বিজ্ঞাপন

বন্যার সাথে বসবাস : আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আমাদের করণীয়

বন্যার সাথে বসবাস : আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও আমাদের করণীয়

নদীমাতৃক বাংলাদেশে বন্যা একটি নৈমিত্তিক প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও এর ভয়াবহতা ও ক্ষয়ক্ষতি দেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে। বিগত বছরের বন্যা পরিস্থিতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় শুধুমাত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে টেকসই বন্যা ব্যবস্থাপনার প্রতি আমাদের গুরুত্ব আরোপ করা উচিত।

বদ্বীপখ্যাত বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় অবস্থিত এবং প্রায় ৭০০টি নদী ও উপনদীর সমন্বয়ে একটি জটিল ও বিস্তৃত নদী ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই ব্যবস্থায় উজান থেকে আগত বিপুল পরিমাণ (প্রায় ১০০ কোটি টন) পলি দেশের ভূ-প্রাকৃতিক গঠন ও উর্বরতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

তবে এই একই ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সঙ্গে মানবসৃষ্ট কারণসমূহ মিলিত হয়ে বন্যাকে একটি পুনরাবৃত্ত ও বিধ্বংসী দুর্যোগে পরিণত করেছে। বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই ছোট থেকে মাঝারি মাত্রার বন্যা দেখা যায়। বর্ষা মৌসুমে (জুন-সেপ্টেম্বর) হিমালয় অঞ্চলের বরফগলা পানি ও মৌসুমি বৃষ্টিপাতের প্রভাবে প্রধান নদীসমূহে পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় ফলে নদীগুলো তাদের ধারণক্ষমতা অতিক্রম করে এবং বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।

প্রতিবছর বাংলাদেশে গড়ে প্রায় ২৬,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা, যা দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ১৮ শতাংশ, বন্যায় প্লাবিত হয়। তবে ইতিহাসে একাধিকবার বন্যা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করেছে তারমধ্যে ১৯৬৬, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪, ২০০৮, ২০১৭, ২০২২ এবং ২০২৪ সালের বন্যাগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০০ সালের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় প্রতি দশকেই একটি করে বৃহৎ বন্যা সংঘটিত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে। ২০২৫-২০২৬ সময়কালে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত, টাইফুন ও চরম আবহাওয়াজনিত প্রভাবের কারণে বন্যা পরিস্থিতি ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করেছে।

বিশেষত ইন্দোনেশিয়াতে ভারী বৃষ্টিপাতজনিত ভূমিধস ও বন্যায় কয়েক শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। একইভাবে চীন ও ভিয়েতনাম-এ শক্তিশালী টাইফুন ও অতিবৃষ্টির প্রভাবে ব্যাপক প্লাবন সৃষ্টি হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান-এও অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের কারণে উচ্চমাত্রার বন্যার ঝুঁকি বিদ্যমান।

অন্যদিকে, ইউরোপের জার্মানি ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে এবং উত্তর আমেরিকার একাধিক অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে বন্যা পরিস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে, যা এই দুর্যোগের বৈশ্বিক মাত্রাকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে। আবহাওয়াবিদদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন ক্রমশ অনিয়মিত ও তীব্র হয়ে উঠছে, যার ফলে কোথাও আকস্মিক ক্লাউডবার্স্ট, আবার কোথাও প্রবল ঝড়বৃষ্টি ও ফ্ল্যাশ ফ্লাডের মতো চরম ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যে কারণেই বন্যা সংঘটিত হোক না কেন, এটি মানুষের জীবনে চরম ভোগান্তি সৃষ্টি করে, এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। বন্যা ও পরবর্তী সময়ে রোগব্যাধির বিস্তার, অবকাঠামোর ধ্বংস এবং ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। এজন্য বিভিন্ন পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়ে উঠে।

বন্যা পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলার পূর্বে বন্যা কি, কাকে বলে, কখন সংঘটিত হয় এবং কীভাবে তাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব এটা জানা জরুরি।

বন্যা বলতে, সাধারণত শুষ্ক বা স্বাভাবিক ভূমি অতিরিক্ত পানি দ্বারা প্লাবিত হওয়াকে বোঝায়। জাতিসংঘের আবহাওয়া সংস্থা-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, বন্যা হলো এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে ভূমির এমন অংশ পানিতে ডুবে যায় যা সাধারণত শুষ্ক থাকে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রধানত চার ধরনের বন্যা পরিলক্ষিত হয়—

(১) মৌসুমি জলবায়ুর প্রভাবে নদ-নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি জনিত বর্ষাকালীন বন্যা,

(২) আকস্মিক (পাহাড়ি ঢল) বন্যা,

(৩) অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থাজনিত বন্যা

এবং (৪) সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড়-সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাস বা জোয়ারের উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত বন্যা।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে ভিন্ন ধরনের বন্যা দেখা যায়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় (সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা) আকস্মিক বন্যা বেশি ঘটে, যা পাহাড়ি ঢলের ফলে সৃষ্টি হয়। মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে (কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ) প্রধানত মৌসুমি নদী বন্যা দেখা যায়, যা বর্ষাকালে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে ঘটে।

বাংলাদেশে বন্যা সংঘটনের পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণই দায়ী। প্রাকৃতিক কারণের মধ্যে অতিবৃষ্টি, মৌসুমি বায়ু, উজানের পানি প্রবাহ, নদীতে পলি জমা এবং জলবায়ু পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা) নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে জলাবদ্ধতা বা বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হয়। অন্যদিকে উপকূলীয় এলাকায় (বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী) ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসজনিত বন্যা বেশি দেখা যায়। এছাড়া ঢাকা ও অন্যান্য শহরে অতিবৃষ্টির কারণে নগর বন্যাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।

বাংলাদেশে বন্যা সংঘটনের পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণই দায়ী। প্রাকৃতিক কারণের মধ্যে অতিবৃষ্টি, মৌসুমি বায়ু, উজানের পানি প্রবাহ, নদীতে পলি জমা এবং জলবায়ু পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকার উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হলে বিপুল পানি দ্রুত বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং নদীর ধারণক্ষমতা অতিক্রম করে বন্যা সৃষ্টি করে।

ভৌগোলিকভাবে এই বদ্বীপ অঞ্চলটি ইউরেশীয়, ভারতীয় ও বার্মা টেকটোনিক প্লেটের মিলনস্থলে অবস্থিত। প্লেটগুলোর নড়াচড়া ও ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তার ফলে ভূপ্রকৃতির ক্রমাগত পরিবর্তন ঘটে, নদীর গতিপথ বদলে যায় এবং পলি জমা ও ক্ষয় প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়, যা বন্যার প্রকৃতি ও তীব্রতাকে প্রভাবিত করে।

অন্যদিকে মানবসৃষ্ট কারণগুলোর মধ্যে বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী ও খাল দখল, দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ উল্লেখযোগ্য। এসব কারণে পানি প্রবাহের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হয় এবং নগর ও গ্রামীণ উভয় এলাকায় জলাবদ্ধতা ও বন্যা বৃদ্ধি পায়।

বন্যার প্রভাব বহুমাত্রিক। এটি প্রাণহানি, বসতবাড়ি ধ্বংস, কৃষিজমি ও ফসলের ক্ষতি, অবকাঠামো ভেঙে পড়া এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। পাশাপাশি দূষিত পানির কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগব্যাধির বিস্তার ঘটে। দীর্ঘমেয়াদে বন্যা দারিদ্র্য, বাস্তুচ্যুতি এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি করে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশে একাধিক বিধ্বংসী বন্যা সংঘটিত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০২২ ও ২০২৪ সালের বন্যা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৮ সালের বন্যায় দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয় এবং প্রায় ৮২,০০০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৯৮ সালের বন্যায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং এটি দীর্ঘস্থায়ী ছিল।

সাম্প্রতিক ২০২২ ও ২০২৪ সালের বন্যায়ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যেখানে লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এই বন্যাগুলোর প্রধান কারণ হিসেবে অতিবৃষ্টি, উজানের পানি প্রবাহ, নদীর ধারণক্ষমতা হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাতকে চিহ্নিত করা হয়।

বিশেষ করে ২০২৪ সালের বন্যায় পূর্বাঞ্চলের ১১টি জেলায় প্রায় ৫৭ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু ঘটে। এছাড়া অবকাঠামো, কৃষিজমি ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়, যা দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) এর তথ্যসূত্রে, ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে ফ্লাড একশন প্ল্যান (ফ্যাপ) গ্রহণ করে।

এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে টেকসই বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ফ্যাপের আওতায় ১৭টি উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহায়তায় ২৬টি সমীক্ষা ও পাইলট প্রকল্প পরিচালিত হয়। এসব প্রকল্পে নদী ড্রেজিং, বাঁধ ও নদী তীর সংরক্ষণ, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন, নগর বন্যা প্রতিরোধ, কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জিয়াইএস ও ফ্লাড মডেলিং এবং পরিবেশগত মূল্যায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এছাড়া জনগণের অংশগ্রহণ এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবায়ন সীমাবদ্ধতার জন্য পরিকল্পনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয়নি। এর প্রধান কারণগুলো হলো, সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি, পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক,স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ সীমিত থাকা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পনির্ভরতা। ফলস্বরূপ, বন্যা নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও একটি সমন্বিত ও টেকসই ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

উন্নত দেশগুলো বন্যা দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করেছে। চ্যান প্রমুখ (২০১৬) তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এই চারটি দেশ টেকসই বন্যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কিন্তু কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। যুক্তরাজ্যে ‘মেকিং স্পেস ফর ওয়াটার’ নীতি এবং জাতীয় পরিকল্পনা কাঠামোর মাধ্যমে নদী ও জলাধারের জন্য প্রাকৃতিক স্থান সংরক্ষণ এবং ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে বন্যার পানি স্বাভাবিকভাবে বিস্তার লাভ করতে পারে এবং ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়।

বন্যার প্রভাব বহুমাত্রিক। এটি প্রাণহানি, বসতবাড়ি ধ্বংস, কৃষিজমি ও ফসলের ক্ষতি, অবকাঠামো ভেঙে পড়া এবং অর্থনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে। পাশাপাশি দূষিত পানির কারণে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগব্যাধির বিস্তার ঘটে।

নেদারল্যান্ডসে ‘রুম ফর দ্য রিভার’ কর্মসূচির মাধ্যমে নদীর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না করে বরং নদীর জন্য অতিরিক্ত স্থান সৃষ্টি করা হয়েছে, যা বন্যা নিয়ন্ত্রণের একটি টেকসই ও প্রকৃতি নির্ভর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত। যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় বন্যা বীমা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে, যা বন্যা ঝুঁকি মোকাবিলায় অর্থনৈতিক নিরাপত্তা প্রদান করে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসতি স্থাপনে নিরুৎসাহিত করে।

অন্যদিকে জাপান উন্নত বন্যা পূর্বাভাস, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে, যা আকস্মিক দুর্যোগ মোকাবিলায় অত্যন্ত কার্যকর। এই উদাহরণগুলো থেকে স্পষ্ট যে, উন্নত দেশগুলো শুধুমাত্র বাঁধ বা অবকাঠামোগত সমাধানের ওপর নির্ভর না করে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দৃষ্টিকোণ সমন্বয় করে একটি সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশে বন্যা একটি পুনরাবৃত্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ হওয়ায় এর ক্ষতি পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যায়। এজন্য বন্যা ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি কার্যকর পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

বাংলাদেশে বন্যা দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রথমত নদী ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত নদী ড্রেজিং ও পলি অপসারণের মাধ্যমে নদীর নাব্যতা বজায় রাখতে হবে, যাতে অতিরিক্ত পানি সহজে প্রবাহিত হতে পারে। একই সঙ্গে নদী তীর সংরক্ষণ, পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ ও স্লুইস গেটের আধুনিকায়নের মাধ্যমে বন্যার পানি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে এসব অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া খাল-বিল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার করে প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বন্যাপ্রবণ এলাকায় উঁচু স্থানে বসতি নির্মাণ, বন্যা সহনশীল ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু তৈরি এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। একই সাথে কৃষিক্ষেত্রে বন্যা সহনশীল ফসলের চাষ বৃদ্ধি এবং কৃষকদের জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। এতে বন্যার সময় খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখা সম্ভব হবে।

তৃতীয়ত, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো দরকার। স্যাটেলাইট তথ্য ও পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নয়ন করে আগাম সতর্কতা প্রদান করা গেলে মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পাশাপাশি বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তথ্য দ্রুত জনগণের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

চতুর্থত, সামাজিক সচেতনতা ও জনসম্পৃক্ততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় জনগণকে বন্যা ঝুঁকি, নিরাপদ আশ্রয়, উদ্ধার কার্যক্রম ও স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় করা হলে দুর্যোগ মোকাবিলা আরও কার্যকর হবে।

অন্যদিকে, বন্যার পূর্বপ্রস্তুতির ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বন্যার আগেই আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুদ করা, গবাদিপশুর নিরাপদ স্থান নির্ধারণ করা এবং গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সুরক্ষিত স্থানে রাখা জরুরি। এছাড়া নদী ও খালের বাধা অপসারণ, পানি নিষ্কাশনের পথ পরিষ্কার রাখা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে আগাম স্থানান্তরের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে বন্যা মোকাবিলায় শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নই যথেষ্ট নয়; বরং প্রাকৃতিক, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত দিক সমন্বয় করে একটি সমন্বিত ও টেকসই ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

ড. নাজমুন নাহার : সহযোগী অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়