বিজ্ঞাপন

এল-নিনোর প্রভাব ও আমাদের করণীয়

এল-নিনোর প্রভাব ও আমাদের করণীয়

চলতি মৌসুমে বাংলাদেশের রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ২১ এপ্রিল ৩৯.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অন্যদিকে, রাজধানী ঢাকায় এ বছরে (১০ মে ২০২৬) এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ তাপমাত্রা উঠেছিল ৪০.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৯৭৬ সালে দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৪৩.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০২৪ সালের এপ্রিলে যশোরে রেকর্ড করা হয়েছিল। এবছরও এপ্রিলের শুরু থেকেই পারদ নামক বস্তুটি ঊর্ধ্বমুখী অবস্থান করছে।

আমরা জানি মানুষের শরীরের সাধারণ তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার চেয়ে বেশি থাকলে আমাদের শুধু অস্বস্তি লাগে না বরং তাপপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করে। প্রাথমিকভাবে তাপ ক্লান্তি এবং হিটস্ট্রোক অন্যতম। পরোক্ষভাবেও কিছু রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এই অসুস্থতাগুলো মারাত্মক হতে পারে, বিশেষ করে বয়স্ক, ছোট শিশু এবং দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্য সমস্যাযুক্ত ব্যক্তিদের মতো দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য।

হিটস্ট্রোক বলতে আমরা কী বুঝি? হিটস্ট্রোক হলো শরীরের অতিরিক্ত গরমের কারণে সৃষ্ট একটি অবস্থা। এটি সাধারণত উচ্চ তাপমাত্রার সংস্পর্শে থাকার কারণে অথবা উচ্চ তাপমাত্রায় দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিক পরিশ্রমের কারণে ঘটে। তীব্র গরমে খেটে খাওয়া মানুষের জীবিকা নির্বাহ করতে অনেক কষ্ট হয়।

শুধু মানুষ নয় অন্যান্য জীবের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বর্তমান সময়ে তাপমাত্রা এবং তাপদাহের সাথে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে এল-নিনো নিয়ে। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা এল-নিনো বিষয়টি অবহিত হলেও সাধারণ মানুষের নিকট বিষয়টিকে সহজ করে তুলতেই আজকের এই লেখাটি। 

এল-নিনো (El Niño) হলো ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধির একটি প্রাকৃতিক ও সাময়িক জলবায়ু চক্র। স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ ‘ছোট ছেলে’ বা ‘যীশুর শিশু’। এটি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ সমুদ্র স্রোত, যা বিশ্বব্যাপী বৃষ্টিপাত, খরা এবং তাপমাত্রা পরিবর্তনের মতো চরম আবহাওয়া সৃষ্টি করে।

প্রশান্ত মহাসাগরে সাধারণত পূর্ব থেকে পশ্চিমে শক্তিশালী ‘ট্রেড উইন্ড’ বা অয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়। এর ফলে দক্ষিণ আমেরিকার পেরু ও ইকুয়েডর উপকূল থেকে ঠান্ডা পানি ও পুষ্টি উপাদান ওপরে উঠে আসে এবং উষ্ণ পৃষ্ঠের পানি এশিয়ার দিকে প্রবাহিত হয়। এল-নিনোর সময় এই অয়ন বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে বা উল্টো দিকে বইতে শুরু করে।

ফলে উষ্ণ পানি এশিয়ার দিকে না গিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে জমা হয়। এটি সাধারণত ২ থেকে ৭ বছর অন্তর ঘটে এবং ৯ থেকে ১২ মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। অয়ন বায়ু হলো একটি নিয়ত বায়ুপ্রবাহ, যা পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চলে (৩০ ডিগ্রি উত্তর এবং ৩০ ডিগ্রি দক্ষিণ অক্ষাংশের মধ্যে) সারা বছর নিয়মিত ও নির্দিষ্ট গতিতে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়।

খরাপ্রবণ জেলাগুলোয় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হবে। ফলে সেচের খরচ বেড়ে যাবে এবং সময়ের সাথে সাথে জমি অনুর্বর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। যা কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে মোটেই কাম্য নয়!

প্রাচীনকালে পালতোলা বাণিজ্য জাহাজগুলো এই বায়ুর ওপর নির্ভর করে চলাচল করত বলে একে ‘বাণিজ্য বায়ু’ও বলা হয়। বৈশ্বিক পর্যায়ে, জলবায়ু বিজ্ঞানীরা নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার (এসএসটি) অস্বাভাবিকতা, বিশেষত নিনো ৩.৪ সূচক ব্যবহার করে এই ঘটনাটি পরিমাপ করেন। যখন এই অঞ্চলের এসএসটি অস্বাভাবিকতার ৩-মাসব্যাপী চলমান গড় কমপক্ষে টানা ৫ মাস ধরে +০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে, তখন একটি এল-নিনো ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করা হয়।

এল-নিনোর কারণে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, ভারত এবং আফ্রিকার কিছু অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত বা তীব্র খরা দেখা দেয়। অন্যদিকে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশগুলো যেমন পেরু এবং চিলিতে প্রচণ্ড বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখা যেতে পারে। সামগ্রিকভাবে এল-নিনো বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (National Oceanic and Atmospheric Administration, NOAA), বাংলায় একে জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন বলা হয়ে থাকে। এটি মূলত আবহাওয়া, জলবায়ু, মহাসাগর এবং উপকূলীয় পরিবেশ নিয়ে কাজ করে থাকে।

সম্প্রতি NOAA-এর জলবায়ু পূর্বাভাস থেকে জানা গেছে যে, ২০২৬ সালের মে-জুলাই পর্যন্ত একটি এল-নিনো দেখা দেওয়ার ৮২% সম্ভাবনা রয়েছে এবং এটি শীতকাল জুড়ে অর্থাৎ ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত এর প্রভাব সম্ভাবনা ৯৬% রয়েছে বলে পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে।

এল-নিনো নিয়ে বিশ্ব খুবই উদ্বিগ্ন। প্রশান্ত মহাসাগরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং ‘কেলভিন ওয়েভ’-এর মতো উষ্ণ স্রোতের কারণে বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন এটি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র ‘সুপার এল-নিনো’-তে রূপ নিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে মিশে এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে বলে অনেক বিজ্ঞানী মনে করছেন।

এল-নিনো বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে বিশ্বে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে চরম খরা ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে আমাজনসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। এল-নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে সাধারণত স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ তাপমাত্রা, তীব্র দাবদাহ এবং বর্ষাকালে তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা থাকে।

এর ফলে দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া, নদীগুলোয় পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে কৃষি ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। এই পূর্বাভাস যদি সত্য হয় তাহলে এল-নিনোর প্রভাবে বাংলাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা, তীব্র তাপপ্রবাহ এবং বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর গ্রীষ্মকালে একাধিকবার তাপপ্রবাহের আশঙ্কা করে থাকে, যা বিদ্যুৎ গ্রিড ও কৃষি খাতের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। এল-নিনোর প্রভাবে সেটির সম্ভাবনা আরও বেশি দেখা যেতে পারে। এল-নিনোর প্রভাবে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আসা আর্দ্রতার প্রবাহকে ব্যাহত করবে এবং মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে দিবে। ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের ফলে দীর্ঘ সময় ধরে শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে, যা আমন ধানের মতো ফসলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ এই ফসলগুলো নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টির পানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

এল-নিনোর কারণে প্রধান আন্তঃসীমান্ত নদী গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা জলপ্রবাহ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠা পানির পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে। ফলে বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি আরও ভূঅভ্যন্তরে প্রবেশ করে ব-দ্বীপ অঞ্চলের পানীয় জলের উৎস এবং কৃষি জমির গুণগত মান নষ্ট হতে পারে। এসব কারণে মানুষের জীবনযাত্রা এবং ফসল উৎপাদনে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাবের সম্ভাবনা দেখা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ঐতিহ্যগতভাবে শুষ্ক হলেও, এল-নিনোর স্থানীয় প্রভাবে স্বল্প সময়ের জন্য প্রবল বর্ষণ হতে পারে, যা আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করতে পারে এবং এর পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে তীব্র ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতাও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যেটি সাধারণ জীবন মানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।  

বাংলাদেশে এল-নিনোর স্বল্পমেয়াদি প্রভাবের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবগুলোর মধ্যে রয়েছে পশ্চিমাঞ্চলে (যেমন বরেন্দ্র ও রংপুর) দীর্ঘস্থায়ী খরা, আমন ধানের ফলন কমে যাওয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং বারবার ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব থেকে সৃষ্ট জনস্বাস্থ্য সংকট। এল-নিনো প্রায়শই মৌসুমি বায়ুর আগমনকে এক মাস পর্যন্ত বিলম্বিত করলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত কমে যাবে। 

বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় বৃষ্টি-নির্ভর কৃষি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। বিশেষত, দেশের প্রধান খাদ্য আমন ধানের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। কিছু কিছু জায়গায় ফসল নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যা খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে। এল-নিনোর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব হলো তাৎক্ষণিক তাপপ্রবাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রংপুরের মতো অঞ্চলগুলো দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের সম্মুখীন হবে।

খরাপ্রবণ জেলাগুলোয় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রকট হবে। ফলে সেচের খরচ বেড়ে যাবে এবং সময়ের সাথে সাথে জমি অনুর্বর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। যা কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে মোটেই কাম্য নয়!

বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীসহ প্রধান জলপ্রবাহ ব্যবস্থাগুলোতে পানির পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে। নদীর উজানের মিঠা পানির প্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়লে, বঙ্গোপসাগরের লবণাক্ত পানি আরও অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে পারে। এই দীর্ঘমেয়াদি অবক্ষয় মিঠা পানির সরবরাহ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেতে পারে। এর প্রভাবে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রকে হুমকির মুখে ফেলে দিবে এবং উপকূলীয় মৎস্য ও জলজ চাষেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সবচেয়ে উপকুলবাসীদের জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। এল-নিনোর প্রভাব যদি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় বিদ্যমান থাকে তবে সেখানেও এল-নিনো-জনিত অনুরূপ কৃষি ঘাটতির সম্মুখীন হতে পারে। আর যদি সেটি বাস্তবেই হয় তাহলে তারাও খাদ্য সুরক্ষার জন্য রপ্তানি সীমিত করে দিলে বাংলাদেশকে আমদানিকৃত খাদ্য ও কৃষি উপকরণের আকাশছোঁয়া মূল্য সামলাতে হিমশিম খেতে হতে পারে। ফলে অর্থনীতির ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।  

তাপমাত্রার চরম ওঠানামা এবং অনিয়মিত ও নির্দিষ্ট স্থানে ভারী বৃষ্টিপাতের সংমিশ্রণ মশার বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে দেবে। ফলে কলেরা ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি মারাত্মক ও দীর্ঘস্থায়ী ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী তীব্র তাপপ্রবাহ বাইরের শ্রম ক্ষমতা হ্রাস করে, যা অসংগঠিত খাত, কৃষি এবং নির্মাণ শিল্পকে প্রভাবিত করবে।

এল-নিনো হলো প্রাকৃতিক সামুদ্রিক ও আবহাওয়া সংক্রান্ত ঘটনা, যা এড়ানোর কোনো উপায় নেই। তবে সঠিক পূর্বপ্রস্তুতি, জলবায়ু-সহনশীল পরিকল্পনা এবং জরুরি সতর্কবার্তা মেনে চলার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

গ্রামীণ এলাকায় ফসলের ক্ষতি এবং পানীয় জলের অভাব ঢাকার মতো প্রধান শহরাঞ্চলের দিকে জলবায়ুজনিত অভিবাসনকে চালিত করার সম্ভাবনা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে পারে, যা শহরের অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে।

এল-নিনো হলো প্রাকৃতিক সামুদ্রিক ও আবহাওয়া সংক্রান্ত ঘটনা, যা এড়ানোর কোনো উপায় নেই। তবে সঠিক পূর্বপ্রস্তুতি, জলবায়ু-সহনশীল পরিকল্পনা এবং জরুরি সতর্কবার্তা মেনে চলার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। এল-নিনোর প্রভাব থেকে রক্ষা পেতে রক্ষা কবচ হিসেবে সব জমিতে একই ফসল না ফলিয়ে স্থানীয় আবহাওয়ার ধরন অনুযায়ী ফসল নির্বাচন করা বাঞ্ছনীয়।

এ ব্যাপারে মাঠ পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখলে প্রান্তিক কৃষকেরা লাভবান হবেন। খরাপ্রবণ এলাকায় খরা-সহনশীল ফসলের চাষ করা বাঞ্ছনীয়। জমিতে মালচিং পদ্ধতি ব্যবহার করে মাটিতে পানির আর্দ্রতা ধরে রাখার পরামর্শ দিয়ে কৃষককে সাহায্য করা।

অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে হিটস্ট্রোক এড়াতে প্রচুর পানি এবং লেবুর শরবত পান করুন। দিনের বেলা সরাসরি রোদে কাজ করা থেকে বিরত থাকুন। হালকা ও ঢিলেঢালা সুতির কাপড় পরিধান করা। আবহাওয়া দপ্তরের সতর্কতা নিয়মিত মেনে চলা এবং দুর্বল শিশু ও বৃদ্ধদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে।

এল-নিনোর সময় অনেক অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে। তাই দৈনন্দিন জীবনে পানির অপচয় রোধ করার পরামর্শ দেওয়া। ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য বৃষ্টির পানি বা ভূগর্ভস্থ পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা। অতিবৃষ্টি বা বন্যার আশঙ্কায় বাড়ির আশেপাশের নর্দমা ও ড্রেনগুলো আগে থেকেই পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে।

সম্ভাব্য দুর্যোগের জন্য টর্চলাইট, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি ওষুধ সবসময় মজুত রাখা। এল-নিনো পরিস্থিতি ও আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাসের নিয়মিত আপডেটের জন্য সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়-এর নির্দেশিকা অনুসরণ করা। এল-নিনোর প্রভাবে ভীত না হয়ে মেধা ও সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা করার উপায়গুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করে আমরা সুস্থ থাকবো। এটায় হোক আমাদের সকলের দৃঢ় অঙ্গীকার। সবার সুস্থ জীবন প্রার্থনা করছি।  

অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা : সাবেক চেয়ারম্যান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়