বিশ্বজুড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের যাতায়াতের ধরনেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সময় বাঁচানো, দূরত্ব কমানো এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ বৃদ্ধির কারণে আকাশপথ আজ আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। তবে বিমান ভ্রমণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি অদৃশ্য ভয় এখনও কাজ করে। কারণ সড়ক দুর্ঘটনার খবর প্রতিদিনের বাস্তবতা হলেও বিমান দুর্ঘটনা তুলনামূলকভাবে বিরল হওয়ায় তা মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, বাস্তবে আকাশ পরিবহনে দুর্ঘটনার হার অন্যান্য পরিবহনের তুলনায় অনেক কম এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থাগুলোর একটি।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে পরিবহন নিরাপত্তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারালেও বিমান দুর্ঘটনার সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা (আইকাও) এবং আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বহুবার উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রতি মিলিয়ন যাত্রীর হিসাবে বিমান ভ্রমণ সবচেয়ে নিরাপদ পরিবহনগুলোর মধ্যে অন্যতম। কারণ বিমান পরিচালনায় প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়।
আইকাও ও আইএটিএ সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আকাশ পরিবহন এখনও বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ গণপরিবহন ব্যবস্থাগুলোর একটি। আইএটিএ’র ২০২৫ সালের সেফটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রায় ৩ কোটি ৮৭ লাখ ফ্লাইট পরিচালনার মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটেছে মাত্র ৫১টি। অর্থাৎ প্রতি ১০ লাখ ফ্লাইটে দুর্ঘটনার হার ছিল ১.৩২। সহজভাবে বললে, গড়ে প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার ফ্লাইটে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৫ সালে প্রতি ১০ লাখ ফ্লাইটে দুর্ঘটনার হার ছিল ৩.৭২, যা ২০২৫ সালে কমে ১.৩২-এ নেমে এসেছে। অর্থাৎ দুই দশকে বৈশ্বিক এভিয়েশন নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
আইএটিএ আরও জানিয়েছে, ২০২৩ সাল ছিল ইতিহাসের অন্যতম নিরাপদ বছর। সে বছর প্রতি ১২ লাখ ৬০ হাজার ফ্লাইটে মাত্র একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল এবং গড়ে একজন যাত্রীকে প্রতিদিন বিমান ভ্রমণ করলেও একটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার মুখোমুখি হতে প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার বছর সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে, আইকাও’র তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাণিজ্যিক ফ্লাইটে দুর্ঘটনার হার বেড়ে প্রতি ১০ লাখ ডিপার্চারে ২.৫৬-এ দাঁড়ালেও সংস্থাটি স্পষ্টভাবে বলেছে—দীর্ঘমেয়াদে বিমান চলাচল এখনও “সবচেয়ে নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা” হিসেবে বিবেচিত।
সড়ক পরিবহনের দিকে তাকালে বাস্তবতা অনেক ভয়াবহ। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় অসংখ্য প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। অতিরিক্ত গতি, চালকের অসতর্কতা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং আইন অমান্য করার প্রবণতা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। বাংলাদেশেও মহাসড়কগুলোতে প্রায় প্রতিদিনই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। অথচ বিমান চলাচলে প্রতিটি ফ্লাইট পরিচালনার আগে আবহাওয়া, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, পাইলটের প্রস্তুতি, রানওয়ের নিরাপত্তা এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের অনুমোদনসহ বহুস্তরীয় যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করা হয়।
রেল ও নৌপরিবহন তুলনামূলক নিরাপদ হলেও সেখানেও অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অব্যবস্থাপনা ও মানবিক ভুলের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে বিমান পরিবহনে একটি ছোট ত্রুটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। আধুনিক বিমানে ব্যবহৃত প্রযুক্তি এতটাই উন্নত যে, যেকোনো যান্ত্রিক সমস্যা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয়। একইসঙ্গে পাইলট ও কেবিন ক্রুদের প্রশিক্ষণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়।
আকাশপথ নিরাপদ হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো আন্তর্জাতিক নজরদারি। বিশ্বের প্রতিটি দেশের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে পরিচালিত হতে হয়। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর গভীর তদন্ত ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংস্কার। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিমান, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সার্বক্ষণিক নজরদারি, বিমানের রক্ষণাবেক্ষণ থেকে শুরু করে পাইলটের লাইসেন্স নবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি বিষয় কঠোর তদারকির আওতায় থাকে। ফলে এখানে দায়িত্বহীনতার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম।
তবে এটাও সত্য যে, বিমান দুর্ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব অনেক বেশি আলোচিত হয়। কারণ একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে বহু মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা থাকে এবং ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রচারিত হয়। ফলে মানুষের মনে ভয় তৈরি হয় যে বিমান ভ্রমণ ঝুঁকিপূর্ণ। বাস্তবে কিন্তু পরিসংখ্যান উল্টো চিত্র তুলে ধরে। একজন মানুষ সড়কপথে প্রতিদিন যে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করেন, আকাশপথে সেই ঝুঁকি বহুগুণ কম।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও আকাশ পরিবহনের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। দেশের অর্থনীতি, পর্যটন, প্রবাসী যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এভিয়েশন খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নিরাপদ ও আধুনিক বিমান পরিবহন একটি দেশের উন্নয়ন সক্ষমতার প্রতীকও বটে। তাই এই খাতের প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
বিমানবন্দর আধুনিকায়ন, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান অনুসরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরিচালনা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের আকাশপথ আরও নিরাপদ ও বিশ্বমানের হয়ে উঠবে। একইসঙ্গে জনগণের মধ্যেও সচেতনতা তৈরি করতে হবে যে, আবেগ বা আতঙ্ক নয়—তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেই পরিবহন নিরাপত্তা মূল্যায়ন করা উচিত।
সবশেষে বলা যায়, দুর্ঘটনা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সামগ্রিক পরিসংখ্যানই বাস্তবতা তুলে ধরে। আর সেই বাস্তবতা বলছে—আকাশ পরিবহন কেবল দ্রুতগতির নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থা। তাই নিরাপদ ভ্রমণের আস্থায় আকাশপথ আজও আধুনিক সভ্যতার অন্যতম বড় অর্জন।
মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট
