আকাশপথের অর্থনীতি আজকের বিশ্বে একটি কৌশলগত শক্তি—যেখানে একটি দেশের সংযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক অবস্থান নির্ধারণে এভিয়েশন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই খাতটি শুধু সম্ভাবনাময়ই নয়, বরং সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এটি দেশের রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে খাতটির গভীরতর বিশ্লেষণ এবং কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
সম্ভাবনার দিকটি বিবেচনা করলে দেখা যায়—বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান একটি বড় শক্তি। দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থান করায় বাংলাদেশ সহজেই একটি ট্রানজিট হাব হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে ঢাকাকেন্দ্রিক যাত্রীর চাপ থাকলেও চট্টগ্রাম, সিলেট, সৈয়দপুর ও কক্সবাজার বিমানবন্দরগুলো আঞ্চলিকভাবে উন্নত করা গেলে যাত্রী ও কার্গো উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব।
স্বাধীনতার পূর্বে চালুকৃত এবং পরবর্তী সময়ে তৈরি বেশকিছু বিমানবন্দর এখনো বন্ধ অবস্থায় আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, কুমিল্লা, ঈশ্বরদী, শমসেরনগর, বগুড়া বিমানবন্দর।
এই বিমানবন্দরগুলো বাণিজ্যিকভাবে চালু হলে দেশের জনগণ উপকৃত হবে, বিমানবন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। সর্বোপরি বিমানবন্দরভিত্তিক অর্থনীতি সচল হবে, যা একটি দেশের সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে। সাথে দেশের আকাশ পথ আরও বেশি সুদৃঢ় হবে।
বিশেষ করে কার্গো খাতে রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্ববাজারে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে, যেখানে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এয়ার কার্গোর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। যদি আধুনিক কার্গো টার্মিনাল, কোল্ড-চেইন সুবিধা এবং দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা চালু করা যায়, তবে শুধু পোশাক নয়—কৃষিপণ্য, ওষুধ, ফ্রোজেন ফুডসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানিতে নতুন দিগন্ত খুলে যাবে। এতে সরাসরি রাজস্ব বাড়বে, পাশাপাশি কর্মসংস্থানও বৃদ্ধি পাবে।
পর্যটন খাতের সঙ্গে এভিয়েশনের সম্পর্কও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কক্সবাজার, সুন্দরবন বা পার্বত্য অঞ্চল আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে যদি সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, সহজ ভিসা প্রক্রিয়া এবং উন্নত বিমানবন্দর সুবিধা নিশ্চিত করা যায়। প্রতিটি আন্তর্জাতিক পর্যটক শুধু বিমান ভাড়া নয়, হোটেল, স্থানীয় পরিবহন, খাদ্য ও অন্যান্য খাতে ব্যয় করে—যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে বহুগুণ প্রভাব ফেলে।
এই সম্ভাবনার বিপরীতে বেশকিছু কাঠামোগত সংকট রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো জেট ফুয়েলের উচ্চমূল্য, যা আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশে অনেক বেশি। ফলে এয়ারলাইন্সগুলোর পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায় এবং তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে। এছাড়া বিমানবন্দরের চার্জ, নেভিগেশন ফি এবং অন্যান্য ট্যাক্সও তুলনামূলক বেশি, যা টিকিটের মূল্য বাড়িয়ে দেয় এবং যাত্রীদের বিদেশি এয়ারলাইন্সের দিকে ঠেলে দেয়।
অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা একটি বড় সমস্যা। যদিও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, কিন্তু অবকাঠামোগত দুর্বল দিক হচ্ছে আকর্ষণীয় টার্মিনাল ব্যবহারের জন্য রয়েছে একটি মাত্র ইন্ডিপেন্ডেন্ট রানওয়ে। যা দিয়ে কোনোভাবেই এয়ারলাইন্স ও যাত্রী চাহিদার পূর্ণতা ঘটাতে পারবে না।
এখনো কার্গো হ্যান্ডলিং, গ্রাউন্ড সার্ভিস এবং যাত্রীসেবায় আন্তর্জাতিক মানের ঘাটতি রয়েছে। অনেক সময় দীর্ঘ সময় ধরে পণ্য আটকে থাকা বা যাত্রীদের ভোগান্তি—এসবই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে।
দক্ষ জনবল সংকট এবং প্রশিক্ষণের অভাব এই খাতকে পিছিয়ে দিচ্ছে। আধুনিক এভিয়েশন খাতে প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে প্রশিক্ষিত পাইলট, ইঞ্জিনিয়ার, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার এবং গ্রাউন্ড স্টাফ অপরিহার্য। কিন্তু দেশীয় প্রশিক্ষণ অবকাঠামো এখনো সেই মানে পৌঁছায়নি, ফলে অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশ নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে।
নীতিগত অসামঞ্জস্য এবং দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। নতুন এয়ারলাইন্স চালু করা, রুট অনুমোদন বা আন্তর্জাতিক চুক্তি—এসব ক্ষেত্রে জটিলতা থাকায় সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এই প্রেক্ষাপটে সমাধানের পথ খুঁজতে হলে কিছু বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিতে হবে।
জেট ফুয়েলের মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে এবং কর কাঠামো পুনর্বিবেচনা করতে হবে। এতে এয়ারলাইন্সগুলোর খরচ কমবে এবং তারা প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া দিতে পারবে। যাত্রীরা উপকৃত হবে।
বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন ও বেসরকারি অংশীদারিত্ব বাড়ানো যেতে পারে। উন্নত প্রযুক্তি, অটোমেশন এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যাত্রী ও কার্গো সেবার মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
একটি শক্তিশালী এভিয়েশন মানবসম্পদ উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের ট্রেনিং ইন্সটিটিউট, সিমুলেটর সুবিধা এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করা জরুরি।
রুট বৈচিত্র্য আনতে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে জাতীয় ও বেসরকারি বিমানসংস্থাগুলো উৎসাহিত করতে হবে। কোড-শেয়ারিং, অ্যালায়েন্স এবং নতুন গন্তব্য চালুর মাধ্যমে যাত্রী সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব।
এভিয়েশন খাতকে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পর্যটন, রপ্তানি, লজিস্টিকস এবং ডিজিটাল বাণিজ্যের সঙ্গে সমন্বয় ঘটিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম তৈরি করতে পারলে এর বহুমাত্রিক সুফল পাওয়া যাবে।
সব বিবেচনায় বলা যায়, বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সম্ভাবনা যেমন বিশাল, তেমনি চ্যালেঞ্জও কম নয়। কিন্তু সঠিক নীতি, দক্ষ নেতৃত্ব এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই খাত দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। রাজস্ব বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈশ্বিক সংযোগ—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে আকাশপথের অর্থনীতি, যদি আমরা এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।
মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট
