বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু দিন রয়েছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়; বরং জাতীয় স্মৃতি, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ইতিহাসের গভীর আবেগের অংশ। ৩০ মে তেমনই একটি দিন। এই দিনে নিহত হন বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সংগঠক এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি সময়, একটি দর্শন এবং একটি রাষ্ট্রচিন্তার প্রতীক হয়ে ওঠে। জিয়াউর রহমান তেমনই এক নাম। স্বাধীনতার বার্তা যার ঘোষণার মাধ্যমে দেশবাসী উদ্বেলিত হয়েছে, সেক্টর কমান্ডার, রাষ্ট্রনায়ক এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা হিসেবে তিনি আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় গভীরভাবে আলোচিত।
তার মৃত্যুবার্ষিকী কেবল একটি রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির দিন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিহাস পুনর্মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ্য।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বড় মোড় তৈরি করে। সেই ঘটনার ৪৫ বছর পেরিয়ে গেলেও ৩০ মে এখনো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেদনা, বিতর্ক, মূল্যায়ন এবং আত্মসমালোচনার দিন হিসেবে স্মরণ করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সৈনিক থেকে রাষ্ট্রনায়ক : জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে রয়েছে তার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার। স্বাধীনতার ঘোষণার ঐতিহাসিক বার্তা পাঠের মাধ্যমে তিনি মুক্তিকামী মানুষের কাছে সাহস ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক অভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রীয় অনিশ্চয়তার সময়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন। সে সময় বাংলাদেশ ছিল অর্থনৈতিক সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রাজনৈতিক বিভাজনে বিপর্যস্ত। এই বাস্তবতার মধ্যেই জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করেন।
বহুদলীয় গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের সবচেয়ে আলোচিত অবদান হলো বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক সংকোচন ও একদলীয় ব্যবস্থার অভিজ্ঞতার পর তিনি রাজনৈতিক বহুমতের সুযোগ তৈরি করেন।
তার শাসনামলে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম চালুর সুযোগ সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সংবাদমাধ্যমের পরিসর এবং গণতান্ত্রিক চর্চার নতুন পরিবেশ তৈরি হয় বলে তার সমর্থকরা মনে করেন।
আজকের বাংলাদেশের বহুদলীয় রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা করতে গেলে জিয়াউর রহমানের নাম অনিবার্যভাবেই সামনে আসে।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা ও রাষ্ট্রচিন্তার নতুন ধারা : জিয়াউর রহমান ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণাকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন। তার এই দর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ভাষা, সংস্কৃতি, ভূখণ্ড, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং জাতীয় স্বাতন্ত্র্যকে সমন্বয় করে একটি বিস্তৃত জাতীয় পরিচয় গঠন করা।
এই ধারণা বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে। সমর্থকদের মতে, এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নকে নতুন মাত্রা দেয়। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এই ধারণা রাজনৈতিক বিভাজনেরও জন্ম দিয়েছে। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই—বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় এটি একটি স্থায়ী বিতর্কের বিষয় হয়ে আছে।
উন্নয়ন, কৃষি ও অর্থনীতিতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি : জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় গ্রামীণ অর্থনীতি ও উৎপাদনমুখী উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন কর্মসূচি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও স্বনির্ভরতার ধারণা সে সময়ে নতুন গতি পায়।
তিনি বেসরকারি খাতের বিকাশ ও উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেন। অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখে রাষ্ট্র পরিচালনার যে বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তা পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। বৈদেশিক সম্পর্কেও তিনি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির দিকে গুরুত্ব দেন।
৩০ মে এক হত্যাকাণ্ড, বহু প্রশ্ন : ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় জিয়াউর রহমান নিহত হন সামরিক অভ্যুত্থানে।
এই ঘটনা শুধু একজন রাষ্ট্রনায়কের মৃত্যু নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। স্বাধীনতার পর বারবার সামরিক হস্তক্ষেপ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক সহিংসতা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক যাত্রাকে দুর্বল করেছে। ৩০ মে সেই অস্থিরতারই এক বেদনাবিধুর স্মারক।
জিয়াউর রহমানের মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক বড় শূন্যতা তৈরি করে। কিন্তু মৃত্যুর পরও তার রাজনৈতিক দর্শন ও প্রতিষ্ঠিত দল দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকে।
আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার নাম উচ্চারিত হয় গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, উন্নয়ন ও রাজনৈতিক সংস্কারের আলোচনায়। তার অনুসারীরা তাকে আধুনিক বাংলাদেশের রূপকারদের একজন মনে করেন।
রাজনৈতিক বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান : বাংলাদেশের রাজনীতিতে জিয়াউর রহমান যেমন একদিকে জনপ্রিয় নেতা, তেমনি বিরোধীপক্ষ তার রাজনৈতিক অগ্রযাত্রায় বিতর্ককে সঙ্গী করেছে। তবে ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়নে এটিও সত্য যে, তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন রাজনৈতিক ধারা তৈরি করেছিলেন।
আজও দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি তার আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে রাজনীতি করছে। অর্থাৎ, তার রাজনৈতিক প্রভাব মৃত্যুর পরও শেষ হয়ে যায়নি।
বর্তমান প্রজন্মের জন্য বার্তা : ৩০ মে শুধু স্মরণ করার দিন নয়; এটি শিক্ষা নেওয়ার দিনও। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে—সংঘাত, প্রতিশোধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই দুর্বল করে।
বর্তমান প্রজন্মের জন্য জিয়াউর রহমানের জীবন থেকে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ— রাজনৈতিক বহুমতের গুরুত্ব, রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের গুরুত্ব, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, আত্মনির্ভর অর্থনীতির চিন্তা, সংকটকালে দৃঢ় নেতৃত্ব ও রাষ্ট্র পরিচালনায় বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি।
পরিশেষে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সৈনিক, রাষ্ট্রগঠনের কঠিন সময়ের নেতা এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা। তার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে, বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির ইতিহাসে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
৩০ মে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের পথচলায় এক গভীর প্রশ্নচিহ্নের সূচনা।
আজ তার মৃত্যুবার্ষিকীতে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নয়; বরং এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা, যেখানে মতভেদ থাকবে, কিন্তু সহিংসতা থাকবে না; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা নয়।
কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—রাষ্ট্র টিকে থাকে সহনশীলতায়, প্রতিহিংসায় নয়। কারণ ব্যক্তি চলে যান, কিন্তু রাষ্ট্রচিন্তা ও ইতিহাসের প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বেঁচে থাকে।
মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট
