অত্যন্ত দুঃখজনক একটি সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এবং প্রচারিত হচ্ছে; বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। জানা গেছে, ম্যালেরিয়ার পাশাপাশি তার আরও কিছু শারীরিক জটিলতাও ছিল।
আমাদের গবেষণায় বা সার্ভিলেন্সে ঢাকায় ম্যালেরিয়ার বাহক অ্যানোফিলিস মশা (Anopheles mosquito)-এর উপস্থিতি পাওয়া গেলেও এখানে ম্যালেরিয়া পরজীবীর সক্রিয় সংক্রমণের প্রমাণ খুব সীমিত। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে তিনি কোথায় এবং কীভাবে এই সংক্রমণের শিকার হলেন?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী আনুমানিক ২৮ কোটি ২০ লাখ ম্যালেরিয়া আক্রান্তের ঘটনা এবং ৬ লাখ ১০ হাজার মৃত্যুর হিসাব পাওয়া গেছে। এটি ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ৯০ লাখ (৩ শতাংশ) বেশি সংক্রমণ এবং ১২ হাজার বেশি মৃত্যুর নির্দেশ করে।
যেসব মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, তাদের বেশিরভাগই আফ্রিকা ও এশিয়ার দরিদ্র দেশগুলোর শিশু ও গর্ভবতী নারী। বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় এটি এখনো একটি মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। এই অবস্থায় সরকারের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মৃত্যু আমাদের চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে তোলে ।
ম্যালেরিয়ার ইতিহাস মানবসভ্যতার ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে জড়িত। বিজ্ঞানীরা ৩০ মিলিয়ন বছর পুরোনো মশার ফসিলে ম্যালেরিয়া পরজীবীর অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছেন। প্রাচীন মিশরের মমি পরীক্ষায় (খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ অব্দ) ম্যালেরিয়া পরজীবীর ডিএনএ শনাক্ত হয়েছে। গ্রিক চিকিৎসক হিপোক্রেটিস প্রথম ম্যালেরিয়ার লক্ষণ বর্ণনা করেন। মধ্যযুগ থেকে ঔপনিবেশিক যুগ পর্যন্ত ম্যালেরিয়া বিশ্ব ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে ভূমিকা রেখেছে।
রোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে শুরু করে ইউরোপীয় উপনিবেশগুলোয় ম্যালেরিয়ার ভয়াবহ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ১৮৮০ সালে চার্লস ল্যাভেরান প্লাজমোডিয়াম পরজীবী শনাক্ত করেন এবং ১৮৯৭ সালে রোনাল্ড রস প্রমাণ করেন অ্যানোফিলিস মশা ম্যালেরিয়া ছড়ায়। বিংশ শতাব্দীতে ক্লোরোকুইন ও ডিডিটির আবিষ্কার ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে বিপ্লব ঘটালেও একবিংশ শতাব্দীতেও এটি একটি বড় হুমকি হিসেবে রয়ে গেছে। এই দীর্ঘ ইতিহাস প্রমাণ করে যে ম্যালেরিয়া মোকাবিলায় আমাদের প্রচেষ্টা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের ইতিহাসে উত্থান-পতনের একটি দীর্ঘ অধ্যায় রয়েছে। পাকিস্তান আমলে ডিডিটির ব্যবহারে সাফল্য আসলেও স্বাধীনতা পরবর্তীকালে এর নিষিদ্ধকরণ ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়। ১৯৯০ সালে সরকার ম্যালেরিয়াকে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সমস্যা ঘোষণা করার পর থেকে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে। ২০০৮ সালে ৮৪,৬৯০ জন আক্রান্তের মধ্যে ১৫৪ জন মৃত্যুর ঘটনা থেকে ২০২৪ সালে এসে আক্রান্তের সংখ্যা ১৩,০৯৯ জনে এবং মৃত্যুর সংখ্যা মাত্র ৬ জনে নেমে আসে।
২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমলেও মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের। এই অভূতপূর্ব সাফল্যের পেছনে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত প্রচেষ্টা। বিনামূল্যে লং লাস্টিং ইনসেক্টিসাইড নেট বিতরণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণের জন্য মাইক্রোস্কোপি ও র্যাপিড ডায়াগনস্টিক টেস্ট (RDT), আর্টেমিসিনিন-ভিত্তিক থেরাপি (ACT) এবং কমিউনিটি ভিত্তিক স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ এই সাফল্যের মূল স্তম্ভ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন (IRES) দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মশার ঘনত্ব, প্রজাতিগত বৈচিত্র্য এবং রোগবাহিতা নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করে আসছে। এই ধারাবাহিক গবেষণার অংশ হিসেবে কয়েক বছরে আমাদের গবেষক দল ঢাকায় ম্যালেরিয়ার বাহক অ্যানোফিলিস মশার উপস্থিতি শনাক্ত করেছে। মাঠ পর্যায়ের জরিপে ঢাকায় অন্তত ছয়টি প্রজাতির অ্যানোফিলিস মশা বিভিন্ন সময়ে সংগ্রহ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে কয়েকটি প্রজাতি ম্যালেরিয়া সংক্রমণের জন্য পরিচিত বাহক হিসেবে বিবেচিত।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঢাকায় এখন পর্যন্ত ম্যালেরিয়া পরজীবীর স্থানীয় সংক্রমণের কোনো সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ, অ্যানোফিলিস মশার উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও শহরটিতে স্থানীয়ভাবে ম্যালেরিয়া সংক্রমণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন তথ্য এখনও নিশ্চিত নয়।
বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শহরাঞ্চলেও ‘আরবান ম্যালেরিয়া’ দেখা যায়, যা জনসংখ্যার ঘনত্ব, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং মানুষের চলাচলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশের প্রায় ১৩টি জেলায় ম্যালেরিয়া এন্ডেমিক হিসেবে বিদ্যমান থাকায় একটি বাস্তব ঝুঁকি তৈরি হয়। যদি এসব অঞ্চল থেকে কোনো ব্যক্তি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত অবস্থায় ঢাকায় আসেন এবং তার রক্তে পরজীবী উপস্থিত থাকে, তাহলে স্থানীয়ভাবে থাকা অ্যানোফিলিস মশার মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।
অর্থাৎ, ঢাকায় বর্তমানে স্থানীয় সংক্রমণের প্রমাণ না থাকলেও ‘ইমপোর্টেড’ সংক্রমণ থেকে ভবিষ্যতে ‘লোকাল ট্রান্সমিশন’ হওয়ার সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় ঢাকায় ম্যালেরিয়ার ঝুঁকি কতটা, তা নিরূপণের জন্য আরও গভীর ও পদ্ধতিগত গবেষণা অপরিহার্য। বিশেষ করে অ্যানোফিলিস প্রজাতিগুলোর রোগ ছড়ানোর সক্ষমতা বা ভেক্টরিয়াল ক্যাপাসিটি, মশার দেহে সংক্রমণযোগ্য পরজীবীর উপস্থিতি (স্পোরোজোয়াইট রেট) এবং পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে সুস্পষ্ট তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য ছাড়া ঝুঁকি মূল্যায়ন বা কার্যকর প্রতিরোধ পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
সার্বিকভাবে বলা যায়, যেকোনো সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতির মূল ভিত্তি হলো গবেষণালব্ধ তথ্য ও প্রমাণ। তাই ঢাকায় ম্যালেরিয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে এখনই সমন্বিত ও প্রমাণভিত্তিক গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ঝুঁকি তৈরি হলে তা দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও কক্সবাজার জেলার দুর্গম অঞ্চলগুলোয় ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ম্যালেরিয়ার প্রবেশ একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন ও তাপমাত্রার পরিবর্তন মশার প্রজনন বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজাতির আবির্ভাব ঘটাচ্ছে, যা ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণকে আরও জটিল করে তুলছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ওষুধ প্রতিরোধী ম্যালেরিয়ার উপস্থিতি, বিশেষ করে প্লাজমোডিয়াম ফ্যালসিপেরামের কিছু স্ট্রেনে। এছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে সচেতনতার অভাব ম্যালেরিয়া নির্মূলে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আমাদের আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
২০৩০ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়া নির্মূলের জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশকে এখনই কিছু কৌশলগত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রথমত, মশা নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি। জেনেটিক্যালি মডিফাইড মশা এবং বায়ো-লার্ভিসাইড প্রয়োগের মাধ্যমে মশার প্রজনন স্থলগুলো ধ্বংস করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত RTS,S/AS01 ম্যালেরিয়া ভ্যাকসিন দ্রুততম সময়ে চালু করতে হবে, বিশেষ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর শিশুদের জন্য।
তৃতীয়ত, ওষুধ প্রতিরোধী ম্যালেরিয়া নিয়ে ব্যাপক গবেষণা পরিচালনা এবং নতুন কার্যকর ওষুধ আবিষ্কারের প্রচেষ্টা জোরদার করতে হবে।
চতুর্থত, স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে স্বাস্থ্য শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে, বিশেষ করে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে।
পঞ্চমত, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি করে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
সর্বোপরি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব জোরদার করে একটি সমন্বিত ও টেকসই কৌশল প্রণয়ন করতে হবে। এইসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে আমাদের সসবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
ম্যালেরিয়া একটি প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য রোগ। বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসিত হয়েছে। সরকার, গবেষক, স্বাস্থ্যকর্মী, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি ম্যালেরিয়ামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার : কীটতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
