১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে ২৮ মে ২০২৬। ১০০ দিন। সাফল্য আর ব্যর্থতার মিশেলে বর্তমান সরকারের পথচলা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নতুন সরকারের প্রথম ১০০ দিনকে বলা হয় “দিকনির্দেশনার সময়”। এই সময়েই বোঝা যায় সরকার কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন এনেছে, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনায়ও নতুন সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সক্ষমতা রাখে। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্ষেত্রেও সেই মূল্যায়ন এখন জনমনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়। জনগণ যেমন পরিবর্তনের আশা নিয়ে নতুন সরকারকে দায়িত্ব দিয়েছে, তেমনি তারা এখন খুঁজছে বাস্তব সাফল্য, দৃশ্যমান উদ্যোগ এবং প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন কোনো সরকারের প্রথম ১০০ দিন সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়কে বলা হয় সরকারের কর্মদক্ষতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা যাচাইয়ের প্রাথমিক মানদণ্ড। বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জনগণের উচ্চ প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব নেওয়া এই সরকারের প্রথম ১০০ দিনের কার্যক্রম এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, জনমত ও গণমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রে।
প্রথম ১০০ দিনে সরকারের কিছু উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধানও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে এই সময়কে একদিকে আশার সূচনা, অন্যদিকে অসম্পূর্ণতার বাস্তব চিত্র— দু’দিক থেকেই মূল্যায়ন করতে হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে— এই ১০০ দিনে সরকার কি সত্যিই জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হয়েছে? নাকি পরিবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা এখনো বাস্তবতার পরীক্ষায় পূর্ণতা পায়নি?
প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে একটি পরিবর্তনের আবহ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিনের সংঘাতময় রাজনীতির পর তুলনামূলক সংলাপমুখী পরিবেশ, প্রশাসনে কিছু সংস্কার উদ্যোগ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার অঙ্গীকার সাধারণ মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীল আচরণ এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার বার্তা জনগণের কাছে ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকার দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টানতে বাজার তদারকি, আমদানি প্রক্রিয়ায় সহজীকরণ, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির প্রতিশ্রুতি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা আস্থা ফিরিয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সংকট মোকাবিলায় জরুরি পরিকল্পনা গ্রহণ এবং কৃষিখাতে প্রণোদনা বৃদ্ধির উদ্যোগও প্রশংসিত হয়েছে।
তবে বাস্তবতা হলো— জনগণের প্রত্যাশা ছিল আরও বড়, আরও দ্রুত এবং আরও দৃশ্যমান পরিবর্তন। কারণ সাধারণ মানুষ কেবল রাজনৈতিক পালাবদল চায় না; তারা চায় জীবনের পরিবর্তন। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম এখনো নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় সৃষ্টি হয়নি। শিল্পখাতে বিনিয়োগের গতি ধীর, আর ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটেনি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা এলেও মাঠপর্যায়ে তার দৃশ্যমান প্রয়োগ এখনো সীমিত।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও সরকারের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। কিছু এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। জনগণ আশা করেছিল নতুন সরকার দ্রুত সুশাসনের শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলবে; কিন্তু বাস্তবতায় এখনো অনেক জায়গায় পুরোনো সংস্কৃতির প্রভাব স্পষ্ট।
অন্যদিকে পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা দৃশ্যমান। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ সরকারকে কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় করেছে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা আরও জোরদার করা জরুরি।
গণমাধ্যমের ওপর চাপ কমানোর প্রতিশ্রুতি এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সরকারের ইতিবাচক অবস্থান সাংবাদিক সমাজ ও নাগরিকদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— জনগণ এখন প্রতিশ্রুতির চেয়ে ফলাফল দেখতে চায়। রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, তারা চায় বাজারে স্বস্তি, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার। তাই প্রথম ১০০ দিনকে চূড়ান্ত সফলতা বা ব্যর্থতার মানদণ্ড বলা না গেলেও এটুকু বলা যায়, সরকার আশার আলো জ্বালাতে পেরেছে; কিন্তু সেই আলোকে স্থায়ী আস্থায় রূপ দিতে হলে আরও কার্যকর, দৃশ্যমান ও জনমুখী পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রথম ১০০ দিন তাই কেবল শুরু। সামনে দীর্ঘ পথ। আর সেই পথের সফলতা নির্ভর করবে সরকার কতটা জনগণের ভাষা বুঝতে পারে, কতটা দ্রুত সমস্যার বাস্তব সমাধান দিতে পারে এবং কতটা আন্তরিকভাবে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারে তার ওপর।
বিএনপি সরকারের যে ব্যর্থতাগুলো জনগণকে হতাশ করেছে কিংবা নতুন সরকার প্রত্যাশা পূরণে জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারেনি, নিচে তা উল্লেখ করা হয়েছে :
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সাফল্যের অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। জনগণের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা ছিল বাজারে স্বস্তি ফিরে আসবে। কিন্তু বাস্তবে চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ দৃশ্যমান হলেও কার্যকর ফল এখনো সীমিত।
কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ধীরগতি তরুণ বা যুবসমাজকে বিক্ষুব্ধ করে তুলতে পারে। যুবসমাজ দ্রুত চাকরির সুযোগ ও নতুন বিনিয়োগ প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু শিল্পখাতে নতুন কর্মসংস্থান এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় হয়নি। শিক্ষিত বেকারদের হতাশা রয়ে গেছে।
দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের বাস্তব প্রয়োগ দুর্বল প্রতীয়মান। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা থাকলেও মাঠপর্যায়ে এখনো বড় ধরনের দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পুরোনো অনিয়ম ও প্রভাবশালী চক্রের আধিপত্য পুরোপুরি ভাঙা যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উদ্বেগ কাটাতে ব্যর্থতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিছু এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। জনগণ দ্রুত সুশাসনের প্রত্যাশা করলেও বাস্তবতায় এখনো দুর্বলতা স্পষ্ট। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় সৃষ্ট মব জাস্টিস এখন পর্যন্ত সরকার সমূলে ধ্বংস করতে পারেনি। যা সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসা ব্যবস্থাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলেছে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা প্রদান কর্মসূচি প্রক্রিয়ার দুর্বলতার কারণে। শিশুদের হাম কিংবা হামের উপসর্গের প্রাদুর্ভাবের কারণে সারাদেশে প্রায় ছয় শতাধিক শিশুর প্রাণহানি চিকিৎসা ব্যবস্থার দিকে অঙ্গুলি প্রদর্শন করতে বাধ্য হচ্ছে দেশের জনগণ।
প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্তহীনতা ভুগছে সরকার। নতুন সরকারকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা ছিল সাহসী ও দ্রুত সিদ্ধান্ত। কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের ধীরগতি এবং সমন্বয়হীনতা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি সংকট নিরসনে কিংবা জ্বালানি বিতরণে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে কালক্ষেপণ হয়েছে।
জনগণের প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
বাংলাদেশের জনগণ এখন আর শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনে সন্তুষ্ট নয়। তারা চায় অর্থনৈতিক স্বস্তি, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা এবং ন্যায়ভিত্তিক প্রশাসন। বিএনপি সরকার প্রথম ১০০ দিনে কিছু ইতিবাচক বার্তা দিতে সক্ষম হলেও সাধারণ মানুষের জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট নয়।
তবে এটিও সত্য— দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সংকট, অর্থনৈতিক চাপ এবং রাজনৈতিক বিভাজনের বাস্তবতায় কোনো সরকারই অল্প সময়ে সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। কিন্তু জনগণ অন্তত একটি শক্তিশালী দিকনির্দেশনা দেখতে চায়, যেখানে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল থাকবে।
প্রথম ১০০ দিন কোনো সরকারের পূর্ণ মূল্যায়নের সময় নয়, বরং এটি ভবিষ্যতের ইঙ্গিত। বর্তমান বিএনপি সরকার কিছু ক্ষেত্রে আশার সঞ্চার করেছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে হতাশাও বাড়িয়েছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— সরকার কি এই প্রাথমিক সাফল্যকে টেকসই রূপ দিতে পারবে? নাকি ব্যর্থতার পুরোনো চক্রেই আটকে যাবে?
ইতিহাস বলে, কোনো সরকারই শুধু রাজনৈতিক স্লোগানে দীর্ঘস্থায়ী জনসমর্থন ধরে রাখতে পারে না। জনগণের আস্থা অর্জনের একমাত্র পথ হচ্ছে সুশাসন, অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র পরিচালনা। বর্তমান সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ— প্রত্যাশার রাজনীতি থেকে বাস্তব অর্জনের রাজনীতিতে উত্তরণ।
কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত স্লোগানকে নয়, ফলাফলকেই মনে রাখে।
মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট
