বিজ্ঞাপন

প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্য বাজেটের সুফল পেতে করণীয় কী

প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্য বাজেটের সুফল পেতে করণীয় কী

বাংলাদেশ সরকার অর্থবছরের জন্য স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাজেটে আগের বছরের তুলনায় বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক ও সাহসী পদক্ষেপ, যা প্রমাণ করে স্বাস্থ্যখাত এখন রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের তালিকায় উঠে এসেছে।

বাজেট বাড়ানোর সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, এই বিপুল অর্থ কি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়িয়ে দিতে সক্ষম? নাকি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এমন কিছু গভীর সমস্যা রয়ে গেছে যার উন্নতি না করলে স্বাস্থ্যখাতে এই বাড়তি অর্থের সুফল জনগণ পাবে না?

সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর থেকে মানুষের গড় বয়স বেড়েছে, শিশু মৃত্যুর হার অনেক কমেছে, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে এবং সাম্প্রতিক কালে হামের দুর্দশা বাদ দিলে টিকাদান কর্মসূচি বিশ্বের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই বড় বড় সাফল্যের আড়ালে কিছু কঠিন সত্যও লুকিয়ে আছে।

বাংলাদেশের অনেক মানুষ বিশেষ করে শহরের বস্তিবাসী, বয়স্ক মানুষ, হতদ্ররিদ্য গোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, পরিচ্ছন্নতা কর্মীসহ বিভিন্ন সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, হিজড়া ও বেদে সম্প্রদায়, ভাসমান মানুষ এবং চরাঞ্চলের ও জলবায়ু-ঝুঁকিতে থাকা মানুষ এখনো সাধারণ চিকিৎসা সেবা পেতে নানা বাধার সম্মুখীন হন। এই বাধাগুলো অনেকে সময় দেখা যায় না বা বোঝা যায় না, কিন্তু এগুলো ব্যবস্থার মধ্যেই গেঁথে আছে নিবিড়ভাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট থেকে প্রান্তিক মানুষদের নিয়ে করা একটি গবেষণায় তাদের সমস্যাগুলো সামনে আনা হয়েছে। সরকার হাজার হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র এবং উপজেলা হাসপাতাল তৈরি করেছে যা সত্যিই প্রশংসনীয়। কিন্তু অনেক সুবিধাবঞ্চিত মানুষ এই সরকারি ব্যবস্থা ব্যবহার করেন না। তার বদলে তারা যান স্থানীয় ফার্মেসিতে, হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে বা চড়া দামের বেসরকারি ক্লিনিকে।

এর কারণ শুধু হাসপাতাল বা যন্ত্রপাতির অভাব নয়। সমস্যাটা আরও গভীর। মানুষ সহজে সেবার প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না, সরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর তাদের আস্থা নেই, সেবা দেওয়ার সংস্কৃতিও সংবেদনশীল নয়, ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার অভাব আছে এবং ডাক্তারের ফি না থাকলেও বা অনেক কম হলেও অন্যান্য চিকিৎসার খরচ মানুষকে নিজের পকেট থেকেই দিতে হয়।

তাহলে শুরুর প্রশ্নে ফিরে আসা যাক, শুধু বাজেট বাড়ালেই কি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ভালো হয়ে যাবে? উত্তরটা স্পষ্ট—না। টাকা প্রয়োজন, কিন্তু সেই টাকা তখনই কাজে আসবে যখন আমরা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ব যেখানে মানুষের প্রকৃত প্রয়োজন বোঝার জন্য সঠিক তথ্য থাকবে, প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা থাকবে, ব্যবস্থাপকরা দক্ষ হবেন এবং সবচেয়ে অসহায় মানুষকে বিপর্যয়কর  চিকিৎসার খরচ থেকে রক্ষা করা হবে।

জাতীয় বা গড় হিসাবের ফাঁদ থেকে বের হওয়া

জাতীয় গড় পরিসংখ্যান অনেক সময় বিভ্রান্তিকর। এই গড় হিসাব আসলে আসল ও গভীর বৈষম্যগুলো আড়াল করে রাখে। বাস্তবতা হলো বিভিন্ন প্রান্তিক গোষ্ঠীর সমস্যা একই রকম নয়, প্রতিটি গোষ্ঠীর বাধা ভিন্ন। যেমন, কিশোরী মেয়েদের জন্য বাধাটা মূলত মানসিক ও সামাজিক। নারী ডাক্তারের অভাব, গোপনীয়তার ঘাটতি এবং প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে সমাজের নেতিবাচক ধারণার কারণে তারা সমস্যা গুরুতর না হওয়া পর্যন্ত ডাক্তারের কাছে যান না।

বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য বাধাটা শারীরিক। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো না থাকা এবং হাসপাতালের ভবনগুলো সবার জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য না হওয়ায় সাধারণ একটি চেকআপও তাদের জন্য কষ্টের কারণ হয়ে যায়। অন্যদিকে হিজড়া সম্প্রদায় প্রতিনিয়ত বৈষম্য ও অসম্মানের শিকার হন। স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো তাদের সম্মানের সাথে সেবা দিতে প্রস্তুত নয়। পরিচ্ছন্নতা কর্মী বা গৃহহীন বা শ্রমজীবী মানুষের জন্য সমস্যা হলো সরকারি ক্লিনিকের সময়সূচি তাদের কাজের সময়ের সাথে মেলে না।

এই সমস্যার সমাধান করতে বাংলাদেশকে সাধারণ গড় হিসাব থেকে বের হয়ে ‘No one left behind (কেউ পিছিয়ে থাকবে না)’ কর্মসূচি চালু করতে হবে। এর জন্য দরকার তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি বদলানো। শুধু মোট সংখ্যা না দেখে প্রতিটি জেলায় লিঙ্গ, বয়স, প্রতিবন্ধিতা, আয়, পেশা এবং এলাকা অনুযায়ী মানুষ কতটা সেবা পাচ্ছে, তাও দেখতে হবে।

থাইল্যান্ডের উদাহরণ এখানে কাজে দিতে পারে। থাইল্যান্ড যখন তাদের ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা’ চালু করে, তখন তারা শুধু বাজেট বাড়িয়েই সমস্যার সমাধান করেনি বরং তারা নিয়মিত দেখত গ্রামের বা দরিদ্র মানুষ কতটা সেবা নিচ্ছে। কেউ পিছিয়ে থাকলে, তাৎক্ষণিকভাবে সেই গ্রুপকে টার্গেট করে তাদের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হতো। বাংলাদেশও প্রতিটি জেলার জন্য একটি বার্ষিক ‘স্বাস্থ্য ইকুইটি স্কোরকার্ড’ তৈরি করতে পারে এবং সে অনুযায়ী যেখানে সম্পদ বেশি বরাদ্দ করা দরকার সেখানে বেশি দিতে হবে।

প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা

সাম্প্রতিক গবেষণার দেখা গেছে, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতি মানুষের আস্থা অনেক দিন ধরেই কমে আসছে। তথ্য বলছে, মানুষ আধুনিক চিকিৎসার গুরুত্ব না বোঝার কারণে সরকারি হাসপাতালে যান না তা নয়। বরং তারা যান না কারণ সেখানে গিয়ে তাদের অসম্মান ও হয়রানির শিকার হতে হয়।

ওষুধের ঘাটতি, ডাক্তারদের অনুপস্থিতি, অতিরিক্ত ভিড়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, ডায়াগনস্টিক সুবিধা পর্যাপ্ত না থাকা এবং বকশিশের অত্যাচার এসব মিলে একটি বাজে পরিবেশ তৈরি হয়। যখন একজন অসহায় রোগী কর্মীদের কাছ থেকে অবহেলা পান, তখন প্রতিষ্ঠানের প্রতি তার আস্থা ভেঙে যায় এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকে সিস্টেমের প্রতি।

গবেষণায় দেখা গেছে, খরচ বেশি হলেও অনেক প্রান্তিকগোষ্ঠী বেসরকারি ক্লিনিকে যান বা ফার্মেসি থেকে নিজেই ওষুধ কেনেন, কারণ সেখানে অন্তত তাদের সাথে মানুষের মতো ব্যবহার করা হয় এবং দ্রুত সেবা মেলে।

এই আস্থার সংকট ছোট বিষয় না, এটি সরকারের বিনিয়োগের পুরো কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। বড় বড় সরকারি হাসপাতালে ভিড় থাকলেও উপজেলা ও তার নিচের যে হাসপাতালগুলোর শয্যা অনেক সময় ফাঁকা পড়ে থাকে বা কম ব্যবহার হয়, তা আসলে সরকারের টাকার অপচয়ই হয়।

বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, মানুষ যখন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ, বিশ্বাসযোগ্য ও সম্মানজনক মনে করে, তখন সেবার ব্যবহার অনেক বেড়ে যায়। শ্রীলঙ্কা এবং রুয়ান্ডা শুধু ভবন তৈরিতে মনোযোগ না দিয়ে সেবার মানবিক দিক গুরুত্ব দিয়েই তাদের উন্নত স্বাস্থ্য সেবার সুফল ভোগ করেছে।

রোগীর সন্তুষ্টির স্কোর সরাসরি হাসপাতাল ব্যবস্থাপকের পদোন্নতি ও বার্ষিক মূল্যায়নের সাথে যুক্ত করতে হবে। কোনো উপজেলা হাসপাতাল যদি বারবার খারাপ স্কোর পায়, তাহলে সেখানে দ্রুত তদন্ত করে সংশোধনের পথ বের করতে হবে। এতে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়বে এবং সেবার মানও উন্নত হওয়া সুযোগ তৈরি হবে।

ডিজিটাল প্রযুক্তি দিয়ে সেবাকে মানুষের কাছে পৌঁছানো

মোবাইল ব্যাংকিং এবং জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যে বিশ্বে নাম করেছে। এই ডিজিটাল দক্ষতা এখন স্বাস্থ্যসেবাকেও সবার জন্য সহজলভ্য করার কাজে লাগানো উচিত। চরসহ দুর্গম এলাকার মানুষ দূরত্ব, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং যাতায়াতের অসুবিধা ও উচ্চ খরচ ইত্যাদি কারণে সময়মতো চিকিৎসা পান না।

সাম্প্রতিক গবেষণার দেখা গেছে, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রতি মানুষের আস্থা অনেক দিন ধরেই কমে আসছে। তথ্য বলছে, মানুষ আধুনিক চিকিৎসার গুরুত্ব না বোঝার কারণে সরকারি হাসপাতালে যান না তা নয়। বরং তারা যান না কারণ সেখানে গিয়ে তাদের অসম্মান ও হয়রানির শিকার হতে হয়।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা এক্ষেত্রে একটি ভালো সমাধান হতে পারে। প্রতিটি গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিককে একটি ডিজিটাল গেটওয়েতে পরিণত করা যেতে পারে। চরাঞ্চলের একজন রোগীর এক সপ্তাহের রোজগার বাদ দিয়ে অনেক খরচ করে ঢাকা বা চট্টগ্রাম যাওয়ার দরকার নেই। বরং তিনি স্থানীয় ক্লিনিকে গিয়েই ভিডিও কলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারবেন। কিশোরী মেয়েদের জন্য থাকতে হবে নাম প্রকাশ না করে নারী স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলার সুযোগ, যাতে তারা সামাজিক চক্ষুলজ্জা ছাড়াই সেবা নিতে পারে।

ভারতের ‘ই-সঞ্জীবনী’ প্ল্যাটফর্ম এই কাজে অনেক সফল হয়েছে তারা কোটি কোটি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অনলাইনে পরামর্শ দিচ্ছে। ভালো দিক হলো বাংলাদেশকে নতুন করে শুরু করতে হবে না। ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন’-এর মতো বিদ্যমান হেল্পলাইনকে আরও শক্তিশালী করে এবং কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়মিত ইন্টারনেট, সোলার বিদ্যুৎ ও প্রশিক্ষিত কর্মী দিয়েই এই সেবা দ্রুত সারা দেশে ছড়ানো সম্ভব।

প্রযুক্তি কখনো মানুষের সেবার বিকল্প হবে না কিন্তু এটি সেই সেবাকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। সাম্প্রতিক কালে সেভ দ্য চিলড্রেন-এর একটা পাইলট দেখিয়েছে যে, প্রযুক্তির ব্যবহার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর কার্যকারিতা বাড়াতে পারে। 

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ

প্রান্তিক মানুষের কথায় বারবার একটি বিষয় উঠে এসেছে যে, দরিদ্র পরিবার অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে এবং অনেক পথ পেরিয়ে উপজেলা হাসপাতালে গিয়ে যখন শোনে আজ ডাক্তার আজ নেই, যন্ত্র খারাপ বা বিনামূল্যের ওষুধ স্টক শেষ, তখন তার ওই সিস্টেমের প্রতি আস্থা কমে যায়।

এই সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি রিয়েল-টাইম ‘ন্যাশনাল একাউন্ট্যাবিটি ড্যাশবোর্ড’ যা যে কেউ চাইলে এক্সেস করতে পারবে এবং সাধারণ স্মার্টফোনে দেখা যাবে। বিদ্যমান DHIS2 সিস্টেমের সাথে যুক্ত করে এই প্ল্যাটফর্মে ডাক্তারের উপস্থিতি (বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে যাচাই করা), বিনামূল্যের ওষুধের লাইভ স্টক তথ্য, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফির মতো যন্ত্রের চালু/বন্ধ অবস্থা, অ্যাম্বুলেন্সের তথ্য, রোগীর অভিযোগ ও সন্তুষ্টির তথ্য ইত্যাদি প্রকাশ করতে হবে। এতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যাবে।

হাসপাতালের তথ্য যখন মন্ত্রণালয়ের সার্ভারে বন্দি থাকে তখন অদক্ষতা ও দুর্নীতি বাড়তেই থাকবে। কিন্তু এই তথ্য জনসমক্ষে এলে পরিস্থিতি বদলে যাবে। সাংবাদিকরা যদি সঠিক তথ্য পান, সাধারণ মানুষ যদি নজর রাখতে পারে তাহলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে বাধ্য। সাথে সাথে দুর্নীতিও কমবে।

চিকিৎসার খরচ মেটাতে গিয়ে দরিদ্র হওয়া থেকে মানুষকে বাঁচানো

যদি চিকিৎসার খরচ মানুষকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব করে দেয়, বুঝতে হবে এই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা রয়েছে। বাংলাদেশে চিকিৎসার মোট খরচের প্রায় ৭০ শতাংশেরও বেশি নিজের ঘাড়ে পড়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় এমনকি বিশ্বেই এরকম খারাপ অবস্থা খুব বেশি দেশে নেই। এর মানে একটি বড় অসুখ মুহূর্তেই একটি পরিবারকে দারিদ্র্যতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

দরিদ্র মানুষের জন্য সাধারণ প্রিমিয়াম-ভিত্তিক বিমা ব্যবস্থা কাজ করে না। বাংলাদেশে ৮৫ শতাংশের বেশি মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে, যেখানে বেতন থেকে প্রিমিয়াম কাটার কোনো সুযোগ নেই। তাই চরম দরিদ্র মানুষের জন্য একমাত্র কার্যকর উপায় হলো কর থেকে অর্থায়িত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি।

কম্বোডিয়ার ‘হেলথ ইক্যুইটি ফান্ড’ এখানে একটি ভালো উদাহরণ। এটি একটি পুরোপুরি সরকারি কর্মসূচি যা ‘আইডিপোর (IDpoor)’ নামক একটি ডেটাবেস ব্যবহার করে অতি-দরিদ্র পরিবারগুলো সব ধরনের চিকিৎসা ও চিকিৎসা সংক্রান্ত খরচ সরকার সরাসরি হাসপাতালকে পরিশোধ করে। এই কর্মসূচি শুধু হাসপাতালের বিলই নয়, রোগী ও তার সাথে থাকা মানুষের যাতায়াত ও খাবারের খরচেরও সহায়তা দেয়। এইরকম ব্যবস্থা আমাদের দেশেও চালু করা সম্ভব।

থাইল্যান্ডের ‘সর্বজনীন কভারেজ স্কিম’-এ একই বার্তা পাওয়া যায়। চাকরিজীবীদের জন্য বিমা থাকলেও, সরকার বুঝতে পেরেছিল গ্রামের ও অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষের জন্য কর থেকে আহরিত অর্থ দিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। এই স্কিম প্রায় পাঁচ কোটিরও বেশি মানুষকে বিনামূল্যে বিস্তৃত চিকিৎসা দিয়েছে যার ফলে চিকিৎসা খরচে দেউলিয়া হওয়ার ঘটনা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে, যেখানে বাংলাদেশে প্রতি বছর এই খরচ মেটাতে গিয়ে ৫০ লাখেরও বেশি লোক দরিদ্র হয়ে যায়।

সরকার ইতিমধ্যে এই লক্ষ্যে একটি সর্বজনীন ডিজিটাল ‘হেলথ কার্ড’ চালুর ঘোষণা দিয়েছে এবং খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী এই পাঁচ জেলায় পাইলট কর্মসূচি শুরু করেছে যার লক্ষ্য ২০২৮ সালের মধ্যে সব নাগরিককে একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় যুক্ত করা।

প্রতিটি গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিককে একটি ডিজিটাল গেটওয়েতে পরিণত করা যেতে পারে। চরাঞ্চলের একজন রোগীর এক সপ্তাহের রোজগার বাদ দিয়ে অনেক খরচ করে ঢাকা বা চট্টগ্রাম যাওয়ার দরকার নেই। বরং তিনি স্থানীয় ক্লিনিকে গিয়েই ভিডিও কলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারবেন।

এই হেলথ কার্ডকে দরিদ্র মানুষের জন্য একটি সুরক্ষা ঢাল হিসেবে কাজে লাগাতে হবে। দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারের জন্য (NID ডেটাবেসের সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে) সব ডায়াগনস্টিক, ইমেজিং ও সার্জারি ফি থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি, সরকারি তালিকার সব ওষুধ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দিতে হবে যাতে বেসরকারি ফার্মেসিতে চড়া দামে কিনতে না হয়। জরুরি প্রয়োজনে জেলা বা বিশেষায়িত হাসপাতালে যাওয়ার জন্য বিকাশ/রকেটের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক যাতায়াত ভাতা নিশ্চিত করলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী উপকৃত হবে।

তথ্যের সঠিক ব্যবহার দিয়ে সেবা বৃদ্ধি

DHIS2-এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কাছে একটি বড় স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থা (এমআইএস) আছে। কিন্তু সমস্যা হলো কর্মী নিয়োগ, ওষুধ ক্রয় এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের সাথে এই তথ্যের কোনো সম্পর্ক নেই। তথ্য জমা দেওয়াটা শুধু একটি নিয়মরক্ষার কাজ হয়ে থেকে গেছে, যখন এটি হওয়া উচিত ছিল সেবা পরিকল্পনার মূল হাতিয়ার।

পুরোনো রীতি বা প্রভাবের ভিত্তিতে ওষুধ বরাদ্দ না করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত তথ্য বিশ্লেষণ করে আগে থেকেই চাহিদা বোঝা। এর মাধ্যমে প্রশাসকরা ওষুধ শেষ হওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই জানতে পারবেন এবং সরবরাহ ঠিক করতে পারবেন। যদি তথ্যে দেখা যায় কোনো এলাকায় শ্বাসকষ্ট বা মাতৃত্বকালীন সমস্যা বাড়ছে তাহলে সংকট তৈরির আগেই সেখানে অতিরিক্ত ওষুধ পাঠানো যাবে।

এর পাশাপাশি জিআইএস ম্যাপ এবং হাসপাতালের নিয়মিত রিপোর্ট মিলিয়ে চিহ্নিত করতে হবে কোন এলাকা সেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে। জনসংখ্যার তথ্যের সাথে হাসপাতালের সেবা গ্রহণের হার তুলনা করে দেখা যাবে কোন গ্রাম, বস্তি বা গোষ্ঠী পিছিয়ে আছে। যেমন কোনো ক্লিনিকে টিকাদানের হার ভালো কিন্তু প্রসবপূর্ব চেকআপের হার খুবই কম হলে সিস্টেম তা দ্রুত চিহ্নিত করবে এবং স্থানীয় টিম দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারবে। এই কাজে সরকারের এমআইএস-এর সাথে একাডেমিয়া একসাথে কাজ করাও সুযোগ রয়েছে।

স্থানীয় হাসপাতাল ব্যবস্থাপকদের ক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানো

স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালানো মানুষদের যদি সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা না থাকে, তাহলে সবচেয়ে ভালো নীতি, তথ্য ব্যবস্থা বা আর্থিক সুরক্ষা কর্মসূচিও কাজে আসবে না।

বাংলাদেশে সাধারণত সিনিয়র ডাক্তারদের কোনো ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ ছাড়াই শুধু চাকরির বয়সের ভিত্তিতে উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপক বা হাসপাতাল পরিচালক করা হয়। এর ফলে হাসপাতালগুলো একটি কঠিন আমলাতান্ত্রিক জালে আটকে থাকে এবং অনেক ভালো অবকাঠামোও কাজে লাগে না।

এই সমস্যা সমাধানে দুটি কাজ করতে হবে। প্রথমত, স্থানীয় ব্যবস্থাপকদের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা দিতে হবে। এখন একটি যন্ত্র মেরামত করতে বা প্রায় যেকোনো বিষয়ে কোন পরিবর্তন আনতে ঢাকা থেকে অনুমোদনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ব্যবস্থাপকদের নিজের বাজেট নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকলে তারা দ্রুত সমস্যা সমাধান করতে পারবেন, স্থানীয় মানুষের সুবিধার্থে সময়সূচি (যেমন সন্ধ্যা বা সাপ্তাহিক ছুটির দিনের সেবা) ঠিক করতে পারবেন এবং প্রয়োজনে ওষুধের জরুরি স্টক কিনতে পারবেন।

দ্বিতীয়ত, পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে মূল্যায়নের একটি সংস্কৃতি গড়তে হবে। ব্যবস্থাপকদের সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কর্মী পরিচালনা ও জনসংযোগে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তাদের পদোন্নতি সরাসরি যুক্ত হওয়া উচিত হাসপাতালের সেবা ব্যবহারের হার এবং সমতার লক্ষ্য অর্জনের সাথে।

যে ব্যবস্থাপক তথ্য ব্যবহার করে ডিউটি রোস্টার ঠিক করেন, বকশিশ বা দালালি বন্ধ করেন, প্রান্তিক মানুষের সাথে যোগাযোগ বাড়ান এবং রোগীর সংখ্যা বাড়ান তাকে পুরস্কার এবং বাড়তি তহবিল দেওয়া উচিত। আর যারা নিয়মিত অনুপস্থিত থাকেন বা সেবার মান খারাপ রাখেন, তাদের জবাবদিহি করতে হবে। ব্যবস্থাপকরা যখন দক্ষ নির্বাহী হয়ে উঠবেন, তখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা একটি জীবন্ত ও কার্যকর সেবায় পরিণত হবে।

শেষকথা

বাংলাদেশের সামনে এখন তার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নতুন করে গড়ার একটি বড় সুযোগ এসেছে। শুধু নতুন ভবন বা যন্ত্রপাতি কেনার মধ্যে এই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা ঠিক হবে না। কারণ দেশের সবচেয়ে অসহায় মানুষ যদি ভয়, লজ্জা বা টাকার অভাবে হাসপাতালের দরজা পার হতে না পারেন তাহলে সেই ভবন বা যন্ত্রপাতির কোনো মূল্য নেই।

একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা কতটা সফল, তা বোঝা যায় না সমাজের ধনী বা মধ্যবিত্ত মানুষদের সেবা দেখে। আসল পরীক্ষা হলো এই ব্যবস্থা সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষের সাথে কেমন আচরণ করে। যেমন, গ্রামের দরিদ্র বিধবা, প্রতিবন্ধী কিশোর, হিজড়া সম্প্রদায়ের মানুষ, শহরের ফুটপাতে ঘুমানো মানুষ, বা নদী ভাঙনের শিকার চরের জেলে।

যদি বাংলাদেশ সঠিক তথ্য, সুশাসন এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এমন একটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে  যেখানে প্রত্যেক নাগরিক বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আত্মবিশ্বাস, মর্যাদা এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার সাথে মানসম্মত চিকিৎসা পাবেন তাহলেই দেশ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার চেয়েও বড় কিছু অর্জন করবে। বেশি বরাদ্দ সে পথে একটা ভালো সূচনা, তবে যথেষ্ট নয়।

ড. শাফিউন নাহিন শিমুল : অধ্যাপক ও পরিচালক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজ্ঞাপন