নগর স্বাস্থ্য : নতুন সরকারের কাছে নগরবাসীর প্রত্যাশা

বাংলাদেশের নগরগুলো আজ দ্রুত ও প্রায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে। জীবিকার সন্ধান, উন্নত শিক্ষা ও উন্নত চিকিৎসাসেবার আশায় প্রতিদিন হাজারও মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে ছুটে আসছে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৯ শতাংশ নগর এলাকায় বসবাস করছে এবং ২০৪০ সালের মধ্যে এই হার ৫০ শতাংশে পৌঁছাবে বলে পূর্বাভাস রয়েছে (World Bank, 2023)।
দ্রুত নগরায়ণ একদিকে নগর অর্থনীতিকে সচল রাখলেও, অন্যদিকে নগর জীবনের ওপর সৃষ্টি করছে তীব্র চাপ। অপরিকল্পিত আবাসন, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং সীমিত নাগরিক সেবার কারণে নগরগুলো ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। এর সবচেয়ে গভীর প্রভাব পড়ছে নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও জীবনমানের ওপর। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য নগর স্বাস্থ্য আজ বড় এক সংকট। এমন বাস্তবতায় নতুন সরকারের কাছে নগরবাসীর প্রত্যাশা-নগর স্বাস্থ্যকে কেবল একটি সেবাখাত হিসেবে নয়, বরং নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
নগরবাসীর প্রথম ও প্রধান প্রত্যাশা হলো সহজলভ্য, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা। বর্তমানে নগরের অধিকাংশ মানুষ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল, যেখানে চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৪ শতাংশই ব্যক্তিগত পকেট থেকে ব্যয় হয়—যা নগরবাসীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে (MOHFW, 2022)। অপরদিকে সিটি কর্পোরেশন পরিচালিত নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো সংখ্যায় ও সক্ষমতায় অপ্রতুল। অনেক কেন্দ্রে চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি রয়েছে। ঢাকা শহরে প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার বিপরীতে সরকারি হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৮-এরও কম (DGHS, 2022)-এ তথ্য নগর স্বাস্থ্যসেবার সংকটকে আরও স্পষ্ট করে। নগরবাসীর দাবি, প্রতিটি ওয়ার্ডে কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করে সেখানে মা ও শিশু স্বাস্থ্য, টিকাদান, পুষ্টি, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো অসংক্রামক রোগের নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নগর দরিদ্র ও বস্তিবাসীর স্বাস্থ্য-সুরক্ষা এখন সময়ের জরুরি অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, নগর এলাকার প্রায় ৩২-৩৫ শতাংশ মানুষ বস্তিতে বসবাস করে, যেখানে স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেশি (BBS, 2022)। বস্তি এলাকাগুলোয় অস্বাস্থ্যকর বাসস্থান, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং নাজুক স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে সংক্রামক রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ইউনিসেফের আরবান হেলথ সার্ভে অনুযায়ী, বস্তি এলাকায় পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার ৪০ শতাংশের বেশি (UNICEF, 2021)। ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, যক্ষ্মা, ডায়রিয়া ও চর্মরোগ এসব এলাকায় প্রায় নিয়মিত সমস্যা। নগরবাসীর প্রত্যাশা- নতুন সরকার বস্তিভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিক, ভ্রাম্যমাণ স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় চিকিৎসা পৌঁছে দেবে।
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হলো, পরিবেশবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা। নগরের বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ঢাকা বিশ্বের অন্যতম দূষিত শহর এবং এখানে বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর হাজারও মানুষের অকাল মৃত্যু ঘটে (WHO, 2022)।
জলাবদ্ধতা ও ময়লা-আবর্জনার কারণে মশাবাহিত রোগ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। উল্লেখ্য যে, ২০২২ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তদের ৭০ শতাংশের বেশি ছিল নগর এলাকার বাসিন্দা (IEDCR, 2022)। তাই নতুন সরকারের কাছে নগরবাসীর দাবি—স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং উন্মুক্ত সবুজ স্থান বৃদ্ধি করতে হবে।
চতুর্থত, নগর স্বাস্থ্যসেবায় সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দালালচক্রের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতে সাধারণ মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হয় এবং আস্থা হারায়। টিআইবি-এর গবেষণায় দেখা গেছে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় অনিয়ম ও দুর্নীতি নগর দরিদ্রদের জন্য অন্যতম বড় প্রতিবন্ধক (TIB, 2020)। নগরবাসীর প্রত্যাশা- ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড, অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক তদারকি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হবে।
পঞ্চমত, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ এখন নগরবাসীর একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি। কর্মজীবনের চাপ, যানজট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নগরবাসীর মধ্যে মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের নগর যুবকদের প্রায় ১৮-২০ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক চাপ বা বিষণ্নতার উপসর্গে ভুগছে (WHO Mental Health Atlas, 2020)। অথচ মানসিক স্বাস্থ্য এখনো অবহেলিত একটি ক্ষেত্র। নগরবাসীর প্রত্যাশা-নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোয় কাউন্সিলিং সেবা চালু করা, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং স্কুল-কলেজে মনোসামাজিক সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।
সবশেষে, নগরবাসীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক প্রত্যাশা হলো একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি নগর স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন। বাস্তবতা হলো নগর স্বাস্থ্য আজ একক কোনো প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয়ের পক্ষে একা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী খাতের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ছাড়া নগর স্বাস্থ্য উন্নয়ন কেবল নীতিগত ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকবে। দায়িত্ব বিভাজনের অস্পষ্টতা ও সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে অনেক ভালো উদ্যোগও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারছে না। নগরবাসীর প্রত্যাশা, এই প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা দূর করে একটি সুস্পষ্ট দায়িত্ব কাঠামো, তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবসম্মত নগর স্বাস্থ্য রোডম্যাপ গ্রহণ করা হবে।
সার্বিকভাবে বলা যায়, নগর স্বাস্থ্য উন্নয়ন কেবল হাসপাতাল বা ডাক্তার বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, মানবিক মর্যাদা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার একটি মৌলিক প্রশ্ন। একটি সুস্থ নগর মানে কেবল চিকিৎসা সুবিধাসম্পন্ন নগর নয়-বরং এমন একটি নগর যেখানে বিশুদ্ধ বাতাস, নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবায় সবার সমান অধিকার থাকবে। নতুন সরকার যদি নগরবাসীর এই বাস্তব ও ন্যায্য প্রত্যাশাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, তবে কেবল স্বাস্থ্যখাতই নয়, সমগ্র নগরজীবন আরও নিরাপদ, মানবিক ও বাসযোগ্য হয়ে উঠবে।
রেফারেন্স:
১। World Bank (2023), Urban Population (% of total population) – Bangladesh
২। Ministry of Health and Family Welfare (2022), Bangladesh National Health Accounts
৩। DGHS (2022), Health Bulletin Bangladesh
৪। Bangladesh Bureau of Statistics (2022), Slum Census
৫। UNICEF Bangladesh (2021), Urban Health and Nutrition Survey
৬। WHO (2022), Air Pollution and Health
৭। IEDCR (2022), Dengue Situation Report
৮। Transparency International Bangladesh (2020), Health Sector Governance Study
৯। WHO (2020), Mental Health Atlas
অভিজিৎ কুমার সিংহ : রিসার্চ অ্যান্ড কমিউনিকেশন অফিসার, এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট
[email protected]