বাঙালির সংস্কৃতি ও ইতিহাসের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে আবহমানকাল ধরে জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় সাধিত হয়েছিল। আজও তা বহমান। আর্য্যরা আসার পর এসেছিল গ্রিক, পার্সিয়ানরা। নিজেদের উন্নত সভ্যতা থাকার পরেও অনার্যদের প্রাচীন সংস্কৃতিকে একেবার নির্মূল করতে পারেনি। তেমনিভাবে মুসলিম বিজয়ের পর এবং ইংরেজ শাসনের সময়কালেও বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির এক অভূতপূর্ব সমন্বয় সর্বকালেই ছিল।
তারই ধারাবাহিকতায় বারো মাসে তেরো পার্বণের চমৎকার প্রবাদটি বাঙালির উৎসবমুখর জীবনের বড় পরিচয় হয়ে উঠেছে। ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ঋতুভিত্তিক বৈচিত্র্যে ও উৎসবের সমাহার বাঙালির জীবন প্রক্রিয়ার অংশ।
এইসব উৎসবের আয়োজনে ও অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে যেন বাঙালি জীবনের বেঁচে থাকার চাহিদাও মিলেমিশে থাকে। এর মধ্যে জড়িয়ে থাকে মানুষের ভালো লাগার আর ভালো থাকার আবেগ। প্রাত্যহিক কর্মচঞ্চল জীবনের একঘেয়েমি, ক্লান্তি আর যান্ত্রিকতা দূর করে নতুন কর্মশক্তি ও আনন্দের সঞ্চার করে এই উৎসবগুলো।
মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবগুলোর মধ্যে প্রধানত রয়েছে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। পরিবারের সবাই নতুন জামাকাপড় পরে ঈদগাহ বা মসজিদে গিয়ে ঈদের নামাজ পড়ে। আয়োজন হয় সেমাই, ফিরনি, কোরমা, পোলাওয়ের। ঈদুল ফিতর বাঙালির সর্বজনীন আনন্দের উপলক্ষ হিসেবে উদযাপন করা হয়।
বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব সর্বজনীন শারদীয় দুর্গোৎসব। তার সঙ্গে আছে কালীপূজা, সরস্বতী পূজা, দোলযাত্রা, রথের মেলা ইত্যাদি। বৌদ্ধদের বুদ্ধ পূর্ণিমা ও খ্রিস্টানদের বড়দিনও উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয়। এই উৎসবগুলো ঘিরে বাঙালি মনের নানা সম্মোহন রয়েছে। উৎসবগুলো হয়ে উঠেছে অনিবার্য, বাঙালির জীবনের সঙ্গে গভীর তাৎপর্য নিয়ে নানা ভাবে যুক্ত।
এছাড়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে রয়েছে বাংলা নববর্ষ বরণ বা পহেলা বৈশাখ। এটি বাঙালির প্রধান অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক উৎসব। নতুন ধান কাটার পর ধান থেকে চাল তৈরি করে পিঠেপুলি ও মিষ্টান্ন তৈরি করে যে উৎসব পালিত হয় তাকে বলা হয় নবান্ন উৎসব।
গ্রামবাংলায় ফসল তোলার আনন্দকে ঘিরে আত্মীয় স্বজনের মিলন মেলা, পিঠা উৎসব, লোকজ গান এই সবকিছুতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাঙালির উৎসবের প্রতি জাদুটান। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, পহেলা ফাগুন, লালন উৎসব, বাউল উৎসব, নৌকা বাইচ এইসব ভিন্ন ভিন্ন উৎসব আমাদের নানাভাবে অনুরণিত করে।
উৎসব মানেই যে শুধু আলো, ভিড়, নতুন পোশাকে সজ্জিত মানুষেরা, আর খাবারের গন্ধে ভরপুর সময় তা কিন্তু শেষ কথা নয়। লেখাটি লিখতে অতীতের একটা স্মৃতি মনে পড়ছে। অনেক বছর আগে পহেলা বৈশাখের দুপুরে ঘটনাটি ঘটে ছিল, যা আজও মনে পড়ে।
ভোরে রমনার বটমূল থেকে গান শুনে, চারুকলার র্যালি শেষে হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে এসে পৌঁছেছি ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে। চারদিকে মানুষের ভিড়, মেলা বসেছে, আর রোদের দাপটের মধ্যেও লেকের থেকে ভেসে আসছে মৃদু ঠান্ডা বাতাস।
মেলার এক কোণে দেখি একজন বৃদ্ধ মাটির খেলনা বিক্রি করছেন। তার সামনে ছোট্ট করে সাজানো ঘোড়া, পাখি, বাঁশি আর রঙিন পুতুল। কিন্তু কেউ সেভাবে কিনছে না। শিশুরা পাশ কাটিয়ে চকচকে প্লাস্টিকের খেলনার দোকানে ভিড় করছে। তা দেখে বৃদ্ধের চোখের নীরব হতাশা যেন পুরোপুরি গভীরভাবে গ্রাস করেছিল।
বিষয়টি আমি দেখেছিলাম বলে আমার খুব অস্বস্তি হতে লাগল। আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। বসে একটি বাঁশি হাতে নিলাম। খুব সাধারণ, তবু তার গায়ে লেগে ছিল শিল্পীর হাতের উষ্ণতা। দাম জিগ্যেস করতেই এত কম দাম বললেন যে, যা আমার চিন্তার বাইরে ছিল। আমি সঙ্গে আরও কয়েকটি খেলনা কিনলাম। বৃদ্ধ মানুষটি টাকাগুলো হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর বললেন, ‘আজ সারাদিনে এই প্রথম মনে হলো, আমার কাজটা এখনো পুরোপুরি মরে যায়নি। হাতে গড়া জিনিসের মূল্য এখনো আছে। যদিও জানি এখন আর এসব কেউ নিতে চায় না।’
বৃদ্ধ লোকটি যে সত্যিই একজন শিল্পী এটা ভেবে আমার মন বিষণ্ন হয়ে উঠেছিল। চারপাশে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হচ্ছিল মেলার সব আনন্দের শব্দ যেন থেমে গেছে। ফিরে আসতে আসতে ভাবছিলাম, মানুষটি শুধু খেলনা নয়, এর মধ্যে দিয়ে নিজের সময়, স্মৃতি, শ্রম, শিল্পবোধ সবই বিক্রি করছেন।
যেকোনো উৎসবের দিনে মানুষেরা কেমন বদলে যায়। অনেকদিন কথাবার্তা নেই, এমন মানুষের সঙ্গে হঠাৎ দেখা, কথা হয় না এমন মানুষকে ফোনে শুভেচ্ছা পাঠানো, অভিমান ভুলে একে অপরের বাড়ি যাওয়া, ক্যাফে বা বইয়ের দোকানে আড্ডা জমিয়ে ওঠা এতসবকিছু একসঙ্গে হঠাৎ করে ঘটতে থাকে।
ঈদের উৎসব মানেইতো নতুন জামা আর আনন্দ। মায়ের রান্নাঘরের ব্যস্ততা, প্রতিবেশীদের শুভেচ্ছা, আলিঙ্গন, সালামি, বাবার নীরব হাসি, অভ্যর্থনা, সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার অপেক্ষা, টিভির অনুষ্ঠান দেখা, অন্য বাড়িতে নিমন্ত্রণ খেতে যাওয়া এসব দৃশ্যের ঠাসবুনোট মাথার ভেতর আজন্ম জায়গা করে নেয়।
শহরের উৎসবে থাকে আলোকসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ব্যস্ত রাস্তায় মানুষের ভিড়, ক্যাফে আর রেস্তোরাঁয় জমে ওঠা আড্ডা। আর গ্রামের উৎসবের আনন্দ—খোলা মাঠে, কুয়াশাভেজা সকালে, দূরের মাইকে, পিঠার গন্ধ আর উঠোনভরা মানুষের গল্পে।
উৎসবের সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি। আনন্দ তখনই পূর্ণ হয়, যখন তা ভাগ করে নেওয়া যায়। তাই উৎসব শুধু ক্যালেন্ডারের একটি দিন নয়, এটি মানুষে মানুষে সম্পর্ক, মমতা, সংস্কৃতি আর স্মৃতির এক জীবন্ত সেতুবন্ধন।
আরও পড়ুন
শহরের উৎসবে গানের শিল্পীরা শুধু গান গায় না, তারা মানুষের অনুভূতিগুলি সাবলীলভাবে সঞ্চারিত করে এক জায়গায় এনে যুক্ত করে। তখন তৈরি হয় এক অলৌকিক বোধ যা হাজার মানুষকে একই সুরে, একই প্রাণে শিল্পীর গানের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়। বিষাদগ্রস্ত অসুখী মানুষ নিজেকে পুনরাবিষ্কারের সুযোগ পায়, এই গানের জগতের সঙ্গে একাত্ম হয়ে।
গ্রামবাংলার নবান্ন উৎসবে ঢোলের শব্দ, পালা গান, বাউলগান এসব হচ্ছে মানুষের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যম। সন্ধ্যার পর গ্রামের মাঠে হারমোনিয়াম, একতারা, আর কাঁসরের শব্দ এক ধরনের সম্মিলিত আবহ তৈরি করে। সেখানে গান মানে শুধু বিনোদন নয়, মানুষের জীবন, প্রেম, কষ্ট আর বিশ্বাসের প্রকাশও।
ফিরোজা বেগমের নজরুল গীতি, সন্জীদা খাতুনের সাংস্কৃতিক আন্দোলন, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লার গান, আইয়ুব বাচ্চু বা জেমসের কনসার্ট এইসবই একসময়ে উৎসবের আয়োজনে ও আবেগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। দুর্গাপূজা ও ঈদ উৎসবে প্রকাশিত গানের অ্যালবামের জন্য ভক্তরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতো।
শিল্পীদের জীবনও উৎসবের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। অনেক শিল্পী সারারাত মঞ্চে গান গেয়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটান, অথচ নিজেদের ব্যক্তিগত ক্লান্তি বা দুঃখ আড়াল করে রাখেন। উৎসবের মঞ্চে একটি হাসিমুখের পেছনেও অনেক অদৃশ্য গল্প থাকে। সময়ের প্রেক্ষিতে উৎসবের আলোকসজ্জা নিভে যায়, কিন্তু উৎসবের সন্ধ্যায় শোনো কোনো গান শ্রোতার হৃদয়ে বেঁচে থাকে বহুবছর।
উৎসবকে ঘিরে বাংলা সাহিত্যে অসংখ্য কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লেখা হয়েছে। সাহিত্যে বারবার ফিরে এসেছে বাঙালির জীবনযাপন, ঋতুচক্র, ধর্মীয় আবেগ ও লোকসংস্কৃতির সঙ্গে জমে থাকা মানুষ ও প্রকৃতির নানা রূপ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি প্রকৃতি, মানুষ, সৌন্দর্য ও নতুন বছরের আগমনের উৎসবকে কেন্দ্র করে।
কাজী নজরুল ইসলামের লেখায় উৎসব মানে প্রাণের উচ্ছ্বাস ও সাম্যের ডাক। বাঙালির সব উৎসবকেই তিনি মানুষের মিলন উৎসব হিসেবে দেখেছেন। ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’—এই গান আজও বাঙালির ঈদ উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জসীমউদ্দীনের ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ গ্রামীণ জীবনের উৎসব ও বেদনাকে সাবলীলভাবে মিশ্র আবহে তুলে ধরেছে। উৎসবের ভিড়ের ভেতরেও একজন মানুষ কেমন করে একা হয়ে যায়, সে মানুষের গল্প আছে সৈয়দ শামসুল হকের লেখায়।
আল মাহমুদ তার কবিতায় বলেছেন, ‘ঘরে ঘরে উৎসবের আলো, শিশুর চোখে নতুন চাঁদ, দরিদ্রের ভাঙা উঠোনেও ঈদ নামে অনাবিল সাধ’।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাস ও গল্পতে উৎসব শুধু পটভূমি নয়, চরিত্র, সময় ও সমাজকে বোঝাবার এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। পথের পাঁচালীতে গ্রামের উৎসব, মেলা, পূজা এসবের বর্ণনা অত্যন্ত জীবন্ত।
হাঁসুলি বাকের উপকথা ও পদ্মা নদীর মাঝি একইভাবে উৎসবের ভেতর দিয়ে সমাজের পরিবর্তন ও লোকজ আচার কীভাবে মানুষের বেঁচে থাকার শক্তি হয়ে দেখা দেয় তার প্রগাঢ় রূপটিকে বিন্যস্ত করা হয়েছে। পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসে নদীজীবনের সংগ্রামের ভেতরেও চিত্রিত হয়েছে মানুষের ছোট ছোট আনন্দের রূপ।
হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসে ঈদ ও পারিবারিক উৎসবের আবহ খুব অনিবার্যভাবে এসেছে। উৎসবকে ঘিরে পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, একাকীত্ব, একধরনের মানবিক সরলতায় বর্ণিত হয়েছে। মানুষের অন্তর্জীবনের উন্মোচন, প্রেমবোধ, হারানোর ব্যথা, সমাজের বৈষম্য এই সবকিছুই বাংলা উপন্যাসে নানা উৎসবকে কেন্দ্র করে নানা ভাবে চিত্রিত হয়েছে।
আমাদের প্রতিদিনের জড়তার আর ক্লান্তির দিনকে, উৎসবের দিন এসে ভেঙেচুরে নতুন নির্মাণের দিকে নিয়ে যায়। আমরা তখন নিজেকে মেলাই অন্যের সঙ্গে। আমাদের মিলিত শক্তি তখন আর কোনো স্থবিরতাকে মেনে নিতে চায় না। তা আশ্চর্যজনকভাবে এক বিশাল আনন্দের আবর্তে পরিণত হয়। একাকী মানুষ এক নিমিষেই নিজের ভেতর সেই সম্মিলিত শক্তির আধার খুঁজে পেয়ে নিজে নিজেই বিস্মিত হয়ে ওঠে।
মণিকা চক্রবর্তী : কথাসাহিত্যিক, কবি ও সংগীতশিল্পী
