বিজ্ঞাপন

২০২৬-২৭ বাজেট : রাজস্ব আদায় ও ঘাটতি মোকাবিলায় সম্ভাব্য কার্যকর কৌশল

২০২৬-২৭ বাজেট : রাজস্ব আদায় ও ঘাটতি মোকাবিলায় সম্ভাব্য কার্যকর কৌশল

১১ জুন ২০২৬ অর্থমন্ত্রী মহান জাতীয় সংসদে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেন, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৩.৭%। প্রাপ্ত তথ্য নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, বাজেটে উল্লেখিত প্রতিশ্রুতিগুলো অনেকটাই জনপ্রিয় হবে যেটা অনুমেয়। কারণ নবনির্বাচিত সরকারের কাছে জনগণের আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা। আর এই প্রত্যাশাকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে সরকার ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য যে বিশাল বাজেট ঘোষণা করেছে, সেটা ‘জনগণের প্রত্যাশা পূরণের বাজেট’ বলা যায়।

এটা বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট। এই বাজেটের মূল প্রতিপাদ্য হলো, গণতান্ত্রিক, মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে যাত্রা। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে সরকার মূল্যস্ফীতি ৭.৫%-এ নামিয়ে আনার এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫% নির্ধারণ করেছে। মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫.৬৪ লাখ কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি রয়েছে ২.২৬ লাখ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৬%। এটা মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ (ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র) ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এই বাজেটের অর্থ কোন কোন খাত থেকে আসবে এবং বাজেটের ঘাটতি কীভাবে মেটানো হবে—তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা, মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা এবং অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হবে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য মোট বাজেটের ১৩.৫৯% বরাদ্দ রাখা হয়েছে যার মোট পরিমাণ হলো ১,২৭,৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে প্রায় ১৩.৬ টাকা যাবে সুদে। তারমধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১,০৫,০০০ কোটি টাকা (যেমন দেশের ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র খাত থেকে নেওয়া ঋণ) এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২২,৫০০ কোটি টাকা (যেমন বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা বিদেশি উৎস থেকে নেওয়া ঋণ)।

বিগত কয়েক অর্থবছরের উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের রাজস্ব আদায়ের হার কেবল মন্থরই নয়, বরং তা একধরনের স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে (বিভিন্ন অর্থনৈতিক প্রতিবেদন ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই হার প্রায় ৬.৬ শতাংশ থেকে ৭.২ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে, যেখানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই অনুপাত সাধারণত ১৫ শতাংশ হওয়া আদর্শ বলে মনে করা হয়) রয়েছে। এমনকি দুই-তিন বছরে রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধির হার কোনো কোনো ক্ষেত্রে নেতিবাচক ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে রাতারাতি রাজস্ব আদায়ের জাদুকরী উল্লম্ফন আশা করা নিছক অলিক কল্পনা। ফলে প্রশ্ন ওঠে সরকার যেসব আকাশচুম্বী উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, তার অর্থায়ন হবে কোথা থেকে?

সরকার যদি বর্তমানে দেশের এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে লক্ষমাত্রা অনুযায়ী কর আদায় করতে সফল না হয় এবং বৈদেশিক ঋণ না পায়, সেক্ষেত্রে বাজেট ঘাটতি আরও বেড়ে যাবে। তখন সরকার দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করবে যা বেসরকারি খাতের অপর ঋণাত্মক প্রভাব ফেলবে। তখন ‘ক্রাউডিং আউট প্রভাব’ (Crowding Out Effect) দেখা দেবে (সহজভাবে বললে দাঁড়ায়, ব্যাংকগুলোতে জনগণের গচ্ছিত টাকা যখন সরকার নিজেই নিয়ে নেয়, তখন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে) এবং তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। বাস্তবতার নিরিখে বলা যায় সরকার দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে অনেক বেশি ঋণ নিতে পারবে না। তখন যদি সরকার টাকা ছাপে তাহলে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই সরকারকে বাজেট বাস্তবায়ন করার জন্য বড় প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

তাই লক্ষ্য অনুযায়ী রাজস্ব আদায় এবং বাজেট ঘাটতি মেটাতে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর জন্য সরকারকে কর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, করের আওতা বৃদ্ধি, কর দিতে জনগণকে উৎসাহ প্রদান, কর প্রদান প্রক্রিয়া সহজিকীকরণ এবং এতে ব্যাপক স্বচ্ছতা আনতে হবে। ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্যে সরকারের জন্য সম্ভাব্য প্রয়োজনীয় এবং কার্যকর পদক্ষেপগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১। করনীতি প্রণয়ন এবং কর আদায় কার্যক্রমকে দুটি পৃথক প্রতিষ্ঠানে বিভক্ত করা উচিত। এতে কাজের স্বচ্ছতা বাড়বে, দুর্নীতি কমবে এবং করদাতাদের হয়রানি লাঘব হবে।

২। বর্তমানে যারা করের বাইরে আছেন, বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক খুচরা বিক্রেতা, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের করের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

৩। পুরো কর ব্যবস্থাকে ডিজিটাল রূপান্তর করতে হবে। অনলাইনে সহজে রিটার্ন জমা দেওয়া, ই-টিআইএন ব্যবহার এবং ইএফডি মেশিনের মাধ্যমে ভ্যাট আদায় নিশ্চিত করলে রাজস্ব ফাঁকি কমবে।

৪। মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে লিক বা ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে। বহুজাতিক কোম্পানি ও বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ভ্যাটের সঠিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।

৫। পরোক্ষ করের (যেমন ভ্যাট ও শুল্ক) ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ কর (যেমন আয়কর ও কর্পোরেট কর) আদায় বাড়াতে হবে। এতে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যও কমবে।

এছাড়া বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কূটনীতি দক্ষতার সাথে পরিচালনা করতে হবে। একই সাথে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রবাহ যাতে আরও বাড়ে, সে ব্যাপারে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে। পাশাপাশি অপচয় ও দুর্নীতি রোধে সরকারকে সর্বদা সজাগ থাকাতে হবে।

ড. নাজমুল ইসলাম : অর্থনৈতিক বিশ্লেষক; বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অর্থনীতির শিক্ষক
[email protected]

বিজ্ঞাপন