বিজ্ঞাপন

বাকি রামিসাদের বিচার কি নিশ্চিত হবে?

বাকি রামিসাদের বিচার কি নিশ্চিত হবে?

সারাদেশকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল শিশু রামিসার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। এই নৃশংস ঘটনা এতটাই তোলপাড় তুলেছিল যে রাষ্ট্রব্যবস্থাও নড়েচড়ে উঠতে বাধ্য হয়। আর সেই নড়াচড়ার কারণে রামিসা হত্যা মামলার বিচার বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুত বিচার হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। রাষ্ট্রপক্ষ বলছে ঘটনার পর থেকে মাত্র ১৯ দিনের মধ্যে বিচারিক রায় দেওয়া হয়েছে। রায়ে প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার  স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ধর্ষণের ঘটনা ঘটার পর সবসময়ই প্রশ্ন ওঠে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, আদালত একা ন্যায়বিচার দিতে পারে না; কারণ মামলা দায়ের, তদন্ত পরিচালনা এবং সাক্ষী উপস্থাপনের ৯৯ শতাংশ প্রক্রিয়াই রাষ্ট্র পরিচালিত। ত্রুটিপূর্ণ এই ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার অভাব আছে। আর সেই আস্থাহীনতার কারণেই ভুক্তভোগীরা মামলা এবং অভিযোগ দিতে নিরুৎসাহিত বোধ করেন, যা শেষপর্যন্ত ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

একটা বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে যে, বিচার দ্রুত হওয়া আর বিচার সম্পূর্ণ হওয়া, এক জিনিস নয়। মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে সাধারণত উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও অন্যান্য আইনগত প্রক্রিয়া বাকি থাকে। তাই ট্রাইব্যুনালের রায় দ্রুত হলেও মামলার পুরো আইনি প্রক্রিয়া চলমান থাকে। এখানে ঠিক কতটা সময় লাগবে, তা দেখার বিষয়। উচ্চ আদালতের রায়ের পর রায় বাস্তবায়নের প্রশ্ন আসে।

রামিসা হত্যা মামলার বিচার এত দ্রুত হওয়ার পেছনে কারণগুলো হচ্ছে পুলিশ তদন্ত খুব দ্রুত শেষ করেছে। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অভিযোগ গঠনের পর টানা শুনানি নেওয়া হয় এবং অধিকাংশ সাক্ষীর সাক্ষ্য স্বল্প সময়ে গ্রহণ করা হয়েছে। তবে সব ধর্ষণ ও হত্যা মামলার ক্ষেত্রে যে এমন দ্রুত বিচার হবে, তা আশা করা যাবে না।

আইনবিদরা মনে করেন, শুধু আইন কঠোর হওয়া নয়, বরং পর্যাপ্ত বিচারক, ফরেনসিক সক্ষমতা, দক্ষ তদন্ত এবং নিয়মিত মামলাগুলোও একই দক্ষতায় পরিচালনা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ন্যায়বিচারের জন্য দ্রুততা এবং যথাযথ প্রক্রিয়াটি সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচারের রায়ে মানুষ খুব খুশি হয়েছেন। মানুষ সবসময়ই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সর্বোচ্চ সাজা দেখতে চান। এর আগে ধর্ষণের আরও বহু ঘটনা ঘটেছে কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে শোরগোল ছাড়া তেমন কিছুই হয়নি।

উচ্চ আদালতের তথ্য অনুসারে, ২০২৫ এর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের ৯৯টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৩০ হাজার ৩৬৫টি।

শুধু আইন কঠোর হওয়া নয়, বরং পর্যাপ্ত বিচারক, ফরেনসিক সক্ষমতা, দক্ষ তদন্ত এবং নিয়মিত মামলাগুলোও একই দক্ষতায় পরিচালনা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ন্যায়বিচারের জন্য দ্রুততা এবং যথাযথ প্রক্রিয়াটি সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিচার চলাকালীন সময়ে নানা সংস্থার কার্যক্রম, বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা, সাক্ষীর অভাব, তদন্তে ত্রুটি, ঠিকমতো আলামত সংগ্রহ না হওয়াসহ অন্যান্য দুর্বলতার কারণে মামলার অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এরকম একটি নেতিবাচক পরিস্থিতিতে যখন স্বল্পতম সময়ে রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বিচার হলো, তখন অবশ্যই তা আশার আলো দেখিয়েছে।

এখন আমরা সবাই আশা করছি ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা মামলার বিচারের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা চালু হবে, অন্যান্য মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রযন্ত্র নড়েচড়ে বসবে। শুধু ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১৮০ জন শিশু ও নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে গণধর্ষণ ৫৬টি এবং ধর্ষণের শিকার ৬৯ জনই শিশু। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৭ জনকে।

সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে ছেলেশিশু ধর্ষণের ঘটনাও। কেবল ২০২৪ সালেই ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬টি, তবে মামলা হয়েছে ২৪টি (সূত্র: আইন ও সালিশ কেন্দ্র)।

সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পাচ্ছে আসামিরা। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে পরিবারগুলো হতাশ। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বরাবরই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ, যার মধ্যে বহু ধর্ষণ মামলা ৫ থেকে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে।

পেছনে ফিরে তাকালে দেখবো যে বিচারাধীন মামলা দ্রুত সুরাহার জন্য প্রায় ৭ বছর আগে সুপ্রিম কোর্ট যখন কিছু বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে নির্দিষ্টভাবে নারী নির্যাতন মামলার কথা ছিল না। সেইসময় একটি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় দেশের প্রায় ১০ ধরনের ট্রাইব্যুনালে করা সব ধরনের মামলার মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলাই উচ্চ আদালতের নির্দেশে সব থেকে বেশি স্থগিত থাকছে।

সারা দেশের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা উচ্চ আদালতে যে হারে স্থগিত হয়, তার থেকে অনেক বেশি হারে নারীর মামলা স্থগিত হয়। দেশের সব ধরনের ফৌজদারি অপরাধের বিচারে দীর্ঘসূত্রতার সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, নারীদের মামলাগুলোর বিচার হতেই বেশি সময় লাগছে।

যেহেতু আমাদের দেশে শিশু ও নারী ধর্ষণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাই আমরা চাইছি দ্রুত বিচার এবং অপরাধীর শাস্তি। অভিযুক্ত অপরাধী বারবার আইনের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যায় বলে বিচার প্রক্রিয়া ও বিচার ব্যবস্থার ওপরেই একধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। এর ভেতর থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। শুধু রামিসা নয়, অন্যান্য রামিসারাও যেন বিচার পায়।

আমরা দেখতে পারি অন্যান্য উন্নত দেশে ধর্ষণের জন্য কী শাস্তি আছে, কীভাবে তারা ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধকে কমিয়ে আনতে পেরেছে। বিভিন্ন দেশে আইন, বিচারব্যবস্থা ও মানবাধিকার নীতির ভিত্তিতে শাস্তি ভিন্ন। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রগুলোয় আছে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, কঠোর নজরদারি, যৌন অপরাধী নিবন্ধন এবং পুনর্বাসনমূলক ব্যবস্থা।

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় সাজার হার মাত্র ৩ শতাংশ। এর বিপরীতে প্রায় ৭০ শতাংশ মামলায় খালাস পাচ্ছে আসামিরা। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ আইন, ২০০০ অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে একটি মামলা শেষ হতে গড়ে ৩ বছর ৭ মাস সময় লাগছে। প্রতিটি মামলায় গড়ে ২২ বার শুনানির তারিখ পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ষণের জন্য বহু বছরের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে আজীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। যুক্তরাজ্যে ধর্ষণের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি বা কখনো কখনো আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে দেশগুলোতে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া খুব কঠোরভাবে ও আইনের সময় ধরে পরিচালিত হয়। কোনো কোনো দেশে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ডও আছে। ধর্ষণ তদন্তে দেশগুলো এতটা দেরি করা হয় না যে প্রমাণ, সাক্ষী, বাদী সব হারিয়ে যায়।

প্রশ্ন উঠতে পারে বাংলাদেশ কি সেই দেশগুলোর সিস্টেম অনুসরণ করতে পারে? বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের কিছু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, যেমন দ্রুত ও দক্ষ তদন্ত, ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহের উন্নতি, বিশেষায়িত আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার, সাক্ষী ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার হার বৃদ্ধি।

তবে শুধু শাস্তির মাত্রা বাড়ালেই অপরাধ কমে, এমন প্রমাণ সবসময় পাওয়া যায় না। অনেক অপরাধবিজ্ঞান গবেষণায় দেখা গেছে, অপরাধী যদি মনে করে ধরা পড়ার ভয় খুব কম এবং জামিন নিয়ে জেলখানা থেকে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব, তাহলে কঠোরতম শাস্তি হলেও প্রতিরোধমূলক প্রভাব সীমিত হতে পারে। তাই কঠোর শাস্তির পাশাপাশি নিশ্চিত তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং কার্যকর আইন প্রয়োগ সাধারণত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শাহানা হুদা রঞ্জনা : যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও কলাম লেখক