জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতীক না ব্যক্তি ইমেজ, কার প্রভাব বেশি?

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে কিংবা সত্তরের নির্বাচনে ব্যক্তির চেয়ে মার্কা বা প্রতীক অনেক বেশি শক্তিশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। কোনো দলের দলীয় প্রধান এবং দলের প্রতীক দুটোই যদি জনপ্রিয় হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুটো দলের মধ্যে কিংবা দুটো দলের সমর্থিত জোটের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সমর্থিত জোটে বেশ কয়েকটা দল এবং আওয়ামী লীগ বিহীন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও ১০ দলীয় জোটের সমর্থনে কয়েকটি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।
নির্বাচনের মাঠে আছে জেনারেল এরশাদের গঠন করা জাতীয় পার্টি কিংবা ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনসহ অনেক মত ও পথের চিন্তাশক্তির রাজনৈতিক দল। সংসদের প্রতিটি আসনে সুসংগঠিত রাষ্ট্র গঠনের অভিপ্রায়ে অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছে। সাথে বিভিন্ন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী যারা ব্যক্তি ইমেজের জন্য চূড়ান্ত ফলাফলে প্রভাব বিস্তার করবে এমনটাই দেখা যাচ্ছে।
একটা সময় দেখা যেত বিএনপি সমর্থিত ৭ দল ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত ৮ দল। কোনো কোনো সময় বিএনপি সমর্থিত ২০ দল আর আওয়ামী লীগ সমর্থিত ১৪ দল। সাধারণত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে নির্বাচনকালীন সময়কে প্রাধান্য দিয়ে এ ধরনের জোটের আবির্ভাব দেখা যায়। নীতি কিংবা রাজনৈতিক আদর্শকে জলাঞ্জলি দিয়ে শুধুমাত্র নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্যই জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রবণতাই বেশি।
এবারের নির্বাচনে নমিনেশন জমা দেওয়ার আগমুহূর্ত পর্যন্ত নবগঠিত এনসিপিকে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত জোটে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা করতে দেখেছি, দেখেছি বহুদিনের বিএনপির রাজনৈতিক সঙ্গী এলডিপিকে আসন সংখ্যার ভাগবাটোয়ারা মনঃপূত না হওয়ার কারণে আজীবন বিরুদ্ধাচরণ করা জামায়াতে ইসলামীর সাথে কর্নেল (অব.) অলি আহমেদের নির্বাচনী জোটে অন্তর্ভুক্তি সত্যই অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
নিজেদের অস্তিত্বকে বিলীন করে দেশ মাতৃকার প্রশ্নে আপসহীন থাকা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ শুধুমাত্র নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য বিভিন্ন জোটে প্রবেশ করে দেশের সাধারণ জনগণকে বিশেষ করে ভোটারদের বিভ্রান্ত করে ফেলা হচ্ছে।
ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন মনোনয়ন জমা দেওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীসহ ইসলামী দলগুলোর জোটের সাথে থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চেয়েছিল কিন্তু আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় এককভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। যাদের প্রতীক হাতপাখা। নির্বাচনী মাঠে সবার লক্ষ্য একটাই যেকোনো উপায়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া।
২০১৮ সালের কোটা বিরোধী আন্দোলনের পর গঠন করা ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর-এর গণঅধিকার পরিষদ থেকে বের হয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান নির্বাচনের আগ মুহূর্তে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠিক তেমনই এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ-এর ক্ষেত্রেও একই ঘটনার আবির্ভাব। আরও এক ধাপ উপরে ববি হাজ্জাজ। তার নিজের হাতে গঠিত রাজনৈতিক দল এনডিএম-কে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজ দলের মূলসহ উপড়ে ফেলে বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ।
এছাড়া জীবন সায়াহ্নে এসে বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামান জামায়াতে ইসলামী থেকে দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের প্রতি ভালো বার্তা দেয় না।
বিগত দিনে অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার, শমসের মুবিন চৌধুরী, ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরসহ আরও অনেকের নিজ দল ছেড়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়া বা কিংস পার্টিও নির্বাচনী খেলায় মেতে ওঠা রাজনীতির জন্য ইতিবাচক নয়।
একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, ভোটের রাজনীতিতে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ-এর সমর্থিত ভোটাররা একটা ফ্যাক্টর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর কাছে। প্রায় মাস খানেক ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলো আওয়ামী সমর্থিত ভোটারদের ভোট প্রাপ্তির জন্য আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকদের রক্ষাকারী হিসেবে জাহির করতে দেখা যাচ্ছে অনেককেই। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সারা দেশে প্রায় ৯০ জন, যা দলীয় প্রার্থীর জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন অনেকেই।
বিএনপির মূলনীতি-ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। এই ভাবাদর্শে যারা রাজনীতি করে আসছেন তারাই নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য দলের সিদ্ধান্তকে অবজ্ঞা করছেন যা, দলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো হয়ে গেছে।
এই সমস্যাগুলো দেখা গেছে বিগত দিনে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সময় আমি-ডামি নির্বাচন খ্যাত ২০২৪-এর নির্বাচনে। দলীয় কর্মী ও সমর্থকরা সবসময় দলের সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে এই প্রত্যাশা সবারই থাকে। নিজের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে দল ও দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবে জনগণ এই প্রত্যাশায় সবার করে।
জনগণকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে ব্যক্তি কিংবা দলের অতীত ইতিহাস, অভিজ্ঞতা কিংবা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রেখে সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন যিনি কিংবা যে দল আস্থার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে—জনগণ তাকেই বেছে নেবেন। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ তাদের কাছেই নিরাপদ থাকবে, দেশের জনগণ এই প্রত্যাশা করে।
মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট