সচেতন ভোটারদের দায় ও দায়িত্ব

বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রেক্ষাপট শুধুমাত্র দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দৃশ্যের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বিষয় যা প্রতিবেশী দেশগুলোর এবং বৃহৎ আন্তর্জাতিক শক্তিরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই অঞ্চলের রাজনৈতিক জটিলতা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং কৌশলগত গুরুত্ব মিলিয়ে নির্বাচনের ফলাফল আন্তর্জাতিক স্বার্থের সঙ্গে সরাসরি জড়িত হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে, বিদেশি শক্তিগুলো কেবল পরামর্শ বা সহযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায় না বরং তারা প্রায়শই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে ফলাফল নির্ধারণের চেষ্টা করে। এই চেষ্টা বিভিন্ন আকারে প্রকাশ পায়; কখনো এটি কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে, কখনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক প্রলোভনের মাধ্যমে, আবার কখনো মিডিয়ার ব্যবহার এবং তথ্য প্রচারের মাধ্যমে হয়।
প্রতিবেশী দেশগুলো, যা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, তাদের দৃষ্টি সবসময় বাংলাদেশের নির্বাচনের দিকে থাকে। ভারতীয় নীতি নির্ধারকরা চায় এমন একটি সরকার আসুক যা তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সমন্বয় এবং কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও সুবিধাজনক হবে। এর ফলে কোনো ঝুলন্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা সংখ্যালঘু সরকার ভারতীয় কূটনীতিকদের জন্য সুবিধাজনক হতে পারে। এ ধরনের সরকার সহজেই দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় অনুকূল অবস্থান নিতে পারে এবং সীমান্ত সংক্রান্ত, বাণিজ্যিক, পরিবহন ও জল সম্পদ নিয়ে যেকোনো বিরোধে সমন্বয়মূলক ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্যদিকে, ভারতের নিজস্ব নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থকে বজায় রাখার জন্যও তারা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় গভীর নজর রাখে।
একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্য, যারা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তারা বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রতি গভীর আগ্রহ রাখে। এই দেশগুলো চায় বাংলাদেশে এমন সরকার আসুক যা পশ্চিমা নীতি, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে সমন্বিত এবং বিশ্ববাজারে তাদের স্বার্থ রক্ষায় সহযোগী ভূমিকা পালন করতে পারে। নির্বাচনী সময়কালে তারা প্রায়শই রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সংবাদমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক রিপোর্টের মাধ্যমে দিকনির্দেশনা বা চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করে। একই সঙ্গে, ইউরোপীয় ইউনিয়নও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের দিক থেকে বাংলাদেশের নির্বাচনের প্রতি নজর রাখে। তারা চায় যে বাংলাদেশ একটি নিরপেক্ষ, কার্যকর এবং গণতান্ত্রিক সরকার দ্বারা পরিচালিত হোক, যাতে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় বাধা সৃষ্টি না হয়।
চীন, যা দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়াতে চায়, বাংলাদেশকে একটি কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখে। বাণিজ্যিক প্রকল্প, অবকাঠামোগত বিনিয়োগ এবং রেলপথ, বন্দরের উন্নয়ন ইত্যাদি প্রকল্পে চীনের আগ্রহ সুস্পষ্ট। চীনা নীতি নির্ধারকরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে এবং এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চেষ্টা করে যা তাদের প্রকল্পগুলো স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। তারা চায় নির্বাচনের ফলাফলে এমন সরকার আসুক যা বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত চুক্তিতে সহযোগী এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে চীনা বিনিয়োগকে সমর্থন করবে।
এমন প্রেক্ষাপটে, তুরস্ক ও পাকিস্তানও তাদের নিজস্ব স্বার্থে বাংলাদেশের নির্বাচনকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তারা চায় এমন একটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসুক যা তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক, সাংস্কৃতিক বা অর্থনৈতিক সহযোগিতায় সহায়ক হবে। কখনো কখনো এই দেশের প্রভাব সরাসরি না হলেও ভোটারদের মনোভাব এবং রাজনৈতিক বার্তায় পরোক্ষভাবে প্রতিফলিত হয়।
এই প্রসঙ্গে ভোটারদের সতর্কতা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুধু দেশের ভবিষ্যৎ প্রভাবিত করে না বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ। যদি ভোটাররা অবগত না থাকে বা প্রভাবিত হয়, তাহলে বিদেশি স্বার্থের খেলায় বাংলাদেশ ক্ষতির মুখোমুখি হতে পারে। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে ভোট দেওয়া, নিরপেক্ষ চিন্তাভাবনা এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা ভোটারদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক দল ও ভোটারদের মধ্যকার প্রতিযোগিতা নয়; এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতি, অর্থনীতি এবং কৌশলগত স্বার্থের একটি মিলনক্ষেত্র। তাই প্রত্যেক ভোটারকে বুঝতে হবে যে তাদের ভোট শুধুমাত্র অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত নয়, এটি দেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে। দেশীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে এবং বিদেশি প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে সচেতন নাগরিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, নির্বাচনের মাধ্যমে ঝুলন্ত জাতীয় সংসদ বা সংখ্যালঘু সরকার বিদেশি শক্তিগুলোর জন্য সুবিধাজনক। যখন কোনো রাজনৈতিক দল সম্পূর্ণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না, তখন দেশীয় সরকার নীতি প্রণয়নে স্বাধীন হতে পারে না এবং বিদেশি চাপের মুখে নড়াচড়া করতে বাধ্য হয়। এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে হুমকি সৃষ্টি করে এবং বিদেশি স্বার্থকে অস্বাভাবিকভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়। অতএব, জনগণের দায়িত্ব হয় কেবল নিজের ভোটাধিকার ব্যবহার করা নয়, বরং তা ব্যবহার করে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থ রক্ষার পথ প্রশস্ত করা।
এছাড়া, তথ্য ও মিডিয়ার ভূমিকা নির্বাচনের সময় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রচারিত সংবাদ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক রিপোর্ট প্রায়শই ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করে। বিদেশি শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে এবং প্রায়শই নির্বাচনের ফলাফলকে নিজেদের অনুকূলে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এমন পরিস্থিতিতে সচেতন ভোটাররা তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ এবং রাজনৈতিক প্রস্তাবনার বাস্তবতা বোঝার মাধ্যমে নিজের ভোটের গুরুত্ব নিশ্চিত করতে পারে। পাশাপাশি, তারা বিভ্রান্তি বা প্ররোচনার শিকার না হলে, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও দৃঢ় এবং মজবুত করা সম্ভব হয়।
বাংলাদেশের নির্বাচনের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস এবং বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নানা ধরনের চাপ এবং প্রভাবের মুখোমুখি হয়েছে। তবুও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে এবং স্থায়ী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণই প্রধান চাবিকাঠি। বিদেশি শক্তি যতই প্রভাব বিস্তার করতে চেষ্টা করুক, সচেতন, তথ্যভিত্তিক এবং ন্যায়পরায়ণ ভোটারশক্তি সব ধরনের প্রভাবকে সীমিত করতে সক্ষম।
সর্বোপরি, বাংলাদেশের নির্বাচন কেবল ভোটের প্রতিযোগিতা নয়; এটি দেশের সার্বভৌমত্ব, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক কৌশলগত অবস্থানের পরীক্ষার ক্ষেত্র। প্রতিটি ভোটার এখানে কেবল রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নয় বরং দেশের ভবিষ্যৎ এবং আন্তর্জাতিক স্বার্থের রক্ষকও বটে। নির্বাচনকে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে দেখা হবে না বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ভোটারদের সচেতনতা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব পালন করা হলে কোনো বিদেশি শক্তি সহজে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করতে পারবে না। এর ফলে দেশ অভ্যন্তরীণভাবে শক্তিশালী থাকবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে আত্মনির্ভর ও সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করবে। তাই আসন্ন নির্বাচনে নাগরিকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং দায়িত্ব হলো নিজের ভোটের মাধ্যমে দেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করা এবং বিদেশি প্রভাব থেকে রক্ষা করা।
ড. খালিদুর রহমান : অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়