নির্বাচনী অর্থনীতি : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

‘নির্বাচন’ বললেই আমাদের চোখের সামনে রাজনৈতিক চালচিত্র ভেসে ওঠে। এই যেমন প্রার্থী-ভোটার, পোস্টার-প্রচারণা, ভোটকেন্দ্র-ব্যালট বাক্স ইত্যাদি। নির্বাচনের এই রাজনীতি বেশ জটিল প্রক্রিয়া, চলেও বেশ কিছুদিন।
তবে নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রেক্ষিতের সঙ্গে এর সামাজিক প্রক্রিয়াও রয়েছে। এই যেমন, মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়, আলিঙ্গন, ভোট-প্রার্থনা, আহার-বিহার ইত্যাদি। অনেকেই বলেন যে নির্বাচনের এই সামাজিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী ও সাময়িক—নির্বাচন শেষ হলেই এইসব সম্প্রীতি কর্পূরের মতো উবে যায়। তখন নির্বাচিত প্রার্থী আর জনগণের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হয়।
তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষিত ভিন্নও নির্বাচনের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র রয়েছে—সেটি হচ্ছে নির্বাচনী অর্থনীতি। পৃথিবীর সবদেশেই নির্বাচনের এই অর্থনীতি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা পালন করে—কখনো কখনো নির্বাচনের ফলাফলকে প্রভাবিত করা পর্যন্ত। বাংলাদেশও এর ব্যত্যয় নয়। আমাদের দেশে বহু নির্বাচন দেখার অভিজ্ঞতা যাদের আছে, তাদের অনেকের মুখেই শুনেছি যে, ‘ভোট ব্যাপারটি আসলে হচ্ছে একটা টাকার খেলা’।
আসন্ন নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন অত্যন্ত উত্তপ্ত। রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্ক তো সেখানে চলছেই, সেই সাথে আলোচনা গড়াচ্ছে কোন দলের কতজন প্রার্থী কোটিপতি, নির্বাচনের জন্য অর্থব্যয়ে কোন কোন প্রার্থী সবচেয়ে বেশি এগিয়ে আছেন ইত্যাদি।
এসব আলোচনা শুধু সাধারণ মানুষের মুখের কথা নয়, প্রচার মাধ্যমও এ বিষয়গুলো নিয়ে নানান প্রতিবেদন তৈরি করছেন। সেই সঙ্গে রয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে দাখিলকৃত সব প্রার্থীর আয়-সম্পদের হিসাব।
তবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে নিজস্ব আয় ও সম্পদ থেকেই নির্বাচনী প্রার্থীরা তাদের নির্বাচন ব্যয় মেটাবেন। কোনো দেশেই তা মেটানো হয় না। সব দেশেই বিশাল বিশাল শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের পছন্দের প্রার্থীর পেছনে অঢেল টাকা ঢালেন। এই অর্থব্যয়ের পেছনে দুটো বিষয় কাজ করে।
এক, তাদের প্রার্থিত প্রার্থীদের জয়ের সম্ভাবনা বেশ। অনেকটা ঘোড়-দৌড়ে যে ঘোড়ার ওপরে তারা বাজি ধরেছেন, সেটির জয়ের সম্ভাবনা অনেক।
আর দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, জয়ী হয়ে ক্ষমতায় গেলে, তাদের সমর্থিত প্রার্থী এসব শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠাগুলো কী কী সুযোগ-সুবিধা দেবেন। অর্থাৎ, প্রক্রিয়াটি একটি বিনিয়োগের—সম্ভাব্য জয়ী প্রার্থীর ওপরে বিনিয়োগ করা হয় সম্ভাব্য মুনাফার কথা ভেবেই।
উন্নত রাষ্ট্রগুলোয় দলীয় সাধারণ সদস্য ও সমর্থকদের ছোট ছোট চাঁদাও প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বহন করে। বলা প্রয়োজন যে, এসব চাঁদা প্রদানকারী ব্যক্তিবর্গের নির্বাচন প্রার্থীর স্বপক্ষে অর্থপ্রদানের পেছনে কোনো ব্যক্তিস্বার্থ থাকে না।
সেই বিনিয়োগ যেসব সময়ে স্বচ্ছ, সৎ এবং দায়বদ্ধভাবে হয়ে থাকে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের নানান স্তরের নির্বাচন, বিশেষত রাষ্ট্রপতি, নির্বাচনের অর্থায়নের দিকে তাকালেই এটা বোঝা যায়। বিভিন্ন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী তাদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার সবটাই যে বিধিসম্মতভাবে করেন এমনটা নয়। অনেক সময়ে এসব চাঁদা কর ফাঁকির জন্যেও ব্যবহৃত হয়।
আমাদের দেশের নানান স্তরের নির্বাচনের অর্থায়ন সম্পর্কেও নানান গুঞ্জন রয়েছে এবং বৃহৎ ব্যবসায়ী ও স্বার্থান্বেষী মহলের অর্থসাহায্যে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় গেলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যে তাদের পৃষ্ঠপোষকদের স্বার্থ দেখবেন, তা বলাই বাহুল্য।
উন্নত রাষ্ট্রগুলোয় দলীয় সাধারণ সদস্য ও সমর্থকদের ছোট ছোট চাঁদাও প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বহন করে। বলা প্রয়োজন যে, এসব চাঁদা প্রদানকারী ব্যক্তিবর্গের নির্বাচন প্রার্থীর স্বপক্ষে অর্থপ্রদানের পেছনে কোনো ব্যক্তিস্বার্থ থাকে না।
সেখানে থাকে হয়তো দলের কিংবা প্রার্থীর প্রতি ভালোবাসা কিংবা নীতির প্রতি সমর্থন। আমাদের দেশের নির্বাচনে এ জাতীয় প্রক্রিয়া কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।
আরও পড়ুন
তবে আমাদের দেশের নির্বাচনের অর্থনীতির দুটো উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে দৃশ্যমান অর্থনীতি বনাম অদৃশ্য অর্থনীতি। নির্বাচনের দৃশ্যমান অর্থনীতির দিকগুলো কী কী? এই যেমন, নির্বাচনী প্রচারপত্র ছাপানো, সেগুলোকে নির্বাচনী এলাকার নানান দেয়ালে সাঁটা, আকর্ষণীয় ব্যানার আঁকা এবং সেগুলো নানান দৃশ্যমান জায়গায় টানানো, নির্বাচনী সভার ব্যবস্থা করা, প্রার্থী এবং তার নির্বাচনী দলের ভ্রমণ।
এইসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নানান কর্মসৃষ্টি এবং কর্ম নিয়োজনের ব্যাপারটি জড়িত। যেমন, প্রচারপত্র ছাপানো মানেই ছাপাখানায় কাজের বৃদ্ধি ও নতুন লোক নিয়োগ। সাময়িকভাবে বহু লোককে কাজে লাগাতে হয় সেই সব প্রচারপত্র দেয়ালে দেয়ালে সাঁটতে। বহু মানুষের কর্ম নিয়োজন হয় ওইসব প্রচারপত্র রাস্তা-ঘাটে, পাড়ায়-মহল্লায়, রিকশা-গাড়িতে বিলির জন্য।
নির্বাচনের ব্যানারগুলো শৈল্পিক কাজ এবং শিল্পীর কাজ। প্রত্যেক প্রার্থীই চান যে, তার ব্যানারগুলো যেন আকর্ষণীয় হয়। অঙ্কনশিল্পের কাজের প্রসার ঘটে নির্বাচনকালে। তারপর সেসব ব্যানার বিভিন্ন জায়গায় টানাতে হয়।
আবার কর্মবৃদ্ধির অর্থনীতি। নির্বাচনকালে বড় একটা সেবাখাতের প্রসার ঘটে এবং সেটি হচ্ছে সভা সংগঠনের কাজ। যেকোনো নির্বাচনী এলাকায় যেকোনো প্রার্থীর জন্যেই ছোট-বড় জনসভার ব্যবস্থা করতে হয়। নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে নানান পরিচিতি এবং মত বিনিময় সভার আয়োজনের সঙ্গে নানান মানুষের রুজি-রোজগারের প্রশ্ন জড়িত থাকে।
নির্বাচনের প্রস্তুতির সময়ে আতিথেয়তা খাতের কর্মকাণ্ডও বেড়ে যায়। কারণ নির্বাচনের কাজের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারটি—নির্বাচনের প্রচারণার কাজটির সময়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং দলীয় সমর্থকদের জন্যে খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয় ব্যাপকভাবে।
বর্তমান সময়ে নির্বাচনের জন্য তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার সর্বজনবিদিত। সেসব প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয় গান বানানোর জন্য, নানান সচল চিত্রাংশের জন্য। সেগুলো ব্যবহার করা হয় অবয়বপত্র এবং নানান সামাজিক মাধ্যম। এইসব কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ তরুণ-তরুণীদের।
এরা দল ও প্রার্থীর পক্ষে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিকেই কাজ করেন। তবে সেই সঙ্গে দেয়াললিখন যে একবারে উঠে গেছে এমন নয়। দলীয় কর্মী এবং প্রার্থীর সমর্থকেরা এ সনাতন কাজটি এখনো করে থাকেন। তবে উপযুক্ত চালচিত্রটি নির্বাচনের ‘দৃশ্যমান অর্থনীতির’ প্রতিচ্ছবি।
নির্বাচন আয়োজন এবং পরিচালনার জন্যে নির্বাচন কমিশনের খরচও নির্বাচনী অর্থনীতির অংশ। এই ব্যয়ের নানান প্রক্রিয়া, স্তর ও বিভাজনের মধ্যে না ঢুকেও বলা যায় যে, এই ব্যয় বিপুল।
বাংলাদেশের নির্বাচনে অদৃশ্য অর্থনীতিতে টাকার ছড়াছড়ি অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞেরা বলে থাকেন যে, এ অর্থনীতির শুরু প্রার্থিতা থেকেই। বাংলাদেশের বিভিন্ন নির্বাচনের সময়ে অভিযোগ শোনা গেছে যে, দলীয় মনোনয়ন সবসময়ে যোগ্যতা বা স্থানীয় জনপ্রিয়তার কারণে হয়নি, বরং প্রচুর টাকা আদান-প্রদানের মাধ্যমে হয়েছে।
দলের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বীকে টাকা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ারও আখ্যান শোনা গেছে নানান সময়ে। অন্য দলের বা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে কিনে নেওয়ার গল্পও আছে। মনোনীত প্রার্থীকে নির্বাচনী এলাকায় একটি সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তুলতে হয়। তাদের সবসময় নীতির সমর্থক হিসেবে সংগঠিত করা হয় না, তারা অনেক সময়েই প্রার্থীর জন্যে প্রয়োজনীয় পেশীশক্তির জোগান দেন।
এর ব্যয়ভারও বিরাট এবং এই পেশীশক্তি অনেক সময়েই শুধু যে সংঘাতের জন্যে ব্যবহার করা হয় তা নয়, তারা চাঁদাবাজি করে জোর করে অর্থ তোলেন—যা পরে ভাগবণ্টন হয়ে যায়। নির্বাচনের সময়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও চাঁদাবাজির শিকার হন।
প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী মিছিল করা থেকে শুরু করে প্রার্থীর পক্ষে জনসভা করতে হলে লোকসমাগম করতে হয়। তার একটি বহুল প্রচলিত পন্থা হলো অর্থবণ্টন। এ কাজটি বাংলাদেশে বহু কাল আগে থেকেই করা হচ্ছে। বাংলাদেশে ভোট কেনার কথা বহু শোনা গেছে, যেখানে একজন ভোটার অর্থের বিনিময়ে একজন প্রার্থীকে ভোট দেয়, তার পছন্দের কারণে নয়। টাকার বিনিময়ে ভোটকেন্দ্রে ভোটের সঙ্গে কর্মচারীদের আনুগত্য ক্রয়ের অভিযোগও তো আমরা শুনেছি এবং এখনো শুনছি।
নির্বাচন আয়োজন এবং পরিচালনার জন্যে নির্বাচন কমিশনের খরচও নির্বাচনী অর্থনীতির অংশ। এই ব্যয়ের নানান প্রক্রিয়া, স্তর ও বিভাজনের মধ্যে না ঢুকেও বলা যায় যে, এই ব্যয় বিপুল। এর মধ্যে প্রশাসনিক ব্যয় রয়েছে, আনুষঙ্গিক খরচ আছে। এবারের নির্বাচনের ব্যয় তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। এই বিশাল বাজেটে অর্থ ব্যয়ের পরে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার পাবো তা আশা করায় যায়।
ড. সেলিম জাহান : ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র