আমি সবসময়ই বলে এসেছি-আমার কাজ সিনেমা বানানো, সিনেমার সমালোচনা লেখা নয়। আমাকে সচরাচর রিভিউ লিখতে দেখাও যায় না। কারণ, আমার নিজের সিনেমাই ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়; নিজের সমসাময়িক নির্মাতাদের কাজ নিয়ে সমালোচনা খুব একটা শোভনও ঠেকে না আমার কাছে। সুতরাং ঈদে দু-তিনটি ছবি দেখে আমার সাধারণ অনুভূতি লেখার চেষ্টা করছি মাত্র ।
বিজ্ঞাপন
দম (২০২৬)

রেদোয়ান রনির দম আসলে সরল কোনো সার্ভাইভাল থ্রিলার নয়-এটা মানুষের অস্তিত্ব, পছন্দ, দায়বদ্ধতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে আটকে পড়া এক নিঃশ্বাসের গল্প। তিনি এখানে ভিজ্যুয়ালকে শুধু দৃশ্য হিসেবে ব্যবহার করেননি, তিনি একে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভূগোল বানিয়েছেন।
পাবনার শান্ত, স্নিগ্ধ গ্রাম আর আফগানিস্তানের ধূসর, অনিশ্চিত ভূদৃশ্য (শুটিং সম্ভবত তাজিকিস্তানে হয়েছে)-এই দুই ভুবনের কনট্রাস্টই দম-এর মূল নাটকীয়তা তৈরি করে। দম সিনেমাটি দেখতে দেখতে একজন নির্মাতা হিসেবে আমি বারংবার টিমের দম নিয়ে ভেবেছি। অমন অচেনা, দুর্গম মরু অঞ্চলে বসে এমন একটি ন্যারেটিভ তৈরি করতে সত্যিই দম লাগে। এই ধরনের প্রচেষ্টায় পূর্বে অনেক আনাড়িপনা দেখা গেলেও রনির দম-এ দক্ষতা খুঁজে পাওয়া গেছে। রনির টেলিভিশন ফিকশন করার পূর্বাভিজ্ঞতা এবং আফরান নিশো, চঞ্চল চৌধুরী, পূজা চেরির জীবনঘনিষ্ঠ অভিনয় দক্ষতা সম্ভবত আমাদের প্রত্যাশিত আনাড়িপনা থেকে রেহাই দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
লং শটগুলো নিশোকে দূর থেকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন তিনি নিজেই নিজের জীবনের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। এই ডিট্যাচমেন্ট দর্শককে বাধ্য করে তার নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে, শুধু দেখা নয়, বহন করতে। বিশেষ করে গাধার পিঠে চড়িয়ে তার ভাগ্য নির্ধারণের অন্তহীন যাত্রার মেটাফোর-সত্যিই এক রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। গাধা হাঁটা থামালেই জীবনাবসান!
আফরান নিশো এই ছবিতে মূলত দম হয়ে ওঠেন-তার শ্বাস, ভয়, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা পুরো ন্যারেটিভকে চালিত করে। বন্দিদশার পর তার পারফরম্যান্স ক্রমশ ইনওয়ার্ড হয়ে যায়, কম সংলাপ, বেশি চোখের ভাষা। এমন একটি গভীর পরিমিতির ভেতরে উচ্চকিতভাবে নিজেকে বাঙালি মুসলমান দাবি করা বা অন্যান্য উচ্চকিত অভিনয়ের বিষয়টি একদম বাড়া ভাতে ছাই দেওয়ার মতো মনে হয়েছে। এটা সেই সুপ্রতিষ্ঠিত তথাকথিত ক্লিশে ঢাকার বাণিজ্যিক সিনেমা হয়ে ওঠার প্রবণতা—এটা না হলেও চলত।
সার্ভাইভালকেন্দ্রিক চলচ্চিত্রে নীরবতা অনেক বড় একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র-সেটার যথেষ্ট ভালো ব্যবহারের সুযোগ ছিল। এটা দেখতে দেখতে আলেহান্দ্রো গঞ্জালেস ইনারিতুর ‘ব্যাবেল (১৯৯৯)’ চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্যের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল, মেক্সিকান সীমান্তে আটকে পড়া এক গভর্নেস, তার দায়িত্বে থাকা দুই আমেরিকান শিশু; প্রতিমুহূর্তে সীমান্তরক্ষীদের হাতে ধরা পড়া থেকে বাঁচার চেষ্টা; ধূ-ধূ মরুভূমি, খাবারা নেই, পানীয় নেই, কিন্তু কোনো সংলাপও নেই। তারপরও এই দৃশ্য দেখতে গেলে দম বন্ধ হয়ে যাবে আপনার। এই দুই চলচ্চিত্রের মধ্যে কোনো ধরনের কাঠামোগত মিল নেই; তথাপি মনে হলো অভিনয় করতে না হলে বরং আফরান নিশো সবচেয়ে গভীর অভিনয়টা করার সুযোগ পেতেন।
বিজ্ঞাপন
চঞ্চল চৌধুরী ওরফে সুজিত, বরাবরের মতোই গ্রে-শেড চরিত্রে অসাধারণ। তার চরিত্রটা একধরনের নৈতিক ধোঁয়াশা, তিনি কি রক্ষাকারী, নাকি আরও বড় বিপদের পূর্বাভাস দিচ্ছে, এই অনিশ্চয়তাই ছবির টেনশন বাড়ায়।

পূজা চেরি ওরফে জোহরা পারভিন রানী তুলনামূলকভাবে কম স্ক্রিনটাইম পেয়েও ছবির আবেগের অন্যতম কেন্দ্র। তার আপত্তি, ভয়, ভালোবাসা এবং প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ঢাকা শহরে স্বামীর কর্মস্থল খুঁজে বের করে মুক্তিপণের অর্থ সংগ্রহের প্রাণপণ প্রচেষ্টা গভীরতর মানবিক আবেদন সৃষ্টি করে। তার অভিনয় দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, বিজ্ঞাপনে মন জয় করা সেই কিশোরী পূজা চেরিকেই দেখছি, যে অবশেষে নিজের অভিনয় দক্ষতা প্রমাণের সুযোগ পেয়েছে।
এছাড়া অনেক বিদেশি অভিনেতাদের অভিনয় দেখতে দেখতে মনে মনে বলছিলাম, এতকিছু কীভাবে পেরে উঠলেন আপনারা! আমাদের চলচ্চিত্রের হাজারও সীমাবদ্ধতা, প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও এমন প্রচেষ্টা সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়। একথা বলাই বাহুল্য, সাম্প্রতিক সময়ে নেটফ্লিক্স, অ্যামাজনের মতো ওটিটি প্ল্যাটফর্মে এর থেকে বড় বাজেটে এই ঘরানার আরও অনেক ছবি দেখা যায়। কিন্তু দম খাঁটি বাংলাদেশি এবং সত্য ঘটনা অবলম্বনে মৌলিক গল্প হওয়াতে মনে হয়েছে, আমরা এই ধরনের ছবিতেও পরিপক্ব হয়ে উঠতে শুরু করেছি।
আরও পড়ুন
দমকে পড়া যায় অন্তত তিনটি স্তরে—
পুঁজিবাদ বনাম মানবিকতা:
এনজিওর মাইক্রোক্রেডিট কাঠামো এখানে নিছক অর্থনৈতিক কার্যক্রম নয়, এটা একধরনের নরম ক্ষমতা (soft power)। দরিদ্র মানুষের ওপর ঋণের চাপ, আর সেই চাপ আদায় করতে গিয়ে আরেক দরিদ্র মানুষের (নূর) মানসিক ভাঙন এটা নিও-লিবারেল অর্থনীতির নির্মম চক্রকে উন্মোচন করে।
দম সিনেমাটি দেখতে দেখতে একজন নির্মাতা হিসেবে আমি বারংবার টিমের দম নিয়ে ভেবেছি। অমন অচেনা, দুর্গম মরু অঞ্চলে বসে এমন একটি ন্যারেটিভ তৈরি করতে সত্যিই দম লাগে।
শরীর ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক:
তালেবানদের হাতে অপহৃত হওয়ার পর নিশোর শরীর যেন আর তার নিজের থাকে না এটা হয়ে ওঠে দরকষাকষির একটা ‘অবজেক্ট’। এখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা রাষ্ট্রীয় ও সামরিক শক্তির কাছে সম্পূর্ণভাবে বিলীন। ভূ-রাজনীতিতে একটা প্রাণ কতখানি অকিঞ্চিৎকর, তা যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে এই চলচ্চিত্রে।
বেঁচে থাকা বনাম অর্থপূর্ণ থাকা:
নূরের লড়াই শুধু বেঁচে থাকার নয়, সে কীভাবে নিজের পরিচয়, নৈতিকতা ধরে রাখবে, সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। জীবনপণ লড়াই করতে করতে গভীর জলে তলিয়ে গিয়ে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে তাকে জলে ভাসিয়ে না দিয়ে সৎকার করার দায়বদ্ধতা তার অপরিবর্তিত মানবিক অবস্থানকে গভীরভাবে উন্মোচিত করে। এই জায়গাতেই দম তার শিরোনামের গভীরতা পায়, শ্বাস নেওয়া আর বেঁচে থাকা এক জিনিস নয়।
আবহসংগীত আরও দৃশ্য ঘনিষ্ঠতার দাবি রাখে, তবে সাউন্ড ডিজাইন যথেষ্ট জুতসই লেগেছে। ক্ষেত্রবিশেষে এডিটিংয়ে একটু তাড়াহুড়া দেখা গিয়েছে, যা কখনো কখনো ছন্দ পতনের কারণ হয়ে উঠেছে।
দম মূলত একটি অস্তিত্ববাদ থ্রিলার সিনেমা, যেখানে প্রতিটি শ্বাস রাজনৈতিক, প্রতিটি সিদ্ধান্ত নৈতিকতা আর পাপের দোলাচলে আবদ্ধ, আর প্রতিটি মুহূর্ত অনিশ্চিত। এটা শুধু একজন মানুষের বেঁচে থাকার গল্প নয়, এটা সেই প্রশ্ন তোলে, ‘আপনি কি শুধু বেঁচে আছেন, নাকি বেঁচে থাকার অর্থও জানেন?’
রাক্ষস (২০২৬)

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘সত্য যে কঠিন, কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’
তো আমিও কঠিনেরে ভালবাসিলাম। সিয়াম আহমেদের লুক দেখেই আমি মনের অজান্তেই ভারতীয় ‘অ্যানিম্যাল (২০২৩)’ চলচ্চিত্রের বাংলা সংস্করণ দেখার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলাম। আগেই বলে নেই, ‘অ্যানিম্যাল (২০২৩)’-ই নিতে আমার কষ্ট হয়েছিল। সুতরাং বাংলা সংস্করণ কেমন লাগবে, সেটা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় নিয়েই এই ছবি দেখতে বসা।
কিছুক্ষণ দেখার পরই বুঝলাম, ‘অ্যানিম্যাল (২০২৩)’ আর মেহেদী হাসান হৃদয় পরিচালিত ‘রাক্ষস (২০২৬)’-এর গল্প হুবহু এক নয়। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, একজন বাংলাদেশি বাঙালি যুবক এবং অন্যান্য চরিত্রকে আরোপিতভাবে তামিল লুক দিয়ে কী লাভ! মানুষ তো চাইলেই তামিল ছবি দেখতে পারে! উপরন্তু, সিয়াম আহমেদের চরিত্র যেহেতু শিক্ষকের, তার গ্যাংস্টার ব্যক্তিত্ব কেন গড়ে তুলতে হলো? বরং উল্টোটা ভাবুন, তার ব্যক্তিত্ব শিক্ষকের, সৌম্য, সুশীল; কিন্তু তার কাজ গ্যাংস্টারের, গোটা বিষয়টাই সিনেমাটিকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যেতে পারত।
বলে নেওয়া ভালো, তামিল হোক, বলিউড বা হলিউড-রক্তপাত, হানাহানি বা নৃশংসতার ছবি সাধারণত আমি দেখি না। তাই এই বিষয়ে আলাপ করার কতখানি যোগ্যতা আমি রাখি, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দিহান।
প্রথম থেকেই একধরনের প্রশ্নবিদ্ধ নৈতিকতা নিয়ে গল্পের শুরু। ছবির নায়িকা জুলিয়েট বেশি নম্বর পাওয়ার আশায় শিক্ষক রুশো (সিয়াম আহমেদ)-কে প্রেমের ফাঁদে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। রাশভারী স্বভাবের ড্যাশিং সিয়াম তাকে প্রথমে পাত্তাই দেয় না। অথচ মনে মনে সে জুলিয়েটকে ভালোবেসে ফেলে। একপর্যায়ে সিয়াম তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চাইলে তিনি জানান, বেশি নম্বর পাওয়ার কৌশল হিসেবে প্রেমের অভিনয় করেছে। এটা শুনে ক্ষিপ্ত সিয়াম তাকে বেদম মারধর করে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। কোথায় শিক্ষক, কোথায় তার প্রত্যাশিত নৈতিক দায়বদ্ধতা এ যেন ঠাওর করেই উঠতে পারলাম না! বহুকাল আগে অনন্ত জলিল আক্ষরিক অর্থেই হৃদপিণ্ড বের করে এনে দেখিয়েছিলেন, বহুকাল বাদে সিয়াম রক্ত দিয়ে গোসল করে দেখালেন।
এরপর আবির্ভাব হয় সিনেমার ভিলেন সোহেল মণ্ডলের। বলাই বাহুল্য, সোহেল মণ্ডল আমার মুক্তি প্রতীক্ষিত সিনেমা ‘বনলতা সেন’ (২০২৪ সালে সম্পন্ন)-এর অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। তার প্রতি নিশ্চিত দুর্বলতা রয়েছে আমার। চোখেমুখে তিনি একজন জাত অভিনেতা। এই ছবিতে সোহেলকেও প্রাণপণে তামিল হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে; তথাপি তিনি নিজের অভিনয় দক্ষতায় অন্য কিছু হয়ে উঠেছে। এই কাণ্ডটা ৯০-এর দশকে ঢাকার চলচ্চিত্রে প্রয়াত হুমায়ুন ফরীদি ঘটিয়েছিলেন, তথাকথিত উচ্চকিত ভিলেন, তবুও কোথায় যেন আলাদা; যৌক্তিক হোক, অযৌক্তিক হোক তা চোখ আটকে যায়।

সিয়াম আহমেদের নাটক বা বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের স্মৃতি যাদের মনে আছে, তারা নিশ্চয়ই আমার সঙ্গে একমত হবেন, তিনি একজন সুদক্ষ অভিনেতা। তাকে যা হয়ে উঠতে বলা হয়, তিনি তা হয়ে উঠতে সক্ষম। তবে সিয়াম আহমেদ বা সোহেল মণ্ডলের মতো শিল্পীদের নিয়ে আফসোস হয়, তাদের সঠিক ব্যবহারটা সম্ভবত আমরা করতে পারছি না।
সিনেমা মানেই বাণিজ্যিক তার বাণিজ্যিক সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু সিনেমা মানেই উচ্চকিত কিছু, আর জীবনঘেঁষা গভীর দর্শন বা চিন্তাপ্রসূত কাজ ‘নাটক’-এই শিশুসুলভ বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি।
একটা বিষয় লক্ষণীয়, দেশে এই সময়ে চলচ্চিত্রের একধরনের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। এই সময়ে মোটা বাজেটের হানাহানি-নৃশংসতাকে ছাপিয়ে দর্শক কম বাজেটের ‘উৎসব (২০২৫)’ বা ‘বনলতা এক্সপ্রেস (২০২৬)’-এর মতো ছবিকে বেছে নিচ্ছে। মানুষ যে ক্রমাগত নৃশংসতার মধ্যে আটকে থাকতে পারে না, এটা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। শিল্প সে যতই বাণিজ্যিক হোক না কেন, সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আমি কী নির্মাণ করছি, তার সামগ্রিক মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, এই দায়বদ্ধতা যেকোনো শিল্পের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রিন্স (২০২৬)

জানি না যে মন্তব্যটা করতে চলেছি, সেটা খুব আগাম হয়ে যাচ্ছে কি না। শাকিব খান অভিনীত প্রিন্স সিনেমাটি দেখতে গিয়ে পশ্চিমবঙ্গের অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কথা মনে পড়ছিল। টলিপাড়ার কনভেনশনাল হিরো প্রসেনজিৎ হঠাৎ করে চিরাচরিত টলি-ঘরানার উচ্চকিত ছবি বাদ দিয়ে মধ্যবিত্তের রুচির পরিমিত চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন।
ফলাফল-আজ অবধি তাকে ভারতবর্ষের নানা ঘরানার চরিত্রে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে এবং অন্তত টালিগঞ্জে এখনো তার একক আধিপত্য অক্ষুণ্ন রয়েছে। এতটা দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব হয়েছে গৎবাঁধা ছবি করা থেকে সরে আসার কারণে।
আরও পড়ুন
শাকিব খানের ক্যারিয়ারও যথেষ্ট দীর্ঘ; তিনি ঢাকার চলচ্চিত্রের অপ্রতিরোধ্য নায়ক। কিন্তু শাকিব ভক্তরা নিশ্চয়ই চাইবেন, তার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ইনিংস যেন আরও দীর্ঘ হয় এবং তিনি যেন এক নম্বর নায়কের অবস্থান ধরে রাখতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে সম্ভবত স্ট্র্যাটেজি বদলানো দরকার।
আমি হয়তো বাংলাদেশি দর্শকের এই মনস্তত্ত্ব বুঝি না, কেন শাকিব খান বা অন্য কোনো নায়কের গেটআপ, উপস্থিতি তামিল নায়কদের মতো হলেই তারা এতটা উচ্ছ্বসিত হন! শাকিবের আগে আমজনতার মহানায়ক ছিলেন প্রয়াত চিত্রনায়ক মান্না এবং তারও আগে সালমান শাহ। দুইজনের কাউকেই কখনো দক্ষিণী নায়ক বানানোর চেষ্টা করা হয়নি। ফলে তাদের কাউকেই বাংলাদেশি বাস্তবতার বাইরের মানুষ মনে হয়নি।
তবে শাকিব খান নিঃসন্দেহে নিজেকে প্রতিটা ছবিতে অত্যন্ত ক্যারিশম্যাটিকভাবে উপস্থাপন করেন এবং তাকে দেশের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের প্রধান নায়ক হিসেবে মেনে নিতে কোনো সমস্যা হয় না। পাশাপাশি একটি প্রশ্নও তৈরি হয়, এই সিনেমাগুলো কি সিনেমা, নাকি শাকিবীয় মিথ?
আবু হায়াত মাহমুদ পরিচালিত প্রিন্স চলচ্চিত্রের গল্প তৈরি হয়েছে ৯০-এর দশকের ঢাকা শহরের এক গ্যাংস্টার ইব্রাহিম (শাকিব খান)-কে ঘিরে। তার গ্যাংস্টার হয়ে ওঠা, জীবনযাপন, ক্ষমতা এবং খানিকটা প্রেম এই নিয়েই প্রিন্স। এই গ্যাংস্টার কালচার আসলেই ৯০-এর দশকের বাংলাদেশে ছিল।
তবে ছবির প্রোডাকশন ডিজাইন সেইভাবে ৯০-এর দশককে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে বলে মনে হয়নি। বিশেষত শাকিব খানের বেশভূষা এবং সেট, লাইট, কালার-অভিন্ন সময়কে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। সেই সময়ের সত্যিকারের ঢাকায় গ্যাংস্টারদের নিয়ে একটু স্টাডি করে নিলে মানুষ খাঁটি ঢাকার অ্যাকশন ছবি দেখার একটা সুযোগ পেত।
তাসনিয়া ফারিনের স্ক্রিন টাইম কম হলেও, তার চরিত্রের জন্য যতটা প্রয়োজন, তিনি ততটাই করার চেষ্টা করেছেন। কলকাতার অভিনেত্রী জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডু এমন বিশেষ কিছু করে উঠতে পারেননি, যা নিয়ে আলাদা করে পর্যালোচনা করা যায়।

আসলে এই ধরনের ছবি দেখলেই আমার মনে হয়, এটা মূলত শাকিব খানকে দক্ষিণী চলচ্চিত্রের নায়কদের মতো ক্যারিশম্যাটিকভাবে উপস্থাপন করার একটি আয়োজন। এখানে গল্প বা অভিনয় মুখ্য নয়, উপস্থিতিই মুখ্য। শাকিব খান তার উপস্থিতি নিয়ে বরাবরই সচেতন, সেখানে তিনি সফল।
ভক্তরা তার যেকোনো ধরনের উপস্থাপনা নিয়েই উচ্ছ্বসিত এবং সন্তুষ্ট। সুতরাং সিনেমা নিয়ে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের খুব বেশি জায়গা আছে বলে মনে হয় না। যেমন ধরুন, আমি হয়তো বললাম, ভিএফএক্স খুব কাঁচা অথবা গোটা কাজটাই অনেক তাড়াহুড়ো করে করা। এটা বলার জন্য কোনো সিনেমাবোদ্ধার দরকার আছে বলে মনে হয় না; যেকোনো সাধারণ দর্শকই তা বলতে পারেন।
প্রয়াত চিত্রনায়ক মান্নার একটি সাক্ষাৎকার দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম, ক্যারিয়ার যখন তুঙ্গে, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি যে ধরনের সিনেমায় অভিনয় করি, সেসব দেখলে আমার বাচ্চারা লজ্জা পায়; ওদের কাছে এসব হাস্যকর লাগে, কারণ ওরা অনেক আধুনিক জিনিস দেখে, পার্থক্য বুঝতে পারে।’
এটি মনে রাখার মতো একটা উদাহরণ, এই বক্তব্য একজন সপ্রতিভ, বুদ্ধিমান মানুষের পরিচয় বহন করে।
একটা জাতি ফিল্মমেকিং নেশন হিসেবে পরিচিতি পায় তার নিজস্বতার মাধ্যমে। অনুকরণ হয়তোবা সাময়িক সাফল্য দিতে পারে, কিন্তু তা স্থায়ী নয়। বলুন তো, বিশ বছর বাদে যখন বলা হবে, আপনার দেশের দুই দশকের কাল্ট ছবি কোনগুলো, আপনি তখন কোন ছবির নাম নেবেন?
২০০০ পরবর্তী টেলিভিশন নাটকগুলো দেখলে বোঝা যায়, আমাদের শক্তিশালী গল্প বলার নিজস্ব ধরন রয়েছে এবং সেই ধারাবাহিকতায় আমরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হচ্ছি। পৃথিবী আমাদের তথাকথিত ‘নাটক’ বলে তুচ্ছ করা কাঠামোর কাজ দিয়েই ফিল্মমেকিং নেশন হিসেবে আমাদের চিনতে শুরু করেছে, আকাশ থেকে লাফিয়ে পড়া নায়ক-নায়িকার ছবি দিয়ে নয়।
বাণিজ্যিক এবং আর্টহাউস চলচ্চিত্রের এই বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সিনেমা মানেই বাণিজ্যিক তার বাণিজ্যিক সাফল্য বা ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু সিনেমা মানেই উচ্চকিত কিছু, আর জীবনঘেঁষা গভীর দর্শন বা চিন্তাপ্রসূত কাজ ‘নাটক’-এই শিশুসুলভ বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত জরুরি।
মাসুদ হাসান উজ্জ্বল : সিনেমা নির্মাতা
