চীন ইতিমধ্যেই চৌদ্দটি পাঁচসালা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। বিশাল এই দেশটি সম্পর্কে একটি কথা আন্তর্জাতিক মহলে বেশ প্রচলিত, আর সেটি হচ্ছে: চীন যখন কোনোকিছু পরিকল্পনা করে, তখন সেটি যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করেও ছাড়ে। আসলে, চীনে কোনোকিছুই যেনতেনভাবে পরিকল্পনা করা হয় না; জাতীয় পর্যায়ে তো নয়ই। সরকার পরিকল্পনা করার আগে প্রচুর হোমওয়ার্ক করে, বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়, জনগণের পরামর্শ গ্রহণ করে, পরিকল্পনার বাস্তবায়নযোগ্যতা খতিয়ে দেখে। আর চূড়ান্তভাবে কোনো পরিকল্পনা গ্রহণের আগে, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় দুটি প্রশ্নের উত্তরের ওপর: পরিকল্পনাটি কি দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য জরুরি? এটি বাস্তবায়িত হলে কি দেশের জনগণ উপকৃত হবে? যখন এই দুটি প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তখনই চূড়ান্তভাবে পরিকল্পনাটি গৃহীত হয়। এটাই মোটাদাগে চীনের দস্তুর। আগের চৌদ্দটি পাঁচসালা পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছিল এই নীতি মেনেই। সেগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে এবং তাতে দেশ ও জনগণের কল্যাণ হয়েছে। আন্তর্জাতিক সমাজ এর সাক্ষী।
চলতি বছর চীনের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী সংস্থা গণকংগ্রেসে গৃহীত হয়েছে ‘পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা, ২০২৬-২০৩০’। মানে আগামী পাঁচ বছর ধরে এটি ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হবে। আগের চৌদ্দটি পাঁচসালা পরিকল্পনার মতো এটিও একটি ‘জনবান্ধব’ পরিকল্পনা। আরও আগ বাড়িয়ে বললে, এবারের পরিকল্পনায় উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে জনগণ তথা মানুষের কথা আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে। বরাবরের মতো আগামী পাঁচ বছরও দেশের অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে মনোযোগ দেওয়া হবে। তবে, এবার জনগণ তথা মানুষের প্রত্যক্ষ কল্যাণ বৃদ্ধিতে বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে বাড়বে; শিক্ষা, চিকিৎসা, পেনশন, কর্মসংস্থান, শিশু ও প্রবীণদের সেবার মতো ক্ষেত্রগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। স্রেফ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ নয়, বরং এক্ষেত্রে মান উন্নয়নের ওপর দেওয়া হবে বিশেষ গুরুত্ব। সবমিলিয়ে, পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনাকে প্রকৃত অর্থেই একটি ‘জনবান্ধব’ পরিকল্পনা বলা যেতে পারে।
এই জনবান্ধব পরিকল্পনায় মোট বিশটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যার ৭টিই সরাসরি জনকল্যাণসংশ্লিষ্ট। এই সাতটি লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে: শহুরে বেকারত্বের হার ৫.৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা হবে; জনগণের মাথাপিছু বার্ষিক আয় জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে বাড়বে; কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর গড় শিক্ষাজীবন চার মাস বাড়িয়ে ১১ বছর ৭ মাস করা হবে; প্রতি হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসকের সংখ্যা ৩.৭ জন ও নার্সের সংখ্যা ৫.১ জন করা হবে; নার্সিংহোমগুলোতে সেবা শয্যার সংখ্যা ৬৮ শতাংশ থেকে ৭৩ শতাংশে উন্নীত করা হবে; ৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের নার্সারিতে ভর্তির হার ৬ শতাংশ বাড়ানো হবে এবং জনগণের গড় আয়ু ৮০ বছরে উন্নীত করা হবে। এসব লক্ষ্যমাত্রায় একটা জিনিস স্পষ্ট: আধুনিক চীনা অর্থনীতির মূল লক্ষ্য গুণগত মানসম্পন্ন উন্নয়ন ও মানুষের সেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
পরিকল্পনায় মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিকে জনকল্যাণের সবচেয়ে বড় সূচক হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ২০২৫ সালে চীনের মানুষের গড় আয়ু দাঁড়ায় ৭৯.২৫ বছর। নতুন পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরে তা ৮০ বছরে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, গড় আয়ু বৃদ্ধির সাথে স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নয়নের বিষয়টি সরাসরি জড়িত। চীনের স্বাস্থ্যসেবা খাত এমনিতেই যথেষ্ট উন্নত। কিন্তু, গড় আয়ু ৮০-তে নিয়ে যেতে এ খাতের আরও উন্নয়ন জরুরি। তাই নতুন পাঁচসালা পরিকল্পনায় গ্রাম ও শহরের প্রান্তিক পর্যায়ে হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে, এক হাজার ‘সমন্বিত কাউন্টি চিকিৎসা জোট’ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য, সাধারণ মানুষের ঘরের কাছে উন্নত চিকিৎসা নিয়ে যাওয়া। পাশাপাশি, বিশেষ নার্সিং ও পুনর্বাসন পরিষেবার ওপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হবে। কারণ, চীনে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
আগেই বলেছি, আগামী পাঁচ বছরে নার্সিংহোমগুলোতে সেবা শয্যার সংখ্যা বাড়ানো হবে। পাশাপাশি, দুই হাজার সরকারি নার্সিংহোম আধুনিকায়ন করার লক্ষ্যমাত্রাও ঠিক করা হয়েছে। নার্সিংহোম থাকলেই তো আর হবে না, সেবা দেওয়ার জন্য দক্ষ ও পর্যাপ্ত নার্সও থাকা চাই। পরিকল্পনায় প্রায় পাঁচ লাখ প্রশিক্ষিত নার্সিং-কর্মী গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
আয় ও কর্মসংস্থান সবসময়ই একটা দেশের জনগণের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। পাঁচসালা পরিকল্পনায় নগর ও গ্রামের বাসিন্দাদের আয় বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে স্বাভাবিকভাবেই। এ ক্ষেত্রে লক্ষ্য মোটাদাগে তিনটি: কম আয়ের মানুষের আয় বাড়ানো; সম্পত্তি থেকে আয়ের ব্যবস্থা করা এবং বেতন ও পেনশন-ব্যবস্থা আরও আধুনিক করা। আয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখা হবে যে, এক্ষেত্রে কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে বা বাদ না পড়ে।
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। নতুন পরিকল্পনায় শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে; বলা হয়েছে, শ্রমশক্তির গড় শিক্ষাজীবন ১১ বছর ৩ মাস থেকে বাড়িয়ে ১১ বছর ৭ মাস করা হবে। পরিকল্পনা অনুসারে, আগামী পাঁচ বছরে নতুন করে এক হাজারটি মানসম্পন্ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় নির্মাণ ও সম্প্রসারণ করা হবে। পাশাপাশি, পাঁচ শতটি ‘শিল্প-শিক্ষা সমন্বিত প্রশিক্ষণকেন্দ্র’ গড়ে তোলা হবে। এর লক্ষ্য হবে, শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনে সাহায্য করা।
চীনে সামাজিক নিরাপত্তা ও পেনশন ব্যবস্থা বহু দেশের তুলনায় আধুনিক ও উন্নত। কিন্তু, সরকার এ নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে নারাজ। তাই, পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনায় সমাজকল্যাণ-ব্যবস্থা আরও উন্নত ও এর আওতা আরও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুসারে, গ্রাম ও শহরের বাসিন্দাদের পেনশনের পরিমাণ বাড়ানো হবে। পরিকল্পনায় বাদ দেওয়া হয়নি ‘ইন্টারনেট ডেলিভারি কর্মী’, চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদেরকেও। এরা সাধারণভাবে বীমার আওতার বাইরে থাকেন। নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে, তারাও বীমার আওতায় আসবেন; তাদের জীবন আগের চেয়ে আরও বেশি নিরাপদ হবে। পাঁচসালা পরিকল্পনায় বিদ্যমান চিকিৎসা-বীমার আওতা বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে চিকিৎসার জন্য অর্থের চিন্তা করতে না হয়।
জনকল্যাণের সাথে সংশ্লিষ্ট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা। পরিকল্পনায় খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে অন্যতম জরুরি বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৫ সালে চীনে রেকর্ড ১.৪৩ ট্রিলিয়ন (এক ট্রিলিয়ন=১০০০ বিলিয়ন) কেজি খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে। পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনায় দেশের মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন ১.৪৫ ট্রিলিয়ন কেজিতে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। অন্যদিকে, জ্বালানি খাতে সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির মাধ্যমে, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ ১৭ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, চীনের সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুসারে, ২০৩০ সালের পর চীন কার্বন নিঃসরণ কোনো অবস্থাতেই বাড়তে দেবে না; তখন থেকে তা শুধু কমতেই থাকবে। এভাবে চলতে চলতে, ২০৬০ সালে গিয়ে, চীন ‘কার্বন-নিরপেক্ষ’ দেশে পরিণত হবে।
চীনে বরাবরই মানুষকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটা দেশটির সরকারের স্থায়ী নীতি। কোভিড মহামারির সময় এই নীতির বাস্তবায়ন বিশ্ব দেখেছে। মানুষের জীবন বাঁচাতে তখন চীন সরকার অর্থনীতির চাকাকে বলতে গেলে থামিয়ে দিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, আগে মানুষের জীবন, পরে অর্থনীতি। স্বাভাবিকভাবেই, পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনায়ও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে মানুষের কল্যাণচিন্তা। শিক্ষার মান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা খাতের উন্নতি, অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বয়স্ক ও শিশুদের সেবার মান ও আওতা বৃদ্ধি, এবং সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে (এবং তা বাস্তবায়িত না হওয়ার আপাতত কোনো কারণ নেই), ২০৩০ সালের মধ্যে চীনা জনগণের জীবনযাত্রার মান আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত হবে, এমনটা আস্থার সাথে বলা যায়। বস্তুত, পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা স্রেফ একটি জাতীয় পরিকল্পনা নয়, বরং এটি চীনের ১৪০ কোটি মানুষের আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের চাবিকাঠি।
আলিমুল হক : সম্পাদক, বাংলা বিভাগ, চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি), বেইজিং
