বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বাঙালির আত্মত্যাগ

কোনো জাতির স্বাধীনতা কখনো হঠাৎ করে আসে না। দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ, রক্ত আর আত্মমর্যাদাবোধের ভেতর দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসও সেরকম এক ইতিহাস—যেখানে এক ভাষাভিত্তিক জাতি তাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব, রাজনৈতিক অধিকার এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার জন্য অসাধারণ আত্মত্যাগের নজির স্থাপন করেছে। বাঙালির এই আত্মত্যাগ কেবল নতুন একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে তাই নয়, বাঙালির এই আত্মত্যাগ বিশ্ব ইতিহাসে স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক ঘটনা নয়। দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার পরিণতি। যার কেন্দ্রে ছিল বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার, সাংস্কৃতিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের দাবি। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশের বিভাজনের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়, যার দুটো অংশ ছিল ভৌগোলিকভাবে হাজার মাইল দূরে অবস্থিত-পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তান।
সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী পূর্বাঞ্চলে বসবাস করলেও রাষ্ট্রক্ষমতা ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র ছিল পশ্চিম অংশে। ফলে শুরু থেকেই অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রশাসনিক বঞ্চনা এবং সাংস্কৃতিক অবমূল্যায়নের একটি বাস্তবতা তৈরি হয়ে যায়।
বাঙালির জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নিলে পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। ভাষার প্রশ্ন তখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যমের প্রশ্ন ছিল না—ছিল সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের প্রশ্ন।
বিজ্ঞাপন
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতীয় চেতনার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। ছাত্রসমাজ, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষ ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে রাস্তায় নেমে আসেন। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণে তরুণ প্রাণ ঝরে যায়। তাদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়। তাতে ভাষার অধিকারের দাবি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই আত্মত্যাগ বাঙালি সমাজে গভীর আবেগ ও রাজনৈতিক সচেতনতার জন্ম দেয়। ভাষা আন্দোলন পরবর্তীকালে বৃহত্তর জাতীয় মুক্তির আন্দোলনের বীজ রোপণ করে।
পরবর্তী দুই দশকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক বঞ্চনার অভিজ্ঞতা ক্রমশ তীব্রভাবে অনুভব করতে থাকে। রাষ্ট্রের আয় ও সম্পদের বড় অংশ পূর্বাঞ্চল থেকে অর্জিত হলেও উন্নয়ন ব্যয় ও প্রশাসনিক সুবিধার বেশিরভাগই পশ্চিমাঞ্চলে কেন্দ্রীভূত ছিল। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ছাত্র, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের প্রতিবাদে আন্দোলন গড়ে ওঠে।
১৯৬০-এর দশকে গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থান রাজনৈতিক পরিবর্তনের দাবিকে আরও জোরালো করে তোলে। এইসব আন্দোলন বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষাকে স্পষ্ট করে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রশাসনিক বঞ্চনা এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়ন বাঙালিদের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র করে দেয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পাকিস্তানি সামরিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয় এবং বাঙালির রাজনৈতিক নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
বিজ্ঞাপন
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে রাজনৈতিক সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছালে সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক দমন অভিযান শুরু করে। ২৫ মার্চ রাতে পরিচালিত সামরিক অভিযানে ঢাকাসহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন শহরে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়, ছাত্রাবাস, শ্রমজীবী এলাকা—কোথাও রেহাই ছিল না। সেই রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যে সামরিক অভিযান চালায়, তা ইতিহাসে পরিচিত অপারেশন সার্চলাইট নামে। এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল বাঙালির রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বুদ্ধিজীবী সমাজ, ছাত্রসমাজ এবং সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে দমন করা।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, পুরান ঢাকা এবং বিভিন্ন ব্যারাকে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায়। এই বর্বরতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। ২৫ মার্চের সেই রাতের পর বাঙালির সামনে দুটো পথ ছিল, হয় আত্মসমর্পণ নয়তো প্রতিরোধ।
বাঙালি জাতি দ্বিতীয় পথটি বেছে নেয় এবং সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। তাতে সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। খুব সহজে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আসেনি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে বাঙালিদের এই যুদ্ধ ছিল অসম লড়াই। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে ছিল অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র।
বাঙালিদের ছিল সাহস আর দেশপ্রেম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত জনযুদ্ধ। এখানে ‘প্রফেশনাল’ যুদ্ধের শর্ত পূরণ করে ‘অ্যাকশনে’ যাওয়া হয়নি। এসব অ্যাকশন ছিল গেরিলা পদ্ধতির। সাধারণ মানুষ ব্যাপকভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। কোনো গ্রাম বা এলাকা নিরাপদ ছিল না। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সব জায়গায় ত্রাস সৃষ্টি করেছে। লুটপাট করেছে। আগুন দিয়েছে।
বাঙালির জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি। কিন্তু পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ নিলে পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
মুক্তিযুদ্ধের অনন্য দিক ছিল সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সহযোগিতা। গ্রামের অনেক সাধারণ মানুষ হয়তো অস্ত্র হাতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেননি, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে তাদের ভূমিকা ও আত্মত্যাগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের নিজ সন্তানের মতো গ্রহণ করেছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তারা ঘরের দরজা খুলে দিয়েছেন, আশ্রয় দিয়েছেন, খাবারের ব্যবস্থা করেছেন।
কখনো কখনো নিজের পরিবারের খাবার কমিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। তারা খবরাখবর আনা-নেওয়ার কাজ করতেন। দিনে বা রাতে প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেই, হাতে অস্ত্র নেই, গায়ে যোদ্ধার পোশাক বা পায়ে জুতো নেই।
তবু সে রওনা হয়ে গেছে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গোলাবারুদের ভারী ব্যাগ হাতে। কিছু নেই তবু তার বুকে আছে অদম্য সাহস। নিজ দেশ স্বাধীন করার দৃঢ় প্রত্যয়। গোপনীয়তা রক্ষার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের গ্রামের মানুষ তাদের ঘরের ভেতর লুকিয়ে রাখতেন। রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজ পেলে পাকবাহিনীর কাছে গিয়ে বলে দিত।
কেউ দেখে ফেলতে পারে সেই আশঙ্কায় মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখযুদ্ধ ছাড়া ঘরের বাইরে বেরুতেন না। এমনকি অনেকে দিনের বেলা গোসলও করতেন না। রাতে বের হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা গেরিলা হামলা চালাতেন। ঝড়, বৃষ্টি, কাদার ভেতর দিয়ে খাল, বিল, কাঁটা ঝোপঝাড়, জঙ্গল মাড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধারা হেঁটে যেতেন মাইলের পর মাইল।
পরনের কাপড়ের অভাব ছিল। বেশিরভাগ সময় পরনের ভেজা কাপড় পরনেই শুকাত। না হয় আগুনে শুকিয়ে নিতে হতো। এক কাপড়ে কাটিয়ে দিতে হতো মাসের পর মাস। মুক্তিযোদ্ধারা কখনো দল ধরে একই গ্রামে কিংবা এক বাড়িতে অনেকে থাকতেন না। যে বাড়িতে বারো/চৌদ্দজন মানুষের রান্না হতো, সেই বাড়িতে থাকতেন দুই/তিনজন মুক্তিযোদ্ধা। যেন তাদের জন্য বাড়তি খাবারের ব্যবস্থা করতে না হয়।
এছাড়া এর সঙ্গে নিরাপত্তার ব্যাপার জড়িত ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে জনগণের ব্যাপক সমর্থন ছিল। আর দেশ স্বাধীন করার জন্য সাধারণ মানুষ লড়ে গেছেন মুক্তির লড়াই। এই নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধ এত বিস্তৃতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতো না।
যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী সারাদেশে গণহত্যা, লুটপাট এবং নারী নির্যাতনের মতো ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত করেছে। বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ২ লাখ নারী যৌন সহিংসতার শিকার হন।
এই নৃশংসতা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করলেও তা প্রতিরোধকে দমাতে পারেনি। বরং পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। পাকিস্তানি বাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য গণহত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে। ময়মনসিংহের সোহাগপুর গ্রামে সংঘটিত গণহত্যায় ১৮৭ জন মানুষ নিহত হন এবং পরে সেই গ্রাম ‘বিধবাপল্লী’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন
কখনো আবার সাধারণ মানুষ স্বাধীনতায় আকাঙ্ক্ষায় হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছেন। আলেয়া বেগম তেমন একজন মানুষ। আলেয়া বেগমের বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন কিশোরী। সশস্ত্রযুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ করেছেন। তাকে কখনো কোনো অভিযানে পিছ পা হতে দেখা যায়নি। তিনি যেমন ছিলেন সাহসী, তেমনি ছিলেন তেজদ্দীপ্ত।
আলেয়া বেগম নিজ সিদ্ধান্তে যুদ্ধে গেছেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে থাকতেন। রান্নাসহ ক্যাম্পের অন্যান্য কাজে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন। মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে থাকতে থাকতে প্রবল উৎসাহে আলেয়া বেগম রাইফেল চালানো, গ্রেনেড ছোড়া, যুদ্ধের কলাকৌশল ইত্যাদি শিখে নেন। দিনে দিনে তিনি রাইফেল, এস.এম.জি, এস.এল.আর সবকিছু চালানোতেই পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
তবু মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার তাকে কোনো অপারেশনে নিয়ে যেতেন না। শুধু বলতেন, ‘সময় হলেই নিয়ে যাবো।’ আলেয়া বেগম অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করতেন। সেই সময় আর আসত না। একদিন অদ্ভুত এক ঘটনা ঘটল। তারা যে গ্রামে ক্যাম্প বানিয়ে থাকতেন। তার পাশের গ্রামে শোনা গেল রাতে ডাকাতি হয়েছে। ডাকাতরা গ্রামবাসীদের খুব অত্যাচার করেছে। লুটে নিয়ে গেছে বাড়ির সব সম্পদ।
মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ভাবলেন ডাকাতদের শায়েস্তা করতে হবে। যে গ্রামের মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের এত সম্মান করে, সমাদর করে থাকতে দেয় সেই গ্রামের মানুষের ওপর ডাকাতের অত্যাচার তিনি মেনে নিতে পারলেন না। দলবল নিয়ে রওনা হলেন ডাকাতদের ধরতে।
আলেয়া বেগম তখন এই দলের সঙ্গে ডাকাত ধরতে রওনা হলেন। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বাধা দিলেন না। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আগে গিয়ে খবর নিয়ে এলেন। তারা জেনে এলেন ডাকাতরা কোথায় আছে। তারপর মুক্তিযোদ্ধারা গেলেন ডাকাত ধরতে।
মুক্তিযোদ্ধারা চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে ডাকাতদের আখড়া চারপাশ থেকে ঘিরে ফেললেন। তারপর ধীরে ধীরে চারদিক থেকে এগিয়ে যেতে থাকলেন। তখন ডাকাতরা মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ধরা পড়ে গেছে।
কেউ খেয়াল করেননি একজন ডাকাত বাইরে থেকে গেছে। তাকে শুধু দেখেছেন আলেয়া বেগম। বাইরে যে ডাকাত ছিল সে নিঃশব্দে হেঁটে হেঁটে পাশ দিয়ে সরে গেল। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার। তিনি জানেন না তার পেছনে একজন ডাকাত অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিনগত রাত্রি ছিল এ দেশের জন্য এক কালরাত্রি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত, নিরপরাধ, নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষের ওপর হিংস্র হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাদের কাছে ছিল গণহত্যার নীলনকশা-অপারেশন সার্চলাইট।
সেই ডাকাত হাতের অস্ত্র তুলে ধরে পেছন থেকে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের মাথা বরাবর তাক করল। আলেয়া বেগমের হাতে ছিল এস.এম.জি। ডাকাত গুলি করার আগেই আলেয়া বেগম ডাকাতকে গুলি করেছেন। তখন আরও একজন ডাকাত অস্ত্র হাতে ছুটে আসছিল। আলেয়া বেগম তাকেও গুলি করেন।
গুলির শব্দে সকলেই চমকে উঠেছে। প্রথমে বুঝে উঠতে পারেননি ঘটনা কী ঘটেছে। তাকিয়ে দেখেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের পেছনে এক ডাকাত গুলি খেয়ে মরে পড়ে আছে। তার হাতে অস্ত্র। আরেক ডাকাত পড়ে আছে পাশে। তাদের দুজনকে গুলি করেছেন আলেয়া বেগম। তখন সবাই ঘটনা বুঝতে পেরেছেন।
তারপর থেকে মুক্তিযোদ্ধারা যতগুলো অপারেশনে গেছেন সবগুলো অপারেশনে আলেয়া বেগমকে নিয়ে গেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সাহিত্যিক ও গবেষকদের হত্যা করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকে মেধাশূন্য করে দেওয়া এবং জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বকে ধ্বংস করা। এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গভীর ট্র্যাজেডি হয়ে আছে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিনগত রাত্রি ছিল এ দেশের জন্য এক কালরাত্রি। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত, নিরপরাধ, নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষের ওপর হিংস্র হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তাদের কাছে ছিল গণহত্যার নীলনকশা-অপারেশন সার্চলাইট।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে বীর বাঙালি। শুরু হয়েছে যুদ্ধ। স্বাধীনতার যুদ্ধ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ পরিণত হয়েছে জনযুদ্ধে। সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধে।
নিয়মিত সৈনিক ছাড়াও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, কলকারখানার শ্রমিক, কৃষক, শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, নানা পেশার মানুষ, মেহনতি কর্মজীবী সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। বাংলাদেশের মুক্তির জন্য তারা বীরোচিত সংগ্রামে লড়েছেন। দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক ঘটনা নয়, এটা মানুষের মর্যাদা, ভাষা, সংস্কৃতি এবং ন্যায়বিচারের জন্য সংগ্রামের অর্জন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাঙালির আত্মত্যাগ প্রমাণ করেছে যেকোনো জাতি যখন নিজের অধিকার ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়, তখন তাকে দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা যায় না।
স্বাধীনতার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগ ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। ভাষা আন্দোলনের শহীদদের রক্ত থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম পেরিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য প্রাণের বিসর্জন। এই দীর্ঘ আত্মত্যাগে গড়ে উঠেছে স্বাধীন বাংলাদেশ।
দীপু মাহমুদ : কথাসাহিত্যিক