কোনো নাগরিক হুমকি, দুর্ঘটনা, হামলা কিংবা মালামাল হারানোর মতো পরিস্থিতির সম্মুখীন হলে আইনি সুরক্ষার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এটি একটি প্রাথমিক আইনগত নথি, যার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয় এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের ভিত্তি তৈরি হয়।
জিডির উদ্দেশ্য হলো সম্ভাব্য অপরাধ প্রতিরোধ, ঘটনার তদন্ত এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা। কিন্তু বাস্তবতা উদ্বেগজনক।
অভিযোগ রয়েছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে জিডি দায়েরের পর তা যথাযথ গুরুত্ব পায় না। অনেক তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি অবহেলা করেন, যার ফলে ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এতে করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়।
১৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রথম আলো-এ প্রকাশিত একটি মর্মান্তিক ঘটনার উল্লেখ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। সংবাদ অনুযায়ী, সিলেট-এর জালালাবাদ থানায় বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার একটি সাধারণ ডায়েরি করেন, যেখানে তিনি পরিবারের ওপর আসন্ন হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করেন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে রাজশাহী-তে বিচারকের বাসায় ঢুকে তার ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং তার স্ত্রী গুরুতর আহত হন। এ ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, একটি জিডি অবহেলা কত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
এ ধরনের অবহেলার আরও উদাহরণ সমাজে বিদ্যমান। একটি সূত্রে জানা যায়, ২৬ অক্টোবর এক ব্যক্তির বাসায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র হামলা চালায়। নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তিনি ৩ নভেম্বর সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। কিন্তু তিনদিন অতিবাহিত হলেও পুলিশ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি বা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেনি।
পরবর্তীতে ভুক্তভোগী আদালতের শরণাপন্ন হলে আদালত ১ জানুয়ারি তদন্ত করে ২৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। কিন্তু এপ্রিল মাস পর্যন্তও সেই প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয়নি। এ সময়ে ভুক্তভোগীকে বারবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দ্বারস্থ হতে হয়েছে, যা বিচারপ্রার্থীর জন্য চরম ভোগান্তির নামান্তর।
এই চিত্র কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন। যখন সাধারণ মানুষ আইনি সহায়তার আশায় থানায় যান, তখন তাদের অভিযোগের যথাযথ তদন্ত না হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে অপরাধীরা উৎসাহিত হয় এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায়।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।
প্রথমত, জিডি দায়েরের পর নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত শুরু এবং অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যাতে ভুক্তভোগী সহজেই তার অভিযোগের অগ্রগতি জানতে পারেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো, প্রতিটি থানায় ২ থেকে ৩ জন পুলিশ সদস্যকে জিডি সংক্রান্ত তদন্ত ও তদারকির জন্য বিশেষভাবে দায়িত্ব প্রদান করা। এ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জিডি গ্রহণের পরপরই ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করবেন। এর মাধ্যমে একটি কার্যকর জবাবদিহিতা কাঠামো তৈরি হবে এবং দায়িত্বে অবহেলার প্রবণতা কমে আসবে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাধারণ ডায়েরি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এই ব্যবস্থাকে অবহেলার বাইরে এনে আধুনিক, কার্যকর এবং জবাবদিহিমূলক করা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ন্যায়বিচার যেমন অধরাই থেকে যাবে, তেমনি সমাজে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা ক্রমেই বৃদ্ধি পাবে।
শহিদুল ইসলাম কবির : সভাপতি, মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিল
