ইরানে হামলা, বন্ধ হরমুজ প্রণালী ও আমাদের জ্বালানি সংকট

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরান আক্রমণ করেছে। ইরানও পাল্টা আঘাত করছে ইসরায়েল এবং অন্যান্য আরব রাষ্ট্রগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা ইত্যাদি লক্ষ্য করে। মানুষের মৃত্যু হচ্ছে।
ইরানে মেয়েদের স্কুলে মিসাইল বিস্ফোরণে মারা গেছে অনেক শিশু। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মৃত্যু হয়েছে, ইরানের সাবেক রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আহমাদিনেজাদের মৃত্যু সংবাদও পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন সেনার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে তাদের সরকার। এর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ড্রোন হামলায় বাংলাদেশি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। মুহুর্মুহু মিসাইল ও ড্রোন হামলায় কাঁপছে দেশগুলো।
আরব দেশগুলোর সাথে বিমান চলাচল আপাতত বন্ধ করেছে এয়ারলাইনগুলো। কতদিন চলবে এই যুদ্ধ কেউ জানে না। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার মৃত্যুতে ইরান ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ। তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোয় ইসরায়েলি হামলা চলছেই। চট করে যে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে সে রকম কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
এই যুদ্ধের কোনো পক্ষেরই সামরিক লক্ষ্যের মধ্যে নেই। তথাপি আশঙ্কা রয়েছে যে, এই যুদ্ধ বাংলাদেশেকে আঘাত করবে তীব্রভাবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় আঘাত হানতে পারে এই যুদ্ধ নানাভাবে।
প্রথমত, বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুইভাবে—জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাবে অস্বাভাবিকভাবে এবং যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, জ্বালানি তেল ও গ্যাস পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের তেল ও গ্যাসের সরবরাহের কমবেশি শতকরা নব্বই ভাগ আসে পারস্য উপসাগরের তীরবর্তী দেশগুলো থেকে।
পরিশোধিত তেল আসে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে আর গ্যাস আসে কাতার থেকে। এরাই মূল উৎস, তবে সরবরাহকারীরা বেশিরভাগ সিঙ্গাপুরকেন্দ্রিক তেল ব্যবসায়ী। আমদানিকৃত গ্যাসের বেশিরভাগই সরবরাহ করে কাতার গ্যাস নামে একটি কাতারের সরকারি সংস্থা।
এইসব তেল ও গ্যাস সবই বাংলাদেশে আসে হরমুজ প্রণালী হয়ে। যুদ্ধের সূচনাতেই বন্ধ হয়ে গেছে হরমুজ প্রণালী। এই যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এইসব উৎস থেকে বাংলাদেশের তেল ও গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। মনে রাখতে হবে, গোটা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের শতকরা ২০ ভাগ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবহন করতে হয়।
০১ মার্চ ২০২৬ প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জ্বালানি তেল নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুইভাবে—জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাবে অস্বাভাবিকভাবে এবং যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, জ্বালানি তেল ও গ্যাস পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
কিন্তু তা কতদিন? যুদ্ধ কতদিন চলবে সেটা আমরা কেউ জানি না। তেলের দাম এর মধ্যেই বাড়তে শুরু করেছে। ০১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭৩ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্রের সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে যে, এই দাম ব্যারেল প্রতি একশ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তেল ব্যবসায় একটা হিসাব প্রচলিত আছে, মোটা দাগে অপরিশোধিত তেলের দাম যদি ব্যারেল প্রতি দশ ডলার বৃদ্ধি পায় তবে পরিশোধিত তেলের দাম গ্যালন প্রতি ২৫ সেন্ট করে বেড়ে যায়।
তাহলে সহজেই আমরা একটা অনুমান করতে পারি যে, অপরিশোধিত তেলের দাম যদি একশ ছাড়িয়ে যায়, আমাদের দৈনন্দিন ব্যবহারের তেলের খুচরা মূল্য কী হারে বাড়তে পারে।
তেলের দামের এইরকম বৃদ্ধির ফলে প্রথম ধাক্কাটা পড়বে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারে। বৈদেশিক মুদ্রার সংগ্রহ আমাদের যেহেতু আছে সেখানে টান পড়লে কী অবস্থা হতে পারে সেই অভিজ্ঞতা আমাদের আছে।
আরও পড়ুন
ইউক্রেন যুদ্ধের পরপরই বাংলাদেশ গুরুতর ডলার সংকটের সময় পার করেছে। প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্যও তখন ব্যাংকগুলো এলসি খুলতে পারছিল না। একইরকম পরিস্থিতি হওয়ার একটা আশঙ্কা এবারও রয়েছে, যদি যুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলমান থাকে। সেই ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আরও তীব্রতর হতে পারে কেননা যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমাদের ওয়েজ আর্নারদের হয়তো ফেরত চলে আসতে হতে পারে।
সেটা যদি হয় তবে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার জোগানের দুটা মূল উৎসের একটা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। আরেকটা উৎস, পোশাক রপ্তানি, সেটাও খানিকটা ধাক্কা খেতে পারে।
যুদ্ধের কারণে অনেক জাহাজের যাত্রাপথ পরিবর্তিত হতে পারে, সেক্ষেত্রে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পাবে, যে প্রভাবে পোশাক রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। রপ্তানির মধ্যে তৈরি পোশাকই আমাদের মূল রপ্তানি পণ্য, এমনিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি হচ্ছে আমদানি অর্থনীতি-আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা আমদানিকারক জাতি। তেল ও গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি, সেই সাথে আমদানি সংকট, দুইটার ফলে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে অস্বাভাবিকভাবে।
গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য বলছে, এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর কাছে সরকারের অনাদায়ী দেনা দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর সমিতি এর মধ্যেই সরকারকে বহুবার তাগাদা দিয়েছে বকেয়া পাওনা দেওয়ার জন্য।
এখন যদি জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পায় তবে বিদ্যুতের মূল্যও বৃদ্ধি পাবে। সরকার যদি আনুপাতিক হারে ভোক্তার কাছে সরবরাহকৃত বিদ্যুতের মূল্য বাড়িয়ে দেয় তাহলে জনজীবনে প্রতিক্রিয়া হবে তীব্র। আর যদি খুচরা বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি না করে তাহলে সরকার পড়বে গুরুতর আর্থিক সংকটে।
এই যুদ্ধ যদি খুব দ্রুত না থামে, জ্বালানি সংকট কেবল বাংলাদেশের জন্যেই নয়, বিশ্বের সব দেশের জন্যই সংকট বয়ে আনবে। আগেই বলেছি, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে কয়েক মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হবে। অন্যান্য দেশগুলো নিজেদের তেলের উৎপাদন বাড়িয়ে এই সংকট আদৌ সামলাতে পারলে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটা দেশই মুদ্রাস্ফীতি, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পড়বে।
...এই যুদ্ধ যদি খুব দ্রুত না থামে, জ্বালানি সংকট কেবল বাংলাদেশের জন্যেই নয়, বিশ্বের সব দেশের জন্যই সংকট বয়ে আনবে।
এই সম্ভাব্য সংকটের সমাধান কী? বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা হয়তো কোনো সৃজনশীল সমাধান বের করতে পারবেন কিন্তু আমরা মোটামুটি নিশ্চিত বলতে পারি যে, যুদ্ধ বন্ধ করাটাই হচ্ছে একমাত্র নির্ভরযোগ্য সমাধান।
বাংলাদেশের মতো একটা দেশের পক্ষে কেবল নিজের চেষ্টায় এই যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়া সম্ভব না। এইজন্য বাংলাদেশকে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে, প্রস্তুতিটা নিতে হবে দ্রুত, যাতে করে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে সম্ভাব্য সংকট সামলানোর জন্যে যেন আমরা একসাথে কাজ করতে পারি।
দেশে বিদ্যমান জ্বালানি নীতি আরেকবার পরীক্ষা করে দেখা দরকার। বেসরকারি খাতে জ্বালানি আমদানিতে যে কয়েকটি ধাপে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর আরোপ করা হয় সেগুলো কিছুটা যৌক্তিক করা যায় কিনা তা পুনর্বিবেচনা করা দরকার।
বেসরকারি খাতের সাথে সরকারের কর্মকাণ্ডের সমন্বয় করা দরকার। ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দের সাথে দেড় বছরে যে বৈরিতা দেখিয়েছে সরকার সেই মনোভাব পরিত্যাগ করে তাদের সাথে আন্তরিকভাবে আলাপ আলোচনা করা দরকার। এই সমন্বয়টা না হলে কোনো সংকটই সাফল্যের সাথে মোকাবিলা করা যাবে না।
বিপদ আসন্ন—সম্ভাব্য এই বিপদ সবার জন্য, সব দেশের জন্যে। এই বিপদ এড়াতে হলে বা মোকাবিলা করতে হলে তৎপর হতে হবে এখন থেকেই। অর্থ ও বাণিজ্য বিষয়ক সব সংস্থাকে তৎপর করতে হবে এখনই, সিদ্ধান্ত নিতে হবে দ্রুত।
রাষ্ট্রসমূহের আঞ্চলিক ঐক্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন হবে সবার জন্যেই। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে নিজেদের মধ্যেও কিছু মৌলিক নীতির ভিত্তিতে ঐক্য জরুরি। আসন্ন সংকট যত তীব্রই হোক, ঐক্যবদ্ধ থাকলে মোকাবিলা করা যাবে সহজেই।
ইমতিয়াজ মাহমুদ : আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট