বিজ্ঞাপন

রবীন্দ্রনাথের বয়সভিত্তিক গান রচনা ও তাল প্রবর্তন

রবীন্দ্রনাথের বয়সভিত্তিক গান রচনা ও তাল প্রবর্তন

ঠাকুর পরিবারের সাংগীতিক পরিবেশ ছিল রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা থেকেই। পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিমপ্রাপ্ত, পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের ভক্ত ছিলেন। গৃহ শিক্ষকের কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত শেখা ঠাকুর পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল। বিষ্ণু চক্রবর্তীর কাছে রবীন্দ্রনাথ প্রথম গান শেখেন। এছাড়াও তিনি শ্রীকণ্ঠ সিংহ, যদুনাথ ভট্টাচার্য (যদুভট্ট), রাধিকা গোস্বামী ও শ্যামসুন্দরের নিকট তালিম নিয়েছিলেন।

তবে সংগীত শাস্ত্রে সুপণ্ডিত দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথই ছিলেন তার প্রকৃত সংগীত গুরু। মাত্র তের বছর বয়সে জানুয়ারি ১৮৭৫ সালে তিনি প্রথম গান ‘গগণের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে’ রচনা করেন এবং মৃত্যুর মাত্র ৯৩ দিন আগে ৮০ বছর বয়সে তার শেষ গান ‘হে নূতন দেখা দিক আর বার’ ৬ মে ১৯৪১ সালে রচিত হয়। এই দীর্ঘ প্রায় ৬৬ বছরের সংগীত জীবনে তিনি নিজে সংগীত রচনা ও সুর করেছেন যা এখন রবীন্দ্রসংগীত নামে পরিচিত।

রবীন্দ্রনাথের লেখা গানের সংখ্যার কথা বলতে গিয়ে ড. সন্‌জীদা খাতুন তার ‘রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ’ গ্রন্থে লিখেছেন,

‘গীতবিতানের সূচিপত্রে উল্লিখিত গানের প্রথম পঙ্‌ক্তি গণনা করে ২২১১টি গানের নাম পাওয়া যায়। এর মধ্যে কিছু গানের প্রথম পঙ্‌ক্তি পাঠভেদের দরুন কখনো দুই কখনো ততধিকাবার তালিকা ভুক্ত হয়েছে। সেই পুনরুক্ত প্রথম পঙ্‌ক্তি পাওয়া যায় ৮৭টির মতো। তাছাড়া সামান্য পাঠান্তরের জন্য দু’জায়গায় বিন্যস্ত বা একাধিকবার উল্লিখিত কিছু গান আছে। সেগুলি গণ্য না করেও ২২১১ থেকে ৮৭ বাদ দিলে, মোট গানের সংখ্যা দাঁড়ায় ২১২৪। অবশ্য, গানের সংখ্যা গণনা করতে হলে দুই সুর বিশিষ্ট এক পদকেই দুই গান হিসেবে ধরা উচিত। তখন গানের সংখ্যা আবার কিছু বেড়ে যাবে।’

গীতবিতান আর্কাইভ-২ তে ডা. পূর্ণেন্দু বিকাশ সরকার উল্লেখ করেছেন, রবীন্দ্রনাথ ২২১৩টি গান রচনা করেছেন। আবার কোথাও রবীন্দ্রনাথের ২২৩০টি গানের কথা বলা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের এই বিশাল সংগীত সম্ভার যে গ্রন্থে সন্নিবেশ করা হয়েছে তার নাম ‘গীতবিতান’। আশ্বিন ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে গীতবিতানের প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড এবং  শ্রাবণ ১৩৩৯ বঙ্গাব্দে তৃতীয় খণ্ড গানের কালানুক্রমিক বিন্যাসসহ প্রথম প্রকাশিত হয়। 

মাঘ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত গীতবিতানের দ্বিতীয় সংস্করণে (দুই খণ্ড) রবীন্দ্রনাথ নিজে তার গানের নতুন বিন্যাস করেছন এবং সংস্করণের বিজ্ঞাপনে তিনি লিখেছেন,

‘গীতবিতান যখন প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল তখন সংকলন কর্তারা সতর্কতার তাড়নায় গানগুলির মধ্যে বিষয়ানুক্রমিক শৃঙ্খলা বিধান করতে পারেননি। তাতে কেবল যে ব্যবহারের পক্ষে বিঘ্ন হয়েছিল তা নয়, সাহিত্যের দিক থেকে রসবোধেরও ক্ষতি করেছিল। সেই জন্য এই সংস্করণে ভাবের অনুষঙ্গ রক্ষা করে গানগুলি সাজানো হয়েছে। এই উপায়ে, সুরের সহযোগিতা না পেলেও, পাঠকেরা গীতিকাব্যরূপে এই গান গুলি অনুসরণ করতে পারবেন।’

কবি প্রদত্ত এই সংস্করণের বিষয় বিন্যাস ও গানের সংখ্যা এইরূপ—ভূমিকা-১; পূজা-৬২৬ [গান ৩২, বন্ধু ৫৯, প্রার্থনা ৩৬, বিরহ ৪৭, সাধনা ও সংকল্প ১৭, দুঃখ ৪৯, আশ্বাস ১২, অন্তর্মুখে ৬, আত্মবোধন ৫, জাগরণ ২৬, নিঃসংশয় ১০, সাধক ২, উৎসব ৭, আনন্দ ২৫, বিশ্ব ৩৯, বিবিধ ১৪৩, সুন্দর ৩০, বাউল ১৩, পথ ২৫, শেষ ৯, পরিণয় ৪৬]; প্রেম-৩৯৫ [গান ২৭, প্রেমবৈচিত্র্য ৩৬৮]; প্রকৃতি-২৮৩ [সাধারণ ৯, গ্রীষ্ম ১৬, বর্ষা ১১৫, শরৎ ৩০, হেমন্ত ৫, শীত ১২, বসন্ত ৯৬ [বিচিত্র ১৩৮; আনুষ্ঠানিক ৯; পরিশিষ্ট-২]।

দ্বিতীয় সংস্করণের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় যে, ‘গীতবিতানের দ্বিতীয় সংস্করণ দুই খণ্ডে প্রকাশিত হওয়ার পর কবি আরও অনেকগুলো গান রচনা করিয়াছিলেন। অসাবধানতা বশত প্রথম দুই খণ্ডে কতকগুলো গান বাদ পড়িয়াছে। এই সকল গান তৃতীয় খণ্ডে প্রকাশিত হইবে।’

গীতবিতান প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড যথাক্রমে পৌষ ১৩৫২ এবং আশ্বিন ১৩৫৪ বঙ্গাব্দে ও তৃতীয় খণ্ড ১৩৫৭ বঙ্গাব্দের আশ্বিনে প্রকাশিত হয়। এই সংস্করণে গীতবিতান থেকে পর্যায় অন্তর্গত পর্বগুলোর অধিকাংশ বাদ দেওয়া হয়েছে। গীতবিতানের তৃতীয় খণ্ডের বিন্যাস করা আছে এরূপ—গীতিনাট্য ও নৃত্যনাট্য [কালমৃগয়া, বাল্মীকি প্রতিভা, মায়ার খেলা, চিত্রাঙ্গদা, চণ্ডালিকা, শ্যামা]; ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী ২০; নাট্যগীতি ১৩২; জাতীয় সংগীত ১৬; পূজা ও প্রার্থনা ৮৩; আনুষ্ঠানিক সংগীত ১৭; প্রেম ও প্রকৃতি ১০১।

অখণ্ড সূচিসহ আশ্বিন ১৩৭১ বঙ্গাব্দে অখণ্ড গীতবিতান প্রকাশ করা হয় এবং আশ্বিন ১৩৭২, বৈশাখ ১৩৭৩, বৈশাখ ১৩৭৪ এবং বৈশাখ ১৩৭৫ বঙ্গাব্দে অখণ্ড সংস্করণের পুনর্মুদ্রণ করা হয়। এর পরে জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৬ এবং পৌষ ১৩৮০ বঙ্গাব্দে গীতবিতানের আরও দুই সংস্করণ বের হয়।

বয়স ও পর্যায় ভিত্তিক রবীন্দ্রসংগীতের বিন্যাস

জানুয়ারি ১৮৭৫ সাল থেকে মে ১৯৪১ সাল এই সুদীর্ঘ ৬৬ বছরের দীর্ঘ সংগীত জীবনকে রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞগণ ১৮৭৫ -১৯০০, ১৯০১-১৯২০ ও ১৯২১-১৯৪১ এই তিনটি পর্যায়ে ভাগ করেছেন। প্রথম পর্যায়ে তিনি গান রচনা করেছেন প্রায় ৬৫৪টি, দ্বিতীয় পর্যায়ে ৬২৭টি এবং সর্বাধিক গান রচনা করেছেন তৃতীয় পর্যায়ে ৮৫০টি।

রবীন্দ্রনাথ ৫৩ বছর বয়সে সর্বাধিক ১১৪টি গান রচনা করেন এবং ১৫ ও ৫৯ বছর বয়সে কোনো গান রচনা করেননি। ১৪ ও ৫৫ বছর বয়সে মাত্র একটি করে গান রচনা করেছেন আর দুইটি করে রচনা করেছেন ৩০, ৫১ ও ৮০ বছরে। ৬১ এবং ৬৪ বছর বয়সে রচনা করেন যথাক্রমে ৯৭ ও ৯৯টি গান।

রবীন্দ্রনাথ ৫৩ বছর বয়সে সর্বাধিক ১১৪টি গান রচনা করেন এবং ১৫ ও ৫৯ বছর বয়সে কোনো গান রচনা করেননি। ১৪ ও ৫৫ বছর বয়সে মাত্র একটি করে গান রচনা করেছেন আর দুইটি করে রচনা করেছেন ৩০, ৫১ ও ৮০ বছরে। ৬১ এবং ৬৪ বছর বয়সে রচনা করেন যথাক্রমে ৯৭ ও ৯৯টি গান।

রবীন্দ্রনাথের  সংগীত জীবনের প্রথম দিকে এবং শেষের দিকে মূলত রচিত হয় তার প্রেমের গান। তবে সর্বাধিক প্রেমের গান রচনা করেন ৬৪ ও ৭৭ বছর বয়সে। আটচল্লিশ থেকে ৫৩ বছর মধ্যে কবি রচনা করেন সর্বাধিক পূজা পর্যায়ের গান। আর ৬১ বছর বয়সে রচনা করেন সর্বাধিক প্রকৃতি পর্যায়ের গান।

স্বরবিতান

কবিগুরু তার বিশাল সংগীত সম্ভারের প্রতিটিতে নিজে সুর দিয়েছিলেন। বিশ্বভারতী ৬৪ খণ্ডে তার গানের স্বরলিপি প্রকাশ করছে। প্রথম খণ্ড ৫১টি গানের স্বরলিপিসহ ১৩৪২ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে প্রকাশিত হয়। এই খণ্ডের প্রথম গান পূজা পর্যায়ের ‘অনেক দিনের শূন্যতা মোর’ এবং শেষ গান প্রেম পর্যায়ের ‘কোন গহন অরণ্যে তারে’। এই খণ্ডের স্বরলিপিকার ছিলেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অনাদিকুমার দস্তিদার, রমা কর, শৈলজারঞ্জন মজুমদার ও শান্তিদেব ঘোষ।

বৈশাখ ১৪১০ বঙ্গাব্দে ১২টি গানের স্বরলিপি নিয়ে স্বরবিতানের ৬৪তম ও শেষ খণ্ড প্রথম প্রকাশিত হয়। এই খণ্ডের প্রথম গান পূজা পর্যায়ের ‘আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে’ এবং শেষ গান প্রেম ও প্রকৃতি পর্যায়ের ‘হিয়া কাঁপিছে’। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, শান্তিদেব ঘোষ ও অনাদিকুমার দস্তিদারসহ নয়জন এই খণ্ডের স্বরলিপি করেছেন। এখানে উল্লেখ্য, গুরুদেব নিজে শুধুমাত্র ‘এ কি সত্য সকলি সত্য’ গানটির স্বরলিপি রচনা করেছেন। স্বরবিতানের ৩৫তম খণ্ডে এই গানটির স্বরলিপি প্রকাশিত হয়।

ভাঙাগান

রবীন্দ্রনাথ নিজের কথায় অন্যগানের সুর বসিয়ে বা অন্যের কথায় নিজে সুর দিয়ে যে সব গান রচনা করেছেন এই দুই ধরনের গানকেই রবীন্দ্রনাথের ভাঙাগান বলা হয়। রবীন্দ্র সংগীত আর্কাইভ-২ তে ডা. পূর্ণেন্দু বিকাশ সরকার ২৪২টি ভাঙা গানের কথা উল্লেখ করেছেন।

প্রথম প্রকারের ভাঙাগানকে চারভাগে ভাগ করা যেতে পারে যেমন—

(ক) হিন্দুস্থানি রাগসংগীতের সুর ভেঙে রচিত গান (হিন্দি খেয়াল, ধ্রুপদ, ঠুমরি, টপ্পা বা তারানা), যেমন ‘একী সুন্দর শোভা’ এর মূল গান ‘বাজুরে মন্দর বাজু’ (খেয়াল);

(খ) আঞ্চলিক গানের সুরে রচিত গান-যেমন ‘আজি শুভ দিনে পিতার ভবনে’ এর মূল গান ‘পূর্নচন্দ্রাননে চিন্ময় হরণে’ (কানাড়ি);

(গ) বাংলা গান ভেঙে রচিত গান-যেমন ‘যদি তোর ডাক শুনে’ এর মূল গান ‘হরি নাম দিয়ে জগত মাতালে’ (বাউল);

(ঘ) পাশ্চাত্য গানের সুরে রচিত গান-যেমন ‘আহা আজি এ বসন্তে’ এর মূল গান ‘Go where glory waits-thee’

বিদ্যাপতির ‘এ ভরা বাদর মহা ভাদর’ এবং সুকুমার রায়ের ‘গান জুড়েছেন গ্রীষ্মকালে ভীষ্মলোচন শর্মা’ এগুলো রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয় প্রকারের ভাঙা গান।

জাতীয় সংগীত

রবীন্দ্রনাথই একমাত্র কবি যার লেখা গান দুটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ ভারত ও বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। ১৯১১ সালে ডিসেম্বরে কলকাতায় ৫০ বছর বয়সে কবি রচনা করেন স্বদেশ পর্যায়ের গান ‘জনগণমন অধিনায়ক’। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গানটি ভারতের জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পায়। গানটির স্বরলিপিকার দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং স্বরবিতানের ১৬তম খণ্ডে গানটির স্বরলিপি লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় ১৯০৫ সালের ৭ আগস্ট কবি ৪০ বছর বয়সে গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে’ বাউল গানের সুরে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলার প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন স্বরূপ কবি রচনা করলেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ যা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রাণের গান, জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। ইন্দিরা দেবীর স্বরলিপি করা স্বদেশ পর্যায়ের এই গানটি স্বরবিতান ৪৬তম খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত রচয়িতা ও সুরকার আনন্দ সামারাকুন ১৯৩০ এর দশকের শেষের দিকে সাহিত্য ও গানে পাঠ নেওয়ার জন্য বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে আসেন। ১৯৪০ সালে আনন্দ সামারাকুন রচনা করলেন ‘শ্রীলঙ্কা মাতা’ গানটি, যা ১৯৫১ সালের ২২ নভেম্বর শ্রীলঙ্কার জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তার এই গানের কথায় ও সুরে রবীন্দ্র ভাবধারার প্রভাব স্পষ্ট ভাবে লক্ষ্য করা যায়।

তাল

প্রচলিত অসংখ্য তালের মধ্যে যে ১৫টি তাল রবীন্দ্রনাথ তার গানে সাধারণত ব্যবহার করেছেন সেগুলো হলো সমপদী [দাদরা ৬ মাত্রা, ৩-৩ ছন্দ-আকাশ ভরা সূর্য তারা; কাহারবা ৮ মাত্রা, ৪-৪ ছন্দ-ওরে গৃহবাসী; ত্রিতাল ১৬ মাত্রা, ৪-৪-৪-৪ ছন্দ-তোমার অসীমে; একতাল ১২ মাত্রা-(ক) ত্রিমাত্রিক ৩-৩-৩-৩ ছন্দ, আজি প্রণমি তোমারে; (খ) চতুর্মাত্রিক ৪-৪-৪ ছন্দে নয়ান ভাসিল জলে; চৌতালা ১২ মাত্রা, ২-২-২-২-২-২ ছন্দ- জগতে তুমি রাজা; সুরফাঁক ১০ মাত্রা, ২-২-২-২-২ ছন্দ-দাঁড়াও মন, অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড মাঝে; আড়া-চৌতাল ১৪ মাত্রা, ২-২-২-২-২-২-২ ছন্দ-সংসারে কোন ভয় নাই; যৎ ৮ মাত্রা, ২-২-২-২ ছন্দ-আরও আঘাত সইবে; মধ্যমান ১৬ মাত্রা, ৪-৪-৪-৪ ছন্দ-কে বসিলে আজি; আড়াঠেকা ১৬ মাত্রা, ৪-৪-৪-৪ ছন্দ-বিমল আনন্দে জাগো; বিষমপদী [তেওড়া ৭ মাত্রা, ৩-২-২ ছন্দ-আমার মাথা নত করে; রূপক ৭ মাত্রা, ৩-২-২ ছন্দ-হে মন তারে দেখো; ঝাঁপতাল ১০ মাত্রা, ২-৩-২-৩ ছন্দ-ভাল যদি বাস সখি; ধামার ১৪ মাত্রা, ৫-২-৩-৪ ছন্দ-অমৃতের সাগরে আমি; পঞ্চম সওয়ারী ১৫ মাত্রা, ৪-৪-৪-৩ ছন্দ-আজি মোর দ্বারে]।

এখানে উল্লেখ্য, দাদরা, কাহারবা, ত্রিতাল, একতাল, ঝাঁপতাল ও তেওড়া তালেই সর্বাধিক রবীন্দ্রসংগীত রচিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ সাতটি নতুনতাল সৃষ্টি করেছেন। এই তালগুলোর দুটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো বিষমপদী এবং কোনোটিতেই ফাঁক নেই।

তালগুলি হলো—ঝম্পক ৫ মাত্রা, ৩-২ ছন্দ-আজি ঝড়ের রাতে; ষষ্ঠী ৬ মাত্রা, ২-৪ ছন্দ-মমচিত্তে নিতি নৃত্যে; রূপকড়া ৮ মাত্রা, ৩-২-৩-জীবনে যত পূজা; নবতাল ৯ মাত্রা, ৩-২-২-২-নিবিড় ঘন আঁধারে; একাদশী* ১১ মাত্রা, ৩-২-২-৪ ছন্দ দুয়ারে দাও; নবপঞ্চ* ১৮ মাত্রা, ২-৪-৪-৪-৪ ছন্দ-জননী তোমার; দশ মাত্রার তাল ১০ মাত্রা, ৫-৫ ছন্দ-দেখা দিয়ে যে চলে গেল ও। (*কেবল একটি করে গানের জন্যই রবীন্দ্রনাথ একাদশী ও নবপঞ্চ তালের প্রবর্তন করেন।)

গীতাঞ্জলি

রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার লাভ করেছিলেন তার ‘গীতাঞ্জলি’-এর অনুবাদের মাধ্যমে। মূলত একশত সাতান্নটি প্রার্থনা সংগীত নিয়ে ১৯১০ সালের ১৪ আগস্ট সর্বপ্রথম বাংলা গীতাঞ্জলি প্রকাশিত হয়। এর প্রথম গান ‘আমার মাথা নত করে দাও’ রচিত হয় ফাল্গুন ১৩২৩ বঙ্গাব্দে এবং শেষ গান ‘দিবস যদি সাঙ্গ হল না’ রচিত হয় ২৯ শ্রাবণ ১৩১৭ বঙ্গাব্দে।

রবীন্দ্রনাথের সংগীত জীবনের প্রথম দিকে এবং শেষের দিকে মূলত রচিত হয় তার প্রেমের গান। তবে সর্বাধিক প্রেমের গান রচনা করেন ৬৪ ও ৭৭ বছর বয়সে। আটচল্লিশ থেকে ৫৩ বছর মধ্যে কবি রচনা করেন সর্বাধিক পূজা পর্যায়ের গান। আর ৬১ বছর বয়সে রচনা করেন সর্বাধিক প্রকৃতি পর্যায়ের গান।

১৯১২ সালে লন্ডন যাওয়ার প্রাক্কালে কবি ইংরেজি গীতাঞ্জলির গানগুলো নিজে ইংরেজিতে অনুবাদ  করেন। Indian Society of London, ১৯১২ সালের নভেম্বরে সর্বপ্রথম ইংরেজি গীতাঞ্জলি প্রকাশ করে। এতে ১০৩টি গান স্থান পেয়েছে যার ৫৩টি কবি নিয়েছেন বাংলা গীতাঞ্জলি থেকে এবং বাকি ৫০টি তার বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া হয়েছে। [গীতিমাল্য ১৬; নৈবেদ্য ১৬; খেয়া ১১; শিশু ৩; চৈতালি ১; কল্পনা ১; অচলায়তন ১; উৎসর্গ ১]।

ইংরেজি গীতাঞ্জলির প্রথম গান ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’ রচনা করেছেন ৭ বৈশাখ ১৩১৯ বঙ্গাব্দে শান্তিনিকেতনে এবং শেষ গান ‘একটি নমস্কারে প্রভু’ রচিত হয়েছে ২৩ শ্রাবণ ১৩১৭ বঙ্গাব্দে, বোলপুরে। ইংরেজি গীতাঞ্জলি বিশ্বজুড়ে প্রধান প্রধান প্রায় সব ভাষাতেই অনূদিত হয়েছে।

পরিশেষে

শ্রীঅমল মুখোপাধ্যায় তার ‘রবীন্দ্রসংগীত পরিক্রমা’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘...আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সাধারণ বিষয়গুলি তাঁর গানে বাদ যায়নি, অথচ একই সঙ্গে তা অসীমের বার্তাবাহী। আর এই গুণেই রবীন্দ্রসংগীত মানুষের চিরকালের আদরের ধন।’

সঙ্গীত ভবনের প্রথম ছাত্র শ্রী অনাদিকুমার দস্তিদার বলেছেন, ‘...মানব মনের এমন কোন অনুভূতি নেই যা তিনি তাঁর গানে প্রকাশ করে যাননি। সুখ, দুঃখ, মিলন, বিরহ, বিষাদ, আনন্দ ভক্তি, প্রীতি প্রভৃতি অনন্ত ভাব ও ব্যঞ্জনায় রবীন্দ্র সংগীত ঐশ্বর্যশালী।’

রবীন্দ্রসংগীত মন দিয়ে শুনলে আর হৃদয় দিয়ে এর সুর ও বাণী উপলব্ধি করলেই আমরা বুঝতে পারব যে অসীম ও আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সবকিছুই রয়েছে রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি রবীন্দ্রসংগীতে। সর্বশেষে তার একটা উক্তি দিয়ে শেষ করছি।

‘God Respects Me When I Work, He Loves Me When I Sing.’

তথ্যঋণ:

১। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯০৪), গীতবিতান (অখণ্ড), বিশ্বভারতী গ্রন্থন বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত;

২। শ্রীঅমল মুখোপাধ্যায় (১৯৮১), রবীন্দ্রসংগীত পরিক্রমা, করুণা প্রকাশনী, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত;

৩। সন্‌জীদা খাতুন (১৯৮১), রবীন্দ্রসংগীতের ভাবসম্পদ, মুক্তধারা, ঢাকা, বাংলাদেশ;

৪। পূর্ণেন্দু বিকাশ সরকার (২০০৬), গীতবিতান আর্কাইভ-২, সারেগামা, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত;

৫। সুবিনয় রায় (১৩৮৫) বঙ্গাব্দ), রবীন্দ্রসংগীত সাধনা, এ মুখার্জী অ্যান্ড কোং প্রাঃ লিমিটেড, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত;

৬। Birth Anniversary Commemorative Volume (ed). University of Colombo, Sri Lanka;

৭। বিভিন্ন ইন্টারনেট সাইট;

ড. গোপাল কৃষ্ণ বোস: সংগীতশিল্পী