নির্বাচিত সরকার কি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে?

মশা মানেই শুধু বিরক্তি নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, নগর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষাও বটে। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সরকার ও নতুন মন্ত্রিসভা এমন এক সময়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন দেশে মশার ঘনত্ব ইতিমধ্যেই অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় রয়েছে এবং আগামী মাসে তা আরও বেড়ে চরম অস্বস্তিকর ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা সার্ভিলেন্স তথ্য আমাদের সামনে একটি স্পষ্ট ও উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে। ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কিউলেক্স মশা এখন কার্যত নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে, আর এডিস মশা আপাতত কমে থাকলেও তা কোনোভাবেই স্থায়ী নিরাপত্তার বার্তা নয়। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, এডিস কখনো ঘোষণা দিয়ে ফিরে আসে না, সে আসে আমাদের অসতর্কতার সুযোগে।
ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর তথ্য বলছে, ঢাকায় সংগৃহীত মোট প্রাপ্তবয়স্ক মশার প্রায় ৯০ শতাংশই কিউলেক্স প্রজাতির। এটি কোনো পরিসংখ্যানগত কাকতালীয় ঘটনা নয় বরং এটি নগর ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিফলন। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ, বছরের পর বছর পরিষ্কার না হওয়া নালা, জলাবদ্ধ বেজমেন্ট ও পার্কিং এলাকা, সব মিলিয়ে ঢাকা শহর নিজেই যেন কিউলেক্স মশার জন্য এক আদর্শ প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে এডিস মশার ঘনত্ব কমে আসার তথ্য অনেকের মধ্যেই স্বস্তি তৈরি করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মশা সার্ভিলেন্স তথ্য অনুযায়ী এডিস মশার ঘনত্ব এবং ব্রেটো ইনডেক্স কমেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত। এটি প্রমাণ করে যে কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ, জনসচেতনতা, দীর্ঘদিন ধরে বৃষ্টিপাত না থাকা এবং তাপমাত্রা কমে যাওয়া ফ্যাক্টরগুলো একসাথে কাজ করেছে। কিন্তু এডিস মশার ঘনত্ব কমার এই স্বস্তিই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, এডিস মশার এই কমে যাওয়া কোনো স্থায়ী অর্জন নয়; বরং এটি এক ধরনের সাময়িক বিরতি। নগরের অলিগলি, বেজমেন্টে গাড়ি পার্কিং করার স্থান, পুরোনো বাড়ির নিচ তলায়, বাড়ির ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পানির ট্যাংক, প্লাস্টিক ড্রাম ও বালতির ভেতরে এখনো এডিস মশার প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান রয়ে গেছে। বর্ষা শুরু হলেই সামান্য অবহেলা এই মশাকে আবার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ করে দেবে। তখন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লে দায় কার হবে, এই প্রশ্নের উত্তর আজও স্পষ্ট নয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালেও দেশে লক্ষাধিক মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এবং শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। এর আগে ২০২৩ সালে ডেঙ্গু ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি রোগের বিস্তার নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পরিকল্পনা ও শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
ঢাকা মহানগর ডেঙ্গুর প্রধান কেন্দ্র হলেও এখন সংক্রমণ বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরেও বিস্তৃত। এডিস মশার প্রজননচক্র বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে দ্রুততর হয়, ফলে জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এটি মারাত্মক আকার ধারণ করে। তবে ডেঙ্গু এখন সারা বছরই বিদ্যমান। অতএব, মৌসুমি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ অভিযানের পরিবর্তে বার্ষিক, পরিকল্পিত ও ধারাবাহিক কর্মসূচি অপরিহার্য।
নতুন সরকারের উচিত একটি জাতীয় ডেঙ্গু ও আর্বোভাইরাস কৌশলপত্র প্রণয়ন করা, যেখানে পাঁচ থেকে দশ বছরের সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বাজেট বরাদ্দ এবং কর্মপরিকল্পনা নির্ধারিত থাকবে। ডেঙ্গুকে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমাদের প্রধান কৌশল ছিল কীটনাশক ছিটানো, জরুরি সভা আহ্বান ও হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো। এগুলো প্রয়োজনীয় হলেও মূলত প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা। কার্যকর নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত বাহক ব্যবস্থাপনার বিজ্ঞানভিত্তিক প্রয়োগ, যেখানে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ, লার্ভা উৎস ধ্বংস, সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশগ্রহণ এবং বৈজ্ঞানিক নজরদারি একসঙ্গে পরিচালিত হবে।
নতুন সরকারের উচিত একটি জাতীয় ডেঙ্গু ও আর্বোভাইরাস কৌশলপত্র প্রণয়ন করা, যেখানে পাঁচ থেকে দশ বছরের সুস্পষ্ট লক্ষ্য, বাজেট বরাদ্দ এবং কর্মপরিকল্পনা নির্ধারিত থাকবে। ডেঙ্গুকে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংযুক্ত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
ডেঙ্গু ও অন্যান্য আর্বোভাইরাল রোগের জন্য একটি একীভূত, রিয়েল-টাইম ডিজিটাল এন্টোমোলজিক্যাল এবং ডিজিস সার্ভেইলেন্স প্ল্যাটফর্ম চালু করা জরুরি। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে বাধ্যতামূলক রিপোর্টিং কাঠামোর আওতায় আনতে হবে। কেস ডেফিনিশন, রিপোর্টিং টাইমলাইন ও ডেটা ভ্যালিডেশন প্রটোকল মানসম্মত না হলে নীতিনির্ধারণ সঠিক হবে না। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ডেটা অ্যানালিটিক্স সেল গঠন করে সাপ্তাহিক ট্রেন্ড বিশ্লেষণ ও ঝুঁকি পূর্বাভাস প্রকাশ করা উচিত।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রোগীর সংখ্যা জানা যথেষ্ট নয়; এডিস মশার ঘনত্ব, ব্রিডিং ইনডেক্স (HI, CI, BI) এবং কীটনাশক প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়মিত পরিমাপ করা অপরিহার্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী মেডিকেল এন্টোমোলজি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে জেলা পর্যায়ে ল্যাব সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে। প্রমাণভিত্তিক তথ্য ছাড়া কীটনাশক নির্বাচন ও ব্যবহার করলে অপচয় ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি- দুই ঝুঁকিই বাড়ে।
বৃষ্টি, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার মতো জলবায়ু উপাদানের সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি ক্লাইমেট-লিঙ্কড পূর্বাভাস মডেল তৈরি করা উচিত, যাতে সম্ভাব্য প্রাদুর্ভাবের ৪–৬ সপ্তাহ আগে সতর্কতা জারি করা যায়। এতে হাসপাতাল প্রস্তুতি, মাঠপর্যায়ে লার্ভা নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতা কার্যক্রম সময়মতো শুরু করা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুহার কমাতে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগী শনাক্তকরণ ও ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় গাইডলাইন নিয়মিত হালনাগাদ করে সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দ্রুত ডায়াগনস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করলে রোগী রেফারেল চাপ কমবে এবং জটিলতা হ্রাস পাবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রেক্ষাপটভিত্তিক গবেষণা অপরিহার্য। বিশ্ববিদ্যালয়, জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউট ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে যৌথ গবেষণা তহবিল গঠন করে ওভিট্র্যাপ-ভিত্তিক নজরদারি, জৈবিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি, কমিউনিটি-ড্রিভেন সোর্স রিডাকশন ও নতুন প্রযুক্তির পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। গবেষণার ফলাফল নীতিনির্ধারণে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করার একটি কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিক আচরণ পরিবর্তন অপরিহার্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সারা বছরব্যাপী বিহেভিয়ার চেঞ্জ কমিউনিকেশন কর্মসূচি চালু করতে হবে। শুধু বর্ষা-পূর্ব প্রচারণা নয়। স্কুল কারিকুলামে ডেঙ্গু প্রতিরোধ অন্তর্ভুক্ত করা, গণমাধ্যমে নিয়মিত বার্তা প্রচার এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে ঘরে ঘরে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
প্রতিটি জেলা ও বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট এন্টোমোলজিক্যাল ইনডেক্স নির্ধারণ করে কর্মসম্পাদন মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা উচিত। মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন ও উন্মুক্ত ডেটা প্রকাশের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি হিসেবে বিবেচনা করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করাই হবে টেকসই সাফল্যের মূল ভিত্তি।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ ডেঙ্গু বিস্তারের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। ভবন নির্মাণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ছাদ ও বেজমেন্টে পানি জমা রোধের নকশা এবং সাইট ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান বাধ্যতামূলক করতে হবে। নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত প্লট ও জলাবদ্ধ এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শন ও জরিমানা কাঠামো কার্যকর করতে হবে। আইন থাকলেও প্রয়োগে শৈথিল্য এডিস মশার প্রজননকে অব্যাহত রাখে। এই সংস্কারটি হতে হবে বাস্তবভিত্তিক ও কঠোর।
খোলা ড্রেন, প্লাস্টিক বর্জ্য ও অব্যবস্থাপিত কঠিন বর্জ্য এডিস মশার কৃত্রিম প্রজননক্ষেত্র তৈরি করে। ওয়ার্ডভিত্তিক বর্জ্য সংগ্রহ, রিসাইক্লিং চেইন উন্নয়ন এবং নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার কর্মসূচিকে রুটিন প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বর্ষার আগে বিশেষ ‘প্রি-মনসুন ড্রাইভ’ পরিচালনা করে সম্ভাব্য জলাবদ্ধ স্থান চিহ্নিত ও সংস্কার করা জরুরি।
সব এলাকায় সমানভাবে কীটনাশক ছিটানো কার্যকর নয়। ওয়ার্ডভিত্তিক হাউস ইনডেক্স, ব্রেটো ইনডেক্স ও কেস ডেনসিটি অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এন্টোমোলজিক্যাল ডেটার সঙ্গে সমন্বয় করে লক্ষ্যভিত্তিক লার্ভা উৎস ধ্বংস ও প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করা উচিত। নির্বিচারে ফগিংয়ের পরিবর্তে লার্ভিসাইডিং ও সোর্স রিডাকশনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রোসিডিউর (SOP) এবং পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর নির্ধারণ করতে হবে। অস্থায়ী ও মৌসুমি নিয়োগের পরিবর্তে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিটি সিটি কর্পোরেশনে একটি নিবেদিত মেডিকেল এন্টোমোলজি সেল গঠন করলে কার্যক্রমের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি শক্তিশালী হবে।
ওয়ার্ডভিত্তিক কার্যক্রম, কীটনাশক ব্যবহার, লার্ভা ধ্বংস অভিযান ও নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তির তথ্য অনলাইন ড্যাশবোর্ডে প্রকাশ করা উচিত। জিও-ট্যাগড রিপোর্টিং চালু করলে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের স্বচ্ছতা বাড়বে। নাগরিকদের জন্য হটলাইন বা অ্যাপভিত্তিক রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করে অংশগ্রহণমূলক তদারকি নিশ্চিত করা যেতে পারে।
ওয়াসা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ সংস্থা, সব সংস্থার কাজের সঙ্গে নগর স্বাস্থ্য সরাসরি সম্পর্কিত। সমন্বয়হীন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রায়ই জলাবদ্ধতা ও অস্থায়ী পানি জমার ঝুঁকি তৈরি করে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে মাসিক সমন্বয় সভা ও যৌথ কর্মপরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে এক সংস্থার কাজ অন্য সংস্থার উদ্যোগকে ব্যাহত না করে।
ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুহার কমাতে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগী শনাক্তকরণ ও ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় গাইডলাইন নিয়মিত হালনাগাদ করে সব সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।
ওয়ার্ড কমিটি, বাসিন্দা কল্যাণ সমিতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে কমিউনিটি সোর্স রিডাকশন কর্মসূচি চালু করতে হবে। ‘নিজ আঙিনা নিজ দায়িত্ব’ নীতিতে নাগরিকদের সম্পৃক্ত না করলে টেকসই সাফল্য সম্ভব নয়। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযানকে সামাজিক আন্দোলনে রূপান্তর করতে পারলে প্রশাসনিক চাপও কমবে।
মশা নিয়ন্ত্রণকে মৌসুমি প্রকল্প হিসেবে নয় বরং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির স্থায়ী অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাঁচ বছরের রোলিং অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করে নির্দিষ্ট সূচক ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত। ধারাবাহিক বাজেট বরাদ্দ ছাড়া অবকাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
এই কাঠামোগত সংস্কারগুলো বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় কেবল প্রতিক্রিয়াশীল অভিযানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং নগর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি টেকসই ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, পরিবেশ ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। একটি উচ্চপর্যায়ের জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করে মাসিক পর্যালোচনা সভা ও অগ্রগতি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ প্রায়শই মৌসুমি সংকটের সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু স্থায়ী সাফল্যের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় (ADP) নির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। নতুন সরকারের উচিত ডেঙ্গুকে জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস ষাটের দশক থেকে শুরু হয়ে আজ এক জটিল নগর বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। অভিজ্ঞতা, তথ্য ও জ্ঞান, সবই আমাদের হাতে রয়েছে। এখন প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতি, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও সমন্বিত কর্মপ্রয়াস।
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা; ডেঙ্গুকে আর মৌসুমি আতঙ্ক হিসেবে নয় বরং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রতিক্রিয়াশীল ধারা থেকে বেরিয়ে প্রতিরোধমূলক, বৈজ্ঞানিক ও টেকসই কৌশল গ্রহণ করা হবে।
অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার : কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]