কেমন নির্বাচন হলো

গণতন্ত্র একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোর অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। জনগণের মতামত, অধিকার এবং অংশগ্রহণের মাধ্যমেই একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চরিত্র গড়ে ওঠে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অন্যতম প্রধান উপায় হলো জাতীয় নির্বাচন। একটি দেশের জনগণের মতামত প্রতিফলনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হচ্ছে ভোটাধিকার প্রয়োগ। তাই জাতীয় নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; বরং এটি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথনির্দেশ করে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের মনে নতুন করে আশার আলো জাগে। জনগণ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের ক্ষমতা একটি গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ন্যস্ত হবে এবং বিদ্যমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সম্মানজনকভাবে দায়িত্ব শেষ করবে। সেই প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখেই ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১২ তারিখে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে নতুন আলোচনা ও আশার জন্ম দেয়।
এই নির্বাচনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বোঝার জন্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। আমি ২০০৮ সালের নিবন্ধিত ভোটার। সে সময় অত্যন্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে ভোট প্রদান করেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল আমি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের দায়িত্ব পালনে অংশ নিতে পেরেছি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নানা কারণে আর ভোট দেওয়ার সুযোগ পাইনি। এমনকি একবার ভোট দিতে গিয়ে জানতে পারি আমার ভোট আগেই প্রদান করা হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা শুধু আমার একার নয়; দেশের বহু ভোটার একই ধরনের হতাশার সম্মুখীন হয়েছেন। ফলে ২০২৬ সালের নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে নতুন করে প্রত্যাশা ও আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
২০২৬ সালের নির্বাচন নির্ধারিত সময় অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয় এবং নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। সারাদেশে বিপুল সংখ্যক ভোট কেন্দ্র স্থাপন এবং ভোট গ্রহণে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা প্রয়োগ করা হয়। নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ভোটারদের সচেতন করতে বিভিন্ন প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বিশেষভাবে আলোচিত হয়, যেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সংখ্যালঘু নারী ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস প্রদান করে। এই উদ্যোগ ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করে এবং বিশেষ করে নারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে সহায়তা করে।
নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময় রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলকভাবে প্রাণবন্ত ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতবিনিময় ও বক্তব্য উপস্থাপন ছিল লক্ষণীয়। যদিও দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য ছিল, তবুও ব্যক্তিগত আক্রমণ খুব বেশি দেখা যায়নি। বরং দলীয় নেতারা তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনা জনগণের সামনে তুলে ধরেন। তারা দেশের অর্থনীতি উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। রাজনৈতিক নেতাদের এই ইতিবাচক ও পরিকল্পনামূলক বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে বেশ উপভোগ্য এবং আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয়েছে।
ভোটারদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও এবারের নির্বাচন ছিল উল্লেখযোগ্য। ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের উপস্থিতি এবং আগ্রহ চোখে পড়ার মতো ছিল। অনেক ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভোট গ্রহণ পদ্ধতি নিয়ে অধিকাংশ ভোটার ইতিবাচক মন্তব্য করেন। যদিও কিছু এলাকায় ভোট প্রদান করতে বিলম্ব বা অতিরিক্ত ভিড়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে, তবুও সামগ্রিকভাবে জনগণের মধ্যে নির্বাচনকে ঘিরে অংশগ্রহণমূলক মনোভাব লক্ষ করা গেছে।
মাঠ পর্যায়ে সাধারণ ভোটারদের অভিজ্ঞতা এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। উত্তরাঞ্চলের একটি ভোট কেন্দ্রে একজন নারী ও একজন পুরুষ ভোটারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। নারী ভোটার জানান, ভোট দিতে গিয়ে তার কোনো ভয় বা সংকোচ কাজ করেনি। তিনি নিজের স্বাধীন মতামতের ভিত্তিতে ভোট প্রদান করেছেন বলে জানান। তার বক্তব্যে আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীন মত প্রকাশের আনন্দ স্পষ্ট ছিল। অন্যদিকে পুরুষ ভোটার জানান, তিনি এবারের নির্বাচনে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পেরে অত্যন্ত সন্তুষ্ট। অতীতে ভোট দিতে না পারার কারণে তিনি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। তবে এবারের নির্বাচনের পর তিনি আশা প্রকাশ করেন যে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করবেন, কারণ তারা এলাকার উন্নয়নের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে নিরাপত্তা বাহিনী সারাদেশে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অধিকাংশ এলাকায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়। কিছু বিচ্ছিন্ন স্থানে উত্তেজনা বা ছোটখাটো সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এবারের নির্বাচনে বড় ধরনের সহিংসতা বা সংঘর্ষের ঘটনা খুব কম দেখা গেছে, যা নির্বাচনকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।
এই নির্বাচনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিদেশি পর্যবেক্ষক নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন এবং নির্বাচন আয়োজনের বিভিন্ন দিক নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য করেন। তাদের মতে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল, ভোটারদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য ছিল এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা সন্তোষজনক ছিল। তারা ভবিষ্যতে নির্বাচন ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করার জন্য কিছু সুপারিশও প্রদান করেন।
এই নির্বাচনের সবচেয়ে আনন্দদায়ক বিষয় ছিল যেকোনো রাজনৈতিক দল বা পক্ষ থেকে বড় ধরনের কারচুপি বা গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়নি। সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছে। এটি একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নির্বাচনের সৌন্দর্য এখানেই যে জনগণের মতামতকে সম্মান জানিয়ে সব পক্ষ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
সর্বোপরি বলা যায়, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন পরিবেশ, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। একজন সাধারণ ভোটার হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা—বাংলাদেশ ভবিষ্যতেও গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে এবং জনগণের ভোটাধিকার সর্বদা সম্মানিত থাকবে।
মাহিউল কাদির : বেসরকারি সংস্থার বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান
[email protected]