বিজ্ঞাপন

আচারে-বিচারে ঈদ আসে

আচারে-বিচারে ঈদ আসে

বাঙালির জীবনে উৎসবের শেষ নেই। অন্যদিকে, বাঙালি উৎসবপ্রিয় জাতিও বটে। সামান্য আনন্দ-উৎসবের সম্ভাবনা দেখলে সেখানে দল বেধে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঙালির পুরোনো অভ্যাস। আর কিছু কিছু উৎসব তো একেবারে অবধারিত, যেমন কোরবানির ঈদ।

বছর বছর ঈদ আসে ধর্মীয় উৎসবের মোড়কে। কিন্তু ঈদ কি কেবল ধর্মীয় উৎসব? সেরকম হলে ঈদে কেবল ইবাদত হতো, কোরবানি হতো, হতো না কোলাকুলিও। আমরা যেমনটা শুনে আসছি, ‘বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্যের মধ্যে দিয়ে ঈদুল আজহা পালিত হলো’—সত্যিই কি ঈদ উৎসবে আছে কেবলই ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য? বরং ঈদ উৎসবে আছে নানান আচার-অনুষ্ঠান। এই আচারগুলো ছাড়া পালনকারীর কাছে ঈদ হয়ে যাবে পানসে।

কোরবানি ঈদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পশু কোরবানি দেওয়া। ধর্মীয় কাহিনি থেকে মানুষ ত্যাগের যে প্রতিচ্ছবি পায়, সেই ত্যাগই নিজের জীবনে চর্চা করতে চায়। বলাবাহুল্য ধার্মিক থাকতে হলে তাকে তা করতে হয়। বাংলাদেশে মানুষ তাই পশু কোরবানির বিষয়ে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। প্রতি বছর কোরবানির ঈদে পশু কোরবানি এখানকার রেওয়াজ।

অদ্ভুত বিষয় হলেও সত্য যে, এই তো এশিয়ারই আরেক মুসলিম দেশ মালয়েশিয়া, যেখানে মানুষ মনে করে ধর্মীয় আচারের মাধ্যমে তার সম্পূর্ণ জীবনে মাত্র একবার কোরবানি অবশ্যপালনীয় করা হয়েছে। কেউ যদি বারবার তা করতে চান তবে তিনি তা করতেই পারেন, কিন্তু অবশ্যপালনীয় মাত্র একবার। অথচ বাংলাদেশিসহ আরও বহু দেশের মুসলিমদের বিশ্বাস কোরবানি প্রতি বছরই করতে হবে। এর মাধ্যমে মানুষ যেমন আত্মত্যাগের চরম মহিমায় পৌঁছে যান, তেমনি তার মনের ক্ষোভ-দুঃখ-লালসা থেকে মুক্ত হন। সোজা কথায় যাকে বলে, মনের পশুকে কোরবানি দেওয়া।

মানুষ কোরবানির মাধ্যমে লোভ-লালসা-হিংসা-বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয় কি না সেটা বিচার্য বিষয়, তবে মানুষ যে কোরবানিকে একটা প্রতিযোগিতামূলক আচারে পরিণত করেছে সেটা চোখের সামনে দৃশ্যমান। কোরবানির ঢের আগে থেকে শুরু হয় গরুসহ অন্যান্য কোরবানির যোগ্য পশুর আমদানি ও বেচাকেনা। সবচেয়ে বড় গরু কেনা এখন আচার। সংখ্যায় কে কতগুলো গরু কোরবানি দিলো, এই নিয়ে জোর আলোচনাও এখন আচার। আর হাল আমলে শুরু হয়েছে গরু-ছাগল ছাড়াও, ভেড়া, উট ইত্যাদি কোরবানি। এই গ্রাহকেরা সমাজের সবচেয়ে উচ্চস্তরে অবস্থান করেন।

ধর্মীয় দিক দিয়ে কোরবানির মাংস গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু কোরবানি ঈদ এলেই বড় বড় ফ্রিজের ব্যবসা বেড়ে যায়। এই উপলক্ষে নিত্যনতুন ফ্রিজের নকশার আবির্ভাব ও ফ্রিজ কিনলে নানান লাভালাভের কথা কোম্পানিরা জানান। মানুষ যদি মাংস বিলিয়েই দেবে, তাহলে এত এত ফ্রিজ প্রয়োজন পড়ে কেন? যা হোক, কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে নতুন ও আরও বড় ফ্রিজ কেনার আচার এখন স্বাভাবিক বিষয়।

একসময় এই ঈদকে বলা হতো বকরি ঈদ। কারণ এতে মধ্যবিত্ত মূলত বকরি কোরবানি দিত। রোজার ঈদ বা ঈদুল ফিতরে মানুষ যেমন নতুন পোশাক কেনে, কোরবানির ঈদে সেটা কিনত না। প্রকৃতপক্ষে স্বল্প আয়ে আর পোশাক শিল্পের উত্তরণের আগে মানুষের হাতে কোরবানির পশু কেনার পরে আর অন্য কিছুর জন্য টাকা থাকত না। কিন্তু এখন দেখা যায় কোরবানি ঈদেও বাজারে কাপড়চোপড়ের রমরমা ব্যবসা। তাই কোরবানির ঈদে নতুন পোশাক নতুন আচারই বটে।   

এখন আরেক আচার হয়েছে কোরবানি ঈদকে ঘিরে, তা হলো, পশু কেনাবেচা আর কোরবানির সময় আসন্ন হলেই পশু কোরবানির বিরুদ্ধে এক দল মানুষ খেপে যায়। তারা তখন পশুদের প্রতি দরদে সারাদিন পশুহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলতে থাকেন। বলাবহুল্য তাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষ সারা বছর জুড়ে মাংস ভক্ষণ করে, কিন্তু চোখের সামনে রক্তারক্তি দেখলে তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন।

পশুহত্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক কথা, কিন্তু সারাবছর লাখ লাখ পশু যে হত্যা হয়েই চলেছে এবং মুসলিম হিসেবে আমরা যে নিরামিষভেজি আচারে অভ্যস্ত নই, তা ওইসময়ে অনেকেই ভুলে যান। তাদের দুঃখকে দ্বিগুণ করে তুলতে তখন ফটোশপে রাস্তায় রক্তের বন্যা বয়ে যাওয়ার ছবি দেখতে পাওয়া যায়। তাই দেখে তাদের হতাশার সীমা থাকে না, আবার ঈদের মাংস ভক্ষণও থামে না।

তবে, হ্যাঁ, বাড়ির সামনে সামনে পশু কেটে, চামড়া ছিলে, রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়ে, বাতাসসহ পুরো পরিবেশকে দূষিত করার অধিকার কারও নেই। কিন্তু আচারের চাপে সারা দেশের লোকেরা সেটাই মেনে নিয়েছেন আর করে চলেছেন। ঈদ উপলক্ষে সিটি কর্পোরেশন পশু কাটার সুনির্দিষ্ট জায়গা ও ব্যবস্থা করে থাকে, কিন্তু সেখানে বলতে গেলে কাউকেই গিয়ে কোরবানি দিতে দেখা যায় না। এ-ও কোরবানি ঈদের আচারেরই অংশ।                

ঈদের সময়ে গ্রামের বাড়িতে ফেলে আসা পারিবারিক সদস্যদের কাছে ফেরা বাঙালির চিরন্তন আচার। রোজার ঈদের সময়ে যদিও ঈদ শেষে মানুষ বলতে গেলে দ্রুতই কর্মস্থলে ফেরে। কিন্তু কোরবানির ঈদ কিছুটা ভিন্ন। বহু মানুষ স্থায়ী ঠিকানা থেকে অস্থায়ী আবাসে ফিরতে বেশ দেরিই করে।

বিশেষ করে নিম্নবিত্ত মানুষেরা। তারা নিজের বাড়ির আশেপাশে বহু উৎসব-আনন্দে সামিল হয়। তবে ঈদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বড় শহরে কাজের জায়গা থেকে নিজ শহর বা গ্রামে পৌঁছানো। ঈদের ছুটি শুরুর তারিখ জেনে পরিবারের জন্য বাস বা ট্রেনের টিকেট পাওয়া এক বিরাট প্রতিযোগিতায় জেতার মতো।

অনলাইনে ট্রেনের টিকেট চেষ্টা করতে না করতেই শেষ, স্টেশনে লম্বা লাইন, বাসস্ট্যান্ডে ধরনা দেওয়া আর মহাসড়কে ১২-১৩ ঘণ্টার যানজট, কোনো কিছুই ঈদে আপন মানুষদের কাছে ফেরার তৃষ্ণাকে দমাতে পারে না। তবে সড়কে অতিরিক্ত গাড়ি, আর বাড়ি ফেরার নেশায় অতিরিক্ত যাত্রীর চাপসহ বেপরোয়া গতি প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটায়। অনেক দুর্ভাগা মানুষ আর কখনোই প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারে না।

ঈদ প্রকৃতপক্ষে ধর্মীয় উৎসব হলেও এর আচার বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন। যেমন, মালয়েশিয়া বা ইন্দোনেশিয়ার কথা ধরা যাক। ঈদকে মালয়েশিয়ায় বলে ‘হারি রায়া’ কিংবা ‘আইদুল ফিতরি’। আমরা যেমন বলি ‘ঈদ মোবারক’, তারা বলে ‘সালামত হারি রায়া’। আমাদের দেশের মানুষদের মতোই এখানকার লোকদের জীবনেও ঈদকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি দেখা যায়। পুরো রোজার সময়টায় সেই প্রস্তুতি আরও বেশি চোখে পড়ে।

শহরের রাস্তায়, দোকানপাটে লোকে লোকারণ্য। ইমারতগুলোর দিকে তাকালে দিনের এক তো রাতের আরেক সাজসজ্জা। আলোকসজ্জা ওখানকার মানুষদের খুব পছন্দ। উপশহর বা শহর থেকে দূরবর্তী এলাকায়ও একই দৃশ্য, আলো আর রঙের প্রাচুর্য। ঈদকে সামনে রেখে তারা নিজেদের বাড়িঘরও নানারকম বাতি দিয়ে সাজায়। আমাদের দেশে বিয়ে বাড়িতে যেমন ছোটো বাতি দিয়ে সাজানোর রীতি দেখতে পাওয়া যায়।

আবার বলা যায় খ্রিস্টানপ্রধান দেশে যেভাবে বড়দিনের সময়ে বাড়িগুলো সাজে। তবে এখানে কেবল বাতির নকশা নয়, বাড়ির চারপাশে একের পর এক মশাল মাটিতে গেড়ে রাখা হয়। মশালগুলোর আগুনের জায়গায় একরকমের ইলেকট্রিক বাতি থাকে যা আগুনের শিখার মতো কেঁপে কেঁপে জ্বলে। দূর থেকে দেখতে অবিকল জ্বলন্ত মশালের মতো।

এ আবার বলতে গেলে আফ্রিকান সাজ। ঈদ এলেই দোকান থেকে মশাল কিনে এনে তারা বাড়ির চারদিকে খুঁটির মতো এক সারিতে দাঁড় করিয়ে রাখে। পাশে রাখে কেটে আনা আস্ত কলাগাছ। এছাড়া, অনেক বাড়িতে সারি করে প্রদীপ জ্বালতে দেখা যায়। সে আবার আমাদের এ অঞ্চলের হিন্দুদের পূজার সাজসজ্জা। প্রদীপে, মশালে আর ছোট বাতির মিটমিট করা আলোয় একেকটা বাড়ি রাতের অন্ধকারে অপূর্ব একেকটা দ্বীপের মতো। ঈদের কয়েকদিন আগে-পরে তাদের এই আলোকসজ্জা অব্যাহত থাকে।

ঈদের দিনের সকালটা শুরু হয় নামাজ দিয়ে। ছেলে বা মেয়ে, প্রত্যেকেই ঈদের নামাজ মসজিদে পড়তে যায়। কাছের বা দূরের নির্দিষ্ট মসজিদে যায় তারা। প্রত্যেকটি মসজিদে ছেলেদের আর মেয়েদের একসঙ্গে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা আছে। তাছাড়া, মেয়েদের জন্য পর্দায় ঘেরা জায়গা আছে। কারও ইচ্ছে হলে পর্দার আড়ালে গিয়েও নামাজ পড়তে পারে। মসজিদের সামনে ড্রেস কোড (বিশেষত কাপড়ের দৈর্ঘ্য) ছবি দিয়ে ঝোলানো থাকে।

কারও গায়ে অন্য ধরনের পোশাক থাকলে সে মসজিদে সংরক্ষিত পোশাক নিয়ে নিজের কাপড়ের ওপরে পরে নেয়। তবে এমনিতেও আপাদমস্তক আবৃত মেয়েদেরও দেখা যায় নামাজের আগে নিজের কাপড়ের ওপরে মসজিদের সেই জোব্বাটা পরে নিয়েছে। নামাজ শেষ হতেই সেটা খুলে সুন্দর করে ভাঁজ করে ঠিক জায়াগায় রেখে তারা বেরিয়ে পড়ে।

তবে কেউ যদি সেটা না পরে, কেবল ড্রেস কোড মেনে নিজস্ব পোশাকে তাদের মাঝখানে বসে নামাজ পড়ে, তাতে তাদের কোনো আপত্তি নেই। নানান জাতি-গোষ্ঠীর সঙ্গে বেড়ে ওঠার যে সহনশীলতা বা উদারতা তাদের ব্যবহারে দেখা যায় তা সত্যি মুগ্ধ হওয়ার মতো। ঈদের নামাজ শেষে তারা কোলাকুলির জন্য হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে।

বাড়ির সামনে বা এখানে-ওখানে পশু কোরবানির কোনো রেওয়াজ সেখানে নেই। কিন্তু মানুষেরা খুবই ধার্মিক। ঈদের দিন বা তার পরের দিনটিকে যে যার সুবিধামতো ‘ওপেন হাউজ’ ঘোষণা করে। তার মানে সেদিন সে বাড়িতে থাকবে আর তার বাড়ি সারাদিন থাকবে সবার জন্য উন্মুক্ত। আত্মীয়-বন্ধু যে কেউ যে কোনো সময়ে সেখানে গিয়ে খেয়ে আর আড্ডা দিয়ে আসতে পারে।

সাধারণত বাড়ির বাইরের গেটের পর থেকেই খাবার দাবার সাজিয়ে রাখার রীতি। বাইরের বারান্দায় শুকনো খাবার আর নানা রঙের সরবত সাজিয়ে রাখে তারা। রান্না করা খাবার বাসার ভেতরের টেবিলের ওপরে রাখা থাকে। আমাদের দেশে যেমন ঈদের কিছু বিশেষ খাবার আছে, যেমন সেমাই বা লাচ্ছা সেমাই, বিশেষ ধরনের মিষ্টি, কোরমা-পোলাও, সেরকম তাদেরও নিজস্ব কিছু খাবারের রীতি আছে।

যেমন, মুন কেক; ছোট্ট আকৃতির নকশাদার কেক, যা তারা বাড়িতেও বানায় আবার পুরো রোজার সময়টাতে দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। অনেকটা আমাদের দেশের ছোটো কোনো পিঠার মতো। কেউ নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে বাড়িতে বানায়, কেউবা দোকান থেকে কিনে এসে সাজিয়ে রাখে। আরেক রকমের কেক আছে কাগজের মতো পাতলা অসংখ্য স্তরের। প্রতিটি স্তর ভিন্ন রঙের।

‘পানদান’ নামের এক পাতার গন্ধ বা স্বাদ তারা তাদের কেকের মধ্যে খেতে পছন্দ করে। স্বাদ-গন্ধের দিক দিয়ে সেটা অনেকটা নারকেলের মতো তবে রঙ হালকা সবুজ। নারকেলেরও প্রচুর ব্যবহার দেখা যায়। নারকেল আর লেমন গ্রাসে তিন-চার ঘণ্টা ভাপে রেখে রান্না করা মুরগি বা গরুর মাংস তাদের উৎসবের প্রধান তরকারি। একে বলে ‘র‌্যানড্যাং’।

এতদিন মালয়েশিয়ার উৎসবে অংশ নিতে নিতে এটাই আমার প্রিয় খাবার হয়ে উঠেছে। তবে প্রায় সব খাবারেই লবণ-মরিচের পাশাপাশি চিনির ব্যবহার অবধারিত। এই ব্যাপারটাকে প্রায়ই উপেক্ষা করতে পারি না; তবে করতে পারলে ঈদের দিনে তাদের বাড়ির খাবারগুলো মজারই। তাদের রান্নার উপাদান আর পদ্ধতিতে যেমন আছে চাইনিজ রান্নার প্রভাব তেমনই আছে ভারতীয় স্বাদ-গন্ধের মৃদু উপস্থিতি। আর তাতে তাদের নিজস্ব পছন্দ নারকেল-পানদান-চিনি মিলেমিশে আমাদের বাঙালি মুখে অনেক সময় জগাখিচুড়ির মতো লাগাটাও অস্বাভাবিক নয়।

রান্নার উপাদানের যে ফিউশন পদ্ধতি এখন পৃথিবীব্যাপী জনপ্রিয়, তার মধ্যে মালয়েশিয়ার লোকেরা সম্ভবত বহু বছর ধরে অভ্যস্ত। আর পানীয়ের ক্ষেত্রে এমনিতেও নানান ধরনের ঠান্ডা সরবত খাওয়া তাদের প্রতিদিনের অভ্যাস। ঈদ উপলক্ষে এর ব্যাপ্তি আরও বাড়ে। এইসব পানীয়ের মধ্যে তারা মাত্রাতিরিক্ত চিনি আর খাবারের রঙ মেশায়। অথচ মুখে নিয়ে কখনো চমকে উঠতে হয় যে, তাদের ফিরনি বা পায়েস জাতীয় খাবারে চিনি প্রায় নেই, কখনোবা সেখানে কিঞ্চিত লবণ মেশানো।

এক জাতের কচি বাঁশের ভেতরে চাল আর নারকেলের দুধ মিশিয়ে রান্না করা ভাত ঈদের সময় তারা তরকারির সঙ্গে পরিবেশন করে। বাঁশের ভেতরে রান্না করা এই ভাত এত জনপ্রিয় যে ঈদের মৌসুমে রাস্তার ধারে ধারে বিক্রি হতে দেখা যায়। সবমিলিয়ে তাদের আতিথেয়তা অসাধারণ।

বরাবর যন্ত্রের মতো কাজে ব্যস্ত থাকলেও ঈদের দিন থেকে পরের দুটো দিন তাদের অতিথি আপ্যায়ন আর আনন্দ-উল্লাস দেখবার মতো ব্যাপার। এমনিতেও মানুষে মানুষে সামাজিক ভেদাভেদজনিত অনুভূতির উপস্থিতি তাদের মধ্যে কম, ঈদের সময়ে প্রত্যেকের অমায়িক ব্যবহার পরিবেশকে আরও বেশি আনন্দময় করে তোলে।                

পৃথিবীতে যতই হানাহানি লেগে থাকুক, বছর ঘুরে চাঁদের ঘূর্ণনে রোজা বা ঈদ ঠিকই সময়মতো হাজির হয়, কারও তাকে বরণ করার পরিস্থিতি থাকুক বা না-থাকুক। তাই তো গাজায় মসজিদের ধ্বংসস্তূপের কোনো এক হেলে যাওয়া পাটাতনের ওপরে বসে সামান্য পানি-খাদ্যে এক দল লোকের ইফতারের দৃশ্য আমাদের সামনে আসে।

ওদিকে রোজার সাধনার মধ্যে ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে মুহুর্মুহু মিসাইল পড়ে। ধর্মীয় ভাব-গাম্ভীর্য আর সংকল্পের প্রতিজ্ঞা, কোনো কিছুই হামলা আর পাল্টা হামলার নেশা থেকে মানুষকে বিরত করতে পারে না। অস্তিত্বের লড়াই কখনো ধর্মীয় সংকল্পের চেয়েও বড়; আবার ধর্মই এমন এক সামাজিক উপাদান, যার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির কারণেও মানুষ যুদ্ধের আগ্রাসনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে জীবন বা সামাজিকতার তাগিদ এত বড় যে, যুদ্ধে মিসাইলের পর মিসাইলে বিলীন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও ওই অঞ্চলের মানুষের মাঝেও দুদিন পরে ঈদের আনন্দ ছুঁয়ে যাবে।

একইভাবে যুদ্ধের ভয়াবহতায় জ্বালানি তেলের বা ভাড়ার উচ্চমূল্য ঈদে প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়া ঠেকাতে পারবে না। কারণ রোজা একা পালন করতে পারলেও ঈদ কিছুতেই একা পালন করার নয়। একাকী বা পরিবারহীন মানুষের জন্য ঈদের উৎসব এক শাস্তির মতো, যেহেতু ঈদ যতটা ধর্মীয়, তার চেয়েও বেশি সামাজিক।

তবে মানুষ যে অবস্থাতেই থাকুক, জীবনের বহু ঈদের স্মৃতি তাকে নাড়া দেয় বা পরিচালনা করে। শৈশব-কৈশোরে কাটানো ঈদের মধুর স্মৃতিই তাকে ঈদ উপলক্ষে হাজার বাধা অতিক্রম করে জন্মস্থানে বা প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়ার তাগিদ দেয়, যে তাগিদ উপেক্ষা করা কঠিন। এই আচারই আমাদের জীবনচক্র।

আফসানা বেগম : কথাসাহিত্যিক; পরিচালক, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র