বিজ্ঞাপন

২০২৬-২৭ কৃষি বাজেট, খাদ্যনিরাপত্তার নতুন অঙ্গীকার

২০২৬-২৭ কৃষি বাজেট, খাদ্যনিরাপত্তার নতুন অঙ্গীকার

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গ্রামের মাঠে দাঁড়িয়ে কৃষক আব্দুল করিম আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলেন, এ বছরের বৃষ্টি কেমন হবে, সার ও বীজের দাম কতটা সামলানো যাবে, আর ফসলের ন্যায্যমূল্য তিনি আদৌ পাবেন কি না।

ঠিক সেই সময় পাশের বাড়ির স্কুলশিক্ষক মোবাইলে জাতীয় বাজেটের খবর শুনে তাকে বললেন, ‘এবার কিন্তু কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’

করিমের চোখে তখন এক ধরনের কৌতূহল। কারণ তিনি জানেন, দেশের বাজেটের বড় বড় সংখ্যা শেষ পর্যন্ত তার জমি, ঘাম আর তার পরিবারের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কৃষি, খাদ্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ৪৩ হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা দেশের মোট জিডিপির ০.৬৩ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই তিন খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৭ হাজার ১২৬ কোটি টাকা বা জিডিপির ০.৬১ শতাংশ। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে বরাদ্দ বেড়েছে ৬ হাজার ২০৯ কোটি টাকা।

এই বৃদ্ধি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষকের কল্যাণ এবং টেকসই কৃষি-অর্থনীতির প্রতি সরকারের অগ্রাধিকারকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে।

এক সময় কৃষিকাজ মানেই ছিল অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরতা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে তথ্য ও প্রযুক্তি ছাড়া কৃষির উন্নয়ন কল্পনা করা কঠিন। এ কারণেই বাজেটে ডিজিটাল কৃষি ও স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

করিমের মতো একজন কৃষকের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং লাভের নিশ্চয়তা। তাই বাজেটে কৃষি ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং কৃষি যান্ত্রিকীকরণে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আধুনিক কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লে শ্রম ব্যয় কমবে, সময় বাঁচবে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে ছোট ও মাঝারি কৃষকরাও আধুনিক কৃষির সুফল ভোগ করতে পারবেন।

এক সময় কৃষিকাজ মানেই ছিল অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরতা। কিন্তু বর্তমান বিশ্বে তথ্য ও প্রযুক্তি ছাড়া কৃষির উন্নয়ন কল্পনা করা কঠিন। এ কারণেই বাজেটে ডিজিটাল কৃষি ও স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

মাটির স্বাস্থ্য, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগবালাই শনাক্তকরণ এবং বাজার তথ্য, সবকিছু যদি প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষকের হাতে পৌঁছে যায়, তবে উৎপাদন আরও পরিকল্পিত ও লাভজনক হবে।

গ্রামের চায়ের দোকানে বসে করিম শুনলেন আরেকটি সুখবর। প্রান্তিক কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ডের মাধ্যমে বছরে ২ হাজার ৫০০ টাকা সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার জন্য ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই উদ্যোগ শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং প্রান্তিক কৃষকদের জন্য একটি সামাজিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে।

কৃষকের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ফসল সংরক্ষণ এবং বাজারজাতকরণ। অনেক সময় ভালো ফলন হলেও সংরক্ষণের অভাবে কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করেন। তাই বাজেটে কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বাজারব্যবস্থা উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। উন্নত গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ এবং দক্ষ সরবরাহ ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠলে কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

বাজেটে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কর-সুবিধা প্রদানের উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কর-সহায়তা যেমন বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে, তেমনি বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন কৃষকের আয় বাড়াতে সহায়ক হবে।

এছাড়া সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কৃষি এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সাশ্রয়ী ও আধুনিক সেচব্যবস্থা কৃষি উৎপাদনকে আরও স্থিতিশীল করতে সাহায্য করবে। বিশেষ করে খরা বা অনিয়মিত বৃষ্টিপ্রবণ এলাকায় এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বাজেটে কৃষিতে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা জোরদার করার যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা ভবিষ্যতের স্মার্ট বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। কৃষকের নিবন্ধন, ভর্তুকি বিতরণ, বাজার তথ্য এবং সরকারি সেবা ডিজিটাল মাধ্যমে সহজলভ্য হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পাবে।

কৃষকের ঋণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কৃষকের ঋণ মওকুফ ও আর্থিক সহায়তামূলক উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজার সংকটের কারণে যারা ক্ষতির মুখে পড়েন, তাদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক বার্তা।

দিন শেষে করিম যখন নিজের জমির আইল ধরে বাড়ি ফিরছিলেন, তখন তার মনে হচ্ছিল, বাজেটের এই বরাদ্দগুলো যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে কৃষকের জীবন আরও বদলে যেতে পারে। কারণ কৃষি শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়; এটি বাংলাদেশের সংস্কৃতি, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি।

কৃষকের ঋণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। কৃষকের ঋণ মওকুফ ও আর্থিক সহায়তামূলক উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজার সংকটের কারণে যারা ক্ষতির মুখে পড়েন, তাদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক বার্তা।

বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রায় কৃষি এখনও অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শিল্পায়ন ও নগরায়নের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী কৃষি ব্যবস্থা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে কৃষি, খাদ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি একটি সুদূরপ্রসারী বিনিয়োগ, যা দেশের মানুষের পুষ্টি, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কৃষিখাতকে কেবল একটি উৎপাদন খাত হিসেবে নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কৃষি ভর্তুকি বৃদ্ধি, যান্ত্রিকীকরণ, স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষক কার্ড, সেচ সম্প্রসারণ, বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষকের আর্থিক সুরক্ষার মতো উদ্যোগগুলো একটি আধুনিক ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার পথকে আরও সুগম করবে।

যদি পরিকল্পিতভাবে এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়, তবে এই বাজেট শুধু কৃষকের মুখে হাসিই ফোটাবে না, বরং একটি সমৃদ্ধ, আত্মনির্ভরশীল ও খাদ্যনিরাপদ বাংলাদেশের ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করবে।

কৃষকের স্বপ্ন আর রাষ্ট্রের পরিকল্পনা যখন এক সুতোয় গাঁথা হয়, তখনই একটি জাতির ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট কৃষির নতুন স্বপ্ন, খাদ্যনিরাপত্তার নতুন অঙ্গীকার।

সমীরণ বিশ্বাস : কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
[email protected]