বিজ্ঞাপন

উন্নত দেশের শিল্প কাঠামো ও বাংলাদেশে এর প্রয়োগ কৌশল

উন্নত দেশের শিল্প কাঠামো ও বাংলাদেশে এর প্রয়োগ কৌশল

শিল্পায়নের ইতিহাস কেবল নীরস পরিসংখ্যান বা যান্ত্রিক অগ্রগতির গল্প নয়; এর ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে আছে অদ্ভুত সব ঐতিহাসিক ঘটনা এবং রোমাঞ্চকর কিছু মুহূর্ত, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে বদলে দিয়েছিল। শিল্প বিপ্লবের শুরুতে ইংল্যান্ডের লর্ডরা যখন প্রথম বাষ্পচালিত ইঞ্জিন দেখলেন, অনেকে একে ‘শয়তানের রথ’ ভেবে ভয়ে পালিয়েছিলেন।

আবার আমেরিকার ফোর্ড কোম্পানি যখন প্রথম গাড়ি তৈরি শুরু করে, তখন ঘোড়া চালকরা আন্দোলন করেছিল এই ভেবে যে, যন্ত্রের গতির কাছে তাদের জীবিকা হারাবে। জাপানের শিল্পায়নের শুরুতে পশ্চিমা টাই বা স্যুট পরাকে ভাবা হতো এক ধরনের বিশেষ বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লব!

রসিকতার ছলে বলা হয়, রাশিয়ার ভারী শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছিল তাদের প্রচণ্ড শীতকে জয় করার জেদ থেকে—ঘরকে গরম রাখার প্রযুক্তি খুঁজতে গিয়েই তারা হয়ে ওঠে ভারী প্রকৌশলের ওস্তাদ। চীন আবার বিশ্বকে অবাক করেছে তাদের ‘কপি-পেস্ট’ বা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে, যা শেষ পর্যন্ত উদ্ভাবনের মহাসড়কে গিয়ে মিশেছে।

এই প্রতিটি গল্পের পেছনে ছিল এক একটি শক্তিশালী ‘মডেল’। আমেরিকা, জার্মানি, জাপান, রাশিয়া এবং চীন এই পাঁচটি দেশ আজ বিশ্ব অর্থনীতি শাসন করছে তাদের নিজস্ব এবং স্বতন্ত্র শিল্প কাঠামোর জোরে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য এই পাঁচটি মডেলের সমন্বয়ে একটি ‘হাইব্রিড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্রেমওয়ার্ক’ বা মিশ্র শিল্প কাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

আমাদের যাত্রার প্রথম ও প্রধান ভিত্তি হওয়া উচিত উদ্ভাবন-নির্ভরতা, যা মূলত আমেরিকার সিলিকন ভ্যালির ‘ইনোভেশন-ড্রিভেন মডেল’। এই মডেলে বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাগার হলো শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। এখানে ল্যাবের একটি ছোট্ট উদ্ভাবনকে ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল’-এর আর্থিক ঝুঁকিতে দ্রুততম সময়ে বৈশ্বিক ব্যবসায় রূপান্তর করা হয়।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয়, যেমন বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ন্যানো-টেকনোলজি বা কেমিক্যাল সিন্থেসিসের গবেষণা হচ্ছে, সেগুলো শিল্পের ‘বীজ’ হিসেবে ব্যবহারের সময় এসেছে। আমরা যদি সাধারণ সুতি কাপড়ের বদলে ল্যাবে তৈরি ‘স্মার্ট ফ্যাব্রিক’ বা ‘হাই-পারফরম্যান্স স্পোর্টসওয়্যার’ তৈরি করতে পারি, তবে রপ্তানি আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

তবে এখানে একটি সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ হলো বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো থিওরি-নির্ভর। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে যে, গবেষণার সাথে যখন বাজার বা ইন্ডাস্ট্রি যুক্ত হয় না, তখন মেধা পাচার বা ‘ব্রেইন ড্রেন’ অনিবার্য হয়ে ওঠে। জরুরি ভিত্তিতে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার অফিস’ স্থাপন করতে হবে এবং গবেষণার খরচ শিল্পখাত বহন করলে তাদের বিশেষ কর ছাড়ের মতো সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে।

উদ্ভাবনের পর আসে উৎপাদন প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন ও সঠিক বিন্যাস, যেখানে জার্মানির ‘ইন্ডাস্ট্রি ৪.০’ এবং জাপানি ‘সাপ্লাই চেইন ইন্টিগ্রেশন’ মডেল আমাদের পথ দেখাতে পারে। জার্মান মডেলে অটোমেশন, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের মাধ্যমে নিখুঁত উৎপাদন নিশ্চিত করা হয়।

অন্যদিকে, জাপানি মডেলে বড় কারখানার চারপাশে অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে ওঠে, যারা ‘জাস্ট ইন টাইম’ পদ্ধতিতে যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অপরিকল্পিত শিল্পায়ন। বিক্ষিপ্তভাবে কারখানা স্থাপনের ফলে লজিস্টিক খরচ যেমন বাড়ে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

তাই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় একই ধরণের শিল্পকে কেন্দ্রীভূত করে ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টারিং’ বা স্মার্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা অপরিহার্য। উদাহরণস্বরূপ, একটি বিশেষ অঞ্চলে যদি শুধু অটোমোবাইল বা ইলেকট্রনিক্স শিল্প থাকে এবং সেখানেই যদি নাট-বোল্ট থেকে শুরু করে মাইক্রোচিপ তৈরির সব কারখানা থাকে, তবে লজিস্টিক খরচ ৩০-৪০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এটি কেবল উৎপাদনশীলতা বাড়াবে না, বরং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় শিল্পের অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলবে।

শিল্পের এই বিশাল চাকা সচল রাখতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং শক্তিশালী অবকাঠামো। এখানে রাশিয়ার কৌশলগত ভারী শিল্প ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা মডেলটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। রাশিয়ার মডেলে রাষ্ট্র কৌশলগত খাতগুলোর (জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, ধাতুবিদ্যা) নিয়ন্ত্রক ও প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট নিরসনে এবং ভারী শিল্পের ভিত্তি স্থাপনে ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প’ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। রুশ প্রযুক্তির এই ব্যবহারের মাধ্যমে কেবল ২,৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নয়, বরং আমাদের স্থানীয় প্রকৌশলীদের যে উচ্চতর কারিগরি প্রশিক্ষণ হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে নিজস্ব ভারী প্রকৌশল শিল্প গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।

তবে এখানে সমালোচনা হলো প্রযুক্তি নির্ভরতা যেন কেবল আমদানিতে সীমাবদ্ধ না থাকে। রাশিয়ার মডেল থেকে আমাদের শিখতে হবে কীভাবে রাষ্ট্রীয় তদারকিতে সার কারখানা, খনিজ উত্তোলন এবং স্টিল মিলের মতো খাতগুলো শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো যায়। জ্বালানি নিরাপত্তা ছাড়া শিল্পায়ন কেবল একটি দিবাস্বপ্ন; তাই রূপপুরের মতো প্রকল্পগুলো সঠিক সময়ে সম্পন্ন করা এবং এর কারিগরি জ্ঞানকে স্থানীয়করণ করা অত্যন্ত জরুরি।

উৎপাদনের বিশালতা বা ‘স্কেল’ অর্জনে চীনের ‘গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং’ মডেল আমাদের দ্বিতীয় কোনো বিকল্প রাখে না। চীন যেভাবে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল  ব্যবহার করে বিশ্বের সরবরাহ চেইন দখল করেছে এবং ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে প্রযুক্তিকে রপ্ত করেছে, বাংলাদেশকেও সেই পথে দ্রুত হাঁটতে হবে।

বিশেষ করে আমাদের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পে আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর প্রায় ৯০ শতাংশ নির্ভরতা রয়েছে। চীনা মডেলের মতো ‘ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ’ নিশ্চিত করতে এপিআই পার্কগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর কোনো বিকল্প নেই। নীতিনির্ধারকদের প্রতি পরামর্শ হলো বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সময় কেবল সস্তা শ্রম নয়, বরং ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার’ বা প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্ত বাধ্যতামূলক করা উচিত।

চীন আজ যে প্রযুক্তিতে এগিয়ে, তার মূলে ছিল বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে দক্ষতা অর্জনের সেই কৌশল। আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে কেবল পণ্য উৎপাদনের কারখানা না বানিয়ে আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনের স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

তবে এইসব বৈশ্বিক মডেলের সফল বাস্তবায়ন একটি গভীর সংকটের মুখোমুখি হবে যদি না আমরা আমাদের শিল্প ব্যবস্থাপনায় আমূল সংস্কার আনি। বাংলাদেশের অধিকাংশ শিল্প ব্যবস্থাপনা এখনও পারিবারিক উত্তরাধিকার ও সনাতন পদ্ধতির ওপর দাঁড়িয়ে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে ‘স্মার্ট ম্যানেজমেন্ট’ বা তথ্য-নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া চালু করা জরুরি।

কারখানায় সেন্সর ও আইওটি ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও পানির অপচয় রোধ করতে হবে। একটি সমালোচনামূলক সত্য হলো, আমাদের শিল্পখাতে দক্ষ মধ্যম সারির ব্যবস্থাপকের অভাব রয়েছে, যার ফলে আমাদের বিদেশি বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হয়। নীতিনির্ধারকদের উচিত ব্যবস্থাপনায় কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন পেশাদার সিইও বা ম্যানেজারদের নিয়োগ দেওয়ার সংস্কৃতি উৎসাহিত করা এবং প্রশাসনিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’কে বাস্তবে রূপ দেওয়া।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই মডেলগুলো বাস্তবায়নে নীতিনির্ধারকদের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেওয়া হলো:

১. শিক্ষা ও শিল্পের একীভূতকরণ: সাধারণ শিক্ষার চেয়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারখানার চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল তৈরি না হলে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশ অভিশাপে পরিণত হবে।

২. রাষ্ট্রীয় সিড ফান্ড গঠন: আমেরিকার মডেলে তরুণ বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনী প্রকল্পের জন্য রাষ্ট্রকে ‘প্রুফ অব কনসেপ্ট’ ফান্ড বা প্রাথমিক মূলধন জোগান দিতে হবে। মেধার কদর না করলে কোনো আধুনিক অবকাঠামোই কাজে আসবে না।

৩. জ্বালানি বৈচিত্র্য: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি সৌর ও বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রাশিয়ার সম্পদ ব্যবস্থাপনা মডেলে রাষ্ট্রীয় বড় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

৪. সহজ অর্থায়ন ও কর কাঠামো: ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো জাপানি মডেলে বড় শিল্পের সাপ্লাই চেইন হিসেবে গড়ে তুলতে তাদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ এবং বিশেষ ট্যাক্স হলিডের ব্যবস্থা করতে হবে।

৫. প্রশাসনিক সংস্কার: শিল্প স্থাপনের অনুমতি থেকে শুরু করে কাঁচামাল আমদানি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দুর্নীতি ও দীর্ঘসূত্রতা রোধ করতে ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে।

পরিশেষে, শিল্পায়ন মানে কেবল চিমনি দিয়ে ধোঁয়া ওঠা কারখানা বা জিডিপি প্রবৃদ্ধির সংখ্যা নয়; এটি একটি জাতির সক্ষমতা, জ্ঞান এবং আত্মমর্যাদার প্রতিফলন। আমেরিকার উদ্ভাবন, জার্মানির নিখুঁত উৎপাদন, জাপানের সাপ্লাই চেইন, চীনের বিশালতা এবং রাশিয়ার কৌশলগত সক্ষমতা-এই পাঁচটি স্তম্ভের সঠিক সংমিশ্রণই পারে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করতে।

নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে যে, আমরা যদি আজ এই আধুনিক বৈশ্বিক মডেলগুলো অনুসরণে দেরি করি, তবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে আমরা কেবল বাজার হয়েই থাকব, নির্মাতা হতে পারব না। গবেষণাগারের ন্যানো-পার্টিকেল যখন রাষ্ট্রীয় সুরক্ষায় আধুনিক কারখানায় প্রক্রিয়াজাত হয়ে বিশ্ববাজারে শ্রেষ্ঠ পণ্য হিসেবে সমাদৃত হবে, তখনই আমাদের শিল্পায়নের সার্থকতা। সময় এখন কঠোর সিদ্ধান্তের গবেষণাগারই হোক কারখানার কাঁচামাল যোগানদাতা, আর কারখানার মুনাফাই হোক আগামীর গবেষণার অবিনাশী জ্বালানি। এই চক্রটি সচল করাই হোক আমাদের জাতীয় শিল্পের লক্ষ্যমাত্রা।

ড. মো. আসাদুজ্জামান : অধ্যাপক, ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়