নির্বাচন ও শিশুদের নিরাপত্তা : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তেজনাও ততই বাড়ছে। রাস্তায় রাস্তায় নির্বাচনী র্যালি, মাইকে উচ্চস্বরে গান, পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে যাচ্ছে পাড়া-মহল্লা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব ও টেলিভিশন চ্যানেলগুলোয় নির্বাচনকেন্দ্রিক খবর, বিশ্লেষণ, বিতর্ক ও সমালোচনা দিনরাত চলছেই।
বড়দের জন্য এই সময়টা রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও অনেক ক্ষেত্রে উৎসবমুখর হলেও, একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়—এই পুরো পরিবেশ শিশুদের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে এবং আমরা কি তাদের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন?
শিশুদের মানসিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত বিকাশের জন্য নিরাপদ, স্থিতিশীল ও ভয়মুক্ত পরিবেশ অপরিহার্য। কিন্তু নির্বাচনকালীন সময়ে সহিংসতা, উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
নির্বাচনী প্রচারণা, সমাবেশ, সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অতিরিক্ত শব্দ ও ভীতিকর দৃশ্য শিশুদের ওপর সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে। অনেক শিশু এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়, আবার অনেকেই টেলিভিশন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সহিংসতা ও উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যের মুখোমুখি হয়। এর ফল হিসেবে শিশুদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে।
নির্বাচনের সময় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে। একদিকে এটি শিশুদের জন্য শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেও, অন্যদিকে তাদের দৈনন্দিন রুটিন ভেঙে যায়।
...গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৭ সালে সহিংসতায় আক্রান্ত এলাকার শিশু ও কিশোররা পরবর্তী জীবনে মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক নানা সমস্যায় ভুগেছে।
বাইরে খেলাধুলার সুযোগ কমে আসে, অভিভাবকেরা নিরাপত্তার কারণে শিশুদের ঘরে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফলে স্ক্রিনটাইম বেড়ে যায়—টেলিভিশন, মোবাইল ফোন বা ট্যাবলেট হয়ে ওঠে সময় কাটানোর প্রধান মাধ্যম।
দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রিনে রাজনৈতিক সহিংসতার দৃশ্য বা উত্তেজক বক্তব্য শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যা অনেক সময় আমরা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করি না।
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, নির্বাচনকালীন সহিংসতার প্রভাব শিশুদের জীবনে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিফলিত হয়। জার্নাল অব ইকোনমিক বিহেভিয়ার অ্যান্ড অর্গানাইজেশন-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৭ সালে সহিংসতায় আক্রান্ত এলাকার শিশু ও কিশোররা পরবর্তী জীবনে মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক নানা সমস্যায় ভুগেছে।
সহিংসতার ফলে শুধু ব্যক্তিগত নয়, পারিবারিক ও সামাজিক পর্যায়েও ক্ষতি হয়েছে—পরিবারগুলোর ভোগব্যয় কমেছে, খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে এবং সামগ্রিকভাবে মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
যদিও নির্বাচনকালীন সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সরাসরি ব্যাহত না হতে পারে, তবুও শিশুদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে এর নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী।
আরও পড়ুন
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। নেপালের সরকারের ‘শিশু এবং নির্বাচন’ (২০০৮) শীর্ষক প্রতিবেদনে নির্বাচনকালীন সহিংসতা ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ শিশুদের ওপর কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে, তা বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার, নির্বাচনী সমাবেশে উপস্থিতি এবং স্কুলকে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার তাদের শিক্ষাগত ও মানসিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করেছে।
শিশুদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ, মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে—যার প্রভাব পরবর্তী জীবনেও বহন করতে হয়েছে।
এই বাস্তবতায় একটি বিষয় স্পষ্ট—শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। শিশুরা রাজনৈতিক মতাদর্শ বোঝার বা বহন করার জন্য নয়; তারা শেখার, খেলাধুলা করার এবং নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার অধিকার নিয়ে জন্মায়।
শৈশবের অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও মানসিক চাপ মানুষের জীবনে দীর্ঘদিন প্রভাব ফেলে। তাই শিশুদের স্বাধীনভাবে বড় হওয়ার সুযোগ, নিজস্ব চিন্তা ও মূল্যবোধ গঠনের পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
নির্বাচনকালীন সময়ে অভিভাবকদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল বন্ধ থাকলে শিশুদের সঙ্গে মানসম্মত সময় কাটানো, তাদের ভয় বা প্রশ্নগুলো গুরুত্ব দিয়ে শোনা এবং বয়স উপযোগী ভাষায় পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
মোবাইল স্ক্রিনটাইম সীমিত রাখা, সহিংস বা উত্তেজনাপূর্ণ কনটেন্ট থেকে শিশুদের দূরে রাখা এবং ঘরের ভেতরে সৃজনশীল ও খেলাধুলাভিত্তিক কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
বিশেষ করে কিশোর ও বয়ঃসন্ধিকালের শিশুদের ক্ষেত্রে গঠনমূলক আলোচনা জরুরি, যাতে তারা দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক মূল্যবোধ ও দেশের কল্যাণের কথা ভাবতে শেখে।
একই সঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের দায়িত্বও কম নয়। সহিংসতা এড়িয়ে চলা, উত্তেজক বক্তব্য পরিহার করা এবং প্রচারণার সময় শিশু, বয়স্ক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
নির্বাচনী মাঠ ও মিডিয়ায় শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয় বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
নির্বাচনী মাঠ ও মিডিয়ায় শিশুবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয় বরং দেশের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায় যে, শিশুদের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী হয়। ২০২৫ সালের মার্কিন নির্বাচনে শিশুদের অধিকার ও কল্যাণকে কেন্দ্র করে নেওয়া নীতিমালাগুলো ভোটারদের ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে।
ফার্স্ট ফোকাস অন চিলড্রেন–এর প্রেসিডেন্ট ব্রুস লেসসি যথার্থই বলেছেন, শিশুদের বিষয়গুলো নির্বাচনী এজেন্ডার কেন্দ্রে আনতে হবে এবং ক্ষতিকর নীতির বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সময়ে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা এখনো সীমিত। সহিংসতায় মানুষের মৃত্যু, পরিবারের আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি শেষ পর্যন্ত শিশুদের জীবনকেই প্রভাবিত করে। সরাসরি শিক্ষার ক্ষতি না হলেও, ভয়, অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক চাপ শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও শিশু বান্ধব নির্বাচন শুধু গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই বাড়ায় না বরং দেশের ভবিষ্যৎকেও সুরক্ষিত করে। অভিভাবক, শিক্ষক, রাজনৈতিক দল, সরকার ও সমাজের প্রত্যেক সদস্যকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
শিশুরা দেশের ভবিষ্যৎ—তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা মানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যতকে নিরাপদ করা।
ফারহানা মান্নান : প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী, শৈশব; শিক্ষা বিষয়ক লেখক ও গবেষক