বিএনপির কাছে প্রত্যাশা : নির্বাচনী অঙ্গীকার থেকে বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ

নির্বাচন শেষ, শপথ সম্পন্ন, এখন শুরু বাস্তবতার কঠিন অধ্যায়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গঠিত নতুন সরকারের সামনে একদিকে যেমন আশার পাহাড়, অন্যদিকে তেমনি চ্যালেঞ্জের সমুদ্র।
জনগণ তাদের ভোট দিয়ে শুধু সরকার গঠন করেনি বরং একটি প্রত্যাশার ভারও তুলে দিয়েছে—উন্নয়ন, সুশাসন, ন্যায়বিচার এবং নিরাপদ ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।
একটি নতুন সরকারের শপথ শুধু সাংবিধানিক নিয়ম রক্ষা নয় বরং একটি দেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ তুলে দেওয়া। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী এরপর এসেছে বর্তমান সরকার।
শুধু সরকার গঠন নয় বর্তমান সরকার বাংলাদেশের জন্য এমনকি সারা পৃথিবীর জন্য উদাহরণ হয়ে উঠার সুযোগ রাখে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিশ বছর পর বীরদর্পে জনগণের ভোটে নির্বাচিত, শুধু নির্বাচিত বললে ভুল হবে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচিত। তাও আবার নিরপেক্ষ নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে নির্বাচিত।
তারেক রহমান প্রায় ১৭ বছর যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত থাকার পর রাজার বেশে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পথ অনুসরণ করে নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন।
দেশের জনগণের কাছে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন সময় সেইসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের। দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আইনের সুশাসন, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থাসহ আরও নানাবিধ প্রত্যাশার পারদ।
প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হচ্ছে সুশাসন প্রতিষ্ঠা। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতা—এই তিনটি বিষয়ের কারণে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তির শিকার।
নতুন সরকারের কাছে তাই সবচেয়ে বড় দাবি হবে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলা। রাষ্ট্রযন্ত্রকে জনগণের সেবক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মানুষের জীবনকে চরমভাবে প্রভাবিত করছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়ছে।
নতুন সরকারের উচিত বাজার নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। শুধু পরিসংখ্যানগত প্রবৃদ্ধি নয়, সেই প্রবৃদ্ধির সুফল যেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষও পায়—এটাই হবে প্রকৃত উন্নয়ন।
তৃতীয়ত, যুবসমাজের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিবছর লাখ লাখ তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু সুযোগের তুলনায় প্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি।
দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ সহায়তা এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি না হলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী হতাশ হয়ে পড়বে, যা সামাজিক অস্থিরতার কারণ হতে পারে।
চতুর্থত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে মৌলিক সংস্কার সময়ের অপরিহার্য দাবি। শিক্ষাব্যবস্থা যদি যুগোপযোগী না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিশ্ব প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। একইভাবে, স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন না হলে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। শহরকেন্দ্রিক সেবার বাইরে গ্রাম পর্যায়ে মানসম্মত স্বাস্থ্য ও শিক্ষা পৌঁছে দিতে হবে।
পঞ্চমত, আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করা নতুন সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা নিরাপদ বোধ করে এবং বিচার পায়। রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে সহনশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত।
এছাড়া ডিজিটাল রূপান্তর, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটতে হলে পরিবেশবান্ধব নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। একইসঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন গড়ে তুলে দুর্নীতি কমানো এবং সেবার গতি বাড়ানো সম্ভব।
সবশেষে, নতুন সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—রাজনৈতিক সদিচ্ছা। পরিকল্পনা, প্রতিশ্রুতি বা ঘোষণার অভাব নেই; অভাব থাকে বাস্তবায়নের। জনগণ এখন আর শুধু আশ্বাস শুনতে চায় না, তারা দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখতে চায়। সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তে জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য দিতে হবে।
নতুন সরকারের জন্য এটি একটি সুযোগ—নিজেদের প্রমাণ করার এবং একইসঙ্গে ইতিহাসে একটি ইতিবাচক অধ্যায় যোগ করার। এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলেই জনগণের আস্থা অর্জন সম্ভব হবে। আর আস্থাই হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি।
মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট