বিজ্ঞাপন

শিশুর অনিরাপদ শৈশব

শিশুর অনিরাপদ শৈশব

বাংলাদেশ উন্নয়নের নানা সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে-অবকাঠামো বিস্তৃত হচ্ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, ডিজিটাল সংযোগ বাড়ছে, নগরায়ণ ত্বরান্বিত হচ্ছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত মানদণ্ড কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নির্ধারিত হয় না। সেই রাষ্ট্র তার শিশুদের কতটা নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, মর্যাদা ও সুরক্ষা দিতে পারছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই জায়গায় এসে বাংলাদেশের বাস্তবতা উদ্বেগজনক।

শিশুমৃত্যু, যৌন সহিংসতা, শারীরিক নির্যাতন, শিশুশ্রম, অপুষ্টি, মানসিক চাপ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতার মতো ঘটনাগুলো এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং বিস্তৃত সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নীতিমালা, শিশু আইন, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার-সবকিছু থাকার পরও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের প্রতি সহনশীলতা ও সংবেদনশীলতা সামাজিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

শিশুদের জন্য বাংলাদেশ দিন দিন আরও অনিরাপদ হয়ে উঠছে। যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন ও মানসিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে প্রায় প্রতিদিন। উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, এসব অপরাধের বড় অংশ সংঘটিত হচ্ছে শিশুদের সবচেয়ে পরিচিত ও বিশ্বাসের জায়গাগুলোয়।

আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, শিক্ষক, পরিবহনকর্মী কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই বারবার উঠছে নির্যাতনের অভিযোগ। ফলে যে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিশুর নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করা হয়, অনেকক্ষেত্রেই সেখানে শিশুরা ভয় ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ সাম্প্রতিক বছরগুলোয় গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু ধর্ষণ, বলাৎকার, শারীরিক নির্যাতন এবং রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় একাধিক শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে প্রকাশ্যে আসা ঘটনাগুলোই পুরো বাস্তবতা নয়।

শিশু অধিকারকর্মীদের মতে, সামাজিক লজ্জা ও চাপ, প্রতিষ্ঠানের প্রভাব এবং বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় অসংখ্য পরিবার নীরব থাকতে বাধ্য হয়। ফলে বহু নির্যাতনের ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়, আর অপরাধীরা থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় বাধ্যতামূলক মনিটরিং, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং স্বাধীন তদন্ত কাঠামো জরুরি হয়ে উঠেছে।

বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয় না। তবে সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানে যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত শিশু অধিকারভিত্তিক সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ৩০৮জন শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে ১৪.৬১ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ছিলেন শিক্ষক। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শিশুদের ওপর সহিংসতার বড় অংশ ঘটছে পরিচিত ও ক্ষমতাধর পরিবেশে। মানবাধিকার সংগঠন ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ বলেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসে দেশে ৩০৬জন শিশুকন্যা ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে আরও ১২৯জন শিশু। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মর্মান্তিক বিষয় হচ্ছে, নির্যাতিত শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকের বয়স মাত্র পাঁচ বা ছয় বছরের মধ্যে। অর্থাৎ শৈশবের নিরাপত্তাও এখন আর সুরক্ষিত নয়।

আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, শিক্ষক, পরিবহনকর্মী কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই বারবার উঠছে নির্যাতনের অভিযোগ। ফলে যে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিশুর নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করা হয়, অনেকক্ষেত্রেই সেখানে শিশুরা ভয় ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যৌন সহিংসতা কেবল শারীরিক অপরাধ নয়, এটি শিশুর মানসিক জগতকে দীর্ঘমেয়াদে ভেঙে দেয়। নির্যাতনের শিকার অনেক শিশু আতঙ্ক, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভেতর দিয়ে বড় হয়। কেউ কেউ পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, কেউ স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে না। অথচ অধিকাংশ  ক্ষেত্রেই পরিবার ও সমাজ শিশুর মানসিক পুনর্বাসনের চেয়ে ঘটনাটি গোপন রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।

এই বাস্তবতা শুধু আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা নয়, এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের সম্মিলিত নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। শিশু সুরক্ষাকে কেবল সেমিনার, বিবৃতি কিংবা আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক কেন্দ্রে কার্যকর নজরদারি, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, নিয়মিত মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা এবং অপরাধীদের দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

একই সঙ্গে পরিবারগুলোরও শিশুদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা ভয় বা লজ্জা ছাড়াই নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলতে পারে। কারণ শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ নিশ্চিত করা না গেলে কোনো উন্নয়নই প্রকৃত মানবিক উন্নয়ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না।

সমস্যাটি কেবল যৌন সহিংসতায় সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের প্রতি সহিংস আচরণ এখনো অনেক ক্ষেত্রে ‘শাসন’ হিসেবে নিয়ে থাকে। স্কুলে অপমান, মারধর, ভয়ভীতি কিংবা মানসিক চাপ প্রয়োগকে অনেক অভিভাবক ও শিক্ষক স্বাভাবিক মনে করেন। এ ব্যাপারে আগেই বলা হয়েছে যে শিশু মনোবিজ্ঞান বলছে, দীর্ঘমেয়াদি ভয় ও অপমান শিশুর আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে, সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করে এবং পরবর্তী জীবনে মানসিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ায়।

স্বাস্থ্যখাতেও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব সেই দুর্বলতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে হাম ও হাম-সদৃশ উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা ৩০০ ছাড়িয়েছে এবং আক্রান্ত হয়েছে কয়েক হাজার শিশু। বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, স্বাস্থ্যসেবার অসমতা, সচেতনতার অভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। সুশীল সমাজের অনেকে বলেছেন এই ঘটনা স্পষ্টভাবে অবহেলাজনিত শিশুমৃত্যু।

এটা শুধুমাত্র একটি রোগের প্রাদুর্ভাব নয়। এটা শিশুস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন। কারণ হাম এমন এক রোগ, যা কার্যকর টিকাদানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। বাংলাদেশ একসময় টিকাদানে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ছিল। অথচ আজ প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এখানে স্পষ্ট যে দেশে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ধারাবাহিকতা ও নজরদারিতে গুরুতর ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

অপুষ্টিও বাংলাদেশের শিশুদের জন্য গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি সংকট। যদিও দুই দশকে শিশুস্বাস্থ্যের কিছু সূচকে অগ্রগতি হয়েছে, তবু পুষ্টিহীনতা এখনো দেশের লাখো শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। ইউনিসেফ, বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে খর্বাকৃতি, কম-ওজন এবং তীব্র পুষ্টিহীনতার হার  এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দারিদ্র্য, খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, মাতৃপুষ্টির ঘাটতি এবং পুষ্টিকর খাদ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা- এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশ Multiple Indicator Cluster Survey (MICS) ২০২৫-এর প্রাথমিক প্রতিবেদনে শিশু পুষ্টিকে দেশের অন্যতম বড় উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে দেখা গেছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী বিপুলসংখ্যক শিশু এখনো খর্বাকৃতি, কম-ওজন ও কৃশতা বা শীর্ণতার সমস্যায় ভুগছে। ইউনিসেফ, বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউএইচওর যৌথ Child Malnutrition Estimates-ও সতর্ক করেছে যে দক্ষিণ এশিয়ায় শিশু অপুষ্টি এখনো বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক বেশি।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা। গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোয় এখনো অনেক শিশু প্রতিদিন প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার পায় না। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের খাবারের তালিকায় প্রাণিজ আমিষ, দুধ, ডিম, ফল বা সবজির পর্যাপ্ত উপস্থিতি থাকে না। ফলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, শৈশবের অপুষ্টি শিশুর ভবিষ্যৎ শিক্ষা, কর্মক্ষমতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।

অন্যদিকে শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর ভিন্ন ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন, মোবাইল ও স্ক্রিনে অতিরিক্ত আসক্তি, খেলাধুলার অভাব এবং প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থার চাপে শিশুদের মানসিক সুস্থতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিশুদের অবসর, খেলাধুলা ও পারিবারিক যোগাযোগের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে একদিকে যেমন অপুষ্টি ও খাদ্যঘাটতি আছে, অন্যদিকে তেমনি বাড়ছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, স্থূলতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি। অর্থাৎ বাংলাদেশের অনেক শিশুই এখন দুই ধরনের সংকটের মুখোমুখি-অপুষ্টি ও মানসিক চাপের দ্বৈত বাস্তবতায় তাদের শৈশব ক্রমেই সংকুচিত ও অনিরাপদ হয়ে পড়ছে।

...সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের শিশুরা। গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোয় এখনো অনেক শিশু প্রতিদিন প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার পায় না। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের খাবারের তালিকায় প্রাণিজ আমিষ, দুধ, ডিম, ফল বা সবজির পর্যাপ্ত উপস্থিতি থাকে না।

শিশুশ্রমও বাংলাদেশের জন্য এক গভীর সামাজিক ব্যর্থতা। আইনগত নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এখনো লাখ লাখ শিশু শ্রমে নিয়োজিত। তারা কাজ করছে কারখানায়, পরিবহন খাতে, ওয়ার্কশপে, হোটেলে, বাসাবাড়িতে। অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, শিক্ষা ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তার সীমাবদ্ধতা এবং তদারকির দুর্বলতা শিশুশ্রম কমানোর পথকে কঠিন করে তুলেছে।

এই বাস্তবতার পেছনে গভীর সামাজিক সংকট থেকে গেছে। শিশুকে এখনো পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখার সংস্কৃতি আমাদের সমাজে শক্তিশালী হয়নি। পরিবারে শিশুর মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া, তাদের আবেগকে তুচ্ছ বা তাচ্ছিল্য করা, ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা এখনো ব্যাপক। ফলে শিশুরা অনেক সময় নিজেদের নিরাপত্তাহীনতা বা নির্যাতনের কথা প্রকাশ করার সাহস পায় না।

শিশুবান্ধব রাষ্ট্র কেবল আইন দিয়ে তৈরি হয় না। শিশুবান্ধব রাষ্ট্র তৈরি হয় সামাজিক আচরণ, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিক সংস্কৃতির মাধ্যমে। সেখানে শিশুকে ‘ছোট’ নয়, পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিরাপদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, খেলাধুলার পরিবেশ, নির্যাতনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার এবং সামাজিক সংবেদনশীলতা- সবকিছু মিলেই শিশুবান্ধব সমাজ গড়ে ওঠে।

বাংলাদেশে শিশু অধিকার নিয়ে আইন আছে, নীতিমালা আছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও আছে। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল। শিশু নির্যাতনের বিচার দীর্ঘ হয়, তদন্তে গাফিলতি থাকে, অনেক প্রতিষ্ঠান নিজেদের সুনামের কথা ভেবে ঘটনা গোপন করার চেষ্টা করে। ফলে ভুক্তভোগী শিশু আরও অসহায় হয়ে পড়ে।

এখন প্রয়োজন শিশুর জন্য প্রয়োজনকে উন্নয়ন নীতির কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত করা। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করতে হবে। আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও হোস্টেলগুলোতে স্বাধীন তদারকি জোরদার করতে হবে। শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে পরিবার পর্যায়ে শিশুদের প্রতি সহনশীল ও মানবিক আচরণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

কারণ যেকোনো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেই রাষ্ট্রে শিশুরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে বড় হচ্ছে তার ওপর। যে সমাজ তার শিশুদের রক্ষা করতে পারে না, তাদের সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে না, সেই সমাজের উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি আধুনিক, মানবিক ও টেকসই রাষ্ট্র হতে চায়, তাহলে শিশুদের প্রশ্নকে আর প্রান্তিক ইস্যু হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। শিশুবান্ধব রাষ্ট্র গঠন এখন কেবল নৈতিক দায় নয়। এটা জাতীয় উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতি এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার অপরিহার্য শর্ত।

দীপু মাহমুদ : কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী
[email protected]