ভাষা থেকে রাষ্ট্র, রাষ্ট্র থেকে বিশ্ব : বাংলা ভাষার নতুন দায়

১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে ভাষা একটি জাতির আত্মপরিচয়ের ভিত্তি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ দেখিয়েছে ভাষা হতে পারে রাষ্ট্র নির্মাণের শক্তি। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে আজ প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—বাংলা কি রাষ্ট্রের ভাষা থেকে বিশ্বভাষায় উত্তরণের প্রস্তুতি নিতে পেরেছে?
কেননা কেবল রাষ্ট্রের ভাষা হিসেবে নয় প্রত্যেকটি ভাষারই রয়েছে বিশ্বভাষায় উত্তরণের সুযোগ। অনেকক্ষেত্রে এই প্রশ্নও উত্থাপন করা যায় যে, বাংলা পরিপূর্ণভাবে কী রাষ্ট্রের ভাষা হতে পেরেছে? এই পথে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ভাষার জ্ঞানগত, প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি।
শক্তিশালী সাংস্কৃতিক কাঠামো যেমন ভাষাকে সুদৃঢ় ভিত্তি দেয় তেমনি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনী শক্তি ভাষাকে বিশ্ব দরবারে নতুন পরিচয়ে পরিচিত করে। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমরা আজও নিজেদের সংস্কৃতি আসলে কোনটি তার বিতর্ক জিইয়ে রেখেছি কেবল রাজনৈতিক স্বার্থে। কেবল স্মৃতিচারণ নয়, ভাষাকে উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তর করা সময়ের দাবি।
প্রশ্ন হলো উৎপাদনশীল শক্তি ব্যাপারটা কী রকম? ভাষা কীভাবে উৎপাদনশীল শক্তি হয়ে ওঠে? ভাষাকে আমরা সাধারণত আবেগ, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের মাধ্যম হিসেবে দেখি। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ভাষা কেবল সাংস্কৃতিক প্রতীক নয়—এটি একটি বাস্তব উৎপাদনশীল শক্তি। অর্থাৎ ভাষা জ্ঞান, প্রযুক্তি, শিল্প ও বাজারে সরাসরি মূল্য সৃষ্টি করতে পারে।
প্রথমত, ভাষা তখনই উৎপাদনশীল শক্তি হয়ে ওঠে, যখন তা জ্ঞান উৎপাদনের ভাষায় পরিণত হয়। যে ভাষায় গবেষণা, বিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি নিয়ে মৌলিক কাজ হয়, সেই ভাষা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির অংশ হয়ে ওঠে। উনিশ ও বিশ শতকে জার্মান ভাষা দর্শন ও বিজ্ঞানের শক্তিশালী ভাষা ছিল; জাপান নিজস্ব ভাষায় প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষার পরিভাষা নির্মাণ করে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। বাংলার ক্ষেত্রেও বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামাজিক বিজ্ঞানে মানসম্মত পরিভাষা ও পাঠ্যবই নির্মাণ এই উৎপাদনশীলতার ভিত্তি হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল যুগে ভাষা প্রযুক্তিগত সম্পদে পরিণত হয়। সফটওয়্যার লোকালাইজেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভয়েস-রেকগনিশন, অনলাইন শিক্ষা—এসব ক্ষেত্র ভাষা নির্ভর। যে ভাষা প্রযুক্তির অবকাঠামোয় যুক্ত হয়, সে ভাষা অর্থনীতির অংশ হয়ে ওঠে। চীনা ভাষা নিজস্ব ডিজিটাল বাজার গড়ে তুলে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো শক্তিশালী করেছে। একইভাবে বাংলা ভাষায় উন্নতমানের ডিজিটাল কনটেন্ট, এডটেক প্ল্যাটফর্ম, সফটওয়্যার ইন্টারফেস ও গবেষণাভিত্তিক তথ্যভাণ্ডার তৈরি হলে তা একটি ভাষাভিত্তিক অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম সৃষ্টি করতে পারে।
তৃতীয়ত, ভাষা সৃজনশীল শিল্পের মূল উপাদান। সাহিত্য, চলচ্চিত্র, সংগীত, নাটক, গেমিং—এসব ক্ষেত্র কেবল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নয়; এগুলো বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ করতে পারলে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপ নেয়। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিও অনুবাদ, বিপণন ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে পৌঁছাতে পারলে তা সাংস্কৃতিক অর্থনীতির অংশ হতে পারে।
চতুর্থত, ভাষা শ্রমবাজারে দক্ষতার উৎস। ভাষাগত পারদর্শিতা কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ায়—তা স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম, শিক্ষা কিংবা আন্তর্জাতিক সেবা যে খাতেই হোক। মাতৃভাষায় শক্ত ভিত এবং বহুভাষিক দক্ষতা—এই দ্বৈত সক্ষমতা একজন নাগরিককে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে।
ভাষা তখনই উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপ নেয়, যখন তা আবেগের গণ্ডি পেরিয়ে জ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৫২ সালে আমরা ভাষার রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি; এখন প্রয়োজন ভাষার অর্থনৈতিক ও জ্ঞানগত ক্ষমতা সুসংহত করা। বাংলা যদি গবেষণা, উদ্ভাবন ও সৃজনশীল শিল্পের ভাষা হয়ে উঠতে পারে, তবে তা কেবল পরিচয়ের নয়—উন্নয়নেরও শক্তি হবে। নতুবা কেবল ছাইভস্মের মতো নিজেকে প্রাচীন দাবি করার কোনো অর্থই থাকবে না।
বাংলা আমাদের আবেগের ভাষা—গান, কবিতা, আন্দোলন ও স্মৃতির ভাষা। কিন্তু উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এর অবস্থান এখনও সীমিত। যে ভাষায় জ্ঞান সৃষ্টি হয় না, যে ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা হয় না, সে ভাষা দীর্ঘমেয়াদে কেবল দেশীয় সাংস্কৃতিক পরিসরে আটকে পড়ে।
আমরা ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে গর্ব করি, কিন্তু বাংলা ভাষায় মৌলিক গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বা আন্তর্জাতিক মানের জার্নাল কতটা তৈরি করতে পেরেছি—সেই প্রশ্ন আমাদের সামনে রাখা দরকার। কেন বিশ্বের অন্য ভাষাভাষী মানুষ বাংলা ভাষা শিখবে তার যৌক্তিক কারণ আমরা দাঁড় করাতে পারিনি। ভাষার মর্যাদা সেই জাতির অবদানের সঙ্গে যুক্ত।
ভাষা তখনই উৎপাদনশীল শক্তি হয়ে ওঠে, যখন তা জ্ঞান উৎপাদনের ভাষায় পরিণত হয়। যে ভাষায় গবেষণা, বিজ্ঞান, দর্শন, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি নিয়ে মৌলিক কাজ হয়, সেই ভাষা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির অংশ হয়ে ওঠে।
আমরা জাতিগতভাবে পৃথিবীর বুকে তেমন কোনো অবদান রাখতে পারছি কিনা সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হলে নিশ্চয়ই আমাদের সাফল্যের দীনতাই প্রবলভাবে ধরা পড়বে। আবার আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে বিরোধ বা সংঘর্ষ এখনো মেটেনি। রাজনৈতিক বিভাজনের নামে এখনো নানা গোষ্ঠী ও মতাদর্শের কাছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ কেবল প্রশ্নসাপেক্ষই নয় বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য।
আবার কেউ কেউ বলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও মুক্তিযুদ্ধ বর্তমানে মৃত ঘোড়া। এসব দ্বিচারিতাও আমাদের ভাষাকে সংকটের মুখে ফেলে দিচ্ছে। অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে বাঙালির বৈশ্বিক অবদান যত বাড়বে, বাংলার আন্তর্জাতিক গুরুত্বও তত বাড়বে।
ভাষা রক্ষার নামে ভিন্ন ভাষা শেখায় অনাগ্রহ একটি বড় সীমাবদ্ধতা। মাতৃভাষায় দৃঢ় ভিত্তি রেখে বহুভাষাজ্ঞান অর্জন করলে বাংলা দুর্বল হয় না; বরং শক্তিশালী হয়। কারণ বিশ্বমঞ্চে প্রবেশ করতে হলে অনুবাদ, বিনিময় ও সংলাপ দরকার। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পৃথক ভাষাকে স্মরণে রেখেই বলা যায়, বাংলাদেশে বহুভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর দেশ নয়, তাই বলে বহুভাষা চর্চার দায় থেকে আমাদের সরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
একভাষার দেশ বলে বৈচিত্র্যহীন একক ভাষার বাইরে আর সবকিছুকে অস্বীকার করার মতো মুর্খামি যেন আমরা না করি। আমাদের মিডিয়াগুলো নিয়মিত পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায় সংবাদ ও অনুষ্ঠানমালা প্রচার জরুরি। এই বিষয়ের শ্রোতা বা দর্শকের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য হলেও এর উপযোগিতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
কেননা ভাষাগত বৈচিত্র্যকে স্বীকার করাই ছিল ভাষা-আন্দোলনের প্রধানতম শর্ত। ভাষা-আন্দোলনের গৌরব যে জাতির তাকে বহুভাষা চর্চাকে উৎসাহিত করতে হবে এটা অনিবার্য সত্য। বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে—আমরা কি তাকে আন্তর্জাতিক জ্ঞানের সঙ্গে সংযুক্ত করতে পারছি, নাকি আত্মপরিসরে সীমাবদ্ধ রাখছি তার ওপর।
আরও পড়ুন
বাংলা সাহিত্যের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ। রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ, নজরুল থেকে শামসুর রাহমান—অসংখ্য সৃজনশীল সাহিত্যিকদের সাহিত্য ধারা রয়েছে আমাদের বাংলা সাহিত্যে। আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে বাংলা সাহিত্য পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম হলো অনুবাদ। আর বাংলা সাহিত্য পাঠের মধ্য দিয়ে তৈরি হতে পারে বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যপ্রীতি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন নিজের রচনার ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে। এটি আমাদের শিক্ষা দেয়—অনুবাদ কেবল ভাষান্তর নয়, সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন। বাংলাদেশে অনুবাদ-সাহিত্য এখনও বিচ্ছিন্ন প্রয়াসের ওপর নির্ভরশীল। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, পেশাদার অনুবাদক তৈরি, আন্তর্জাতিক বইমেলায় পরিকল্পিত উপস্থিতি—এসব ক্ষেত্র শক্তিশালী করা জরুরি।
বাংলা থেকে বিশ্বভাষায় এবং বিশ্বভাষা থেকে বাংলায় উচ্চমানের অনুবাদ সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনুবাদ মানে আত্মসমর্পণ নয়; এটি সাংস্কৃতিক আত্মপ্রকাশের কৌশল। একটি ভাষা তখনই পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানভাষা হয়ে ওঠে, যখন সে নিজস্ব পরিভাষা তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, দর্শন, অর্থনীতি—এসব ক্ষেত্রে সুসংহত বাংলা পরিভাষা নির্মাণ এখনো অসম্পূর্ণ।
বাংলা একাডেমি বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পরিভাষা-প্রণয়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা জনপ্রিয় ব্যবহারে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অনেক সময় মিডিয়া ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইংরেজি শব্দের সরাসরি ব্যবহারকে সহজ মনে করে। ফলে বাংলা বিকল্প থাকা সত্ত্বেও সেগুলো অবহেলিত হয়। পরিভাষা নির্মাণ কেবল ভাষাতাত্ত্বিক কাজ নয়; এটি বৌদ্ধিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। যদি আমরা ‘ডেভেলপমেন্ট’ বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি, কিন্তু ‘উন্নয়ন’ শব্দকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে জোরদার না করি, তবে ভাষাগত নির্ভরতা থেকেই যায়।
বিজ্ঞান বিষয়ক পঠন-পাঠনে বাংলা ভাষা সবচেয়ে অবহেলিত। এই বিষয়ে রাষ্ট্র বা সচেতন মহল কারও কোনো ধরনের কার্যকরী উদ্যোগ চোখে পড়ে না। একসময় বিজ্ঞানের প্রাথমিক বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের পাঠযোগ্য করে বাংলা ভাষায় পরিবেশন করা হতো কিন্তু বর্তমানে সেটিও অবহেলিত একটি ধারায় পরিণত হয়েছে। যদিও মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চা বলতে যা বোঝায় সেটি বাংলায় আদৌতে হয়নি বলাটাই অনেকটা যুক্তিযুক্ত। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বাংলায় বিজ্ঞান শিক্ষা সম্ভব হলেও উচ্চশিক্ষায় বাংলার ব্যবহার আজও করা সম্ভব হয়নি।
আজকের গণমাধ্যম ভাষা-চর্চার সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেত্র। টেলিভিশন, সংবাদপত্র, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম—এসবের ভাষা দ্রুত জনভাষায় পরিণত হয়। সেখানে অপ্রয়োজনীয় বিদেশি শব্দের ব্যবহার, বাংলা বিকল্প থাকা সত্ত্বেও ইংরেজি প্রয়োগ—ভাষার স্বাভাবিক বিকাশে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
মিডিয়ার দায়িত্ব হলো—যেসব শব্দের উপযুক্ত বাংলা রয়েছে, সেগুলো সচেতনভাবে ব্যবহার করা। এটি কৃত্রিম বিশুদ্ধতাবাদ নয়; বরং ভাষাগত আত্মসম্মান। একই সঙ্গে প্রয়োজন নমনীয়তা—ভাষা পরিবর্তনশীল, তাই নতুন শব্দ গ্রহণও স্বাভাবিক। কিন্তু গ্রহণ ও নির্ভরতার মধ্যে পার্থক্য আছে।
ভাষা তখনই উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপ নেয়, যখন তা আবেগের গণ্ডি পেরিয়ে জ্ঞান, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৫২ সালে আমরা ভাষার রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি; এখন প্রয়োজন ভাষার অর্থনৈতিক ও জ্ঞানগত ক্ষমতা সুসংহত করা।
আমরা দিন দিন গ্রহণের বদলে পরভাষা নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। যেখানে উপযুক্ত বাংলা শব্দ বর্তমান সেখানে ইংরেজি ব্যবহার করছি। আবার যথেচ্ছ ভুল বাংলা ব্যবহারের ফলে ভাষা তার সৌন্দর্য হারাচ্ছে ও ভাষা পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। ভাষা-আন্দোলনের দেশ হিসেবে আমাদের আরেকটি নৈতিক দায়িত্ব আছে—দেশের অন্যান্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা করা।
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা এখনো পর্যাপ্ত নয়। এক্ষেত্রে সমতলের আদিবাসীদের অবস্থা সবচেয়ে করুণ। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা শিশুদের আত্মবিশ্বাস ও শিক্ষাগত সাফল্য বাড়ায়—এটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। আমরা যদি নিজের ভাষার জন্য সংগ্রামের ইতিহাস ধারণ করি, তবে অন্য ভাষার অধিকার নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব।
ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় সাহিত্যিকদের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা-আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ প্রতিটি পর্যায়ে লেখক, কবি, বুদ্ধিজীবীরা পথ দেখিয়েছেন। এখন প্রয়োজন নতুন ধরনের নেতৃত্ব—পরিভাষা নির্মাণে অংশগ্রহণ, অনুবাদে উৎসাহ, প্রযুক্তিভিত্তিক ভাষাচর্চা এবং ভাষানীতিতে সক্রিয় মতামত।
আমাদের বদ্ধমূল ধারণা যে সাহিত্য কেবলই নন্দনতাত্ত্বিক ব্যাপার কিন্তু ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। কেননা সাহিত্য কেবল নন্দনচর্চা নয়; সাহিত্য ভাষা-নির্মাণের দায় নিয়েই এগিয়ে যায়। এটি ভাষার সম্ভাবনা বিস্তারের ক্ষেত্র। নতুন ধারণা, নতুন শব্দ, নতুন বাক্যগঠন—এসব সাহিত্য থেকেই জনপ্রিয় হয়।
একজন নবজাতক প্রথম যে ভাষা শেখে, তা তার নিরাপত্তা ও পরিচয়ের ভিত্তি। কিন্তু তাকে এমন এক পৃথিবীতে বড় হতে হবে, যেখানে প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি বৈশ্বিক। তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত—মাতৃভাষায় দৃঢ় ভিত্তি, বহুভাষায় দক্ষতা এবং বিশ্বসংলাপে অংশগ্রহণ। ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস আমাদের রাজনৈতিক শিক্ষা দেয়, কিন্তু ভাষার জৈবিক ও জ্ঞানগত তাৎপর্য বোঝাতে নোয়াম চমস্কির ভাষাতত্ত্ব প্রাসঙ্গিক।
চমস্কি দেখিয়েছেন, মানুষ জন্মগতভাবে ভাষা অর্জনের ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। অর্থাৎ মাতৃভাষা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মানবমস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের ভিত্তি। যদি একটি শিশু নিজের ভাষায় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, তবে তার সৃজনশীল সম্ভাবনা সংকুচিত হয়। ভাষা তাই কেবল রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন নয়, এটি মানবমুক্তির প্রশ্ন। ১৯৫২ সালে আমরা ভাষার রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছি; এখন প্রয়োজন ভাষার জ্ঞানগত ও সৃজনশীল অধিকার নিশ্চিত করা।
বাংলা ভাষা সংকটে আছে—কারণ আমরা তাকে উৎপাদনশীল করে তুলতে পারছি না। আবার সম্ভাবনাও অসীম—কারণ এর পেছনে আছে সংগ্রামের ইতিহাস। ভাষা-আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছে প্রতিবাদ, মুক্তিযুদ্ধ দিয়েছে স্বাধীনতা। এখন প্রয়োজন সৃজনশীলতা ও নীতিগত দূরদর্শিতা। ভাষা থেকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব ভাষাকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়া। অনুবাদ, পরিভাষা নির্মাণ, মিডিয়ার দায়িত্বশীলতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাষানীতি—এসব মিলেই গড়ে উঠতে পারে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ। আর সেই ভবিষ্যতের সূচনা হয় নবজাতকের প্রথম উচ্চারণে—যে উচ্চারণে লুকিয়ে থাকে ইতিহাসের স্মৃতি এবং আগামীর সম্ভাবনা।
সঞ্জয় সরকার : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়