ছোটবেলায় ফুটবলে লাথি না দেওয়া, কোনো বাঙালি সন্তানের পক্ষে কি সম্ভব ছিল? যদিও আমাদের দেশের নাম ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা নয়। না ফ্রান্স বা ইতালি। পর্তুগালও নয়। পৃথিবীর কোনো বিখ্যাত ফুটবল দেশের আমরা কেউ নই। কিন্তু উপরে নাম বলা দেশগুলোর মতোই, আমাদেরও আছে ফুটবল নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত উন্মাদনা, আবেগ আর ভালোবাসার এক স্বপ্নিল আবেশ।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ নেই। তাতে কী? সারা বাংলাদেশের নানা অঞ্চলের পাড়া-মহল্লাসহ গ্রামগঞ্জের আনাচেকানাচে পতপত করে উড়ছে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার পতাকা, তুলনামূলক বিচারে কম হলেও জার্মান, ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগালসহ অন্যান্য দেশের কিছু পতাকার উড়ন্ত চেহারাও অনেকটা দৃশ্যমান।
অনেক ছেলেমেয়েকে জানি, যারা সারা পৃথিবীর সব সেরা খেলোয়াড়দের নামে-চেহারায় চেনে। তারা, অর্থাৎ সেইসব খেলোয়াড়রা, নানা দেশের নানান লিগের খেলায় বিপুল অর্থের বিনিময়ে খেলতে যায়। কে কত টাকা পায়, কোন ক্লাবের হয়ে খেলে, কোচ কত টাকা পায়, তাদের নাম, তাদের আচরণ, কোচ আর খেলোয়াড়দের নানান মজার সব মন্তব্য, সব নখদর্পণে এ যুগের অনেক তরুণ-তরুণীর।
অথচ, ফুটবলের জায়গাটুকুতে আমরা দীর্ঘকাল বিশ্বপরিসরে তেমন পদচিহ্ন আঁকতে না পারলেও আমাদের মেয়েরা আমাদের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে। হয়তো মেয়েদের ফুটবলকে কেন্দ্র করেই আমাদের দেশকে সারা বিশ্ব একদিন চিনবে।
এখন যেসব কারণে চেনে, তাতে সমীহের চাইতে অবজ্ঞা, তাচ্ছিল্য বেশি-দারিদ্র্যতা আর নানা দুষ্কর্মের কারণে আমাদের যে অবয়ব আমরা বাইরের বিশ্বের কাছে পরিচিত করিয়েছি ইচ্ছে আর অনিচ্ছায়, হয়তো সেই ভুল চেহারার কারণেই অনেক ইতিবাচক বিষয় যুক্ত থাকা সত্ত্বেও আমরা অনেকটাই অনুচ্চারিত, যেন মর্গের ঠান্ডা শীতল শব।
গার্মেন্টস সেক্টরে আমাদের সুনাম আছে, কিছু উল্লেখযোগ্য পণ্য রপ্তানিতেও বিশিষ্ট স্থান জুড়ে আছি, ক্রিকেটের মতো খেলায় বিস্ময়কর উত্থান ও ব্যাপক সম্ভাবনা নিয়েও কোথায় যেন আটকে যাই।
নব্বই মিনিটের যে উত্তেজনাকর সময়, বাইশ খেলোয়াড়, পাঁচ রেফারি, আর কোটি দর্শকের যে ক্ষণে ক্ষণে হৃৎস্পন্দন থেমে যেতে যেতে আবার সচল হওয়ার যে জোয়ার, ফুটবল-অনাসক্ত কোনো মানুষকে এর উচ্চতা, এর বিস্তৃতি কথায় বোঝানো প্রায় অসম্ভব।
স্কুলের মাঠে, মাঠের বাইরের মাঠে, ধানক্ষেতে ফুটবল খেলতে খেলতে একসময় নিজেকে আবিষ্কার করি টেলিভিশনের পর্দায় চোখ- রাখা এক সাধারণ দর্শকের রূপে। আবাহনী-ব্রাদার্স-মোহামেডানের খেলা, মাঠে বসে দেখেছি। বাংলাদেশের সত্তরের আর আশির দশকের সব সেরা খেলোয়াড়দের খেলা মাঠেই দেখেছি।
খেলায় হেরে যাওয়ার বেদনা শুধু সমর্থনকারীকে কাঁদায় না, এই বেদনা স্পর্শ করে প্রায় সব দর্শককেই। আসলে, এই ফুটবল মাঠের আবেগের ভেতর দিয়ে আমরা যেন মানুষের বিশাল বিচিত্র জীবনের এক অসামান্য প্রতিচ্ছবিকেই দেখতে পাই। মানুষের জীবনের তুচ্ছ ক্ষুদ্র অনেকগুলো ছোট ছোট ঘটনার, এক আলো ঝলমল মঞ্চে আমরা প্রতীকী এক মঞ্চায়ন যেন দেখতে পাই।
স্কুলের মাঠে, মাঠের বাইরের মাঠে, ধানক্ষেতে ফুটবল খেলতে খেলতে একসময় নিজেকে আবিষ্কার করি টেলিভিশনের পর্দায় চোখ- রাখা এক সাধারণ দর্শকের রূপে। আবাহনী-ব্রাদার্স-মোহামেডানের খেলা, মাঠে বসে দেখেছি। বাংলাদেশের সত্তরের আর আশির দশকের সব সেরা খেলোয়াড়দের খেলা মাঠেই দেখেছি।
মারামারির দৃশ্য দেখেছি। পুলিশের লাঠির মার আর টিয়ারগ্যাসে চোখ জ্বলার অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে পালিয়ে বেঁচেছি। এসবের পর থেকে গৃহজীবী শ্যামবালক। বুকের ভেতর পুষে রেখেছি ফুটবল বিশ্বকাপের সোনার ময়নাপাখিটাকে। ফুটবলে আমাদের অনেকেরই তিন টিমের প্রতি ভালোবাসার আনুকূল্য দেখতে পেতাম, বিশ্বকাপে ব্রাজিল, পশ্চিমবঙ্গের লিগে ইস্টবেঙ্গল আর বাংলাদেশের ঢাকা লিগে আবাহনী। আর ক্রিকেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
একটা সময় ছিল, কেবল কালো মানিক পেলের জন্যেই লোকে ব্রাজিল সমর্থন করতো। আর আজ মেসির জন্যে করে আর্জেন্টিনা। রোনালদোর জন্যে পর্তুগাল। এতসব প্রতিভাবান ফুটবলার বিভিন্ন দেশ আমাদের উপহার দিয়েছে যে, নাম বলে শেষ করা যাবে না।
বৃহত্তর সাধারণ মানুষের খেলা হিসেবে ফুটবল সবার আগে। সাধারণ মানুষ সে অর্থে সাহিত্যের তত ঘনিষ্ঠ না হলেও ফুটবলসহ নানা খেলা নিয়ে কিছু লেখক আর ক্রীড়াক্ষেত্রের সাংবাদিক অজস্র দুর্দান্ত সাহিত্য গুণসম্পন্ন লেখার জন্ম দিয়েছেন। ওপার বাংলার মতি নন্দীর কথা সবাই কমবেশি জানেন। আমার বন্ধু কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়েরও ফুটবল নিয়ে এক বিশাল বই আছে।
আরও পড়ুন
একদল দার্শনিক একবার এমন প্রশ্ন তোলেন যে, বিশ্বকাপ ফুটবলের এমন উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে নাকি সাধারণ মানুষকে তার আসল ক্ষুধার গল্প ভুলিয়ে রাখা হচ্ছে। আসল ক্ষুধার কথা কেউ কি ভোলে? আর ভুলেও যদি যায় মেসি-রোনালদো কিংবা বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সময়ের সোনালি প্রজন্মের একগুচ্ছ অসামান্য কুশলী ক্রীড়াবিদ শিল্পীর পদযুগলের অমিতবিক্রম শিল্প সৌকর্যের সৃজনানন্দে, গোল উৎসবের আশ্চর্য সব শিল্পিত উদযাপনে, তবে যাক, ভুলে যাক সব। আনন্দ পাওয়ার আনন্দ সবচেয়ে বড় আনন্দ।
বিশ্বকাপ আমার কাছে ২৯ ফেব্রুয়ারি জন্মদিনের মতো। প্রতি চারবছর পর একবার করে আসে। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় কত কিছুই যে বদলে যায়! ভেন্যু বদলায়। আয়োজক বদলায়। খেলোয়াড় বদল হয়। নতুন নতুন খেলোয়াড়দের মুখ দেখা যায়।
নতুন রেফারি। নতুন ধরনের গোল। নতুন নতুন উদযাপনের ভঙ্গি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের নতুন গায়িকা-গায়ক। ঢোল-ড্রামের ইতিহাস চাপা দিয়ে ভুভুজেলার আফ্রিকান উত্তুঙ্গ কানফাটানো মাঠজোড়া বিস্ফোরণ। আফ্রিকান নারীর বহুবর্ণিল পোশাকআশাক, সাজসজ্জা, হেয়ারস্টাইলের সৃজনীকলা-আরও যে কত কিছু!
ব্রাজিল-সুন্দরীরা না ফরাসি-সুন্দরীর দল, নাকি স্প্যানিশ যুবতীরা এবার চোখের দৃষ্টি কাড়বে বেশি! নাকি ইংলিশ-জার্মান আয়ত-নয়নিকারা? মাঠের ভেতর ঢুকে পড়া পাগল ফ্যানের দল এবারও কি পুলিশ-রক্ষীদের চোখ এড়িয়ে নতুন করে চ্যালেঞ্জ নেবে? এরকম হাজারও প্রশ্ন নতুন করে তুলে আবারও একটা নতুন বিশ্বকাপের পর্দা উঠতে যাচ্ছে শিগগিরই। সবাই ঊর্ধ্বশ্বাসে অপেক্ষায় আছে।
ফুটবলের আদি দেশ চীন, এই জানা তথ্য ঘুরেফিরে সেই ব্রিটিশদের কৃতিত্বের ঝোলায় কীভাবে জানি জমা হয়ে আছে। ক্রিকেটের মতোই অনেকটাই। খেলাটা যে আমাদের বৃহত্তর সংস্কৃতির অংশ, এটা যেন আমরা ভুলেই থাকি প্রায়। সারা পৃথিবীতে সূর্য ডুবতে না দেওয়ার অহমিকার পাশাপাশি এক ধরনের সভ্যতার বিকাশ তো ব্রিটিশদের ছাতার নিচেই হয়েছিল।
সেই সভ্যতার পথ ধরেই খেলাধুলা বিকশিত হয়েছে। আজ নানা তথ্যের আলোকে এটুকু আমরা জেনেছি যে, সবটাই ফরাসি ভাষা সভ্য গ্রিসের অবদান। আজকের ম্যারাথন দৌড় যে গ্রিকদের যুদ্ধের তথ্য দ্রুত আদান- প্রদানের পরিবর্তিত রূপ, সেকথাটাও তো এক পরম বিস্ময়।
ভরপ্রাণ আনন্দ আমরা একটা নির্দিষ্ট সময় পরিসরে ফুটবল ছাড়া আর কোন খেলার ভেতর পায় না। আর সব ধরনের দর্শকের এতটা জড়িত আর কোনো খেলার ক্ষেত্রেই তেমন একটা দেখা যায় না, ফুটবল ছাড়া।
ছাত্রজীবনে হলে দু’চারবার খেলা দেখেছি, আবছা মনে পড়ে। তবে মনজুর (সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম) ভাইয়ের বাসায় ছাত্রজীবনের শেষে, তার ড্রয়িং রুমে শুয়ে একা একা বিশ্বকাপের সেইসব স্নায়ুছেঁড়া মারাত্মক উত্তেজনাপূর্ণ খেলা দেখা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা।
একটা সময় ছিল, কেবল কালো মানিক পেলের জন্যেই লোকে ব্রাজিল সমর্থন করতো। আর আজ মেসির জন্যে করে আর্জেন্টিনা। রোনালদোর জন্যে পর্তুগাল। এতসব প্রতিভাবান ফুটবলার বিভিন্ন দেশ আমাদের উপহার দিয়েছে যে, নাম বলে শেষ করা যাবে না।
একা একা এরকম ফুটবল খেলা দেখার অভিজ্ঞতা (বলা যেতে পারে মর্মন্তুদ যন্ত্রণা) নিশ্চয়ই আমার মতো আর কোনো দুর্ভাগার হয়তো নেই। নানা ধরনের উপাদেয় খাদ্য, চিপস-চানাচুর-কাবাব তো বটেই; সঙ্গে চা, কফি, কোল্ড ড্রিংকস এসব গলাধকরণ করতে করতে, চলমান খেলার নানা ধরনের ভুল পাসের, ভুল শটের, নির্দিষ্ট ম্যাচে ভুল খেলোয়াড় নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যে কোচের মুণ্ডুপাত করার অভাবনীয় বিশেষজ্ঞতার পরিচয় অনুন্মোচনের বেদনা নিয়ে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর পারস্পরিক লড়াইয়ের অসামান্য দৃশ্য দেখা ছিল একেকটা অনন্য রংধনুর দৃশ্য দেখার মতো।
ফুটবলের অজস্র গল্প। বেদনার। আনন্দের। চ্যাম্পিয়ন দলের উন্মাদ উল্লাসের পাশাপাশি হেরে যাওয়ার বেদনায় ভেঙে পড়া রানার্স আপ দলের অশ্রু-বেদনায় নুয়ে পড়া চেহারাগুলো সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় সহৃদয় হৃদয় সংবেদী দর্শকদের। তাদের চোখেও আনে টলোমলো জল।
আবার জয়ী দলের খেলোয়াড়রা যখন বিজিত দলের, অন্যদেশের লিগে খেলা, একই টিমের সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দেয়, তখন মানবিকতার এক উচ্চশিখরের সন্ধান আমরা পেয়ে যাই। তখনো চোখ ভিজে ওঠে দর্শকদের, চোখ ভেসে যায়।
ফুটবল নিয়ে যা-ই বলি না কেন, এর ভেতরকার আসল সত্য হলো, সারা পৃথিবীর বহুজাতিক, বহু বর্ণ আর গোত্রের, বহু ভাষাভাষী মানুষগুলো, তাদের পোশাকআশাক আর সাংস্কৃতিক বিন্যাসের বিস্ময়কর, বিস্তৃততর প্রেক্ষাপটকে এক সুনির্দিষ্ট সময়বৃত্তের ভেতর দেখে নেওয়ার এমন আনন্দময়, দু’চোখ জোড়ানো সুযোগ আর কোথায় পাওয়া যাবে?
মহামানবের মিলনমেলার এমন উৎসবের আয়োজন চিরকালই বহমান থাকুক। এটাই কামনা করি।
তুষার দাশ : কবি, প্রাবন্ধিক, সমালোচক

