গণতন্ত্রের ভিত্তির সঙ্গে যুক্ত। ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ অনুসারে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। জাতীয় সংসদের নির্বাচন পরিচালনার জন্য The Representation of the People Order, 1972 বিদ্যমান রয়েছে, যা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংক্ষেপে আরপিও) নামে বহুল পরিচিত’ (বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন, ২০০৮; পৃ. ৫)।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদ মূল বিষয়গুলো হলো—রাষ্ট্রপতি ও সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব, ভোটার তালিকা প্রস্তুতকরণের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ, সংসদীয় নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, সংবিধান বা সংসদ কর্তৃক প্রণীত অন্য কোনো আইনের (যেমন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) অধীনে অর্পিত অন্যান্য দায়িত্ব পালন। আর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ হলো বাংলাদেশে সংসদ নির্বাচন পরিচালনার প্রধান আইনি কাঠামো, যা প্রার্থীর যোগ্যতা, নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ করে। সহজ কথায়, সংবিধানের ১১৯ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবে প্রয়োগ করার বিস্তারিত নিয়ম ও কার্যপ্রণালী হলো এই আরপিও।
ডিজিটাল মাধ্যমে সাংবাদিক যদি ভাইরাল কনটেন্টের পেছনে ছোটে, তাহলে সে নিজেই বিভ্রান্তির অংশ হয়ে ওঠে। যদি এই মাধ্যমকে যাচাই, প্রেক্ষাপট ও নাগরিক সচেতনতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তবে ডিজিটাল সাংবাদিকতাই নির্বাচনী সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।
লাইভ সম্প্রচার নির্বাচনী সাংবাদিকতার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি। রাজনৈতিক যোগাযোগ গবেষণায় একে বলা হয় ‘মিডিয়াটাইজেশন অব পলিটিক্স’—যেখানে রাজনীতি ক্রমে মিডিয়ার দৃশ্যমানতা, নাটকীয়তা ও তাত্ক্ষণিক যুক্তির অধীন হয়ে পড়ে (Strömbäck, 2008)।
লাইভ সম্প্রচারে যাচাইয়ের সময় কম থাকে, আবেগ বেশি থাকে এবং ভুল বা গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে, যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র, লাইভ ক্যামেরা কখনো কখনো ভোটারদের মধ্যে ভয়ভীতি বা সামাজিক চাপও তৈরি করতে পারে। সে কারণেই আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা নীতিমালায় নির্বাচনী লাইভ কাভারেজে বিলম্বিত সম্প্রচার এবং শক্ত সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেওয়া হয় (UNESCO, 2023)।
ডিজিটাল মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্বাচনী সাংবাদিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এআই-নির্ভর কনটেন্ট, ডিপফেক ভিডিও, মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন এখন নির্বাচনী বাস্তবতার অংশ। UNESCO নির্বাচনী সময়কে ‘information integrity crisis moment’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে (UNESCO, 2023)।
এই বাস্তবতায় সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব দ্বিগুণ—একদিকে যাচাই ছাড়া কোনো ইউজার-জেনারেটেড কনটেন্ট প্রকাশ না করা, অন্যদিকে গুজব ও ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে সক্রিয় ফ্যাক্ট-চেকিং ভূমিকা পালন করা। বাংলাদেশের নির্বাচনী সাংবাদিকতায় ডিজিটাল মাধ্যম একদিকে গতি এনে দিয়েছে, অন্যদিকে দায়িত্বের মাত্রাও বহুগুণ বাড়িয়েছে।
আগে যেখানে নির্বাচনসংক্রান্ত তথ্য আসতে আসতে দিন গড়াত, এখন সেখানে ফেসবুক পোস্ট, ইউটিউব লাইভ বা হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে খবর—বা খবরের মতো দেখতে গুজব—ছড়িয়ে পড়ে।
অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংবাদমাধ্যমকে দ্রুত আপডেট দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করেছে ‘আগে দাও, পরে যাচাই করো’—এমন বিপজ্জনক প্রবণতা। নির্বাচনী সময়ে এই তাড়াহুড়োর চাপেই অনেক সময় অসম্পূর্ণ তথ্য, অতিরঞ্জিত ভিডিও বা প্রেক্ষাপটহীন বক্তব্য সংবাদ হিসেবে হাজির হয়, যা ভোটারদের বিভ্রান্ত করে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থাকে দুর্বল করে।
আরও পড়ুন
অন্যদিকে, ডিজিটাল মাধ্যম সাংবাদিকতার জন্য নতুন একটি দায়িত্বের ক্ষেত্রও তৈরি করেছে—তা হলো তথ্য যাচাই ও ব্যাখ্যার কাজ। বাংলাদেশে নির্বাচনী সময়ে ফেক নিউজ, এডিট করা ভিডিও, পুরোনো ছবি বা কৃত্রিমভাবে তৈরি কনটেন্টকে নতুন ঘটনার মতো চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এই বাস্তবতায় সাংবাদিকতার ভূমিকা আর শুধু খবর দেওয়া নয়; বরং কী সত্য, কী মিথ্যা এবং কেন একটি তথ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়—তা ব্যাখ্যা করে দেওয়া।
ডিজিটাল মাধ্যমে সাংবাদিক যদি ভাইরাল কনটেন্টের পেছনে ছোটে, তাহলে সে নিজেই বিভ্রান্তির অংশ হয়ে ওঠে। যদি এই মাধ্যমকে যাচাই, প্রেক্ষাপট ও নাগরিক সচেতনতার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তবে ডিজিটাল সাংবাদিকতাই নির্বাচনী সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।
এই আলোচনায় ভারতের অভিজ্ঞতাও বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বিশ্বের বৃহত্তম ভোটারসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে ভারতে নির্বাচন বহু ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। এত বড় স্কেলে নির্বাচনী সাংবাদিকতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ‘পেইড নিউজ’, সরকারি সুবিধার অপব্যবহার এবং মিডিয়া পক্ষপাত (Press Council of India, 2019)।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের Model Code of Conduct সরকারি বিজ্ঞাপন ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করেছে, যা মিডিয়ার জন্যও একটি নৈতিক কাঠামো তৈরি করে (Election Commission of India, 2024)। এই তুলনা আমাদের দেখায়—বড় নির্বাচন মানেই বড় প্রলোভন, আর তাই আরও শক্ত নীতিমালার প্রয়োজন।
দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী সাংবাদিকতা কেবল পেশাগত নয়; এটি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রশ্নও বটে। সাংবাদিকদের হুমকি, অনলাইন হ্যারাসমেন্ট এবং আইনি চাপ এই অঞ্চলে পরিচিত বাস্তবতা। এ কারণেই সংঘাত-সংবেদনশীল সাংবাদিকতার ধারণা নির্বাচনী কাভারেজে বিশেষ গুরুত্ব পায় (Lynch & McGoldrick, 2005)।
উত্তেজনামূলক ভাষা এড়িয়ে, যাচাই করা তথ্য ও প্রক্রিয়াগত বিশ্লেষণের ওপর জোর দেওয়া নির্বাচনকে সহিংসতা থেকে দূরে রাখতে সহায়ক হতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নির্বাচনী সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—হলো কীভাবে বস্তুনিষ্ঠভাবে এই নির্বাচনকে নথিবদ্ধ ও ব্যাখ্যা করা যায়। ড. মোহাম্মদ সাইফুল আলম চৌধুরীর ‘বস্তুনিষ্ঠ নির্বাচন সাংবাদিকতা’ বইয়ে বলা হচ্ছে, নির্বাচন কোনো নিছক রাজনৈতিক আয়োজন নয়; এটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ, যেখানে নাগরিকদের সচেতন ও তথ্যভিত্তিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সাংবাদিকতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ (Chowdhury, 2025, p. 12)।
একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, নির্বাচনকালীন সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তি হলো পক্ষপাতহীনতা—ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আগ্রহ বা দলীয় আনুগত্য সাংবাদিকতার দায়িত্বকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে (Chowdhury, 2025, p. 85)।
বইয়ে নির্বাচনী সহিংসতা ও সংঘাত–সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে সংবাদ পরিবেশনের প্রশ্নেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যেখানে উত্তেজনা না বাড়িয়ে দায়িত্বশীল কাভারেজের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে (Chowdhury, 2025, p. 99)।
ভোটকেন্দ্র কাভারেজ ও লাইভ সম্প্রচারের ক্ষেত্রে লেখক মনে করিয়ে দিয়েছেন যে সাংবাদিকরা এখানে নির্দিষ্ট নৈতিক ও আইনগত সীমারেখার মধ্যে থেকেই কাজ করতে বাধ্য, কারণ ভোটের গোপনীয়তা ও ভোটারের নিরাপত্তা গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত (Chowdhury, 2025, p. 107)।
একই সঙ্গে ডিজিটাল মিডিয়া ও ফেক নিউজের নির্বাচনী প্রভাব নিয়ে আলোচনাটি বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো স্পষ্টভাবে সামনে আনে (Chowdhury, 2025, p. 148)।
নির্বাচন শুধু ব্যালট বাক্সে সিল দেওয়া নয়; এটি নাগরিকদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি সুযোগ। সেই সুযোগ কতটা অর্থবহ হবে, তার বড় অংশ নির্ভর করে সংবাদমাধ্যমের ওপর।
এর পাশাপাশি নির্বাচন ও নির্বাচনবিষয়ক সাংবাদিকতা আরও দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রয়েছে। এগুলো হলো হ্যান্ডবুক অন ইলেকশন রিপোর্টিং (Handbook on Election Reporting) এবং রিপোর্টিং গাইড (Reporting Guide)।
হ্যান্ডবুক অন ইলেকশন রিপোর্টিং বইটি ফিলিপ গাইন সম্পাদিত এবং নির্বাচনসংক্রান্ত সংবাদ সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরিতে সাংবাদিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশিকা হিসেবে বিবেচিত। বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে এবং পরবর্তীতে ২০০৮ সালে এতে হালনাগাদ তথ্য সংযোজন করা হয়।
অন্যদিকে, রিপোর্টিং গাইড মূলত অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতা ও প্রতিবেদন প্রস্তুতের একটি সহায়ক গ্রন্থ, যেখানে নির্বাচন ও সংসদীয় প্রতিবেদন তৈরির বিভিন্ন নিয়ম-কানুন, কৌশল এবং পদ্ধতি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
এই বইগুলো দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্ট আইন এবং মাঠপর্যায়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাংবাদিক ও গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে প্রকাশের পর দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ায় সমাজে রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশল ও সাংবাদিকতার ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে।
অ্যানালগ যুগ পেরিয়ে আমরা ডিজিটাল এবং বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছি। পাশাপাশি নির্বাচনসংক্রান্ত সরকারি বিধিনিষেধ ও আইনেও এসেছে নানা পরিবর্তন ও হালনাগাদ। ফলে বই দুটি মৌলিক গুরুত্ব বহন করলেও সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এর কিছু বিষয় আংশিকভাবে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি নাগরিকদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় সাংবাদিকতার ভূমিকা নির্ধারক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম যদি কমিউনিকেশন স্টাডিজ ও সাংবাদিকতার নৈতিক তত্ত্বগুলো বাস্তব চর্চায় রূপ দিতে পারে, তবে এই নির্বাচন কেবল একটি ভোটের দিন হয়ে থাকবে না—এটি গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার একটি মানদণ্ডও স্থাপন করতে পারে।
নির্বাচন শুধু ব্যালট বাক্সে সিল দেওয়া নয়; এটি নাগরিকদের তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার একটি সুযোগ। সেই সুযোগ কতটা অর্থবহ হবে, তার বড় অংশ নির্ভর করে সংবাদমাধ্যমের ওপর। নির্বাচনী সাংবাদিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ‘কে জিতল’ প্রশ্নের চেয়েও ‘খবরটা ঠিক ছিল কি না’ প্রশ্নটি বেশি জরুরি—তবেই একটি নির্বাচন ইতিহাসে শুধু ‘ভোটের দিন’ হিসেবে নয়, বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার একটি মানদণ্ড হিসেবেও জায়গা করে নেবে।
তথ্যঋণ:
১। Entman, R. M. (1993). Framing: Toward clarification of a fractured paradigm. Journal of Communication, 43(4), 51–58.
২। Election Commission of Bangladesh. (2025). Code of conduct for media and election coverage. Dhaka.
৩। Election Commission of India. (2024). Model code of conduct. New Delhi.
৪। Kovach, B., & Rosenstiel, T. (2014). The elements of journalism (3rd ed.). Three Rivers Press.
৫। Lynch, J., & McGoldrick, A. (2005). Peace journalism. Hawthorn Press.
৬। McCombs, M. E., & Shaw, D. L. (1972). The agenda-setting function of mass media. Public Opinion Quarterly, 36(2), 176–187.
৭। McQuail, D. (2010). McQuail’s mass communication theory (6th ed.). Sage.
৮। Press Council of India. (2019). Paid news and media ethics. New Delhi.
৯। Strömbäck, J. (2008). Four phases of mediatization of politics. The International Journal of Press/Politics, 13(3), 228–246.
১০। UNESCO. (2023). Media and elections in the digital age. Paris: UNESCO.
১১। Chowdhury, M. A. (2025). Objective election journalism (বস্তুনিষ্ঠ নির্বাচন সাংবাদিকতা) (pp. 1–177). Dhaka: Media Resources Development Initiative (MRDI).
১২। গাইন, ফিলিফ (সম্পা.). (২০০৮). সাংবাদিক সহায়ক তথ্যপঞ্জি: নির্বাচনী রিপোর্টিং (তৃতীয় সংস্করণ). ঢাকা, বাংলাদেশ: সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড). পৃ. ৭।
১৩। গাইন, ফ. (সম্পা.). (২০০৫). রিপোর্টিং গাইড. সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড) পৃ. ৪৫)।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন. (২০০৮), জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়েল. ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রেস। পৃ. ৫।
রাজীব নন্দী : সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ক গবেষক
[email protected]
