মানুষের মন বড় বিচিত্র জিনিস। সে জ্যামিতিক হারে স্বপ্ন দেখে, কিন্তু তার প্রাপ্তিগুলো জোটে গাণিতিক হারে।
বিজ্ঞাপন
সামনে ভোট। সবখানে একটা সাজ সাজ রব। চায়ের দোকানে আড্ডা জমছে, গণমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ প্রচার ও প্রকাশ করছে। সবাই অঙ্কের হিসাব মেলাতে ব্যস্ত।
কেউ বলছে, ‘বিএনপি তো ১৮০ থেকে ১৯০টি সিট পাবে!’ আবার কেউ বিজ্ঞের মতো চশমা মুছে বলছে, ‘আরে না, জামায়াত আর তাদের জোট এবার ৯০ থেকে ১০০টা আসন তো পাবেই।’
অঙ্কের ফলাফল কোনদিকে যাবে তা জানা যাবে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর পরে।
বিজ্ঞাপন
মূল বিষয় হলো, মানুষ আজকাল অনেক হিসাব কষে ভোট দেয়। কিন্তু আমার কাছে এই হিসাবটা নিছক অঙ্ক মনে হয় না। এই হিসাব হলো মানুষের এক ধরনের দীর্ঘশ্বাস আর প্রত্যাশা।
ঘরছাড়া এক বেকার যুবক যখন তার ছেঁড়া মানিব্যাগটা পকেটে রেখে রোদে পুড়ে ভোট দিতে দাঁড়াবে, সে কি তখন এই আসন বিন্যাস নিয়ে ভাববে? মোটেই না। সে ভাববে তার চাকরির কথা। সে ভাববে, ভোটের পর যে নতুন সরকার গদিতে বসবে, তারা কি তাকে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে?
আমার খুব ইচ্ছা করে ওই বিজয়ী দলগুলোকে ডেকে বলি—‘শোনেন বাপু, মানুষ আপনাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে ক্ষমতায় বসে পা দোলানোর জন্য নয়। মানুষ আপনাদের কাছে জমানো পাহাড় সমান অভিমান জমা রেখেছে। অর্থনীতিটা আজকাল বেশ কাহিল হয়ে পড়েছে, তাকে একটু সুস্থ করে তুলুন।’
বিজ্ঞাপন
কর্মসংস্থান জিনিসটা বড় অদ্ভুত। একটা মানুষের হাতে যখন কাজ থাকে, তখন তার পৃথিবীটা রঙিন হয়ে যায়। তখন তার ঘরে ডাল-ভাত জুটলেও দিনশেষে সে একটা তৃপ্তির ঘুম দিতে পারে। ১২ ফেব্রুয়ারির এই ব্যালট বিপ্লব তখনই সার্থক হবে, যখন আমার দেশের সাধারণ তরুণদের চোখে আর হতাশার ছায়া থাকবে না।
এই যে আমাদের ১৬ কোটি মানুষের ভিড়, এদের প্রত্যেকেরই ছোট ছোট কিছু স্বপ্ন আছে। কেউ তার বৃদ্ধ বাবার জন্য ওষুধ কিনতে চায়, কেউ তার ছোট বোনটার জন্য নতুন একটা জামা। এই স্বপ্নগুলো পূরণ করতে হলে বড় বড় বুলি না আউড়িয়ে নতুন সরকারকে কাজের পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
আরও যেসব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া যায় তা হলো—
১. উদ্যোক্তা বান্ধব পরিবেশ: শুধু সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণরা যাতে নিজেরাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) গড়ে তুলতে পারে, সেজন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
২. বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণ: রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে ফিরবেন। আইটি খাত এবং ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগ এলে লাখ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান হবে।
৩. দক্ষতা উন্নয়ন: আধুনিক বাজারের সাথে সংগতি রেখে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। সরকার গঠনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে ‘ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট’ মিশনকে নতুনভাবে সাজাতে হবে।
আগামীর বাংলাদেশটা যদি তারুণ্যের শক্তিতে ঝলমল করে ওঠে, তবেই মনে হবে আমরা জয় পেয়েছি। শেষ বিকেলের আলোয় ছাদে বসে এক কাপ চা খেতে খেতে যেন বলতে পারি—‘যাক, দেশটা অন্তত ঠিক পথে হাঁটছে।’
মো. বেনজীর শাহ শোভন : পরিকল্পনাবিদ; সদস্য, বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ প্ল্যানার্স
md.benozirshah@gmail.com
