বর্তমান বিশ্বে শ্বাসতন্ত্রের সুরক্ষায় বায়ু দূষণ কেবল একটি পরিবেশগত উদ্বেগের বিষয় নয়, বরং এটি এক অভূতপূর্ব এবং নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান আমাদের এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষ অস্বাস্থ্যকর ও বিষাক্ত বাতাসে শ্বাস নিতে বাধ্য হচ্ছে, যার চূড়ান্ত পরিণাম হিসেবে প্রতি বছর প্রায় ৬৭ লাখ মানুষ অকাল মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। ২০১৯ সালের বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অকাল মৃত্যুর চতুর্থ প্রধান ঝুঁকির কারণ ছিল এই বায়ু দূষণ, যার প্রায় ৯০ শতাংশ প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর ওপর (WHO, 2024)।
বিজ্ঞাপন
দক্ষিণ এশিয়া বর্তমানে এই বৈশ্বিক সংকটের উপকেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে দূষণের কারণে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটছে এবং আঞ্চলিক জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে (Alkhanani, 2025)।
বিশেষ করে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বাতাস বর্তমানে যে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে, তা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মরণফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয়। সাম্প্রতিক আইকিউএয়ার (IQAir)-এর তথ্যমতে, ঢাকার বাতাসে ক্ষতিকারক সূক্ষ্ম কণা PM2.5-এর ঘনত্ব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্ষিক নির্দেশিত সীমার চেয়ে প্রায় ১০.৫ গুণ বেশি, যেখানে গত সপ্তাহের (মার্চ ২০২৬, শেষ সপ্তাহে) গড় এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) ছিল ১৮০-এর উপরে, যা সরাসরি ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত (Dhaka Air Quality Index, IQAir)।
এই জনস্বাস্থ্য সংকটের মূলে থাকা (particulate matter) বা PM2.5 কণাটি কতটা বিষাক্ত ও বিপজ্জনক তা বুঝতে এর গঠন জানা জরুরি। ইউ.এস. এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন এজেন্সি (EPA)-র মতে PM2.5 হলো বাতাসে ভাসমান এমন ক্ষুদ্র কণা যার ব্যাস মাত্র ২.৫ মাইক্রোমিটার বা তার কম সহজভাবে বললে, আমাদের মাথার একটি চুলের চেয়েও এটি প্রায় ৩০ গুণ বেশি সূক্ষ্ম।
বিজ্ঞাপন
ভয়াবহতা লুকিয়ে আছে এর অতি-ক্ষুদ্র আকৃতিতে; মানুষের শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যেমন নাকের লোম বা শ্লেষ্মা একে ফুসফুসে প্রবেশে বাধা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র, অপরিকল্পিত শিল্পকারখানা, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো থেকে নির্গত এই বিষাক্ত কণাগুলো শ্বাস গ্রহণের সময় সরাসরি ফুসফুসের অ্যালভিওলাই ভেদ করে রক্তপ্রবাহে মিশে যায়। একবার রক্তে মিশে গেলে এই কণাগুলো শরীরের প্রতিটি কোষে প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা অকাল মৃত্যু থেকে শুরু করে শরীরের দীর্ঘমেয়াদি অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে।
এই ক্ষুদ্র কণাটির সাথে নগর স্বাস্থ্য এবং অসংক্রামক ব্যাধির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও উদ্বেগজনক। অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন ও আধুনিক জীবনযাত্রার আড়ালে শহরের মানুষ প্রতিনিয়ত যে বিষ গ্রহণ করছে, তা দীর্ঘমেয়াদি হৃদরোগ, স্ট্রোক, ফুসফুসের ক্যান্সার এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট বা সিওপিডি (COPD)-র হার বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যখন এই কণাগুলো রক্তনালীতে প্রবেশ করে, তখন তা ধমনীতে মারাত্মক প্রদাহ সৃষ্টি করে, যা উচ্চ রক্তচাপ ও হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে মৃত্যু এবং পঙ্গুত্বের ঝুঁকির প্রায় ১৭.৬ শতাংশের জন্য দায়ী কেবল বায়ু দূষণ (Siddiqui et al., 2020)।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে যারা আগে থেকেই হাঁপানিতে ভুগছেন, তাদের জন্য এই দূষিত বাতাস রোগের তীব্রতা বৃদ্ধিতে একটি ‘ট্রিগার’ হিসেবে কাজ করে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইনডোর এয়ার পলিউশন বা ঘরের ভেতরের দূষণ; দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার রান্নার কাজে জৈব জ্বালানি ব্যবহার করায় নারীরা ও শিশুরা সরাসরি এই স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে, যা পুরো নগর জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর এক অসহনীয় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে (Alam et al., 2022)।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, বাংলাদেশে বায়ু দূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে যথেষ্ট সচেতনতা থাকলেও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে এক বিশাল ‘জ্ঞান ও অভ্যাসের ব্যবধান’ লক্ষ্য করা যায়।
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ বায়ু দূষণের ঝুঁকি সম্পর্কে অবগত থাকলেও কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা, যেমন মানসম্মত মাস্ক ব্যবহার বা বাতাসের মান পর্যবেক্ষণ করে চলাফেরা করার হার অর্ধেকেরও কম (Niloy & Hossain, 2025)।
এই স্থবিরতার নেপথ্যে রয়েছে চরম অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় ও নির্ভুল তথ্যের অভাব এবং ‘ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র পদক্ষেপে কোনো পরিবর্তন আসবে না’—এমন এক হতাশাজনক ভুল ধারণা। তবে আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, কেবল ব্যক্তিগত সচেতনতা দিয়ে এই বিষবাষ্প রোধ করা সম্ভব নয়। বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কাঠামোগত পরিবর্তন, শিল্পবর্জ্যের কঠোর ব্যবস্থাপনা এবং সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। নতুবা ‘বিপদের জ্ঞান’ থাকা সত্ত্বেও আমরা কেবল নিরাপত্তার অভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক শ্বাসরুদ্ধকর ও পঙ্গু সমাজের দিকে ঠেলে দেবো, যেখানে অকাল মৃত্যু হবে এক অনিবার্য পরিণতি।
তথ্যঋণ:
১। Alam, M. B., Acharjee, S., Mahmud, S. A., Tania, J. A., Khan, M. M. A., Islam, M. S., & Khan, M. N. (2022). Household air pollution from cooking fuels and its association with under-five mortality in Bangladesh. Clinical Epidemiology and Global Health, 17, 101134. https://doi.org/10.1016/j.cegh.2022.101134
২। World Health Organization. (2024). Ambient (outdoor) air quality and health. https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/ambient-(outdoor)-air-quality-and-health
৩। WHO (2022). Ambient (outdoor) air pollution. Available online at: https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/ambient-(outdoor)-air-quality-and-health
৪। Alkhanani, M. F. (2025). Assessing the Impact of Air Quality and Socioeconomic Conditions on Respiratory Disease Incidence. Tropical Medicine and Infectious Disease, 10(2), 56. https://doi.org/10.3390/tropicalmed10020056
৫। U.S. Environmental Protection Agency. Particulate matter (PM) basics. Retrieved March 31, 2026, from https://www.epa.gov/pm-pollution/particulate-matter-pm-basics
৬। Niloy, L. T., & Hossain, I. (2025). Indoor Air Pollution and Respiratory Health in Bangladesh. Medical Research Archives, 13(5). https://doi.org/10.18103/mra.v13i5.6305
মিনহাজুল ইসলাম : হেলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসার, এমিনেন্স এসোসিয়েটস ফর সোশাল ডেভেলপমেন্ট, এসোসিয়েট, বাংলাদেশ আরবান হেলথ নেটওয়ার্ক
minhajul.islam@eminence-bd.org
