ক্যান্সার শুধু একটি রোগের নাম নয়; এটা একটা পরিবার, একটা সমাজ এবং একটা রাষ্ট্রের জন্য গভীর মানবিক পরীক্ষা। একজন মানুষ যখন ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, তখন শুধু তার শরীর নয়, অর্থনীতি, পরিবার, মানসিক শক্তি এবং সামাজিক নিরাপত্তাও ভেঙে পড়ে। চিকিৎসার খরচ এত বেশি যে অনেক পরিবার জমি বিক্রি করে, ঋণ নেয়, সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করে, কখনো চিকিৎসা মাঝপথে থামিয়ে দেয়। এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন তোলে, চিকিৎসা যদি মানুষের জন্য হয়, তাহলে মানবতা কোথায়?
ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় বেশি হওয়ার কিছু বাস্তব কারণ আছে।
প্রথমত, ক্যান্সার নির্ণয় নিজেই ব্যয়বহুল। বায়োপসি, প্যাথলজি, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, পিইটি স্ক্যান, রক্ত পরীক্ষা, হরমোন রিসেপ্টর বা মলিকিউলার টেস্ট-এসবের প্রতিটি ধাপ রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য জরুরি। কিন্তু একজন সাধারণ রোগীর জন্য এই পরীক্ষাগুলোর খরচ অনেক সময় অসহনীয় হয়ে ওঠে।
অপরদিকে, ক্যান্সার শনাক্তকরণে বা চিকিৎসায় সব ব্যয় অনিবার্য নয়। সিটি স্ক্যান, এমআরআই, পিইটি স্ক্যান-এসব পরীক্ষা চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার, কিন্তু এগুলো সব রোগীর জন্য সবসময় প্রয়োজনীয় নয়। পরীক্ষা তখনই করা উচিত, যখন তার ফল রোগীর চিকিৎসা সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বাস্তব পরিবর্তন আনবে। রোগীর পকেট থেকে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষার টাকা নেওয়া শুধু অর্থনৈতিক অন্যায় নয়, এটি চিকিৎসা-নৈতিকতারও প্রশ্ন। মানবিক ক্যান্সার সেবা মানে হলো-সঠিক রোগীর জন্য সঠিক পরীক্ষা, সঠিক সময়ে, সঠিক কারণে।
ক্যান্সার চিকিৎসায় আরেকটি নির্মম বাস্তবতা হলো, অনেক পরিবার চিকিৎসা শুরুর আগেই নিঃস্ব হয়ে যায়। রোগ নির্ণয়ের নামে একের পর এক পরীক্ষা, স্ক্যান, বায়োপসি, রিপোর্ট যাচাই, শহরে যাতায়াত ও থাকার খরচ-এসব মিলিয়ে রোগী যখন অবশেষে চিকিৎসকের টেবিলে চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য বসেন, তখন তার পরিবারের হাতে আর চিকিৎসার অর্থ থাকে না। অথচ রোগ নির্ণয়ের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত চিকিৎসার পথ খুলে দেওয়া, চিকিৎসার আগেই রোগীকে অর্থহীন করে ফেলা নয়। তাই ক্যান্সার সেবায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্রেও ন্যায্যতা, যুক্তি ও মানবিকতা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, ক্যান্সারের ওষুধের দাম অত্যন্ত বেশি। কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, হরমোন থেরাপি-এসব চিকিৎসা অনেক সময় মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর চলতে পারে। কিছু ওষুধ বিদেশ থেকে আসে, কিছু ওষুধ পেটেন্টের কারণে ব্যয়বহুল, আবার কিছু ক্ষেত্রে বাজারে প্রতিযোগিতা কম থাকায় দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকে।
তৃতীয়ত, ক্যান্সার চিকিৎসা কখনো একজন চিকিৎসকের কাজ নয়। এখানে সার্জন, মেডিকেল অনকোলজিস্ট, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, প্যাথলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট, নার্স, টেকনিশিয়ান, কাউন্সিলর, প্যালিয়েটিভ কেয়ার কর্মী-সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। এই বহুমাত্রিক সেবার জন্য দক্ষ জনবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। ফলে চিকিৎসার কাঠামোগত ব্যয়ও বেশি।
ক্যান্সার চিকিৎসার ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি নীরব কারণ হলো আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় জ্ঞান, গবেষণা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক গাইডলাইন, গবেষণার ফলাফল এবং মাল্টিডিসিপ্লিনারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি যদি দুর্বল থাকে, তাহলে চিকিৎসক অনেক সময় নিজের ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেন না। তখন রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা পরিকল্পনায় অতিরিক্ত পরীক্ষা, স্ক্যান এবং রেফারেলের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। এটি সবসময় চিকিৎসকের ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; বরং এটি একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা। চিকিৎসককে দোষারোপ নয়, তাকে জ্ঞান, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, দলগত সিদ্ধান্ত ও নৈতিক সহায়তায় শক্তিশালী করাই মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার দায়িত্ব।
কিন্তু ব্যয়ের এই ব্যাখ্যা মানবতার প্রশ্নকে মুছে দিতে পারে না। কারণ চিকিৎসা শুধু বাজারের পণ্য নয়; এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। একজন দরিদ্র মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে তার কষ্ট কি কম? একজন গ্রামের মা, একজন কৃষক, একজন দিনমজুর, একজন শিশু-তাদের জীবন কি কম মূল্যবান? চিকিৎসার দরজায় এসে যদি অর্থই প্রধান পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আমরা সভ্যতার কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি?
আমাদের দেশে ক্যান্সার চিকিৎসার আরেকটি বড় সমস্যা হলো সেবা শহরকেন্দ্রিক। গ্রামের মানুষকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় বা বড় শহরে যেতে হয়। হাসপাতালের বিলের বাইরে থাকে যাতায়াত, থাকা, খাবার, কর্মহীনতা, পরিবারের সদস্যের সময় ও আয় হারানো। ফলে প্রকৃত খরচ হাসপাতালের রসিদের চেয়ে অনেক বেশি। তাই অনেক পরিবার চিকিৎসার আগেই অর্থনৈতিকভাবে ভেঙে পড়ে।
এই সংকটের সমাধান শুধু দান বা সহানুভূতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রয়োজন একটি মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক সমাজ, দাতা সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় সমাজ-সবাইকে একসঙ্গে ভাবতে হবে কীভাবে ক্যান্সার চিকিৎসা মানুষের কাছে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য করা যায়।
প্রথমত, প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্তকরণ বাড়াতে হবে। যত আগে ক্যান্সার ধরা পড়বে, চিকিৎসা তত সহজ ও তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল হতে পারে। গ্রাম পর্যায়ে সচেতনতা, স্ক্রিনিং, রেফারেল ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্যান্সার ও এনসিডি সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে। সব সেবা রাজধানীতে কেন্দ্রীভূত রাখলে দরিদ্র মানুষের জন্য চিকিৎসা বাস্তবে অপ্রাপ্য থেকে যাবে।
তৃতীয়ত, ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত জেনেরিক ওষুধের ব্যবহার, স্বচ্ছ মূল্য তালিকা এবং দরিদ্র রোগীদের জন্য বিশেষ সহায়তা তহবিল গঠন জরুরি। হাসপাতালগুলো চিকিৎসার পাশাপাশি সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থাও রাখতে হবে।
চতুর্থত, ক্যান্সার চিকিৎসাকে শুধু রোগের চিকিৎসা হিসেবে দেখা যাবে না। এটি পরিবারভিত্তিক, সমাজভিত্তিক এবং মানবিক সহায়তার বিষয়। একজন রোগীর পাশে কাউন্সিলিং, পুষ্টি পরামর্শ, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, প্যালিয়েটিভ কেয়ার এবং মানসিক সমর্থন থাকা দরকার।
মানবতা মানে শুধু বিনামূল্যে চিকিৎসা নয়। মানবতা মানে রোগীকে সম্মান করা, দরিদ্র মানুষকে অপমান না করা, খরচের বিষয়ে স্বচ্ছ থাকা, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা না দেওয়া, রোগীকে সত্য বলা, পরিবারের সঙ্গে সহমর্মিতার ভাষায় কথা বলা। মানবতা মানে- ‘আপনার টাকা নেই, তাই চিকিৎসা নেই’-এই নিষ্ঠুর বাক্যকে স্বাস্থ্যব্যবস্থা থেকে মুছে ফেলা।
ক্যান্সার চিকিৎসা ব্যয়বহুল হতে পারে, কিন্তু মানবতা ব্যয়বহুল নয়। সহমর্মিতা, সততা, ন্যায্যতা এবং দায়িত্ববোধের কোনো আমদানি খরচ নেই। আমাদের দরকার এমন একটি ক্যান্সার সেবা দর্শন, যেখানে বিজ্ঞান থাকবে, কিন্তু তার সঙ্গে থাকবে মানুষের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
ক্যান্সার চিকিৎসা ধনীদের বিশেষ সুবিধা হতে পারে না। এটি প্রতিটি মানুষের অধিকার। যে সমাজ তার অসুস্থ মানুষকে একা ফেলে দেয়, সে সমাজ উন্নত হতে পারে না। আর যে সমাজ দরিদ্র রোগীর পাশে দাঁড়ায়, সেই সমাজই সত্যিকার অর্থে মানবিক।
রেজা সেলিম : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আমাদের গ্রাম ক্যান্সার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, রামপাল, বাগেরহাট
