বিজ্ঞাপন

মানবতা কি ক্যামেরার পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে?

মানবতা কি ক্যামেরার পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে?

ঈদের নতুন জামা কিনে আর বাড়ি ফেরা হলো না দেড় বছর বয়সী শিশু সাফওয়ান ওরফে হাসেন এবং তার মায়ের। ঈদকে সামনে রেখে নতুন পোশাক কিনে বাড়ি ফেরার পথে ট্রেনের ধাক্কায় মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারান মা-ছেলে। ২৭ মে রাতে নরসিংদী রেলস্টেশনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

নরসিংদী রেলস্টেশনের সেই মর্মান্তিক দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। তবে ভাইরাল হওয়া দৃশ্যটি আমাদের এক নতুন বার্তা দিচ্ছে। যে ছবিটি আমাদের সামনে এসেছে সেটি আমাদের সময়ের এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

ট্রেনের ধাক্কায় মা ও দেড় বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু, আহত অবস্থায় স্বামীর ছুটে চলা, আর চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য মানুষ- যাদের অনেকের হাতেই ছিল মোবাইল ফোন। কেউ ভিডিও ধারণ করেছে, কেউ ছবি তুলেছে, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, কতজন এগিয়ে এসেছিল সাহায্যের জন্য?

সারা বিশ্বেই প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের আচরণে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে অনেক সময় মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় সাহায্য করা নয়, বরং ঘটনাটি ধারণ করা। যেন বাস্তবতার চেয়ে তার ডিজিটাল রূপটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সমাজবিজ্ঞানী ও মনোবিজ্ঞানীরা এ প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করার জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব দিয়েছেন। ১৯৬৮ সালে মনোবিজ্ঞানী জন এম. ডার্লি এবং বিব ল্যাটানে একসাথে ‘বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট’ তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তাদের মতে, কোনো বিপদে যত বেশি মানুষ উপস্থিত থাকে, ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করার সম্ভাবনা তত কমে যায়। কারণ প্রত্যেকে মনে করে অন্য কেউ নিশ্চয়ই সাহায্য করবে। ফলে দায়িত্ব ছড়িয়ে যায়। কিন্তু কার্যকর সাহায্য আসে না।

নরসিংদীর ঘটনাটি যেন এই তত্ত্বের বাস্তব উদাহরণ। কিন্তু বর্তমান যুগে কেবল ‘বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট’ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। আজকের সমাজে যুক্ত হয়েছে ‘ডিজিটাল বাইস্ট্যান্ডার এফেক্ট’। মানুষ মনে করে, ভিডিও ধারণ করাও এক ধরনের দায়িত্ব পালন। অথচ বাস্তবে আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়া, অ্যাম্বুলেন্স ডাকা কিংবা জনতাকে সংগঠিত করা অনেক বেশি প্রয়োজনীয় কাজ।

সারা বিশ্বেই প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের আচরণে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আমরা এমন এক যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে অনেক সময় মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া হয় সাহায্য করা নয়, বরং ঘটনাটি ধারণ করা। যেন বাস্তবতার চেয়ে তার ডিজিটাল রূপটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জার্মান সমাজবিজ্ঞানী জর্জ সিমেল আধুনিক নগরজীবনের একটি ধারণা দিয়েছিলেন, ‘ব্লেস অ্যাটিটিউড’। নগর জীবনে মানুষ প্রতিদিন এত ঘটনা, দুর্ঘটনা ও তথ্যের মুখোমুখি হয় যে, ধীরে ধীরে তার আবেগগত প্রতিক্রিয়া ভোঁতা হয়ে যায়। অন্যের কষ্ট আর তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। প্রতিদিন শত শত দুর্ঘটনা, যুদ্ধ, হত্যা, নির্যাতনের ভিডিও দেখতে দেখতে অনেকের মনে সহমর্মিতার পরিবর্তে এক ধরনের আবেগগত ক্লান্তি তৈরি হয়।

ফরাসি দার্শনিক জঁ বোদ্রিয়ার আরও গভীর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, আধুনিক মানুষ বাস্তবতার চেয়ে তার প্রতিচ্ছবির মধ্যে বেশি বাস করে। অনেকের কাছে ঘটনাটি ঘটার চেয়ে সেটি রেকর্ড করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে একজন আহত মানুষ কখনো কখনো একজন সহায়তার প্রয়োজনীয় মানুষ হিসেবে না দেখে বরং ‘কনটেন্ট’ হিসেবে দেখা শুরু হয়।

এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ। যখন মানুষের কষ্ট অন্য মানুষের কাছে কনটেন্টে পরিণত হয়, তখন মানবিকতার জায়গাটি সংকুচিত হতে শুরু করে। আর সেই কাজটিই ক্রমাগতভাবে আমাদের সমাজব্যবস্থাকে আঁকড়ে ধরছে। তবে এর ফলাফল অনেক ভয়াবহ হতে চলেছে। যদি এমন আচরণ ক্রমাগত বাড়তেই থাকে তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে চরম মূল্য দিতে হবে।

আমাদের শিশুরা আসলে কী শিখছে? তারা দেখছে, কেউ রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকলে আগে মোবাইল বের করতে হয়। কেউ বিপদে পড়লে আগে ভিডিও ধারণ করতে হয়। সহমর্মিতা নয়, ভাইরাল হওয়াই যেন বড় অর্জন। সমাজবিজ্ঞানী অ্যালবার্ট বান্দুরা-এর সোশ্যাল লার্নিং থিওরি অনুযায়ী, শিশুরা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আচরণ শেখে। বড়দের আচরণই তাদের জন্য শিক্ষা। যদি তারা বারবার দেখে যে মানুষ সাহায্যের পরিবর্তে ভিডিও করছে, তবে তারাও সেটিকেই স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গ্রহণ করবে।

অন্যদিকে মার্কিন সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট ডি. পুটনাম তার বিখ্যাত গ্রন্থ বোলিং এলোন-এ দেখিয়েছেন যে, আধুনিক সমাজে সামাজিক বন্ধন ও পারস্পরিক আস্থা দুর্বল হয়ে গেলে মানুষ ক্রমশ ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। তখন সমাজ একটি সম্প্রদায় হিসেবে কাজ না করে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের সমষ্টিতে পরিণত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা কি সেই দিকেই এগোচ্ছি না?

তবে পৃথিবীর সব সমাজ একই পথে হাঁটেনি। জাপানে ট্রেন দুর্ঘটনা, ভূমিকম্প কিংবা সুনামির সময় সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সহযোগিতা বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছে। জাপানে স্কুল পর্যায় থেকেই নাগরিক দায়িত্ব, দলগত সহযোগিতা এবং দুর্যোগকালীন সহায়তার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ফলে সংকটের মুহূর্তে মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়ায় সাহায্য করা।

ফিনল্যান্ড, নরওয়ে এবং ডেনমার্কের মতো দেশগুলোতে নাগরিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো সামাজিক দায়বদ্ধতা। সেখানে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় যে সমাজের দুর্বল মানুষদের পাশে দাঁড়ানো কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি একজন নাগরিকের মৌলিক কর্তব্য।

কিছু ইউরোপীয় দেশে ‘গুড সামারিটান ল’ রয়েছে, যা বিপদে থাকা মানুষকে সহায়তা করার জন্য নাগরিকদের উৎসাহিত করে এবং অনেক ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষাও দেয়। ফলে মানুষ সাহায্য করতে ভয় পায় না।

একটি দেশের যতই উন্নয়ন হোক না কেন সেখানে যদি যথাযথভাবে মানুষের মানবিকতার উন্নয়ন না ঘটে তাহলে সেটিকে আমরা কোনোভাবেই উন্নত সমাজ বলতে পারি না।

বাংলাদেশের জন্য এখানেই বড় শিক্ষা রয়েছে। শুধু কঠোর আইন করলেই হবে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিকতা, নাগরিক দায়িত্ব এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক প্রশিক্ষণ যুক্ত করতে হবে।

গণমাধ্যমকে কেবল ভিডিও প্রচার নয়, সাহায্যকারী মানুষদেরও সামনে আনতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হওয়ার সংস্কৃতির পাশাপাশি ‘মানবিক হওয়ার’ সংস্কৃতিও প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

নরসিংদীর সেই ঘটনাটি আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে। বিষয়টি শুধু একটি ট্রেন দুর্ঘটনা নিয়ে নয়; এটি মূলত আমরা কেমন সমাজে পরিণত হচ্ছি তার প্রতিচ্ছবি। মানুষ বিপদে পড়লে আমরা প্রথমে ক্যামেরা খুঁজি, আর সাহায্যের হাত পরে বাড়াই, তবে প্রযুক্তিগতভাবে আমরা যতই উন্নত হই না কেন, মানবিকভাবে আমরা পিছিয়ে পড়ব।

একটি দেশের যতই উন্নয়ন হোক না কেন সেখানে যদি যথাযথভাবে মানুষের মানবিকতার উন্নয়ন না ঘটে তাহলে সেটিকে আমরা কোনোভাবেই উন্নত সমাজ বলতে পারি না। উন্নয়নকে কেবল মাথাপিছু আয়, উঁচু ভবন বা ডিজিটাল অগ্রগতিতে পরিমাপ করা কোনোভাবেই যুক্তিসঙ্গত না।

প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয়, যখন একজন আহত মানুষ রাস্তার পাশে পড়ে থাকলে দশজন মানুষ তাকে ঘিরে ভিডিও না করে, দশটি হাত তাকে বাঁচানোর জন্য এগিয়ে আসে। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো জাতির প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তার মানবিকতায়।

ড. সুলতান মাহমুদ রানা : অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]