বুদ্ধ পূর্ণিমা বৌদ্ধদের একটি পুণ্যময় তিথি; তাৎপর্যমণ্ডিত দিন। এই দিনে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব গৌতম বুদ্ধ বিশাখা নক্ষত্রে বৈশাখের পুণ্যলোক জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সিদ্ধার্থ গৌতমের পিতা ছিলেন শাক্যবংশের রাজা শুদ্ধোধন। মাতা ছিলেন রাণী মহামায়া। হিমালয়ের পাদদেশে নেপালের শাক্যদের রাজধানী ছিল কপিলাবস্তু। সিদ্ধার্থ গৌতমের মাতৃদেবী রাণী মহামায়া পিত্রালয়ে যাওয়ার পথে কপিলাবস্তু হতে কয়েক মাইল দূরে লুম্বিনী কাননে বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে রাজকুমার জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
কথিত আছে, রাজা শুদ্ধোধন তাকে সন্ন্যাস গ্রহণে বিমুখ করার চেষ্টা করলে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি আপনি এই আশ্বাস দিতে পারেন যে, কখলধ আমার মৃত্যু হবে না, ব্যাধি আমায় পীড়িত করবে না, জরা আমার যৌবনকে আকর্ষণ করবে না বা কোনো বিপদই আমার সম্পত্তি হরণ করবে না, তা হলেই আমি সন্ন্যাস গ্রহণের সংকল্প ত্যাগ করতে পারি।’
পৃথিবীতে এ আশ্বাস দিতে পারে কোনো মানুষ? মুক্তির সন্ধানে অবশেষে সিদ্ধার্থ গৌতম কঠোর সাধনায় নিমগ্ন হলেন। গয়ার নিকট তিনি কৃচ্ছ্রসাধনে প্রবৃত্ত হলেন। অবশেষে ছয় বছর কঠোর সাধনার পর উপলব্ধি করলেন কৃচ্ছ্রসাধনে নয়, মধ্যম পথই মানবের মুক্তির উপায়।
মধ্যমপন্থা গ্রহণ করে গয়ার নৈরঞ্জনা নদীর তীরে অশ্বত্থ বৃক্ষমূলে বুদ্ধত্ব লাভ করলেন। সে দিনই ছিল বৈশাখী পূর্ণিমা। সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধত্ব লাভ করে হলেন গৌতম বুদ্ধ। জগৎ সংসারের জন্ম-মৃত্যু রহস্য তার কাছে উন্মোচিত হলো।
বুদ্ধত্ব লাভ করে তিনি আনন্দোচ্ছাসে যে বাণী দিলেন তাতে বুদ্ধের নির্বাণ দর্শনের সারতত্ত্ব উপলব্ধি করা যায়—
‘হে গৃহকারক, তোমার সন্ধানে কত জন্ম-জন্মান্তরই না এই দুঃখময় সংসার আবর্তে ঘুরে বেড়িয়েছি-তোমায় খুঁজে পাইনি এতদিন। আজ তোমায় চিনেছি, আর তুমি গৃহ-নির্মাণ করতে পারবে না। এই গৃহের সকল কাষ্ঠদণ্ড (ফাসুকা, পার্শ্বকা) ভগ্ন হয়েছে। গৃহচূড়া ধ্বংস হয়েছে। সংসারসমূহের বিনাশে আমি নির্বাণপ্রাপ্ত হয়েছি। আমার সকল তৃষ্ণার ক্ষয় হয়েছে’। (ধর্মপদ-১৫৩)
আরও পড়ুন
তথাগতের এ সত্য উপলব্ধি বিধৃত হয়েছে এ গাথায়। এখানে যে গৃহকারকের অন্বেষণে গৌতম জন্ম-জন্মান্তরে সংসার আবর্তে আবর্তিত হয়েছেন তার নাম হলো ‘তৃষ্ণা’। এ তৃষ্ণার কারণে মানুষ জন্ম-জন্মান্তর ঘুরে বেড়ায়। এই তৃষ্ণা থেকেই রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান-এদের সমষ্টিরূপ। অবিদ্যার গ্রন্থি যখন ছিন্ন হয়, তৃষ্ণার যখন ক্ষয় হয়, তখনই মানুষ দুঃখ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পায়। সেই মুক্তি হলো বুদ্ধের দর্শনে নির্বাণ।
দুঃখের নিবৃত্তির পথ খুঁজেছিলেন তথাগত বুদ্ধ। তিনি তার সন্ধানও পেয়েছিলেন। বোধি লাভের পর চারটি আর্যসত্য উপলব্ধি করলেন, তা হলো-(১) দুঃখ আছে, (২) দুঃখের উৎপত্তি আছে, (৩) যার উৎপত্তি আছে তার লয়ও আছে, সুতরাং দুঃখেরও লয় আছে, (৪) দুঃখ নিরোধের পথও আছে।
এ চতুরার্য সত্য ব্যতীত জগতে অন্য কোনো ধর্ম নেই। এতেই পৃথিবীর সব সত্যের সন্ধান নিহিত। বুদ্ধ পঁয়তাল্লিশ বছরব্যাপী দেব মানবের হিতে তার-এ সত্যের বাণী প্রচার করেন।
তথাগত বুদ্ধের বয়স যখন আশি বছর তখন উপলব্ধি করলেন, তার মহাপরিনির্বাণের সময় আসন্ন। বৈশালীতে তিনি একদিন তার ভিক্ষুসংঘকে ডেকে বললেন, বৈশালীতে এই আমার শেষ অবস্থান, তিন মাস পরেই তথাগত পরিনির্বাপিত হবেন। তোমরা কাতর হয়ো না। যে ধর্ম তোমাদের কাছে প্রকাশ করলাম, অনুরাগের সঙ্গে সেই ধর্ম অনুশীলন করে নির্বাণ লাভের জন্য চেষ্টা করো।
অতঃপর বুদ্ধ আনন্দকে ডেকে বললেন, ‘কুশীনগরে গিয়ে মল্লদের সংবাদ দাও যে তথাগতের পরিনির্বাণ আসন্ন। পরে যেন তারা খেদ না করে যে, তথাগত আমাদের গ্রামেই দেহ রক্ষা করলেন কিন্তু শেষ সময় আমরা তাকে দেখতে পেলাম না।’
অনন্ত বুদ্ধ সমবেত শিষ্যদের বললেন, ‘সংহত পদার্থ মাত্রই নশ্বর। এই সকল বস্তুই ক্ষয়শীল। তোমরা অপ্রমাদের সাথে নিজের মুক্তির পথ অন্বেষণ কর।’
তথাগত বুদ্ধ এ কুশীনগরের মল্লদের শালবনে মহাপরিনির্বাণপ্রাপ্ত হলেন, সেদিনও ছিল বৈশাখের পুণ্যলগ্ন পূর্ণিমা তিথি। মহাপরিনির্বাণ লাভের পূর্বে বুদ্ধ শিষ্যদের যেসব উপদেশ দিয়েছিলেন, ‘আত্নদীপো ভব’ অর্থাৎ তুমি নিজের তোমার আলোকবর্তিকা হও, তোমার প্রজ্ঞাদৃষ্টিই তোমাকে পথ দেখাবে; তোমার পথ দেখাবার আলো আসবে না তোমার বাইরে থেকে। যারা পথ দেখাবার ভিড় করে না, তারা কেবল বাড়ায় খোঁজা।
এ প্রজ্ঞা দৃষ্টি লাভ করেই সিদ্ধার্থ গৌতম পথের সন্ধান পেয়েছিলেন। তিনি আলোকবর্তিকা বুদ্ধ হয়েছিলেন। আর তখনই তিনি বলতে পেরেছিলেন ‘সর্বোচ্চ জ্ঞান লাভ করে আমি আর কার কাছে শিক্ষা নেবো’।
শিষ্যদেরও উপদেশ দিয়ে বলছেন, ‘অত্তা হি অত্তনো নাথো কোহি নাথো পরো সিযা’ অর্থাৎ তুমিই তোমার নাথ বা প্রভু। তুমিই তোমার আশ্রয়। তুমি ছাড়া তোমার অন্য কোনো আশ্রয় আছে? সুতরাং ‘তুম্মে হি কিচচং আতপ্পং’ অর্থাৎ মুক্তির চেষ্টা তোমাকেই করতে হবে; আমি পথ প্রদর্শক মাত্র!
‘সব্বে ধম্মা অনত্তা’ অর্থাৎ সব বস্তুই অনিত্য ক্ষয়শীল এদের প্রতি আসক্তি বা মমত্ববোধ ত্যাগ করলেই মানুষ মুক্ত হবে। সেই মুক্ত পুরুষই অর্হৎ পুরুষোত্তম যার ইহ ও পরলোক কোনো কিছুর প্রত্যাশা নেই, যিনি বিসংযুক্তা, বিতৃষ্ণা এবং সেই হেতু বিগত ভয়। মৃত্যুর ভয় থেকেও তিনি মুক্ত, কারণ তিনি আসক্তিহীন, আত্মদৃষ্টি বা আত্মপ্রীতি তার সমুচ্ছিন্ন।
তথাগত বুদ্ধের জন্ম, বোধিলাভ ও মহাপরিনির্বাণ বৈশাখের মহাপূণলগ্নে বিশাখা নক্ষত্রযোগে সংঘটিত হয়েছিল বলে বিশ্বে সর্বত্র ‘শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা’ নামে উদযাপিত হয়। এটি তথাগত বুদ্ধে ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত মহাপুণ্যময় দিন। শান্তি, মৈত্রী ও করুণার প্রতীক তথাগতের ত্রি-স্মৃতি বিজড়িত দিনটি বৌদ্ধ ও শান্তিকামী মানুষ স্মরণ ও পালন করে থাকে।
কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বৈশাখী পূর্ণিমা উপলক্ষে মহাবোধে সোসাইটি হলে ১৩৪২ বঙ্গাব্দে ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ দেওয়া ভাষণে বলেন, ‘আমি যাকে অন্তরের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব বলে উপলব্ধি করি। তার জন্মোৎসবে আমার প্রণাম নিবেদন করতে এসেছি। এ কোনো বিশেষ অনুষ্ঠানের উপকরণগত অলঙ্কার নয়, একান্তে নিভৃতে যা তাকে বারবার সমর্পণ করেছি। সেই অর্ঘ্যই আজ এখানে উৎসর্গ করি।’
শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমার পুণ্যলোকে ধরণী হোক সুশীতল। বিশ্বের সব প্রাণী সুখী হোক, শান্তি লাভ করুক।
ভিক্ষু সুনন্দপ্রিয় : সম্পাদক, সৌগত; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন
[email protected]
