বিজ্ঞাপন

যুদ্ধ-সংঘাত ও জলবায়ু সংকট, শান্তি ফিরবে কীভাবে

যুদ্ধ-সংঘাত ও জলবায়ু সংকট, শান্তি ফিরবে কীভাবে

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, যেখানে অনিশ্চয়তা, প্রতিযোগিতা ও বহুমাত্রিক সংকট একে অপরকে জটিল করে তুলেছে। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যে উদারপন্থী আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে।

আদর্শবাদ অনেকটা ফিকে হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে বাস্তববাদ আবারও রাষ্ট্রের আচরণ ব্যাখ্যার প্রধান কাঠামো হিসেবে ফিরে এসেছে। দেশ, অঞ্চল ও বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে প্রাণী হত্যার মতো জঘন্যতম কাজ করে চলছে।

বর্তমান বাস্তবতায় রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, ইরানের ওপর আক্রমণ কিংবা আফ্রিকার গৃহযুদ্ধগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, নৈতিকতা নয় বরং কৌশলগত স্বার্থই প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ক্রমশ ‘শক্তির রাজনীতি’-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।

ইমানুয়েল ক্যান্টের Perpetual Peace বা উড্রো উইলসনের আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাজার থেকে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।

১৬৪৮ সালের ওয়েস্টফালিয়া চুক্তির মধ্যে দিয়ে যে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয় তা আজ ‘Responsibility to Protect (R2P)’ বা মানবিক হস্তক্ষেপের কথা বলে দুর্বল করে ফেলা হয়েছে। বড় ও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো বাণিজ্যের কথা বলে অনেক দেশের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করছে, যেখানে নিয়ম বা আইনের কোনো স্থান নেই।

বিশ্বব্যবস্থায় কর্তৃত্ব দাবি শাসনের বিস্তার হয়েছে। বহু দেশে নির্বাচন থাকলেও তা প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক নয়, বরং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করে এবং তাদের পছন্দমত শাসক ক্ষমতায় বসায়। এতে পরাজিত হয় জনগণ, আর বিঘ্নিত হয় দেশের স্বার্থ ও উন্নয়ন।

বর্তমান বাস্তবতায় রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, ইরানের ওপর আক্রমণ কিংবা আফ্রিকার গৃহযুদ্ধগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, নৈতিকতা নয় বরং কৌশলগত স্বার্থই প্রাধান্য পাচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং বিরোধী মতের দমন, এই তিনের সমন্বয়ে একটি হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা গণতন্ত্রের বাহ্যিক রূপ ধরে রেখে ভেতরে কর্তৃত্ববাদকে শক্তিশালী করছে।

নিওরিয়ালিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নির্ভর করে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর ইচ্ছার ওপর। বর্তমান সময়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো অকার্যকর। শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, বাণী প্রদান করা ছাড়া এ সংস্থাগুলো কিছু করছে না। একইভাবে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অফ কর্মাস-এর মতো প্রতিষ্ঠানও রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। ফলে বহুপাক্ষিকতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

হেজেমোনিক স্ট্যাবিলিটি থিওরি অনুযায়ী একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র বৈশ্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নীতিতে এক ধরনের দ্বৈততা লক্ষ্য করা যায়। জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন থেকে সরে আসা, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অফ কর্মাসকে চ্যালেঞ্জ করা, কিংবা বাণিজ্যযুদ্ধ, এসব পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিযোগিতাকে উসকে দেয়। একইসঙ্গে চীনের উত্থান নতুন এক ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সূচনা করেছে, যা বিশ্বকে নতুন ধরনের ঠান্ডা যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

বিশ্ব এক নতুন সংকটে পতিত তা হলো জলবায়ু পরিবর্তন ও বাস্তুহীন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি। যুদ্ধ, সহিংসতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কোটি কোটি মানুষ স্থানচ্যুত হচ্ছে। এই বাস্তুচ্যুতি শুধু মানবিক সংকট নয়; এটি নতুন সংঘাতেরও জন্ম দেয়।

সীমিত সম্পদের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়, যা স্থানীয় জনগণ ও উদ্বাস্তুর মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে। এসব কারণে বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা, বৈষম্য ও অস্থিরতা দিনে দিনে বাড়ছে। 

বিশ্বে অর্থনৈতিক অসমতা রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে। বিশ্বে একদিকে সম্পদের কেন্দ্রীকরণ, অন্যদিকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের বিস্তার, এই বৈপরীত্য সামাজিক অস্থিরতা ও সহিংসতার ভিত্তি তৈরি করে। এটি সরাসরি নিরাপত্তা ও শান্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই প্রেক্ষাপটে, শান্তির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা বোঝার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিশেষভাবে বিবেচ্য। যেমন কার্যকর বহুপাক্ষিকতা পুনর্গঠন অপরিহার্য। জাতিসংঘসহ বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও গণতান্ত্রিক, প্রতিনিধিত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে।

নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ব্যবস্থা সংস্কার, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অধিক অংশগ্রহণ এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠকে শক্তিশালী করা ছাড়া আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থা বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরে পাবে না। একই সঙ্গে নতুন ধরনের সহযোগিতামূলক প্ল্যাটফর্ম, বিশেষ করে জলবায়ু, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি খাতে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্বিন্যাস জরুরি। পরমাণু অস্ত্রের বিস্তার, সাইবার যুদ্ধ, ড্রোন প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিকীকরণ বিশ্বকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংলাপ, আস্থা-বর্ধক ব্যবস্থা এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির পুনরুজ্জীবন ছাড়া সংঘাতের ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়; এটি একটি নিরাপত্তা ইস্যু। জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে উন্নয়নশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা নতুন ধরনের অভিবাসন, সম্পদসংকট ও সংঘাতের জন্ম দেবে। তাই কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, ক্ষতিপূরণ তহবিল কার্যকর করা এবং টেকসই উন্নয়নকে বাস্তবায়ন করা শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।

অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। যে রাষ্ট্রগুলোয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত, বিরোধী মত দমিত এবং আইনের শাসন দুর্বল, সেখানে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদে সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা এবং স্বচ্ছ নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা শান্তির ভিত্তিকে মজবুত করে।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কেবল পরিবেশগত ইস্যু নয়; এটি একটি নিরাপত্তা ইস্যু। জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে উন্নয়নশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যা নতুন ধরনের অভিবাসন, সম্পদসংকট ও সংঘাতের জন্ম দেবে।

অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক বঞ্চনা হ্রাস করাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। চরম বৈষম্য কেবল নৈতিক সমস্যা নয়; এটি রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা ও চরমপন্থার উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করে। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ন্যায্যতা নিশ্চিত করা শান্তি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

সবশেষে, শান্তিকে একটি স্থির অবস্থা হিসেবে নয়, বরং একটি গতিশীল ও ক্রমবিবর্তিত প্রক্রিয়া হিসেবে বুঝতে হবে। এটি কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; বরং ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, সমতা এবং সহযোগিতার উপস্থিতি। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ এবং ব্যক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

অতএব, বিশ্বশান্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নের ওপর, আমরা কি কেবল শক্তির রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকব, নাকি ন্যায়বিচার ও সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি নতুন বৈশ্বিক চুক্তি গড়ে তুলতে পারব? এই দ্বিধার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের শান্তি ও অশান্তির দিকনির্দেশ।

ড. মো. রফিকুল ইসলাম : অধ্যাপক, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়