বিজ্ঞাপন

বাজেটে এভিয়েশন ও পর্যটন : স্বপ্ন বাস্তবায়ন কি সম্ভব?

বাজেটে এভিয়েশন ও পর্যটন : স্বপ্ন বাস্তবায়ন কি সম্ভব?

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন খাতকে দীর্ঘদিন ধরে বিবেচনা করা হলেও বাস্তবতা হলো, জাতীয় বাজেটে এই খাতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি এখনো মূলত অবকাঠামো নির্মাণকেন্দ্রিক।

২০২৩-২৪ থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারের অগ্রাধিকার ছিল বিমানবন্দর নির্মাণ, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন; কিন্তু সেই অবকাঠামোকে ঘিরে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার বিষয়টি এখনো কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায়নি।

২০২৩-২৪ অর্থবছর ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ সরকার বাজেট পেশ করেছিল, তা বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছে জুলাই আন্দোলনের ফসল হিসেবে স্বীকৃত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার কোনো জবাবদিহিতা ছিল। সর্বশেষ ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করে জনগণের ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার।

চার অর্থবছরে চার ধরনের বাজেট পেশ করা হয়েছিল কিন্তু উল্লেখিত বাজেটে এভিয়েশন ও পর্যটন খাতে বাস্তবিক কোনো পরিবর্তন আমরা দেখিনি।

৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, দেশের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাজেট, কিন্তু এভিয়েশন ও পর্যটন খাতের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট ১৮৮৪ কোটি টাকা। এ খাতে স্বপ্ন পূরণে কতটুকু বাস্তবসম্মত হয়েছে তা সময়ই বলে দেবে।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬,৫৯৭ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫,৬৯৫ কোটি টাকায়।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দ আরও নেমে আসে ২,৪৫৫ কোটিতে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বরাদ্দ দেওয়া হয় ১,৮৮৪ কোটি টাকা। এই ধারাবাহিক হ্রাস অনেকের কাছে উদ্বেগের কারণ হতে পারে, কিন্তু এর পেছনে রয়েছে বাস্তবতা।

শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ এবং অন্যান্য বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছানোর ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের স্বাভাবিক সংকোচন ঘটেছে।

তবে প্রশ্ন হলো, কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রতিফলন ঘটাবে? বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) কয়েক বছরে সরকারের বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ পেয়েছে। দেশের বিমানবন্দরগুলো আধুনিক হয়েছে, ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনাল নির্মিত হয়েছে।

নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণই সফলতার শেষ ধাপ নয়। প্রকৃত সফলতা তখনই আসবে, যখন এই অবকাঠামো আন্তর্জাতিক ট্রানজিট যাত্রী, কার্গো পরিবহন, বিমান রক্ষণাবেক্ষণ শিল্প এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।

বিশ্বের অনেক দেশ বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলেছে। সিঙ্গাপুর, দুবাই, কাতার কিংবা তুরস্ক বিমানবন্দরকে কেবল যাত্রী ওঠানামার স্থান হিসেবে দেখেনি; বরং একে ব্যবসা, বাণিজ্য, পর্যটন এবং বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে।

বাংলাদেশেও এখন সেই চিন্তার সময় এসেছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল শুধু একটি স্থাপনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার আকাশপথে বাংলাদেশের নতুন অবস্থান তৈরির সুযোগ।

অন্যদিকে, পর্যটন খাতের চিত্র কিছুটা হতাশাজনক। বাজেটের বড় অংশ বিমানবন্দর উন্নয়নে ব্যয় হলেও পর্যটন অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক বিপণন এবং গন্তব্য উন্নয়নে বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে সীমিত। অথচ বিশ্বের বহু দেশ পর্যটনকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় প্রত্যেকটি দেশের পর্যটন ও এভিয়েশন খাতের আয় জিডিপিতে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। বাংলাদেশেও সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র সঠিক পরিকল্পনার অভাবে পর্যটন ও এভিয়েশন খাত পিছিয়ে পড়া খাতগুলোর মধ্যে অন্যতম খাত হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের মতো বিশ্ব ঐতিহ্য, পার্বত্য অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং সমৃদ্ধ সংস্কৃতি। কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যটক আকর্ষণে আমরা এখনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করতে পারিনি। এর অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং বৈশ্বিক বিপণনের অভাব।

বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন এবং ট্যুরিজম বোর্ডের কার্যক্রম আরও গতিশীল করা জরুরি। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটন বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং, ডিজিটাল প্রচারণা, পর্যটন নিরাপত্তা এবং সেবার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স-এর ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। নতুন বিমান সংযোজন বা রুট সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিচালন দক্ষতা, সেবার মান এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা। বিমান সংস্থা লাভজনক না হলে দেশের এভিয়েশন খাতের টেকসই উন্নয়নও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

আজকের বাস্তবতায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অবকাঠামো নির্মাণ থেকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে যাত্রা। বিমানবন্দর নির্মিত হয়েছে, এখন প্রয়োজন সেই বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কার্গো হাব গঠন, ট্রানজিট সুবিধা সম্প্রসারণ এবং পর্যটন শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।

নতুন সরকারের পুরাতন স্বপ্ন, অব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলো ব্যবহার উপযোগী করে দেশের আকাশপথকে আরও গতিশীল করে দেশের সার্বিক অর্থনীতির চিত্র পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে এভিয়েশন খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রদান না করলে স্বপ্ন বাস্তবায়ন বাধার সম্মুখীন হতে পারে। সংশোধনী বাজেটে কিংবা সম্পূরক বাজেটে এ খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ করলে স্বপ্ন বাস্তবায়ন আরও সহজ হতে পারে।

বাজেটের অঙ্ক কমছে কী বাড়ছে, তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বরাদ্দকৃত অর্থের কার্যকর ব্যবহার। কারণ একটি আধুনিক বিমানবন্দর শুধু কংক্রিটের স্থাপনা নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক সংযোগ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রতীক।

বাংলাদেশ এখন সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অবকাঠামো নির্মাণের যুগ প্রায় শেষ। সামনে শুরু হতে যাচ্ছে অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টির নতুন অধ্যায়।

সরকারের নীতিনির্ধারক, এভিয়েশন খাতের অংশীজন এবং পর্যটন সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত উদ্যোগই নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশের আকাশপথ ও পর্যটন শিল্প আগামী দশকে দক্ষিণ এশিয়ার সাফল্যের গল্প হবে, নাকি অপূর্ণ সম্ভাবনার আরেকটি অধ্যায় হয়ে থাকবে।

মো. কামরুল ইসলাম : ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক, ঢাকা পোস্ট