আড়ম্বরের অবসান, মানবিক নেতৃত্বের উত্থান : সরলতার রাজনীতিতে নতুন বার্তা

বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অতি সাধারণ চলাফেরা, বেশভূষা এবং রাষ্ট্রীয় আড়ম্বর থেকে স্বতঃস্ফূর্ত দূরত্ব—এ এক নীরব রাজনৈতিক ভাষ্য। এই ভাষ্য উচ্চারণ করে না কোনো স্লোগান, দেয় না কোনো জাঁকজমকপূর্ণ ঘোষণা; বরং তা জন্ম নেয় আচরণে, দৃষ্টিতে, হাঁটার ভঙ্গিতে। রাজনীতির ইতিহাসে অনেক সময় ব্যক্তির পোশাকই হয়ে ওঠে দর্শনের প্রতীক, জীবনাচারই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রচিন্তার প্রকাশভঙ্গি।
যখন একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী নিজেকে রাজকীয় আলোকমালায় মুড়ে না রেখে মানুষের ভিড়ে মিশে যান, তখন তিনি কেবল একজন প্রশাসক নন—তিনি হয়ে ওঠেন প্রতীকী চরিত্র। এই প্রতীকের ভেতর দিয়ে তিনি জানান দেন, ক্ষমতা মানে দূরত্ব নয়; নেতৃত্ব মানে উঁচু মঞ্চ নয়; রাষ্ট্র মানে কেবল প্রটোকল নয়—রাষ্ট্র মানে মানুষ।
রাজনীতি অনেক সময় ভাষণের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে আচরণে। পৃথিবীর ইতিহাসে আমরা দেখেছি, সরলতা কখনো কখনো সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছে। মহাত্মা গান্ধী তার ধুতি ও খালি পায়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শুধু স্বাধীনতার দাবি তোলেননি; তিনি ঘোষণা করেছিলেন—ক্ষমতা জনগণের, শাসক জনগণের প্রতিনিধি মাত্র। নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগার থেকে বেরিয়ে প্রতিশোধ নয়, ক্ষমার রাজনীতি বেছে নিয়ে দেখিয়েছিলেন—রাষ্ট্রের শক্তি মানবিকতায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরল চলাফেরা ও সাধারণ পোশাক যেন একই ধারার প্রতিধ্বনি। এটি হয়তো কোনো কৌশল নয়; হয়তো ব্যক্তিগত অভ্যাস। কিন্তু রাজনীতিতে ব্যক্তিগত অভ্যাসও জনমানসে হয়ে ওঠে রাজনৈতিক সংকেত। আড়ম্বরের বিপরীতে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান নিয়ে মানুষের মন জয় করছেন ম্যাজিকের মতো। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিশাল বহর, দীর্ঘ প্রটোকল, নিরাপত্তার কঠোর বলয়। রাষ্ট্রপ্রধানের গাড়িবহর যখন শহর অতিক্রম করে, তখন সাধারণ মানুষের যান চলাচল থেমে যায়—এই দৃশ্য যেন আমাদের চেনা বাস্তবতা। কিন্তু যখন একজন প্রধানমন্ত্রী এই সংস্কৃতি থেকে নিজেকে খানিকটা সরিয়ে আনেন, তখন তিনি আসলে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন—রাষ্ট্র কি নাগরিকের ওপরে, নাকি নাগরিকের জন্য?
এই প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনিক নয়; এটি নৈতিক। কারণ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি সামাজিক চুক্তি—শাসক ও শাসিতের পারস্পরিক আস্থা। যখন শাসক নিজেকে নাগরিকের সমতলে নামিয়ে আনেন, তখন তিনি সেই চুক্তিকে দৃশ্যমান করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই মানবিকতার রাজনীতির শুভ সূচনা করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে নেতৃত্ব সবসময় আবেগের সঙ্গে যুক্ত। শেখ মুজিবর রহমান, মওলানা ভাসানী সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলতেন, গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ ছিল তাদের কণ্ঠে। সেই ধারাবাহিকতায় যদি নতুন প্রধানমন্ত্রী নিজেকে প্রটোকলের দেয়াল থেকে সরিয়ে মানুষের কাতারে দাঁড় করান, তবে তা একধরনের মানবিক রাজনীতির পুনরুজ্জীবন।
এই মানবিকতা কেবল পোশাকে নয়; এটি দৃষ্টিভঙ্গিতে। সাধারণ বেশভূষা যেন বলে—আমি তোমাদেরই একজন। এই ‘আমি’ এবং ‘তোমরা’র দূরত্ব কমে এলে রাজনীতি হয় সংলাপের, হয় অংশগ্রহণের। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সরল জীবনাচার অর্থনৈতিক বার্তাও দেয়। যখন দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জে জর্জরিত—মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ—তখন রাষ্ট্রপ্রধানের সংযমী জীবনধারা নাগরিকদের কাছে এক ধরনের নৈতিক আহ্বান হয়ে ওঠে। এটি যেন বলে—রাষ্ট্র নিজেই সাশ্রয়ী হলে নাগরিকের ত্যাগ অর্থবহ হয়।
ইতিহাসে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত সরলতা অনেক সময় জনআস্থাকে বাড়িয়েছে। হোসে মুজিকার সাধারণ জীবনযাপনের জন্য তাকে ‘বিশ্বের দরিদ্রতম প্রেসিডেন্ট’ উপাধি দিয়েছিল, কিন্তু সেই উপাধির ভেতর ছিল গভীর সম্মান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার চালচলন ও বেশভূষায় প্রজন্মগত রাজনীতির পরিবর্তনের আভাস দিয়ে চলেছেন।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আজ রাজনৈতিক নেতাদের কেবল বক্তৃতায় নয়, আচরণে বিচার করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে নেতার ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক, চলাফেরা সবই হয়ে ওঠে রাজনৈতিক বার্তা। সরলতা এখানে হয়ে ওঠে স্বচ্ছতার প্রতীক। এটি যেন বলে—লুকানোর কিছু নেই, প্রহসনের কিছু নেই।
এই প্রজন্ম ক্ষমতার অহংকার পছন্দ করে না; তারা চায় অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব। তাই সাধারণ চলাফেরা তাদের কাছে হয়ে ওঠে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক সেতুবন্ধন। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও আছে—সরলতা কি কেবল প্রতীক, নাকি তা নীতিতে প্রতিফলিত হবে? কারণ রাজনীতিতে প্রতীক শক্তিশালী হলেও, শেষ পর্যন্ত মূল্যায়ন হয় নীতিনির্ধারণে। যদি সরল জীবনাচার প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, দুর্নীতি দমন, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা—এসব বাস্তব পদক্ষেপে রূপ নেয়, তবে তা হবে এক গভীর রাজনৈতিক রূপান্তর। অন্যথায়, সরলতা কেবল হয়ে থাকবে এক নান্দনিক ছবি। রাষ্ট্রীয় আড়ম্বর অনেক সময় ক্ষমতার দূরত্বকে দৃশ্যমান করে। কিন্তু গণতন্ত্রের মূল দর্শন হলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। যখন প্রধানমন্ত্রী নিজেকে প্রটোকলের প্রাচীর থেকে খানিকটা সরিয়ে আনেন, তখন তিনি যেন গণতন্ত্রের সেই মৌল দর্শনকে পুনরায় স্মরণ করান—ক্ষমতা জনগণের অর্পিত। এখানে বার্তাটি স্পষ্ট; রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত মহিমা নয়; রাষ্ট্র একটি সমষ্টিগত দায়িত্ব।
সাধারণ পোশাক ও চলাফেরা জনমনে একধরনের আস্থা তৈরি করে। মানুষ ভাবে—তিনি আমাদের মতোই। এই ‘আমাদের মতো’ হওয়া রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ গণতন্ত্রে নেতৃত্বের বৈধতা আসে জনগণের স্বীকৃতি থেকে, ভয় বা দূরত্ব থেকে নয়। বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ জীবনাচার হয়তো এক নতুন রাজনৈতিক ভাষার সূচনা করছে। এই ভাষা কোলাহলহীন, কিন্তু তা গভীর। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—রাজনীতি কেবল ক্ষমতার স্থাপত্য নয়; এটি নৈতিকতার অনুশীলন।
সরলতা যদি সত্য হয়, তবে তা বিপ্লবী। কারণ ক্ষমতার শীর্ষে দাঁড়িয়ে সাধারণ থাকা সবচেয়ে কঠিন সাধনা। সম্ভবত এই বার্তাই তিনি দিতে চান—রাষ্ট্র মানে প্রাসাদ নয়, প্রজাদের হৃদয়। নেতৃত্ব মানে দূরত্ব নয়, দায়িত্ব। আর রাজনীতি মানে কেবল শাসন নয়, সেবা। এই সরল পদচারণা যদি নীতির দৃঢ়তায় রূপ নেয়, তবে তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রে এক মানবিক অধ্যায়ের সূচনা করবে—যেখানে আড়ম্বর নয়, মানুষ হবে রাষ্ট্রের।
অধ্যাপক ড. মোহা. হাছানাত আলী : উপাচার্য, নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়