আ. লীগের ১৫ বছর, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর ও বর্তমান সরকারের পথচলা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত প্রায় দুই দশক এক গভীর পরিবর্তন ও পুনর্বিন্যাসের সাক্ষী। দীর্ঘ ১৫ বছর ৭ মাস ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার, তার পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রায় দেড় বছরের শাসনকাল এবং বর্তমান সরকারের পথচলা—এই তিনটি ধাপ দেশের গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে।
আওয়ামী লীগের টানা শাসনামলে বাংলাদেশ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ডিজিটালাইজেশন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলের মতো মেগা প্রকল্পগুলো দেশের সক্ষমতার প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে একই সঙ্গে এই সময়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, নির্বাচনব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে নানাভাবে সংকুচিত পরিসরে রেখে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের চেষ্টা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এক ধরনের একমুখী প্রবাহে নিয়ে যায়। অতীতের একদলীয় শাসনব্যবস্থা ‘বাকশাল’কে মনে করিয়ে দেয়। গণতন্ত্রের লেবাসে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রণয়নে ব্যস্ত সময় পার করে আওয়ামী লীগ।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আগমন ছিল দেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড়। প্রায় দেড় বছরের এই সময়ে প্রশাসনিক সংস্কার, নির্বাচন ব্যবস্থার পুনর্গঠন এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী পরিবেশ তৈরির চেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। যদিও প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি, বাস্তবতা ছিল জটিল—রাষ্ট্রযন্ত্রের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আস্থা পুনর্গঠন—সবকিছু একসঙ্গে সামলানো সহজ ছিল না।
বর্তমান সরকারের পথচলা শুরু হয়েছে এই দুই অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ থেকে। একদিকে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব। অর্থনৈতিক বাস্তবতা—বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বৈশ্বিক অস্থিরতা—সরকারকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এই তিনটি পর্ব আমাদের একটি স্পষ্ট শিক্ষা দেয়—টেকসই উন্নয়নের জন্য কেবল অবকাঠামো নয়, প্রয়োজন শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি। বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই ভারসাম্য রক্ষা করা—উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তোলা।
বাংলাদেশ এখন এক নতুন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করা যায়, তবে একটি স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা আরও বেগবান হবে—এটাই প্রত্যাশা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার শুরু থেকে আজ অবধি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকারের সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। তার কথা আর কাজের মধ্যে কোনো বালখেল্য বা আদিখ্যেতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদের অনেক সদস্যই মন্ত্রীত্বের আসন আর রাজনৈতিক দলের নেতার আসনের মধ্যে পার্থক্য করতে পারছেন না। কথার ফুলঝুরি দেখতে পাচ্ছি। যেমন দেখেছিলাম বিগত দিনে আওয়ামীলীগ শাসিত সরকার আর ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিদের কথায় আর আচরণে। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের আচরণ হতে হবে সংযত, হতে হবে সহনশীল। সেই সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে হবে জনগনের সঙ্গে। তবেই একটি জনসম্পৃক্ত গণতান্ত্রিক সরকার দেশের আর দশের উন্নয়নে অগ্রসর হতে পারবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বর্তমানে আর মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যায় রূপ নিয়েছে। গত প্রায় তিন সপ্তাহের অধিক সময় ধরে চলমান যুদ্ধে কয়েক হাজার সামরিক-বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন। নিজেরা হয়েছেন আশ্রয়হীন। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গোটা আরববিশ্ব আক্রান্ত হয়েছে। জ্বালানি সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো একটি অনিশ্চিত সময়ের অপেক্ষায় আছে। আর এই সময়ে বাংলাদেশে নতুন সরকারের আগমণ। মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে এক দীর্ঘ সময় অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। মধ্যপ্রাচ্য সংকট এই মূল্যস্ফীতিকে আরো বাড়িয়ে তুলতে পারে, যা দেশের জনগণ কতটুকু গ্রহণ করতে পারবে ঠিক বুঝে ওঠা মুশকিল। বিশ্ব বাস্তবতায় সরকারকে আরও বেশি ক্যালকুলেটিভ হতে হবে, সিদ্ধান্ত নিতে হবে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য সকল অগ্রাধিকার খাতকে বিবেচনায় রেখে।
বিজ্ঞাপন
লেখক : মো. কামরুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট