বিজ্ঞাপন

আয়নায় অচেনা মানুষ

আয়নায় অচেনা মানুষ

আজকাল আয়নার সামনে দাঁড়িয়েও আমার সঙ্গে আমার আর দেখা হয় না। পারদে প্রতিফলন, প্রতিসরণের নিয়মে আটকা পড়ে যাওয়া এই ‘আমি’ অস্তিত্বধারী মানুষটির মনে হয়, অন্য কেউ একজন তার জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে।

আমি তাকে নিয়মিত দেখছি ঠিকই, কিন্তু চিনতে ব্যর্থ হচ্ছি। আমার দখল নেওয়া সেই অন্য মানুষটা আমার দিকে প্রতিদিনের কিছুটা সময় তাকিয়ে থাকে প্রতিক্রিয়াহীন ভাবে। তার চোখ, তার মুখ অথবা চিবুক আমার মতোই; কিন্তু সে আমি নই!

মাঝে মাঝে মনে হয়,আয়নায় যাকে দেখছি তার দাঁত-নখ কি বড় হয়ে প্রকট ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে? আবার কখনো মনে হয়, তার ঠোঁটের কোণে মাঝে মাঝে ভীষণ নিষ্ঠুর আর নিরাসক্ত যে হাসির রেখা দেখতে পাচ্ছি যা আমার হাসি নয়।

কী এক অদ্ভুত অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের দোলাচল! পাঠকের মনে হতেই পারে, এই কয়েকটি লাইন কোনো অদ্ভুতুড়ে গল্পের অথবা লেখার মুখবন্ধ অথবা সূচনা। হয়তো এখানেও অভিনীত হচ্ছে ড. জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইডের সেই বিখ্যাত ও ভয়ানক গল্প। অথবা গল্প নয়; নিজের চিন্তাসূত্রের এক ধরনের সম্প্রসারণ।

এই একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের গল্পগুলো এভাবে নিঃশব্দে পাল্টে যাচ্ছে? তারা কি নিজেরাই নিজেদের এরকম চিনতে ব্যর্থ হচ্ছেন কখনো, অথবা ব্যক্তির ভেতর থেকে বদলে যাচ্ছে তার নিজস্ব পরিচয়?

পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকেই একটা শিশুর ভেতরে পালাবদল ঘটতে থাকে। তার শারীরিক অবস্থা থেকে মানসিক অবস্থায় পরিবর্তন ঘটে একটু একটু করে। এই পরিবর্তন স্বাভাবিক। অভিযোজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সদ্যজাত প্রাণটি বিকশিত হয়। তার মধ্যে নানা পরিবর্তন ঘটে; তার শারীরিক, মানসিক পর্বের পালাবদল ঘটতে থাকে।

শিশুর মনোজগৎ তৈরি হতে শুরু করে তার ঘর থেকে, পরিবার থেকে। সে তার পারিপার্শ্বিক থেকে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি এবং আচরণ শেখে। তার পরিবার, সমাজ তাকে একটু একটু করে চিনিয়ে দেয় চারপাশের অদ্ভুত সঞ্চরণশীল ও পরিবর্তনশীল পৃথিবীকে। তার বয়স বাড়ে, মনের মধ্যে বাড়ে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা।

এই পরিবর্তন বা পাল্টে যাওয়া শব্দটির অর্থ আমার কাছে এখন এক ঘোলাটে অবস্থা। মানুষের মনোজগতে পরিবর্তনের একটি ধারাবাহিকতা আছে। ওই যে শিশুটির জন্মের কথা বলছিলাম, বয়সের নানা ধাপ অতিক্রম করে সে পরিবর্তিত হয়ে যায়। এ যেন এক অচেনা সিঁড়ি। কিন্তু বেঁচে থাকার প্রয়োজনে সিঁড়ির ধাপগুলো তাকে টপকাতেই হবে।

প্রতিটি ধাপে তাকে মুখোমুখি হতে হয় নতুন অভিজ্ঞতার। আর সেই অভিজ্ঞতাই তাকে বদলে দেয়। আমাদের জীবনচক্রে এগুলো চিরচেনা প্রক্রিয়া। কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দীর বয়ে চলা সময়ের অস্থির জঙ্গলে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমাদের রূপান্তরের পেছনে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কাজ করে।

এই রাজনীতির অর্থ রাজপথে শ্লোগান, মিছিল নয়। এই রাজনীতি মাঠে-ঘাটে বয়ে যাওয়া ঝোড়ো ভাষণ নয়; না-পাওয়ার ক্রোধ থেকে উৎপন্ন কোনো ভীষণ অগ্নিকাণ্ড নয়। এই রাজনীতি আসলে ড. জেকিল অ্যান্ড মি. হাইডের গল্পে সেই হাইডের মতো গভীর অন্তরাল থেকে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে; বদলে দিচ্ছে অন্তরমহল।

মি. হাইড জুয়েল আইচের মতো জাদুকর নয়। সে মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজার দৃষ্টিকে বোকা বানিয়ে টুপির ভেতর থেকে একটানে পায়রা বের করে আকাশে উড়িয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে না। কিন্তু সে মানুষের মনোজগতকে একটু একটু করে সন্দেহ, বাতিকগ্রস্ততা আর অস্থিরতার সংস্কৃতির অতলে ডুবিয়ে দিতে পারে; যেখানে তলিয়ে গিয়ে একজন মানুষ কিংবা অনেক মানুষের কাছে নিজেকেই অচেনা ঠেকছে।

রাজনৈতিক সংস্কৃতি ব্যক্তি মানুষকে কি আমূল পাল্টে দিতে পারে? এই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে উত্তরে বলা যায়, পারে। নিজের আপন দর্পণের সামনে দাঁড়িয়ে এই পরিবর্তনের ভয়ংকর রূপ সম্পর্কে অনুধাবন করা যায়। মানুষ নিজেই নিজের কাছে আগন্তুক হয়ে উঠেছে। এই ভয়ের অনুভূতি একবিংশ শতাব্দীতে হয়তো আমাদের অন্বিষ্ট।

ঘটনাটি একদিনে ঘটে যায়নি। পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা খেলোয়াড়রা মানুষের মধ্যে জন্ম দিয়েছে ড. জেকিল অ্যান্ড মি. হাইডের মধ্যেকার অন্ধকারাচ্ছন্ন এক খেলার। সত্তরের দশকে ইরা লেভিনের লেখা সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার ‘বয়েজ ফ্রম ব্রাজিল’ আমাদের এই খেলার প্রেক্ষাপটকে আমাদের সামনে আবারও ফিরিয়ে নিয়ে আসে।

এই কাহিনির মূল বিষয় ছিল হিটলারের অনুরূপ তৈরি করা নিয়ে। হিটলারের ৯৪টি অনুরূপ তৈরি করে পৃথিবীতে চতুর্থ রাইখ সৃষ্টি করার গল্প বলেছেন ঔপন্যাসিক। কিন্তু এই সময়ের ভিতরে বেঁচে থেকে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির জাদুস্পর্শে আমরা কি নিজেদের ভেতরেই এক স্বৈরাচারী উত্থানকে দেখতে পাচ্ছি না?

আমাদের মানসিক জগতের বিকাশ পূর্ব থেকে স্থির করা অথবা সমাজের প্রচলিত কিছু নির্দিষ্ট রীতির ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠে। পারিবারিক অথবা সামাজিকভাবে এই রীতিগুলো গড়ে উঠেছে দীর্ঘ সময় ধরে। কিন্তু এই রীতি ভেঙে পড়ছে আর্থ-রাজনৈতিক এবং সামাজিক নতুন বন্দোবস্তের প্রবল তোড়ের মুখে পড়ে।

যে রীতি বা ধারার ভেতর দিয়ে একজন মানুষের চরিত্র গড়ে উঠেছে, মনোজগৎ নির্মিত হয়েছে সেই মানুষটিকেই এখন হঠাৎ করেই দেখতে পাই দলবদ্ধ সহিংস কার্যকলাপ অথবা মব অনুষ্ঠিত করতে। তাকেই দেখতে পাই, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে পিষ্ট করতে উদ্যত হচ্ছে ভিন্নমতকে। আমাদের নিজের অজান্তেই মনের মধ্যে চলেফিরে বেড়াচ্ছে মাথায় স্বৈরতন্ত্রের শিরস্ত্রাণ চাপান হিটলারের প্রতিরূপ; বিশ্বায়নের রাজনীতি যার সৃষ্টিকর্তা।

বিগত শতকের শেষ ভাগে পৃথিবীর রাজনৈতিক ভূগোলে গুরুতর পরিবর্তন ঘটে গেছে। রাজনৈতিক প্রভাবকে পেছনে হটিয়ে দিয়ে জায়গা দখল করেছে খোলা বাজার অর্থনীতি। অর্থনৈতিক প্রাধান্য অর্জনের এই যুদ্ধে ভোগবাদী এক নতুন পৃথিবীর জন্ম হয়েছে। সে পৃথিবী ব্যক্তি মানুষের মনোজগতেরও দখল নিয়েছে।

শিক্ষা, সংস্কৃতি আর নীতিবোধের স্থান দখল করেছে অপরিসীম লোভ। গভীর ভাবে মানুষের মননে কেটে বসে গেছে নতুন ধরনের এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। রাজনীতিকে লাভের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়ে সে হারিয়ে ফেলেছে নিজস্ব পরিচয়। ফলে ফ্রান্‌ৎস কাফকার লেখা কয়েকটি লাইন এখন প্রশ্ন হওয়ার সুযোগ তৈরি করছে একবিংশ শতাব্দীতে মানসিক সংকটের মুখোমুখি হওয়া মানুষের মনে। কী লিখেছিলেন কাফকা?

‘জীবন আসলে মুখোশে ঢাকা এক উৎসব। সেখানে নিজের আসল চেহারা সমেত উপস্থিত হয়ে আমি নিজেই আমার আত্মার সমুখে লজ্জায় সংকুচিত হয়ে গেছি’।

বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে বসে কী মারাত্মক এক অনুভূতির কথা এই বরেণ্য সাহিত্যিক লিখেছিলেন, এখন ভাবতে নিজস্ব ভাবনার জগত লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় বিস্ময়ে! তীক্ষ্ণ দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন সাহিত্যিক ছিলেন ফ্রান্‌ৎস কাফকা। মানুষ এবং সমাজের বিকাশের ভেতরে গভীর সংকটের আসন্ন সূত্রপাতকে তিনি অনেককাল আগেই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

মি. হাইডদের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে মানুষ, এই সত্যকে দেখতে পাওয়ার শক্তি অনেক সাহিত্যিকেরই ছিল না। মানুষ কি তাহলে এখন ক্রমাগত অন্যের সঙ্গে, নিজের সঙ্গে অভিনয় করে চলেছে? তার শিক্ষা, সংস্কৃতির চর্চা, তার সামাজিক চেতনার স্রোত এতদিন ইঁদুরে খাওয়া ঝুরঝুরে মাটির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে? এরকম অসংখ্য প্রশ্ন ভেসে বেড়ায় মনের মধ্যে। কিন্তু তার উত্তর খুঁজে পাওয়া দুরূহ।

আয়নার সামনে তাই আজকে নিজের প্রতিকৃতিই পাল্টে যাচ্ছে। নিজের পরিচয়, অস্তিত্ব সন্দেহের নিক্তিতে চড়ে অসহায়ের মতো তাকিয়ে দেখছে নিজেকেই; চিনতে পারছে না। ‘কে আমি?’ এবং ‘আমি কী চাই?’ এই দুটি প্রশ্নের সামনে মানুষ এখন অসহায় হয়েই থাকবে বলে মনে হয়। কারণ তার কাছে দুটো উত্তরই অজানা।

তার দ্বিখণ্ডিত সত্তা ড. জেকিল আর মি. হাইডের ভূমিকায় অভিনয় করে চলেছে। এই অভিনয়ের ইতিহাস হুট করে লেখা হয়নি। কিন্তু উপলব্ধিটা সাম্প্রতিক হয়তো। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্ধ স্রোত তাই হয়তো মধ্যপ্রাচ্যে বৃষ্টির মতো বোমা উগড়ে দিচ্ছে পরাশক্তির যুদ্ধ বিমানের গর্ভ থেকে।

ইউক্রেনে যুদ্ধের মাঠে শিকারিরা চালাচ্ছে হত্যাকাণ্ড। আফ্রিকায় গৃহযুদ্ধের আগুন পোড়াচ্ছে অন্যদের। পর্দার পেছন থেকে এক অদ্ভুত নকশা তছনছ করে দিচ্ছে মানুষ নামক প্রাণীর প্রচলিত সব শিক্ষাকে। এ এক ছায়াচ্ছন্ন সময়, এ এক অস্থির সময়; যখন আয়নায় নিজেকেই নিজের কাছে অপরিচিত বলে মনে হয়। সবকিছু ভেঙে পড়তে থাকে আমাদের স্বৈরাচারী মনোবৃত্তির দানবীয় লেজের ঝাপটায়। 

ইরাজ আহমেদ : কবি

বিজ্ঞাপন