বাঙালির উৎসব মানেই বিনোদন। বছরের দুটো ঈদ। ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা। এই দুই ঈদে মানুষ আনন্দ চায়। আমার এখনো মনে পড়ে ছোটবেলায় ঘরে বসে ঈদের নাটক দেখার স্মৃতি। এ যেন একটা অন্যতম ঈদের আকর্ষণ ছিল। টেলিভিশনে ঈদের বিশেষ নাটক কেউ মিস করত না।
রাস্তাঘাট মোটামুটি থমথমে হয়ে যেত। অতিথিরা খেতে আসলে তারাও বসে যেত নাটক দেখতে। সেটা ছিল আশির দশকের কথা। তখন বাংলাদেশে একটাই টেলিভিশন। বাংলাদেশ টেলিভিশন। আহা! সেই নাটকগুলো ভোলার মতো না। সাধারণত ঈদের পরের দিন আমরা ঈদের বাংলা ছবি দেখতাম হলে।
সিনেমা হলগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। ঈদের জামা পরে, ঈদের আনন্দ ভাগ করার অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঈদের সিনেমা দেখা। সিনেমা হলের সংখ্যা অল্প ছিল তখন। সিনেপ্লেক্স-এর মতো আরাম, আয়েশ ছিল না। কিন্তু দর্শকের আগ্রহ ছিল। আর ছিল ঈদসংখ্যা পড়ার আনন্দ। মোটামুটি দুর্গাপূজার সময়ও একই চিত্র দেখা যেত।
সময় এখন ২০২৬। এ বছরের রোজার ঈদে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ প্রমাণ করেছে, ভালো চলচ্চিত্রের প্রতি দর্শকের আগ্রহ এখনো অটুট। ছবিটি হলে গিয়ে দেখেননি এমন মানুষের সংখ্যা বাংলাদেশে খুব কম। বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরাও দূরদূরান্ত থেকে হলে গিয়ে দেশের ছবি দেখেছেন।
প্রবাসে এটি যেন তাদের ঈদ উদযাপনের একমাত্র সাংস্কৃতিক অবলম্বন। ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর পাশাপাশি ‘প্রেশার কুকার’, ‘রাক্ষস’, ‘দম’, প্রিন্সসহ কিছু চলচ্চিত্র দর্শকের হৃদয় ছুঁয়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত বাঙালির ঈদ বিনোদনের অংশ হিসেবে সিনেমা হলে ফেরার একটি নতুন প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
উৎসবের বিনোদন নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। আশির দশকে বাংলা চলচ্চিত্রে কালো টাকার প্রভাব বাড়তে থাকে। অশ্লীলতা ও নকলনির্ভর চলচ্চিত্রের কারণে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গৌরবময় ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঠিক সেই সময় প্রয়াত চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবিরের হাত ধরে বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র আন্দোলনের সূচনা হয়। এটি ছিল নকল ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ।
তরুণ নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, মানজারে হাসিন মুরাদ, তারেক মাসুদসহ আরও অনেকে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। অনেক পরে আমরাও সেই ধারার অংশ হই। আমি নিজেও খুব কাছ থেকে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন ও বিকল্প ধারার চলচ্চিত্রচর্চার সঙ্গে জড়িত ছিলাম।
যদিও চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের শুরু সত্তরের দশকে। সেই সময় বাংলা চলচ্চিত্রে ছিল রুচি ও বাণিজ্যের এক সুষম সমন্বয়। ভারত ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের মাধ্যমে বিশ্বসিনেমার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি প্রয়াত মুহম্মদ খসরুকে, যিনি এই আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন। চলচ্চিত্র সংসদগুলোর কাজ ছিল বিদেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং চলচ্চিত্রের তাত্ত্বিক চর্চা।
আমি নিজেও ১৯৯৬-৯৭ সালে প্রথম সারির চলচ্চিত্র সংসদ ‘চলচ্চিত্র ফিল্ম সোসাইটি’-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। জার্মান কালচারাল সেন্টার, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার, আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ ও ভারতীয় হাইকমিশনের সহযোগিতায় আমরা অসংখ্য ধ্রুপদি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করতাম। এর ফলে এক ধরনের সচেতন দর্শকশ্রেণি তৈরি হয়।
আমি মনে করি, এই বিকল্প ধারার আন্দোলন, বিশ্বসিনেমার সঙ্গে পরিচিতি এবং চলচ্চিত্র সংসদগুলোর নিরন্তর চর্চার ফলেই বাংলাদেশে ইন্ডিপেনডেন্ট চলচ্চিত্রের একটি শক্ত ভিত তৈরি হয়েছে। আজ যে স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র ঈদ উৎসবেও ব্যবসাসফল হচ্ছে, তার পেছনে এই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান রয়েছে।
প্রয়াত আলমগীর কবিরের প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম আজও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করে যাচ্ছে। সেখানে অসংখ্য স্বল্পদৈর্ঘ্য ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। পঁয়ত্রিশ বছরে বহু তরুণ-তরুণী এই উৎসবের মাধ্যমে বিশ্বসিনেমার সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। মৃণাল সেন, অপর্ণা সেন, ক্রিস্তফ জানুসিসহ পৃথিবীখ্যাত অনেক নির্মাতা এই উৎসবে অংশ নিয়েছেন।
সত্যি কথা বলতে কি, তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’ থেকে শুরু করে আজকের আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ-এর ‘রেহানা মরিয়ম নূর’, যে চলচ্চিত্র কান চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নেয়, এসবের পেছনেও চলচ্চিত্র সংসদ ও বিকল্প ধারার আন্দোলনের অবদান রয়েছে।
এই ইন্ডিপেনডেন্ট চলচ্চিত্রচর্চার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে নন-ফিকশন বা প্রামাণ্যচিত্র। দীর্ঘদিনের বিকল্পধারার আন্দোলনের ফলেই এ ধারার বিকাশ ঘটেছে।
তবে সময় বদলেছে। এখন পৃথিবীর নানা দেশের ফিকশন ও নন-ফিকশন কনটেন্ট ঘরে বসেই দেখা যায়। ফলে চলচ্চিত্র সংসদগুলোর প্রয়োজনীয়তা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। ক্লাসিক চলচ্চিত্র থেকে শুরু করে আধুনিক সময়ের সেরা ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট সবই এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সহজলভ্য।
বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা হচ্ছে। এর ফলে নতুন এক চলচ্চিত্রবোদ্ধা প্রজন্ম তৈরি হয়েছে। তারা শুধু কাহিনিচিত্র নয়, প্রামাণ্যচিত্র, এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম ও নন-ফিকশন ধারার কাজেও আগ্রহী হয়ে উঠছে। চলচ্চিত্র সংসদগুলোর ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স এবং নিয়মিত প্রদর্শনী প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ভালো চলচ্চিত্রের সংস্পর্শে এনেছে। এর ফলেই স্বাধীনধারার চলচ্চিত্রচর্চার একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
আমি নিজেও একজন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছি। প্রামাণ্যচিত্র দেখা এবং নির্মাণ, দুটোতেই আমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, প্রামাণ্যচিত্র কি বিনোদন? এর কি গল্প বলার নিজস্ব ভঙ্গি আছে? অবশ্যই আছে। বরং চলচ্চিত্রের সূচনাই হয়েছে প্রামাণ্যধর্মী চিত্রের মাধ্যমে। ১৮৯৫ সালে লুমিয়ের ব্রাদার্স যে ছোট ছোট চলমান দৃশ্য প্রথমবার মানুষের সামনে উপস্থাপন করেন, সেগুলো ছিল মূলত তথ্যচিত্রধর্মী।
আরও পড়ুন
একটি ভালো প্রামাণ্যচিত্রও একটি কাহিনিচিত্রের মতোই দর্শককে আনন্দ দিতে পারে, বেদনাহত করতে পারে, ভাবাতে পারে। এতে থাকে গল্প, চরিত্র, নির্মাণশৈলী এবং শক্তিশালী ন্যারেটিভ। পৃথিবীর বড় বড় চলচ্চিত্র উৎসবে ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। এর শিল্পবোধ, স্টাইল এবং ভাষা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিস্তর চর্চা হচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রে অনুদান দিয়ে আসছে। প্রতিবছর সরকারি অনুদানে বেশ কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়। আমি নিজেও ২০২০-২১ অর্থবছরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অনুদানে বাংলাদেশের প্রথম নারী চলচ্চিত্রকার রেবেকাকে নিয়ে ‘বিন্দু থেকে বৃত্ত: একজন বকুলের আখ্যান’ নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছি। ছবিটি বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে প্রদর্শিত হয়েছে এবং মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজিত লিবারেশন ডকফেস্ট-এ জাতীয় বিভাগে স্পেশাল জুরি অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেছে। তবুও সাধারণ মানুষের একটি প্রশ্ন বারবার শুনতে হয়, ‘ছবিটি কোথায় দেখা যাবে?’
এটাই প্রামাণ্যচিত্রের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। নির্মাতাদের নিজস্ব অর্থায়নে প্রদর্শনীর আয়োজন করা সম্ভব হয় না। তাই অনলাইন প্ল্যাটফর্মই হয়ে উঠেছে প্রধান ভরসা। সুখের বিষয়, এখন কিছু ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র প্রদর্শনে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ঈদের মতো বড় উৎসবে কি কোথাও প্রামাণ্যচিত্রের জন্য বিশেষ আয়োজন থাকে?
বাস্তবতা হলো, নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে সরকারি উদ্যোগে কিছু চলচ্চিত্র উৎসবে এসব ছবি দেখানো হয়, কিংবা বিদেশে পাঠানো হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে তার খবরই পৌঁছায় না। ফলে প্রামাণ্যচিত্র এখনো মূলধারার বিনোদনের অংশ হয়ে উঠতে পারেনি।
অথচ প্রতিবছর সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অসংখ্য ভালো ডকুমেন্টারি নির্মিত হচ্ছে। আমরা তার কতটুকু জানি খুব সামান্য।
বছরে দুটি ঈদ, পহেলা বৈশাখ, দুর্গাপূজা এতসব উৎসবের সঙ্গে যদি প্রামাণ্যচিত্রকে যুক্ত করা যায়, তাহলে এটি ভিন্নধর্মী সাংস্কৃতিক বিনোদনের একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। সরকারি অনুদানে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্রগুলো অন্তত উৎসব উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচার করা যেতে পারে। শিল্পকলা একাডেমি বা সিনেপ্লেক্সগুলো সপ্তাহব্যাপী বাছাই করা ডকুমেন্টারি প্রদর্শনের আয়োজন করতে পারে।
হয়তো দর্শকসংখ্যা খুব বেশি হবে না, কিন্তু যারা দেখতে চান, তাদের জন্য তো একটি সুযোগ তৈরি হবে। প্রামাণ্যচিত্র থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া কঠিন। তাই পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া নির্মাতাদের টিকে থাকাও সহজ নয়। তবে আশার কথা হলো, বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি নির্মাতা বিদেশি ফান্ড পেয়ে আন্তর্জাতিক মানের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করছেন এবং বিদেশের চলচ্চিত্র উৎসবে সুনাম কুড়াচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের কাজ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না।
ঈদ উপলক্ষে টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সিনেপ্লেক্সগুলো যদি বিশেষভাবে প্রামাণ্যচিত্র, শর্ট ফিল্ম, এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম এবং স্টুডেন্ট ফিল্ম প্রদর্শনের উদ্যোগ নেয়, তাহলে উৎসবের বিনোদনে এক নতুন মাত্রা যুক্ত হতে পারে। বড় বাজেটের বাণিজ্যিক ছবির পাশাপাশি এ ধরনের কাজও দর্শকের সামনে আসা উচিত।
সবাই হয়তো এসব চলচ্চিত্র পছন্দ করবেন না। কিন্তু যারা দেখবেন, তারা হয়তো নতুন কোনো বিষয় সম্পর্কে আগ্রহী হবেন, নতুনভাবে ভাবতে শিখবেন। ধীরে ধীরে একটি নতুন রুচিবোধও তৈরি হবে।
ঈদের ছুটিতে মানুষ সারা দেশ ঘুরে বেড়ায়। দেশের প্রতিটি জেলায় শিল্পকলা একাডেমিগুলোতে প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের আয়োজন করা যেতে পারে। প্রামাণ্যচিত্র হয়তো কখনো বাণিজ্যিক ছবির মতো ব্যবসাসফল হবে না, কিন্তু মানুষের কাছে পৌঁছানোই তো এর মূল উদ্দেশ্য। আর উৎসবের সময় তার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
উৎসব মানেই বৈচিত্র্য। আমরা যেমন পোশাক, খাবার বা বিনোদনে বৈচিত্র্য চাই, তেমনি চলচ্চিত্রেও কিছু বৈচিত্র্য আসতে পারে। বিশেষ করে এখন, যখন বাংলাদেশের মানুষ আবার পরিবার-পরিজন নিয়ে সিনেমা হলে ফিরছে।
আমার বিশ্বাস, উৎসবের বিনোদনের অংশ হিসেবে নন-ফিকশন ফিল্ম, এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ম এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রকে যুক্ত করা একটি অভিনব এবং সময়োপযোগী ভাবনা। কারণ উৎসব তো শুধু আনন্দের নয়—সংস্কৃতি, রুচি ও সৃজনশীলতাকে একসঙ্গে উদযাপনেরও নাম।
মেহজাদ গালিব : চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সম্পাদক
