বাসযোগ্য শহর গড়তে নির্বাচিত সরকারের করণীয়

কত সরকার এলো গেল, নানান প্রতিশ্রুতি শোনা গেল। কিন্তু আমাদের যাপিত নগর জীবনের মৌলিক সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান আজও অধরাই রয়ে গেছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান আমাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। মানুষের সম্মিলিত প্রত্যাশা ছিল—এবার বুঝি আমাদের যাপিত জীবনের সমস্যাগুলো সমাধানে দীর্ঘদিনের জট খুলবে।
গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারও নগর ব্যবস্থাপনা সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিল। বায়ু দূষণ ও শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ, খাল-নদী দখলমুক্ত করা, দূষণ কমানো, যানজট নিরসন—এসব ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কিছু আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কয়েকটি অধ্যাদেশও জারি হয়েছিল।
দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা শেষে জাতীয় নগর নীতি অনুমোদন পেয়েছে। বাস্তবতা হলো, নাগরিক জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব একটা আসেনি। বরং আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ আবারও সংশোধন করে একেবারেই অবাসযোগ্য ঢাকার জনসংখ্যা, জনঘনত্ব আরও বাড়াবার পথ উন্মুক্ত করেছে।
পাশাপাশি ঢাকা শহরে নতুন কিছু সমস্যা যোগ হয়েছে। নগরে লাখ লাখ অটোরিকশা—যাকে অনেকে ‘বাংলার টেসলা’ বলে আখ্যা দেন—নেমেছে ঢাকার রাজপথে। ফলে যানজট, বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়েছে। পরিকল্পনাহীন সংযোজন যে সমস্যাকে কমায় না, বরং জটিল করে—এ বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে।
ঢাকাসহ বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে দেশের অনেক শহর, নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন প্রয়োজন
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর এখন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার আবার দায়িত্ব নিয়েছে। অতীতের নির্বাচিত সরকারগুলোর সময়েও আমরা কয়েক দশক পার করেছি; কিন্তু নগরগুলোর বাসযোগ্যতা ধারাবাহিকভাবে অবনতি হয়েছে। রাজধানী ঢাকা দিন দিন বিশ্বের কম বাসযোগ্য শহরের তালিকায় নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লাসহ অন্যান্য দ্রুত বর্ধনশীল শহরও একই চাপে জর্জরিত। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন, দুর্বল সেবা ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বয়ের অভাব নগর সংকটকে বহুমাত্রিক করেছে। এখন নতুন সরকারকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে বাংলাদেশের নগরগুলোকে বাসযোগ্য করতে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, ঢাকার ভয়াবহ যানজট কমাতে রাজধানীর বাইরে স্যাটেলাইট টাউন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব নতুন শহর গড়ে উঠলে ঢাকার ওপর জনসংখ্যা ও অবকাঠামোগত চাপ কমবে বলে মনে করছে দলটি।
যানবাহন ব্যবস্থার উন্নয়নে বিদ্যমান মেট্রোরেলের পাশাপাশি ‘মনোরেল’ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে ঢাকা ও আশপাশের এলাকার মধ্যে নিরাপদ ও দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে শুধু নারীদের জন্য বাস চালুর কথা জানিয়েছে বিএনপি। এসব বাসে চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে নারীরাই দায়িত্ব পালন করবেন।
ঢাকার বায়ু দূষণ কমাতে পরীক্ষামূলকভাবে ইলেকট্রিক যানবাহন চালুর উদ্যোগের পাশাপাশি যানজট কমিয়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে প্রধান সড়কগুলোয় ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (আইটিএস) চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
জননিরাপত্তা বাড়াতে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরার পরিধি বাড়াবে বিএনপি। একই সঙ্গে সড়ক ও মহাসড়কে যানজট কমাতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও টোলিং ব্যবস্থা চালুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আমরা এইসব প্রতিশ্রুতির কার্যকর বাস্তবায়ন চাই।
ঢাকাকেন্দ্রিকতা থেকে বেরিয়ে নগরায়নের বিকেন্দ্রীকরণ দরকার
বাংলাদেশের নগরায়ন টেকসই করতে ঢাকাকেন্দ্রিকতা পরিহারের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকাকেন্দ্রিক নগরায়নের প্রবণতা ভাঙতে হলে এখনই কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ নীতি গ্রহণ করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক হওয়ায় দেশের অন্যান্য বিভাগীয়, জেলা ও পৌর শহরগুলো কাঙ্ক্ষিত বিকাশ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে কর্মসংস্থান, উন্নত চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা ও ব্যবসায়িক সুযোগের সন্ধানে মানুষ ঢাকামুখী হচ্ছে, যা রাজধানীর ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করছে।
আমাদের নগর পরিবহন ব্যবস্থার দর্শনজনিত পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধুমাত্র বড় বড় ফ্লাইওভার নির্মাণ করলেই যানজট কমে না। এর জন্য প্রয়োজন গণপরিবহনভিত্তিক পরিকল্পনা, অটোরিকশা ও ক্ষুদ্র যানবাহনের সুশৃঙ্খল একীকরণ এবং সবশেষে পথচারীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা।
এই প্রবণতা বদলাতে হলে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, আইটি পার্ক, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলো বিভাগীয় ও জেলা শহরে বিস্তৃত করতে হবে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শহরগুলোয় মানসম্মত সড়ক যোগাযোগ, নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্নত হাসপাতাল গড়ে তুললে মানুষের ঢাকায় আসার প্রয়োজন অনেকটাই কমবে।
স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং উদ্যোক্তা সহায়তা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলো আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে ক্ষমতায়ন করে জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর স্থানীয় শাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রকৃত অর্থে উন্নয়নকে সমতাভিত্তিক ও টেকসই করতে হলে রাজধানীর একক আধিপত্য কমিয়ে আঞ্চলিক শহরগুলো উন্নয়নের সমান অংশীদার করতে হবে। ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর ওপরে চাপ কমাতে দেশের অন্য নগর এলাকায় কর্মসংস্থান, নাগরিক সুবিধাদি, ভালো মানের স্কুল, হাসপাতাল, খেলার মাঠ, পার্ক তৈরি করতে হবে। তাহলেই এসব এলাকায় মানুষজন থাকতে আগ্রহী হবে, ঢাকামুখী মানুষের চাপ কমবে।
নগরে যানজট সমস্যা: শুধু অবকাঠামো নয়, প্রয়োজন সমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা
আমাদের নগর পরিবহন ব্যবস্থার দর্শনজনিত পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধুমাত্র বড় বড় ফ্লাইওভার নির্মাণ করলেই যানজট কমে না। এর জন্য প্রয়োজন গণপরিবহনভিত্তিক পরিকল্পনা, অটোরিকশা ও ক্ষুদ্র যানবাহনের সুশৃঙ্খল একীকরণ এবং সবশেষে পথচারীবান্ধব অবকাঠামো নিশ্চিত করা। নগরীর রাস্তাগুলো যেন শুধু যান্ত্রিক যানবাহনের না হয়ে সাধারণ মানুষের হাঁটার যোগ্য হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহার এই বিষয়গুলোয় গুরুত্ব দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। এখন এগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে।
রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে বহুমাত্রিক গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে মেট্রোরেল, মনোরেল, লাইট র্যাপিড ট্রানজিট (এলআরটি), কমিউটার ট্রেনের পাশাপাশি বাসভিত্তিক বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ব্যবস্থা, উন্নত বাস-মিনিবাস সার্ভিসের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। জলপথ ও রেলপথ ব্যবহারের সুযোগকেও প্রাধান্য দিতে হবে।
আরও পড়ুন
পরিবহন খাতে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবহন খাতে এ দুর্ঘটনা রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি সকল পরিবহন চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদানসহ ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-জলাশয় পুনরুদ্ধার
নগরের প্রাণ হলো তার পরিবেশ। বর্তমানে বায়ু ও শব্দ দূষণ যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে মানুষের স্বাস্থ্য ও মানসিক প্রশান্তি চরম হুমকির মুখে। এই দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইনের কঠোর প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে নগরীর হারিয়ে যাওয়া খাল ও নদীগুলো পুনরুদ্ধার করে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা স্বাভাবিক করতে হবে এবং উন্মুক্ত স্থান ও সবুজায়ন সংরক্ষণে দৃশ্যমান ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
এই উদ্যোগ নিতে গেলে তাকে দখলদারদের মোকাবিলা করতে হবে, তাদের অনেকেই আবার রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী। ফলে এইক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে খাল পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভবপর হবে না।
আবাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন
আমাদের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য মহাপরিকল্পনাভিত্তিক আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকারের পদক্ষেপ সমূহ মহাপরিকল্পনায় চিহ্নিত ভূমি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে হওয়া বাঞ্ছনীয়। নগর জীবনে দারিদ্র ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী অর্থনীতিতে বৃহৎ অবদান রাখছে। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর জন্য নগর এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আবাসন দৃষ্টি করা জরুরি। এক্ষেত্রে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের আবাসন সৃষ্টি নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে অগ্রসর হওয়া দরকার।
খেলার মাঠ, পার্ক ও বিনোদন সুবিধাদি নিশ্চিত করতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর পরিকল্পনা প্রয়োজন
আমাদের নগর এলাকায় শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে খেলার মাঠ, পার্ক ও বিনোদন সুবিধাদির বিশাল ঘাটতি রয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ নগর এলাকাগুলোয় হাতেগোনা যে কয়টি মাঠ রয়েছে, তার বেশিরভাগই উন্নত এলাকায়। আর যেসব এলাকায় মাঠ রয়েছে, সেগুলোও শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি, জনপ্রতিনিধি, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। নিরাপত্তার অভাব, পর্যাপ্ত সুবিধা ও পরিষেবার অভাবে নারী ও শিশুদের বেশির ভাগই প্রবেশ করতে পারে না।
সম্প্রতি ইন্সটিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশনে মোট ওয়ার্ড রয়েছে ১২৯টি। এর মধ্যে ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো খেলার মাঠ নেই। আইপিডির সমীক্ষায় বলা হয়েছে, নগর পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী ঢাকা মহানগরে ৭৯৫টি, চট্টগ্রামে ৫৪১টি, রাজশাহীতে ৩৭টি, খুলনায় ৬৫টি, সিলেটে ৪০টি এবং বরিশাল নগরে ৪৫টি খেলার মাঠের ঘাটতি আছে। অনুরূপভাবে কুমিল্লা শহরে প্রয়োজনের তুলনায় খেলার মাঠের সংখ্যা অপ্রতুল।
এতে এসব নগর এলাকার শিশু-কিশোররা খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে স্বাভাবিক বিকাশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে নগর এলাকার শিশু-কিশোরদের পরিপূর্ণ বিকাশ নিশ্চিত করতে খেলার মাঠ, পার্ক, বিনোদন সুবিধাদি তৈরির জন্য কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে রাষ্ট্রের পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে হবে। ক্লাব কিংবা বিভিন্ন গোষ্ঠীর অবৈধ দখলে থাকা খেলার মাঠগুলো কমিউনিটির কাছে অনতিবিলম্বে ফিরিয়ে দিতে হবে।
নগর সংস্থাসমূহের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের কোনো বিকল্প নেই
বর্তমানে সিটি কর্পোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থার মধ্যে যে চরম সমন্বয়হীনতা বিদ্যমান, তা উন্নয়নের সুফলকে ম্লান করে দিচ্ছে। এই সংস্থাগুলোর মধ্যে জবাবদিহিমূলক এবং তথ্যভিত্তিক একটি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন মানেই কেবল বিশাল বাজেটের মেগা প্রকল্প নয়; উন্নয়ন হলো পরিকল্পিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ব্যবস্থাপনা।
বর্তমান সরকারের সামনে সুযোগ এসেছে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, যার মূলে থাকবে মানুষ ও পরিবেশ। এই সুযোগ হাতছাড়া হলে নগরের বাসযোগ্যতার সংকট আরও ঘনীভূত হবে। নগর সরকার তৈরি করা গেলে কার্যকর সমন্বয় করা সহজ হবে, কিন্তু এজন্যে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
নগরে শৃঙ্খলা ফেরাতে আইনের শাসন প্রয়োজন
আমাদের নগর পরিকল্পনা ও ভূমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনিয়ম এবং অপরাধ দমনে অনতিবিলম্বে বিশেষায়িত পরিকল্পনা আদালত গঠন করা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যমান পরিবেশ আদালতকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এবং আইন প্রয়োগে দৃশ্যমান ফল আসে।
আইপিডির সমীক্ষায় বলা হয়েছে, নগর পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী ঢাকা মহানগরে ৭৯৫টি, চট্টগ্রামে ৫৪১টি, রাজশাহীতে ৩৭টি, খুলনায় ৬৫টি, সিলেটে ৪০টি এবং বরিশাল নগরে ৪৫টি খেলার মাঠের ঘাটতি আছে। অনুরূপভাবে কুমিল্লা শহরে প্রয়োজনের তুলনায় খেলার মাঠের সংখ্যা অপ্রতুল।
পরিবেশ ও ভূমি ব্যবহার–সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর যুগোপযোগী সংস্কারের মাধ্যমে পরিবেশ ধ্বংস, দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে দূষণজনিত অপরাধের জরিমানার পরিমাণ তাৎপর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি করে তা কার্যকরভাবে আদায় করার ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে আইন ভঙ্গের প্রবণতা নিরুৎসাহিত হয়।
দেশের উন্নয়নসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে—এমন ব্যবসায়ী, শিল্পগোষ্ঠী ও স্বার্থান্বেষী মহলের অবৈধ প্রভাব বন্ধ করাও সময়ের দাবি। মেগা, বিশেষ ও উন্নয়ন প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই, বাছাই ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থা, রাজনৈতিক বা কর্পোরেট গোষ্ঠীর অযাচিত প্রভাবমুক্ত থেকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপযোগিতা, জনকল্যাণ এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। উন্নয়ন যেন কেবল প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার মাধ্যম না হয়ে জনগণের সামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করে—সে বিষয়টি স্পষ্ট নীতিগত অবস্থানে আনতে হবে।
নগর এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সব ধরনের দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। নগরের উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, তথ্যপ্রকাশ ও জবাবদিহি বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক ও তদারকি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করার কোনো বিকল্প নেই।
আমাদের প্রত্যাশা
নগরকে বলা হয় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন। অথচ আমাদের নগরগুলো বাসযোগ্যতার বিবেচনায় ক্রমাগত ধুঁকছে। এদের বাঁচাতে কার্যকর পরিকল্পনার পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছার কোনো বিকল্প নেই। খাল-ফুটপাত-খেলার মাঠ দখলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে যদি আইনের প্রয়োগ ও সুশাসন নিশ্চিত করা যায়, আমাদের নগরগুলো ঘুরে দাঁড়াবে।
ব্যবসায়ী ও কর্পোরেট স্বার্থের কাছে অনেক ক্ষেত্রেই নতি স্বীকার করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এই পথে যেন না হাঁটে নতুন রাজনৈতিক সরকার। তাহলেই নগর এলাকায় ধীরে ধীরে প্রাণ, পরিবেশ, বাসযোগ্যতা ও জীবনের উচ্ছ্বাস ফিরবে।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান : অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, ইন্সটিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)