কাজের আগেই সমালোচনা নয়

বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে মো. মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগ ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা একেবারে অপ্রত্যাশিত নয়। দেশের আর্থিক খাত যখন নানামুখী চাপে, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব পরিবর্তন স্বাভাবিকভাবেই জনআলোচনার বিষয় হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদদের অনানুষ্ঠানিক আলোচনায়ও তার যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও সম্ভাব্য নীতিগত অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তবে আলোচনার ধরন ও সময়—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচনা যেমন গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ, তেমনি দায়িত্ব গ্রহণের আগেই চূড়ান্ত রায় দিয়ে দেওয়াও সুবিচার নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক কেবল একটি দপ্তর নয়; এটি দেশের মুদ্রানীতি, ব্যাংকিং শৃঙ্খলা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দু। ফলে গভর্নর পদে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তির অতীত পেশাগত পরিচয়, দক্ষতা ও সম্ভাব্য স্বার্থ–সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
মোস্তাকুর রহমান একজন ব্যবসায়ী—এই পরিচয় নিয়েই অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাদের আশঙ্কা, ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা ভবিষ্যতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে কিনা। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো জটিল প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা তার আছে কিনা।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও বেশি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বা দীর্ঘমেয়াদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং পটভূমি থাকার প্রয়োজন ছিল বলে কেউ কেউ অভিমত দিচ্ছেন।
এই প্রশ্নগুলো অমূলক নয়। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে এমন বিতর্কের জায়গা থাকা দরকার। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে স্বার্থ–সংঘাত এড়ানো অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে—কেবল পেশাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে আগাম অযোগ্যতার সনদ দিয়ে দেওয়া ন্যায়সঙ্গত নয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পর তার ঘোষিত নীতি, সম্পদ-স্বার্থের ঘোষণা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা—এসবই প্রকৃত মূল্যায়নের ভিত্তি হওয়া উচিত।
এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে সরকারের সমালোচনাও হচ্ছে। কেউ বলছেন, আরও বিস্তৃত পরামর্শ বা অনুসন্ধানের মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়া যেত।
আবার সদ্য বিদায়ী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে যেভাবে বিদায় জানানো হয়েছে, তা শোভন হয়নি বলেও আলোচনা উঠেছে। একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তার বিদায় যদি বিতর্কের জন্ম দেয়, তাহলে সেটি প্রতিষ্ঠান ও সরকারের উভয়ের ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব ফেলে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতিমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের সূচনা করেছেন বলে অনেকে মনে করেন। প্রশাসনিক সংস্কার, নীতি–স্বচ্ছতা বা জবাবদিহি—এসব ক্ষেত্রে যে মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার কথা বলা হচ্ছে, তা যেন সবক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রতিফলিত হয়, সেটিই জনমতের প্রত্যাশা। কারণ অর্থনৈতিক খাতের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে তার প্রভাব বিস্তৃত হয় ব্যবসা, বিনিয়োগ ও জনআস্থায়।
তবে সব আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেও একটি মৌলিক সত্য রয়েছে, একজন গভর্নরের প্রকৃত মূল্যায়ন তার কাজের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। তিনি কীভাবে মুদ্রানীতি পরিচালনা করেন, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় কতটা কঠোর হন, খেলাপি ঋণ বা আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে কী অবস্থান নেন—এসবই তার নেতৃত্বের মাপকাঠি। দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ব্যর্থতার পূর্বাভাস দিলে তা গঠনমূলক সমালোচনার পরিবেশকে দুর্বল করে।
গণতান্ত্রিক সমাজে প্রশ্ন থাকবে, বিতর্ক থাকবে। কিন্তু সেই বিতর্ক তথ্যনির্ভর ও সময়োপযোগী হওয়া জরুরি। নতুন গভর্নর পেশায় একজন ব্যবসায়ী যেমন সত্য, একইসাথে তিনি একজন হিসাববিদও বটে।
তাকে বাস্তবসম্মত সময় দেওয়া প্রয়োজন, যাতে তিনি তার নীতি ও কর্মপন্থা উপস্থাপন করতে পারেন। এরপর যদি সিদ্ধান্তে অসঙ্গতি থাকে, যদি স্বার্থের দ্বন্দ্বের প্রমাণ মেলে কিংবা নীতিগত ব্যর্থতা দেখা যায়—তখন কঠোর সমালোচনা অবশ্যই হওয়া উচিত।
সুতরাং মোস্তাকির রহমানের নিয়োগ নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার স্বার্থেই প্রয়োজন ধৈর্য ও দায়িত্বশীল মূল্যায়ন।
নতুন গভর্নরের কাজ শুরু হোক, নীতির ফলাফল সামনে আসুক—তারপরই চূড়ান্ত বিচার হোক। এখন সময় আগাম রায় দেওয়ার নয়; সময় কাজ দেখার।
এস এম রাশিদুল ইসলাম : সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)